Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

শিক্ষার যান, শিক্ষার বাহন : মেক’লের সহিত বিচার

Advertisement

Icon

সলিমুল্লাহ খান

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষার যান, শিক্ষার বাহন : মেক’লের সহিত বিচার

Advertisement

‘ভারতবর্ষীয় প্রাচীন জ্ঞানবিজ্ঞানের অধোগতির প্রধান কারণ এই ভিত্তির সংকীর্ণতা, ব্যাপ্তির অভাব, একাংশের সহিত অপরাংশের গুরুতর অসাম্য।’-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘প্রসঙ্গকথা,’ (১৮৯৮)

বাংলাদেশে ব্রিটিশ অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রথম পঞ্চাশ কি পঞ্চান্ন বছর পার হওয়ার আগ পর্যন্ত পূর্ব ভারত কোম্পানির সরকার এই দেশের জনশিক্ষা খাতে কোন অর্থের বরাদ্দ দেন নাই-এই সত্য সকলেই জানেন। সকলে ইহাও জানেন যে বিলেতে পার্লামেন্ট ১৮১৩ সালের সনদ আইনে যে বরাদ্দ মঞ্জুর করিয়াছিলেন, তাহার পরিমাণ ছিল সাকুল্যে দশ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড বা এক লক্ষ ভারতীয় রুপি। ১৮১৩ সালের সনদ আইনে বলা হইয়াছিল এই বরাদ্দের উদ্দেশ্য দুই: প্রথম উদ্দেশ্য ‘সাহিত্যের পুনরুজ্জীবন ও উন্নতিসাধন আর ভারতীয় পণ্ডিতদের কাজে উৎসাহ যোগান’, আর দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ‘ব্রিটিশ অধিকৃত এলাকার বাসিন্দাদের নিকট বিজ্ঞানের জ্ঞান প্রবর্তন ও প্রচারণা।’

‘বিজ্ঞানের জ্ঞান’ বলিতে ১৮১৩ সালের সনদ আইনে কি বোঝানো হইয়াছে, সেই প্রশ্নটি লইয়া কোম্পানির ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক দেখা দেয়। ইহাতে কি ভারতবর্ষের পুরানা বা পরম্পরাগত জ্ঞান বোঝানো হইল, নাকি নির্দেশ করা হইল এয়ুরোপের নতুন বিজ্ঞান ইহাই ছিল তর্কের সার। টাকাটা কার পেছনে খরচ করা কর্তব্য, সেই প্রশ্নের নিষ্পত্তি নির্ভর করে আগের প্রশ্নের মীমাংসা কি দাঁড়াইয়াছিল তাহার উপর।

বিতর্কের নিষ্পত্তি হইতে হইতে সময় পার হইল ১৮৩৫ সাল পর্যন্ত। বিজয়ী পক্ষের কর্মকর্তা, কোম্পানি সরকার নিয়োজিত শিক্ষা বোর্ডের সভাপতি আর বড়লাটের আইন ও শাসন পরিষদের সদস্য টমাস মেক’লে (১৮০০-১৮৫৯) তাঁহার প্রস্তাবে লিখিয়াছিলেন : ‘এই দেশের বাসিন্দাদের বুদ্ধিগত উন্নতির স্বার্থে সরকারের নির্দেশ অনুসারে খরচ করার মতো একটা তহবিল আমাদের হাতে আছে। প্রশ্নটি সহজ : এই তহবিলটা কাজে লাগানোর সর্বোত্তম উপায় কোনটা?’

তাঁহার সিদ্ধান্ত হইল, শিক্ষার লক্ষ্য হইবে ‘এয়ুরোপের নতুন জ্ঞানবিজ্ঞান’ প্রবর্তন আর তাহা প্রচার করিতে হইবে ইংরেজি ভাষার মধ্যস্থতায়। আজিকালি যে ভাষা চলে, তাহার কৃপায় যাহাকে বলে ‘ইংরেজি মাধ্যম’, তাহা প্রবর্তিত হইল সেই সিদ্ধান্তের জোরে। মেক’লে সাহেব মানে এখন যাঁহারা ইংরেজি মাধ্যমে বিদ্যাবিস্তারের পক্ষপাতী, তাঁহাদের অপর নাম।

ইংরেজি ভাষা কেন শ্রেয় সে কথা মেক’লে সাহেব জানাইয়াছিলেন : ‘কি সংস্কৃত কি আরবি কোন ভাষারই জ্ঞান আমার নাই। তবে ইহাদের গুরুত্ব কতটুকু তাহা সঠিক জানিবার সর্বোচ্চ চেষ্টা আমি করিয়াছি। যে সমস্ত আরবি ও সংস্কৃত বইপুস্তক সর্বাধিক প্রসিদ্ধ, আমি সেগুলির তর্জমা পড়িয়া লইয়াছি। যেমন এই দেশে তেমন স্বদেশে, পূর্বদেশের নানান ভাষার শ্রেষ্ঠ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করিয়াছি। খোদ পূর্ব ব্যবসায়ী বিশেষজ্ঞগণ পূর্বদেশীয় জ্ঞানবিজ্ঞানের মূল্য যতটুকু নির্ধারণ করেন, সেই মূল্য দিয়া গ্রহণ করিতে আমি বিলকুল রাজি। তাঁহাদের মধ্যে আমি কখনও এমন কাহারও দেখা পাই নাই যিনি অস্বীকার করিতে পারেন যে এয়ুরোপের ভালো কোন গ্রন্থাগারের এক তাক বই গুরুত্বে ভারতবর্ষ আর আরবদেশের সমগ্র জাতীয় সাহিত্যের সমান মূল্যবান।’

ইংরেজি ভাষায় বিদ্যাবিস্তারের পক্ষে মেক’লের যুক্তিটি ছিল অকাট্য : ‘ভারতের শাসকশ্রেণী যে ভাষায় কথাবার্তা বলিয়া থাকেন তাহা ইংরেজি। সরকার অধিষ্ঠিত শহরে-বন্দরে বসবাসরত উচ্চশ্রেণীর দেশীয় অধিবাসীরাও এই ভাষায় বাতচিত করেন। পূর্বদেশের সমুদ্রতীরে যত দেশ আছে, তাহাদের সর্বত্রই এই ভাষা ব্যবসায়-বাণিজ্যের ভাষা হইয়া উঠিবে এই সম্ভাবনা জারি আছে। যে দুইটি বড় এয়ুরোপিয়া সমাজ এক্ষণে গড়িয়া উঠিতেছে, একটা আফ্রিকার দক্ষিণ দিকে, আরেকটা অস্ট্রালেশিয়ায়, যে সমাজ দুইটি বছর বছর অধিক হইতে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হইয়া উঠিতেছে এবং যেগুলি আমাদের ভারতীয় সাম্রাজ্যের সহিত নিবিড়তর বন্ধনে আবদ্ধ, এই ভাষাটা তাহাদেরও ভাষা।’

কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা ছাড়িয়া যদি বলি, ভারতে ইংরেজি ভাষার একাধিপত্য সেই যে নিরঙ্কুশ হইল, আজ পর্যন্ত তাহার আর অবসান হয় নাই। মেক’লের বিজয় নিশ্চিত হইয়াছিল শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে আরবি, ফার্সি ও সংস্কৃতের সহিত তুলনায় ইংরেজি ভাষার গরিমায়।

কিন্তু এ দেশের মানুষজন যে সব ভাষার মধ্যস্থতায় চিন্তা করে বা কাজকারবার চালায়, তাহাদের তুলনায় নহে। দেশে প্রচলিত ভাষার সহিত তুলনাটা তিনি এক বাক্যেই সারিলেন, লিখিলেন : ‘যে ভদ্রলোকদের মতামতের সঙ্গে আমি সচরাচর একমত নহি, তাঁহাদের সঙ্গে একটা প্রশ্নে অবশ্য আমি একমত পোষণ করি। তাঁহাদের মতন আমিও মনে করি, আমাদের হাতের যৎসামান্য সম্বল দিয়া আমরা দেশবাসী সকলের শিক্ষার ব্যবস্থা করিতে পারিব না। এই মুহূর্তে আমাদের সাধ্যে যতটা কুলায়, ততটা দিয়া এমন একটি শ্রেণী গড়িয়া তুলিতে হইবে, যাঁহারা আমাদের এবং আমরা যে কোটি কোটি লোকের উপর শাসনের কাজ করি, তাহাদের মধ্যে দোভাষী হিসাবে কাজ করিবেন। এই শ্রেণীর লোকগুলি রক্তধারায় আর গাত্রবর্ণে ভারতীয় হইলেও রুচি, অভিমত, নৈতিক আচরণ আর বুদ্ধিশুদ্ধিতে হইবেন ইংরেজ। এই দেশের জনসাধারণের মধ্যে প্রচলিত ভাষাগুলির সংস্কার আর পাশ্চাত্য সাহিত্যের অভিধান হইতে বিজ্ঞানের ভাষা ধার করিয়া সমৃদ্ধ করার আর ভাষাগুলিকে বিশাল বিশাল সব জনগোষ্ঠীর নিকট জ্ঞান বহিয়া নিবার উপযুক্ত বাহনে পরিণত করার কাজটা আমরা এই শ্রেণীর হাতে ছাড়িয়া দিতে পারি।’

মেক’লে সাহেবের যুগ আজও অতিক্রান্ত হয় নাই। এই শ্রেণীর জন্য বরাদ্দ করা কাজটা সমাপ্ত হওয়া দূরের কথা, এখন পর্যন্ত সমাগতই হয় নাই। এই সত্য যিনি আর দশজনের আগে সাহস করিয়া বলিয়াছিলেন তাঁহার নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৮৯২ সালে যখন তাঁহার বয়ঃক্রম মাত্র একত্রিশ, তিনি রাজশাহী কলেজের অধ্যাপক ও ছাত্রছাত্রীদের সামনে “শিক্ষার হেরফের” নামক একটি প্রবন্ধ পড়িয়াছিলেন। মেক’ল প্রবর্তিত শিক্ষানীতির বিষময় ফসল অর্ধশতাব্দীর খানিক বেশি ব্যবধানে কি দাঁড়াইয়াছিল তাহার একটি পরিচয় তিনি ঐ নিবন্ধযোগে পেশ করিয়াছিলেন। বলাবাহুল্য তিনি প্রবল বিরূপ সমালোচনার মুখে পড়িয়াছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও আনন্দমোহন বসু প্রভৃতি বড় বিদ্বান তাঁহাকে একান্তে চিঠি লিখিয়া সমর্থন করিলেও তাঁহার সমর্থনে প্রকাশ্যে বিশেষ কিছু বলেন নাই।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই সংগ্রাম আমৃত্যু চালাইয়াছিলেন। নানা উপলক্ষে তিনি যে শিক্ষার মাধ্যম বা বাহনের কাজে মাতৃভাষার প্রয়োগের দাবি নিত্য তুলিবেন, তাহা স্বাভাবিক। মেক’লে সাহেবের এদেশীয় সন্ততিদের সঙ্গে তাঁহার মতবিরোধ মানে মেক’লের সহিত তাঁহার দ্বিমত। এই বক্তব্যটি আমি এখানে অল্প পরিসরে যতটা সম্ভব আলাদা করিব।

১৮৯৮ সালে এই প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথ আরেক দফা লড়াইয়ে নামিয়াছিলেন। আজিকার নিবন্ধে আমি সেই লড়াইয়ের কথাটা স্মরণ করিতেছি। ইংরেজি ১৮৭৬ সালে কলিকাতায় ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দি কালটিভেশন অব সায়েন্সেস’ নামে প্রতিষ্ঠিত অনুষ্ঠানের পঁচিশ বছর পার উপলক্ষে ঐ অনুষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার একটি বক্তৃতা। বক্তৃতাটি শোচনীয় হইয়াছিল, কারণ পঁচিশ বছর ধরিয়া বিজ্ঞানসভার গবেষণা ও প্রকাশনা, বক্তৃতা ও বিবৃতি প্রভৃতি চলিতেছিল রাজভাষা ইংরেজির যোগে, দেশের জনসাধারণ বুঝিতে পারেন এমন কোন ভাষায় নহে, অথচ পাল্টা অবহেলা-অনাদরের অভিযোগ তোলা হইল দেশ ও দেশবাসী সর্বসাধারণের বিরুদ্ধে।

রবীন্দ্রনাথ অকপটে বলিলেন, বক্তৃতার তুবড়ি ছুটাইবেন রাজভাষায় আর আক্রোশের পাত্র হইবে স্বদেশের, জনসাধারণ; এই ব্যবহারে যাহাই থাকুক, ন্যায়বিচার নাই। সরকারের নালিশ শুনিয়া ঠাকুর দুঃখ পাইয়াছিলেন। দুঃখের স্পর্শটা কবির গদ্য রচনার মধ্যেও অনুভব করা যায় : ‘অল্পকাল হইল বাংলাদেশের তৎসাময়িক শাসনকর্তা ম্যাকেঞ্জি সাহেবকে সভাপতির আসনে বসাইয়া মান্যবর শ্রীযুক্ত ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার মহাশয় তাঁহার স্বপ্রতিষ্ঠিত সায়ান্স অ্যাসোসিয়েশনের দুরবস্থা উপলক্ষে নিজের সম্বন্ধে করুণা, স্বদেশ সম্বন্ধে আক্ষেপ, এবং স্বদেশীয়দের প্রতি আক্রোশ প্রকাশ করিয়াছেন। ব্যাপারটি সম্পূর্ণ শোচনীয় হইয়া উঠিয়াছিল।’

এই করুণা, আক্ষেপ ও আক্রোশ, এককথায় নালিশটা, কি কারণে? ‘নালিশ’, ঠাকুরের কথায়, ‘এই যে বিজ্ঞানসভা দেশের জনসাধারণের নিকট হইতে উপযুক্তমত খোরাকি এবং আদর পায় না।’

তরুণ রবি ঠাকুর দেশবাসীর পক্ষ হইয়া এই নালিশের একটা প্রত্যুত্তর রচনা করিলেন, লিখিলেন খানিকটা তিতাস্বাদের কথাই, আমগাছে কাঁঠাল ফলিবে কেন? ‘বড়োলোকেরা বড়ো কাজ করিয়া থাকেন কিন্তু তাঁহারা আলাদিনের প্রদীপ লইয়া জন্মগ্রহণ করেন না। কাজেই তাঁহারা রাতারাতি অসাধ্যসাধন করিতে পারেন না। আমাদের দুর্ভাগ্য, দেশে উচ্চপদস্থ রাজপুরুষদের নাম ছোটোখাটো আলাদিনের প্রদীপবিশেষ। সেই প্রদীপের সাহায্যে এবং ডাক্তার সরকারের নিজের নাম ও চেষ্টার জোরে এই বিজ্ঞানচর্চাবিহীন বঙ্গদেশে অকস্মাৎ পাকা ভিত এবং যন্ত্রতন্ত্রসহ এক সায়ান্স অ্যাসোসিয়েশন উঠিয়া পড়িল। ইহাকে একপ্রকার ভেলকি বলা যাইতে পারে।’

ঠাকুর অধিক গিয়াছিলেন। তাঁহার মতে আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ মাত্র আরব্য উপন্যাসে জ্বলিতে পারে, বাংলাদেশের আর্দ্র হাওয়ার ছোঁয়া লাগিলে সেই প্রদীপ নিবিয়া যায় : ‘ভেলকির জোরে জনসাধারণের মনে বিজ্ঞানের প্রতি অনুরাগ সঞ্চার করা সম্ভব নহে।’ ঠাকুর লিখিলেন : ‘আজ প্রায় সিকি শতাব্দীকাল বাংলাদেশে বিজ্ঞানের জন্য একখানা পাকাবাড়ি, কতগুলি আসবাব এবং কিঞ্চিৎ অর্থ আছে বলিয়াই যে বিজ্ঞান আপনা-আপনি গোকুলে বাড়িয়া উঠিতে থাকিবে, এমন কোনো কথা নাই। আরো আসবাব এবং আরো টাকা থাকিলেই যে বিজ্ঞান আরো ফুলিয়া উঠিবে এমন কোনো বৈজ্ঞানিক নিয়ম দেখা যায় না।’

প্রবীণ ডাক্তারকে মৃদু ভর্ৎসনাই করিলেন নবীন কবি। বলিলেন, ‘এখানে সায়ান্স অ্যাসোসিয়েশন নামক একটা কল জুড়িয়া দিলেই যে বিজ্ঞান একদমই বাঁশি বাজাইয়া রেলগাড়ির মতো ছুটিতে থাকিবে, অত্যন্ত অন্ধ অনুরাগও এরূপ দুরাশা পোষণ করিতে পারে না। গাড়ি চলে না বলিয়া দেশাধিপতির নিকট দেশের নামে নালিশ রুজু না করিয়া আপাতত রাস্তা বানাইতে শুরু করা কর্তব্য।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যাহাকে বলিলেন ‘রাস্তা’ আদ্যের বাংলা ভাষায় তাহা ‘যান’ বলিয়া প্রসিদ্ধ ছিল। বৌদ্ধধর্মের দুই পন্থার হীনযান আর মহাযান নামে পুরানা সেই দিনের কথা মনে পড়ে। আজ লোকে বহুবচনে ‘যানবাহন’ বলে। বাহন চালাইতে হইলে আগে যান বানাইতে হয়। আর যান বানাইতে গেলে হাতে মাটি লাগাইতে হয়। এই প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিঃসংকোচ। তিনি জানেন : ‘বিজ্ঞান যাহাতে সর্বসাধারণের নিকট সুগম হয়, সে-উপায় অবলম্বন করিতে হইলে একেবারে মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চার গোড়াপত্তন করিয়া দিতে হয়।’ বাংলাদেশে জ্ঞানবিজ্ঞানের অধিকাংশ ‘ইংরেজি ভাষার কড়া পাহারার মধ্যে আবদ্ধ’ থাকার ফলে, তাঁহার আক্ষেপ, ‘বিদ্যালয়ে আমরা যাহা লাভ করি সমাজে তাহার কোন চর্চা নাই। সুতরাং আমাদের বিদ্যা আমাদের প্রাণের সহিত রক্তের সহিত মিশ্রিত হয় না। বিদ্যার প্রধান গৌরব দাঁড়াইয়াছে অর্থোপার্জনের উপায়রূপে।’

মহেন্দ্রলাল সরকার প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানসভার বিরুদ্ধেও একই নালিশ রুজু করা চলে: যে কয়জন ভাগ্যবান লোক অন্য কোথায়ও ইংরেজি ভাষার মধ্যস্থতায় এয়ুরোপ হইতে আনীত বিজ্ঞান শিখিলেন, বিজ্ঞানসভা তাহাদের সকাশ আবার ইংরেজিতেই এয়ুরোপিয়া বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা পেশ করিলেন; ঠাকুরের কথায় বলিতে, ‘বাকি সমস্ত বাঙালির সহিত তাহার কিছুমাত্র সংস্রব নাই।’ এই ধরনের বিজ্ঞানসভার জন্য বাংলাদেশের জনসাধারণ যে বিশেষ উদ্যোগী হইবেন না তাহাতে বিস্ময়ের কিছু নাই। ইহা লইয়া আক্ষেপ নিক্ষেপ-প্রক্ষেপ করা একান্তই বৃথা।

ঠাকুরের কথা মোটেও দ্ব্যর্থবোধক ছিল না : ‘ঘরে-বাইরে চারি দিকে বিজ্ঞানের আলোককে সাধারণভাবে পরিব্যাপ্ত করিয়া দিলে তবেই বিশেষভাবে বিজ্ঞানের চর্চা এ দেশে স্থায়ীরূপে বর্ধিত হইতে পারিবে। নতুবা আপাতত দুইদিন উন্নতি দেখিয়া অত্যন্ত উৎফুল্ল হইবার কারণ নাই-কেননা, চারি দিকের দিগন্তপ্রসারিত মূঢ়তা দিনে নিশীথে অলক্ষ্যভাবে আকর্ষণ করিয়া সংকীর্ণমূল উচ্চতাকে আপনার সহিত সমভূম করিয়া আনিবে। ভারতবর্ষীয় প্রাচীন জ্ঞানবিজ্ঞানের অধোগতির প্রধান কারণ এই ভিত্তির সংকীর্ণতা, ব্যাপ্তির অভাব, একাংশের সহিত অপরাংশের গুরুতর অসাম্য।’

বিদেশি ভাষায় বিজ্ঞানাদি শিখিবার পর যাঁহারা আরেকবার ঐ ভাষাতেই জ্ঞানবিজ্ঞানের ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেন, তাঁহারা রবীন্দ্রনাথের শ্রদ্ধার পাত্র হন নাই। তিনি আক্ষেপ করিয়াছিলেন এদেশের বিজ্ঞান ব্যবসায়ীরাও ভয়ানক কুসংস্কারাচ্ছন্ন, কেননা বিজ্ঞানের শিক্ষা দেশের মর্মমূলে প্রবেশ করে নাই।

তিনি লিখিলেন : ‘বিজ্ঞানচর্চার দ্বারা জিজ্ঞাসাবৃত্তির উদ্রেক, পরীক্ষণশক্তির সূক্ষতা এবং চিন্তনক্রিয়ার যাথাযথ্য জন্মে এবং সেইসঙ্গে সর্বপ্রকার ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত ও অন্ধ সংস্কার সূর্যোদয়ে কুয়াশার মতো দেখিতে দেখিতে দূর হইয়া যায়। কিন্তু আমরা দেখিয়াছি আমাদের দেশের ইংরেজিশিক্ষিত বিজ্ঞানঘেঁষা ছাত্ররা কালক্রমে তাঁহাদের সমস্ত বৈজ্ঞানিক কায়দা ঢিলা দিয়া অযৌক্তিক সংস্কারের হস্তে আত্মসমর্পণপূর্বক বিশ্রামলাভ করেন। যেমন পাথুরে জমির উপর আধহাতখানেক পুষ্করিণীর পাঁক তুলিয়া দিয়া তাহাতে বৃক্ষ রোপণ করিলে গাছটা প্রথম প্রথম খুব ঝাড়িয়া মাথা তুলিয়া ডালেপালায় গজাইয়া উঠে, অবশেষে শিকড় যেমনি নীচের কঠিন স্তরে গিয়া ঠেকে, অমনি অকস্মাৎ মুষড়িয়া মরিয়া যায়-আমাদের দেশের বিজ্ঞানশিক্ষারও সেই অবস্থা।’

রবীন্দ্রনাথ অকপটে তাঁহার সিদ্ধান্ত নিবেদন করিয়াছিলেন : ‘আপাতত মাতৃভাষার সাহায্যে সমস্ত বাংলাদেশকে বিজ্ঞানচর্চায় দীক্ষিত করা আবশ্যক, তাহা হইলেই বিজ্ঞানসভা সার্থক হইবে এবং সফলতা মৃগতৃষ্ণিকার ন্যায় দিগন্তে বিলীন হইবে না।’

দুর্ভাগ্যের মধ্যে, বাংলাদেশের শাসকশ্রেণী এখনও বুঝিতেই পারিতেছেন না আমাদের দেশে জ্ঞানবিজ্ঞানের অধোগতির প্রধান কারণ আজও সেই একই : ‘ভিত্তির সংকীর্ণতা, ব্যাপ্তির অভাব, (সমাজের) একাংশের সহিত অপরাংশের গুরুতর অসাম্য।’

২ জুলাই ২০২৬

সলিমুল্লাহ খান : অধ্যাপক, ইতিহাস ও দর্শন বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

(লেখকের বানান ও ভাষারীতি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে)

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

রাজনীতির ভাষা

রাজনীতির ভাষা

দিল্লিতে কী হচ্ছে

দিল্লিতে কী হচ্ছে

অর্থনীতির রক্তক্ষরণে ফুটো বন্ধ করবে কে?

অর্থনীতির রক্তক্ষরণে ফুটো বন্ধ করবে কে?

হালফিল বয়ান ধর্ষণ বৃদ্ধি কীসের আলামত

ধর্ষণ বৃদ্ধি কীসের আলামত

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম