এইচএসসি পরীক্ষা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ : একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
Advertisement
ড. ইমরান হোসেন খান
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষা শুধু একটি পাবলিক পরীক্ষা নয়; এটি বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন, অসংখ্য পরিবারের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা এবং দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার। প্রতি বছর এই পরীক্ষাকে ঘিরে শিক্ষা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অভিভাবকরা একটি বিশাল জাতীয় আয়োজনের অংশ হয়ে ওঠেন। তাই এইচএসসি পরীক্ষাকে ঘিরে যে কোনো সিদ্ধান্ত শুধু পরীক্ষার্থীদের নয়, বরং পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। এবারের এইচএসসি পরীক্ষাও সেই জাতীয় গুরুত্ব নিয়েই শুরু হয়েছে। তবে প্রথম দিন থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে অনেক শিক্ষার্থীকে ভয়াবহ দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়েছে। কোথাও কোমরসমান পানি পেরিয়ে, কোথাও নৌকায় চড়ে, আবার কোথাও দীর্ঘ পথ ঘুরে পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত এসব দৃশ্য শুধু কয়েকজন শিক্ষার্থীর কষ্টের চিত্র নয়; বরং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি নতুন বাস্তবতার প্রতিফলন।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে জাতীয় পরীক্ষা পরিচালনা করা যে কোনো রাষ্ট্রের জন্যই খুবই কঠিন দায়িত্ব। বিভিন্ন দেশেও ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, দাবানল কিংবা চরম আবহাওয়ার কারণে জাতীয় বা আঞ্চলিক পরীক্ষা স্থগিত, পুনঃনির্ধারণ অথবা বিকল্প ব্যবস্থায় নেওয়ার নজির রয়েছে। তবে এসব সিদ্ধান্ত সাধারণত পূর্বপ্রস্তুত নীতিমালা, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং শিক্ষার্থীদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয় বিবেচনায় করেই নেওয়া হয়। কারণ প্রশ্নটি শুধু পরীক্ষা নেওয়া বা না নেওয়ার নয়; বরং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, মানবিক বাস্তবতা এবং শিক্ষাব্যবস্থার ধারাবাহিকতার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য তৈরি করা।
বাংলাদেশও এখন সেই বাস্তবতার মুখোমুখি। তাই এবারের এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটিকে শুধু একটি সাময়িক ঘটনা হিসাবে দেখলে ভুল হবে। এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে নতুন করে মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। প্রশ্ন হলো-এমন একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক ছিল? এর উত্তর খুঁজতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ও বাস্তব পরিস্থিতি-দুই দিকই বিবেচনা করতে হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বন্যার কারণে রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়িসহ পুরো চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা আগেই স্থগিত করা হয়েছিল। অন্য বোর্ডগুলোর ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকার সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছে। ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার, আটটি বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার, প্রতিটি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং আবহাওয়া অধিদপ্তরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হয়। সংশ্লিষ্টদের মতামত পরিস্থিতি অনুকূলে থাকার ইঙ্গিত দেওয়ার পরই পরীক্ষা যথাসময়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
প্রকৃতপক্ষে, এটি সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য একটি অত্যন্ত কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল। কারণ পরীক্ষা পেছানো মানে শুধু একটি পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়া নয়; এর সঙ্গে ফল প্রকাশ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী শিক্ষাবর্ষের সময়সূচিও জড়িত। তাই শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, মানবিক দিক এবং শিক্ষা ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা-সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তবে একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, এইচএসসির মতো একটি জাতীয় পরীক্ষায় সব শিক্ষার্থীর জন্য সমান পরিবেশ নিশ্চিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমার মতে, পরীক্ষার আগের রাত পর্যন্ত আবহাওয়ার সর্বশেষ পরিস্থিতি আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনে পরীক্ষা স্থগিত বা বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেত। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে কিছু তাৎক্ষণিক পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছিল। যেমন, পরীক্ষার দিন কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে পানি জমে যাওয়ার পর স্থানীয় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের সমন্বয়ে পরীক্ষার্থীদের নৌকায় করে কেন্দ্রে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়। পরীক্ষা এক ঘণ্টা বিলম্বে শুরু হলেও পরীক্ষার সময়সীমা সমন্বয় করা হয়। এছাড়া দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে প্রয়োজন হলে পরীক্ষা বিলম্বিত বা স্থগিত করার ক্ষমতাও স্থানীয় প্রশাসনকে দেওয়া হয়েছিল। তবে এসব উদ্যোগের পরও একটি বিষয় স্পষ্ট, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার ক্ষেত্রে আগাম প্রস্তুতি, বিকল্প পরিকল্পনা এবং দুর্যোগকালীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। এবারের অভিজ্ঞতা আমাদের সেই শিক্ষা দিয়েছে। কারণ কেন্দ্রীয়ভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে মনে হলেও মাঠের বাস্তবতা সব জায়গায় এক ছিল না। একজন পরীক্ষার্থীর জন্য কোমরসমান পানি পেরিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছানো শুধু একটি প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি তার শারীরিক কষ্ট, মানসিক চাপ এবং পরীক্ষার প্রস্তুতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
তাই যেসব শিক্ষার্থী পরীক্ষা স্থগিতের দাবি জানিয়েছে, তাদের উদ্বেগকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। তাদের দৃষ্টিতে সবাই সমান পরিবেশে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পায়নি-এটি একটি বাস্তব ও মানবিক প্রশ্ন। একটি দায়িত্বশীল শিক্ষাব্যবস্থা শুধু পরীক্ষা আয়োজনের বিষয় নয়; বরং প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য নিরাপদ, ন্যায়সংগত ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও বহন করে। এবারের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে আরও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক ও দুর্যোগ-সহনশীল পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলাই হওয়া উচিত আমাদের মূল লক্ষ্য। এর মধ্যেই পদার্থবিজ্ঞান প্রশ্নপত্র নিয়ে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে, প্রশ্নপত্রে ত্রুটি রয়েছে এবং কয়েকটি প্রশ্ন অস্বাভাবিকভাবে কঠিন হয়েছে। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় দুটি প্রশ্নে ত্রুটির বিষয়টি স্বীকার করে এবং শিক্ষামন্ত্রী ঘোষণা দেন, ওই দুটি প্রশ্নের জন্য সব পরীক্ষার্থীকে পূর্ণ নম্বর দেওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রশ্ন প্রণয়ন ও মডারেশন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চারজন শিক্ষককে শোকজ করা হয়।
তবে প্রশ্নপত্রের মান ও কঠিনতা নিয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্বেগকেও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। একটি জাতীয় পরীক্ষায় প্রশ্ন সহজ বা কঠিন হওয়া মূল বিষয় নয়; বরং তা নির্ভুল, পাঠ্যক্রমভিত্তিক এবং সব শিক্ষার্থীর জন্য ন্যায়সংগত হওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও মডারেশন প্রক্রিয়া প্রায় দুই বছর আগে শুরু হয়েছিল এবং বর্তমান সরকার দায়িত্ব নিয়েছে মাত্র চার মাস আগে। এই ব্যাখ্যায় বাস্তবতা থাকলেও, চূড়ান্ত প্রশ্নপত্র পরীক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছেছে বর্তমান প্রশাসনের অধীনে। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে-চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে যথাযথ যাচাই ও মাননিয়ন্ত্রণের পরও ত্রুটি কীভাবে রয়ে গেল? এই প্রশ্নগুলো দোষারোপের জন্য নয়; বরং একটি আরও নির্ভরযোগ্য শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য।
এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদকেও ইতিবাচকভাবে দেখা প্রয়োজন। নতুন প্রজন্ম তাদের অধিকার, সমতা ও জবাবদিহি সম্পর্কে সচেতন। তারা প্রশ্নপত্রের ত্রুটির প্রতিকার, দায়ীদের জবাবদিহি এবং দুর্যোগ পরিস্থিতিতে পরীক্ষার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে। এসব দাবি তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসেছে। তবে গণতান্ত্রিক সমাজে প্রতিবাদের অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য প্রতিষ্ঠান ও প্রক্রিয়ার সংস্কারও সমান জরুরি। প্রতিটি প্রশাসনিক সমস্যার সমাধান শুধু পদত্যাগের দাবিতে সীমাবদ্ধ না রেখে শক্তিশালী নীতিমালা, উন্নত ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর জবাবদিহির দিকে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
এবারের অভিজ্ঞতার আলোকে সরকারের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ করণীয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথমত, দুর্যোগকালীন জাতীয় পরীক্ষা পরিচালনার জন্য একটি সুস্পষ্ট ও স্থায়ী নীতিমালা (ন্যাশনাল এক্সামিনেশন কনটিনজেন্সি ফ্রেমওয়ার্ক) প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে কোন পরিস্থিতিতে পরীক্ষা যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হবে, কখন আংশিক বা সম্পূর্ণ স্থগিত করা হবে, স্থানীয় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিধি কী হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের জন্য কী ধরনের বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হবে-এসব বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকবে। দ্বিতীয়ত, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মডারেশন ও চূড়ান্ত অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী, জবাবদিহিমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে, যাতে প্রশ্নপত্র যে সময়েই প্রস্তুত হোক না কেন, পরীক্ষার আগে একাধিক স্তরে পুনঃযাচাই ও মাননিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে যে কোনো ত্রুটি দূর করা যায়। তৃতীয়ত, সংকটকালীন সময়ে সরকার, শিক্ষা প্রশাসন, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে আরও কার্যকর ও স্বচ্ছ যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনের যুক্তি, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এবং সম্ভাব্য বিকল্প ব্যবস্থা দ্রুত জানানো যায়, অনিশ্চয়তা ও গুজব কমে এবং একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও তথ্যনির্ভর, দায়িত্বশীল ও সমাধানমুখী মতপ্রকাশের সংস্কৃতি আরও বিকশিত হয়।
শিক্ষা বোর্ডগুলোর জন্য শিক্ষা হলো-প্রশ্নপত্রের বহুস্তরীয় মাননিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করা। প্রশ্ন সহজ না কঠিন, সেটি মূল বিষয় নয়; মূল বিষয় হলো প্রশ্ন যেন নির্ভুল, পাঠ্যক্রমভিত্তিক এবং ন্যায়সংগত হয়। একটি ছোট ত্রুটিও লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর আস্থাকে নাড়িয়ে দিতে পারে। এইচএসসি ২০২৬ একসময় শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু এই অভিজ্ঞতা থেকে যদি আমরা আরও মানবিক, বৈজ্ঞানিক ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের শিক্ষা নিতে পারি, তবে এই বিতর্কের একটি ইতিবাচক অর্জন থাকবে। কারণ সরকার, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থী, কেউ কারও প্রতিপক্ষ নয়; সবার লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে দুর্যোগ শিক্ষার্থীর স্বপ্নকে থামাতে না পারে এবং কোনো প্রশ্নপত্র শিক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে না ফেলে।
ড. ইমরান হোসেন খান : সহযোগী অধ্যাপক, যন্ত্রকৌশল বিভাগ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর; গবেষক, কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি, অস্ট্রেলিয়া
