শতফুল ফুটতে দাও
আমরা তার ছলনায় ভুলব না
Advertisement
সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে ভারত এক মারাত্মক খেলায় মেতে উঠেছে। ২০২৪-এর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা বাংলাদেশে তার দীর্ঘদিনের মসনদ হারিয়ে ভারতে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন। পালিয়ে যাওয়া ছাড়া শেখ হাসিনার আর কোনো গত্যন্তর ছিল না। গণভবন থেকে সরে যাওয়ার জন্য তাকে ৪৫ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তাকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তাদের পক্ষে তার জীবন রক্ষা করা সম্ভব নয়। লাখো জনতা গণভবনের নিরাপত্তাব্যূহ ভেদ করে শেখ হাসিনাকে তাদের করায়ত্তে নেওয়ার জন্য বদ্ধপরিকর ছিল। শেখ হাসিনাকে সরাসরি হাতে পেলে যে জনতা তার অস্থিমজ্জার কী অবস্থা করত, তা ভাবা যায় না। শেখ হাসিনা নিজেই ভারত সরকারের কাছে তাকে সাময়িকভাবে আশ্রয় দেওয়ার জন্য আবেদন জানিয়েছিলেন। ভারতের বিদেশমন্ত্রী শ্রী জয়শংকর এ কথাটি ভারতীয় পার্লামেন্টে জানিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার জন্য এ সিদ্ধান্তই স্বাভাবিক ছিল। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর তিনি ভারতের তাঁবেদারি করেছেন। বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধা না দেখিয়ে ভারতের স্বার্থ পূরণে প্রতিনিয়ত ব্যাগ্র ছিলেন তিনি। তিনি তো নিজেই বলেছিলেন, ভারতকে যা দিয়েছি তা তারা চিরদিন স্মরণ রাখবে। ভারতকে ট্রানজিট করিডর ও বন্দর সুবিধা দিতে গিয়ে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে কুমড়ার ফালির মতো টুকরো টুকরো করে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল। শেখ হাসিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন লজ্জাশরমের মাথা খেয়ে বলেছিলেন, ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রীর মতো। এই উচ্চ ডিগ্রিধারী কুলাঙ্গার যে কত নিু রুচির মানুষ হতে পারে, তা তার কথা থেকেই ফুটে উঠেছে।
বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য, সাড়ে ১৫ বছর ধরে এ অজাত-কুজাতের দল বাংলাদেশ শাসন করেছে। বীরের জাতি হিসাবে বাংলাদেশিদের জন্য এ পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত অবমাননাকর। ভারতের আধিপত্যবাদী সরকার আওয়ামী লীগদলীয় সরকারকে অব্যাহতভাবে মদদ দিয়ে গেছে সংকীর্ণ জাতীয় স্বার্থে। বাংলাদেশের আর কোনো রাজনৈতিক দল ভারতের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি কিংবা পাচ্ছে না। অবিমৃশ্যকারীর মতো ভারত তার সব ডিম এক খাঁচায় রেখেছে। তারপর, ২০২৪-এর ৫ আগস্ট খাঁচাটি খাপছাড়া হয়ে যায়। ভারত এখনো আওয়ামী লীগের ওপর ভর করে বাংলাদেশের ওপর তার আধিপত্যবাদের জোয়াল চাপিয়ে দেওয়ার জন্য অবিরত কোশেশ করে চলেছে। ভারত মনে করে, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের একটা শক্ত গণভিত্তি রয়েছে। এই শক্ত গণভিত্তি কিছু অন্ধ আওয়ামী অনুরক্তদের দ্বারা গঠিত। এরা কোনো যুক্তির ধার ধারে না। আওয়ামী লীগের প্রতি তাদের অন্ধ বিশ্বাস। ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ যে আমূল পরিবর্তিত হয়ে গেছে, এটা বোঝার মতো বুদ্ধি-বিবেক এদের নেই। এদের নেতাদের একটি বড় অংশ ভারতে আরাম-আয়েশের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বাংলাদেশের জনগণের অর্থ লুণ্ঠনই এদের বিলাসব্যসনের উৎস। বাংলাদেশে অবস্থানরত আওয়ামী কর্মী বাহিনী কীভাবে পলাতক নেতৃত্বের আহ্বানে যুদ্ধ জয় করবে, তা কোনো কল্পনাতেই ভাবা যায় না। কথা উঠেছে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তারা দেশে গৃহযুদ্ধের সূচনা করবে। বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্তভাবে কিছু নাশকতা করলেও গৃহযুদ্ধ বলতে যা বোঝায় তার কিছুমাত্র কার্যকর করার শক্তি সামর্থ্য তাদের নেই। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে একদল যুবক সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে যায়। তারা প্রতিজ্ঞা করেছিল, রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে শেখ মুজিব হত্যার বদলা নেবে। ভারতে তারা গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর মাধ্যমে অস্ত্রশস্ত্রসহ নানা ধরনের সামগ্রী সহায়তা হিসাবে পেয়েছিল। তারা বর্ডার আউট পোস্টগুলোর ওপর আগ্রাসন চালায়। কিন্তু জনপ্রতিরোধসহ বিডিআরের প্রতিরোধের মুখে তাদের মুজিব হত্যার বদলা নেওয়ার প্রতিজ্ঞা ভেস্তে যায়। অবশেষে মোরারজি দেশাই-এর সরকার ভারতে ক্ষমতাসীন হলে তাদের নিষ্ক্রিয় করে ফেলা হয়।
বাংলাদেশে নবনির্বাচিত তারেক রহমানের সরকারকে ব্যতিব্যস্ত করতে ভারত আবার সেই হাসিনা ‘কার্ড’ সামনে নিয়ে এসেছে। ঢাকার ওপর নানামুখী চাপ প্রয়োগের পাশাপাশি সরকারকে নিরস্ত্র করার জন্য দিল্লির চাণক্যনীতির অনুসারী ‘ডিপ স্টেট’ ও নীতিনির্ধারকরা অবিরত ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে চলেছে। গত ৩০ জুলাই ভারতের পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় কমিটি জানিয়েছে, নরেন্দ্র মোদি সরকার শেখ হাসিনাকে দিল্লির মাটিতে বসে কোনো ধরনের রাজনীতি করার অনুমতি দেয়নি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে পতিত হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়টিও খতিয়ে দেখছে সরকার।
ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো এ খবর ফলাও করে প্রচার করে। এর ঠিক তিন দিন পর গত ২ জুলাই ভারতীয় মিডিয়ার শিরোনাম হয়েছে, ৫ আগস্ট প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে আসছেন হাসিনা। ওই দিন তিনি দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরবেন।
বক্ষ্যমাণ কলামটি লেখা হচ্ছে ৪ আগস্ট রাতে। তাই ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করলেন কিনা তা বলা যাচ্ছে না। তবে এটুকু বলা যায়, শেখ হাসিনা বারবার উসকানি দিয়ে চলেছেন। তার নিজের কৃতকর্মের জন্য বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই। বাংলাদেশের মানুষের জীবন নিয়ে হোলিখেলার পর শেখ হাসিনার ঔদ্ধত্য সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। শেখ হাসিনা তার আরেক মুরুব্বি ইন্দিরা গান্ধীর কাছ থেকে কিছুই শেখেননি। ইন্দিরা গান্ধী ভারতে জরুরি অবস্থা জারি করে ভয়াবহ রাজনৈতিক নিষ্পেষণ চালিয়েছিলেন। এরপর তাকে ক্ষমতা হারাতে হয়। তারপর নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমে তিনি বলেছিলেন, ‘ম্যায় মাফি মাংতা হ্যায়’। জনগণ তাকে ক্ষমা করে দিয়েছিল। তিনি নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন। শেখ হাসিনা ঘোষিত ৫ আগস্টের কর্মসূচি নিয়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে চলছে নানামুখী আলোচনা। শেখ হাসিনা এখন বাংলাদেশের ওপর নতুন করে প্রভাব বিস্তারের জন্য ভারতের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছেন। নরেন্দ্র মোদির সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের সমীকরণে দরকষাকষিতে হাসিনাকে তুরুপের তাস হিসাবে ব্যবহার করছে।
শেখ হাসিনা মানবতাবিরোধী অপরাধে বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন আসামি। এমন একজন হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বারবার অনুরোধ জানানো সত্ত্বেও ভারত তার আধিপত্যবাদী স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে শেখ হাসনাকে হাতের মুঠোয় রেখে বাংলাদেশের ওপর নানাবিধ চাপ প্রয়োগের অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
ভারতের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে, নিউজ-১৮, টাইমস্ অব ইন্ডিয়াসহ ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে, জুলাই বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ২ বছর পর প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে আসছেন হাসিনা। নয়াদিল্লিতে ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেবেন তিনি। ৫ আগস্ট স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা থেকে সাড়ে ৭টা পর্যন্ত ফরেন করসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ার অনুষ্ঠানে হাসিনা তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা এবং বাংলাদেশে ফেরার প্রস্তুতির বিষয়ে কথা বলবেন। নয়াদিল্লির মাথুরা রোডে অবস্থিত স্যার মার্ক টালি অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে অনুষ্ঠানটি। ক্লাবটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে এটি। এ অনুষ্ঠান আয়োজনে ভারত সরকারের কোনো আপত্তি নেই বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা।
এই কলাম লিখতে লিখতে জানা গেল, ভারত সরকার জানিয়েছে, শেখ হাসিনার কার্যকলাপের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। শেখ হাসিনার ভার্চুয়ালি সংবাদ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পর আমাদের নতুন সরকার সব সময়ই বলেছে যে, পলাতক আসামিরা যদি সেখান থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেয় বা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়, তবে তা কাম্য নয়। তিনি বলেন, আমরা ভারতের সঙ্গে একটা দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগোচ্ছি। এ সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হোক তা আমরাও চাই না এবং আমার গভীর বিশ্বাস ভারতও তা চায় না। সুতরাং তারা এ অনুষ্ঠানকে সমর্থন দিচ্ছে কিনা, তা ভারতকেই পরিষ্কার করতে হবে। এ কথাগুলো সুললিত ভাষার মোড়কে কূটনৈতিক উক্তি। বাস্তবতা অবশ্যই এর চেয়ে অনেক বেশি সংশয়পূর্ণ এবং আস্থায় স্থান দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। ঢাকা ও দিল্লির একাধিক কূটনৈতিক সূত্র বাংলাদেশের একটি দৈনিককে জানিয়েছে, মূলত তারেক রহমান সরকার তথা বাংলাদেশের ওপর নানামুখী চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসাবে হাসিনাকে বারবার মাঠে ছেড়ে দেওয়ার কসরত করা হচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশকে বিভ্রান্ত করার জন্য মাঝে মাঝে মিষ্টিমধুর উক্তিও করা হচ্ছে। ব্রিক্স সম্মেলন উপলক্ষ্যে তারেক রহমানকে দিল্লি সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হলেও তাকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে উল্লেখ না করে তার পরিচয় বলা হয়েছে বিম্সটেক প্রধান। অর্থাৎ ভারত এখনো তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মেনে নিতে চাচ্ছে না। তাহলে তারেক রহমান কীভাবে দিল্লি যেতে পারেন! কথায় বলে, দুর্জনের ছলের অভাব নেই। রাষ্ট্র হিসাবে আধিপত্যবাদী ভারতের ছলের অবসান কি কোনোদিন হবে?
ড. মাহবুব উল্লাহ্ : জাতীয় অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

