আমাদের কালের নায়ক : লাল রক্তের প্রতীক
Advertisement
ছবি: যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
‘পথের গ্রাফিতি একদিন মুছে যাবে,
দেয়াললিপিকে তবু আদর্শ ভেবে
যে শিশু শিখল আজ স্বরবর্ণ, সে
জেনে গেল লাল ছিল রক্তের প্রতীক’
-নিজাম বিশ্বাস (২০২৪)
যে আন্দোলন, জাগরণ, বা অভ্যুত্থানে দেশের জনসাধারণ অফুরান সংখ্যায় শরিক হয়, সে আন্দোলন বা অভ্যুত্থানের সৃষ্টিশীলতাও অশেষ। দেখা গিয়াছে বাংলাদেশের জুলাই-আগস্ট (২০২৪) গণ-অভ্যুত্থানও এই নিয়মের ব্যতিক্রম ছিল না। জুলাই আর আগস্টের সেই উত্তাল দিনে ও রাতে সৃষ্টিশীলতার অগণন উদাহরণ আমরা দেখিয়াছি বড় বড় শহর-নগরে দেয়ালে দেয়ালে আঁকা অজস্র লিপি আর ছবির উৎসারে। এমনই এক অভিনব সৃষ্টির নাম ‘৩৬ জুলাই’।
এই তারিখটি পঞ্জিকা, ক্যালেন্ডার কি ডায়েরির পাতায় কোথায়ও লেখা ছিল না। কোটি মানুষের কল্পনা এই তারিখটির সৃষ্টি সম্ভব করিয়াছিল, রক্তের আখরে তাহারাই লিখিয়াছিলেন আগস্টের ৫ নয়, জুলাইয়ের ৩৬। রক্তের কোন উত্তাপে এহেন সৃষ্টি সম্ভব, এতদিনে তাহা আর হিসাবের বিষয় নয়। এই রূপান্তরের প্যাটেন্ট লইয়া মামলা-মোকদ্দমার অবকাশও বিশেষ নাই!
ভেতরের খবর যাহারা রাখেন, তাহারা স্বীকার করিবেন যে শক্তির অপর নাম জনগণ, সেই জনসাধারণ আদতে নিরেট নহে, ঘটনার উত্তাপেই তাহারা নিরেট গণ হইয়া ওঠেন। এই জনসাধারণ সাধারণের জটলা মাত্র নয়, এই জনসাধারণ মৃত্যুভয়জয়ী উত্তেষ্ঠিত, জাগ্রত, দণ্ডায়মান জনসাধারণ। কল্পনার ঔরসে, সৃষ্টির গর্ভে ৩৬ জুলাইর মতন শত পদবাচ্য পদার্থের পয়দা সম্ভব হইয়াছিল এই দুরন্ত সত্যের কল্যাণেই।
মানুষ প্রশ্ন করিবে এতদিন কোথায় ছিলেন এই দুরন্ত সত্যশক্তি? আপনি হয়তো বলিবেন জুলাই-আগস্ট, দীর্ঘ জুলাই যেখানে ছিল সেখানেই। অফুরান মৃত্যুভয় ফুরাইল, মানুষ ভয়কে জয় করিলেন; শত শত মানুষ হত, আহত, ও নির্যাতিত হইলেন, তবু পথ হারাইলেন না। মৃত্যুঞ্জয় মানুষের এই কাফেলাই জুলাই-আগস্টের, আমাদের কালের নায়ক হইয়া উঠিল। মানুষ নায়ক হইয়া জন্মায় না, হইয়া ওঠে!
কেন পথে নামিয়াছিলেন তাঁহারা? আমরা জানি এই প্রশ্ন করা হইবেই। ইহার একটা সরল উত্তর তো সকলেই জানেন, স্বাভাবিক নিঃশ্বাস নিতে পারিতেছিলেন না তাহারা। হইতে পারে এই উত্তরেরও একটা উত্তর আছে। ঐ উত্তরের পথ চাহিয়া আমাদের অপেক্ষা করিতে হইবে।
এই অবসরে মনে আবার প্রশ্ন জাগিতেছে এমন অকাতর প্রাণদান কি অকারণ হইতে পারে? আমার হঠাৎই মনে হইল আমাদের কালের নায়ক এর্নেস্তো চে গেভারার প্রাণদানের সঙ্গে কোথায় যেন দীর্ঘ জুলাইর প্রাণদানের একটা মেলবন্ধন আছে।
১৯৬৭ সালের ৮ অক্টোবর। রবিবার। দক্ষিণ আমেরিকার পার্বত্য দেশ বলিভিয়ার পার্বত্য এক গ্রামের নাম ‘লা হিগেরা’। গ্রামের অদূরে ঝোপঝাড়ের আড়ালে একটি ক্যাম্পে মাত্র নয় গেরিলার একটি দল রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীর দুই ইউনিটের সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে ঘেরাও হইল। সাত জন পলাইয়া বাঁচিতে পারিলেও দুই জন পারিলেন না, গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ধরা পড়িলেন তাঁহারা। একজন সামান্য স্থানীয় যোদ্ধা, সহজ-সরল নামটা তাহার ‘উইলি’; আরজন এক অসামান্য বীর, কুবা বিপ্লবের সর্বোচ্চ তিন নায়কের একজন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর (১৯৫৯) আর সাবেক শিল্পমন্ত্রী (১৯৫৯-১৯৬৫) এর্নেস্তো গেভারা দে লা সের্না ওরফে চে গেভারা।
চে গেভারা বন্দী হইয়াছেন। খবরটা রাষ্ট্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লেফটেন্যান্ট কর্নেল আন্দ্রেস সেলিচ তড়িঘড়ি হেলিকপ্টারযোগে অকুস্থলে হাজির হইলেন। লা হিগেরার ভাঙাচোরা একটা স্কুল। সেই স্কুলঘরের বারান্দায় যুদ্ধাহত বন্দী চে একটা স্ট্রেচারে শায়িত। স্কুলঘরের বারান্দায় কর্নেল সেলিচের সঙ্গে বন্দী চের পৌনে এক ঘন্টামতন কথাবার্তা হয়। সেই কথাবার্তার বিষয়বস্তু কি তাহা এতদিন কাহারও জানার উপায় ছিল না।
ঘটনার গোটা ২৯ বছর পর, ১৯৯৬ সালের দিকে, পরলোকগত কর্নেল আন্দ্রেস সেলিচের বিধবা মার্কিন সাংবাদিক জন লি অ্যান্ডারসনকে চে-সেলিচ কথাবার্তার সেলিচ-লিখিত একটি ভাষ্য পড়িবার সুযোগ দিলেন। এই ভাষ্য এখনও পড়িবার মতন। চেকে যাঁহারা বিপ্লবী আতিশয্যদোষে দোষী ভাবিয়াছিলেন, এই সংলাপে তাহাদের অনেক সমালোচনার জবাব আছে।
জন অ্যান্ডারসন রচিত বিপুলায়তন জীবনচরিত (‘চে গেভারা : অ্যা রেভলুশনারি লাইফ’, নিউ ইয়র্ক, ১৯৯৭) প্রকাশের আগ পর্যন্ত আমরা জানিতাম না চে গেভারার জীবনসায়াহ্নে শেষ কয়েকটি ঘন্টা কিভাবে কাটিয়াছিল। আর্হেন্তিনার বংশোদ্ভূত ফরাশি-কানাডাবি আলবের্তো মঙ্গেল (জন্ম ১৯৪৮) মনে করেন, ‘ইতিহাসের দলিল হিসাবে তো বটেই, অধিক কি, কোন মানুষের সর্বশেষ কথাবার্তা উঁহার শত্রুপক্ষও যে সম্মানের সহিত লিখিয়া রাখিয়াছিলেন, তাহাও তীব্র ঘটনা বিশেষ।’
কর্নেল সেলিচ জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘কমান্দান্তে, আপনাকে কেমন যেন বিষণ্ন মনে হইতেছে। আমার এমন মনে হইতেছে কেন, তাহার কারণটা বুঝাইয়া বলিতে পারেন?’
জওয়াবে চে বলিলেন, ‘আমি বিফল হইয়াছি। আমাদের সর্বনাশ ঘটিয়াছে, সেই জন্যই আমাকে আপনার এমন মনে হইতেছে।’
সেলিচ প্রশ্ন করিলেন, ‘আপনি কোথাকার লোক, কুবার না আর্হেন্তিনার?’
‘আমি কুবার, আর্হেন্তিনার, বলিভিয়ার, পেরুর, একুয়াদোরের, ইতি ও আদির...আপনি তো জানেন।’
‘কোন কারণে আপনি আমাদের দেশে তৎপরতা চালাইতে উদ্বুদ্ধ হইয়াছিলেন?’
পাল্টা জিজ্ঞাসা করিলেন চে, ‘এ দেশের চাষাভূষা মানুষ কোন পরিস্থিতির মধ্যে বাঁচিয়া আছে তাহা আপনি কি জানেন না? তাহারা আছে বন্যদশার কাছাকাছি, গরিবির যে হাল তাহাদের, তাহাতে মন মুষড়ায়, তাহারা যে ঘরে ঘুমায়, সেই ঘরেই রান্না সারে, তাহাদের পিন্ধনের কাপড়ও নাই, অবস্থা বেগতিক পশুর মতন...।’
‘এই অবস্থা তো কুবায়ও,’ বলিয়া ফোড়ন কাটিলেন সেলিচ।
খেপিয়া উত্তর দিলেন চে, ‘কুবার মানুষ গরিব, একথা অস্বীকার করি না আমি, কিন্তু সেখানে চাষাভূষাদের [কমসে কম] প্রগতি প্রগতি একটা ধোঁয়াটে আশা হইলেও তো আছে, আর এই দিকে বলিভিয়ায় মানুষের কোন আশা নাই, ভরসা নাই। তাহারা যেভাবে জন্মায়, সেভাবেই মরে, এই মানবজীবনে কোন অগ্রগতির সুযোগ তাহাদের হয় না।’
শোনা যায় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) মতলব ছিল চে গেভারাকে সপ্রাণ ধরা। কিন্তু অকুস্থলে হাজির ছিলেন তাহাদের কুবাবংশীয় চর ফেলিস রদ্রিগেস। ভদ্রলোকের উৎসাহ ছিল চের অন্য পরিণতি হোক।
চে গেভারাকে পরদিন, অক্টোবরের ৯ তারিখ, ঠান্ডা মাথায় খুন করা হয়। যুদ্ধরত অবস্থায় হত্যা করা হইয়াছে এমন ভাব দেখাইবার জন্য জল্লাদ প্রথমে তাঁহার হাতে ও পায়ে গুলি করিল। যখন যন্ত্রণাকাতর চে ‘আপাতদৃষ্টিতে মনে হইতেছিল চিৎকার করিতে না হয় মতো নিজের একটা কব্জি নিজেই কামড়াইয়া ধরিলেন’ তখন একটা বুলেট তাঁহার বুকে ঢুকিল, তাঁহার ফুসফুস রক্তে ভরিয়া উঠিল।
চের লাশ হেলিকপ্টার উঠাইয়া ভাইয়েগ্রান্দে শহরে নেওয়া হইল। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, সাংবাদিক আর শহরবাসীর সুবিধার্থে কয়দিন প্রদর্শনীর পর ভাইয়েগ্রান্দে বিমানবন্দরের পাশে কোন এক অজ্ঞাতস্থানে চের দেহ পুঁতিয়া ফেলা হয়।
১০ অক্টোবর ১৯৬৭, রোজ মঙ্গলবার, একটি ছবি পৃথিবীর পথে ছড়াইয়া দেওয়া হয়। মৃত গেভারার তিনপাশে কর্নেল সেলিচ আর তাঁহার সহচর দলবল দাঁড়াইয়া। মতলব আর কিছুই নহে, অধীর পৃথিবীকে একটি সুসমাচার জানাইতে হইবে: দুইদিন আগে, রোজ রবিবার, রিও গ্রান্দে নদীর উত্তর পাড়ের পাহাড়ি গ্রাম লা হিগেরার কাছে বলিভীয় সেনাবাহিনীর দুইটি কোম্পানির সহিত একদল গেরিলার বন্দুকযুদ্ধে চে গেভারা নিহত হইয়াছেন।
গেভারার এই সত্য সকলেই জানেন। যে দেশে আশাও নাই, সেই দেশের এক কর্নেল চের শেষ একটা জবানবন্দী লিখিয়া রাখিয়াছিলেন! অবাক লাগে?
আমাদের জুলাই-আগস্টে অমর হইয়াছিল পথের অজস্র গ্রাফিতি। হৃদয়ধর্মের এই আর্তনাদ নিজাম বিশ্বাস এই কয়টি পংক্তিযোগে লিখিয়াছিলেন :
‘পাখিদের শ্লোগান বোঝেনি শিকারি
ভেবেছিল পাখি প্রণয়ের গান গায়,
সূর্যকে ডোবানো হলো তড়িঘড়ি করে,
নিশাচর পাখির ডানার লাল লাল ছায়া
দীর্ঘকায় হয়ে পড়ে থাকল পথের ওপর’
৬ আগস্ট ২০২৬
সলিমুল্লাহ খান : অধ্যাপক, ইতিহাস ও দর্শন বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
(লেখকের বানান ও ভাষারীতি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে)

