Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

বাইফোকাল লেন্স

আখেরে কারা লাভবান হলেন

Advertisement

Icon

একেএম শামসুদ্দিন

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

আখেরে কারা লাভবান হলেন

Advertisement

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের এক যুগান্তকারী অধ্যায়। ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ, সাহসিকতা এবং গণ-আকাঙ্ক্ষার সম্মিলিত শক্তিতে সংঘটিত এ আন্দোলন রাষ্ট্র, সমাজ এবং গণতান্ত্রিক চেতনার নতুন এক প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে। তাই এ আন্দোলনের ইতিহাস সংরক্ষণ ও দলিলায়ন রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু এ সংরক্ষণ প্রক্রিয়ায় তথ্যগত অসংগতি এবং বিকৃতি অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক ও বিভ্রান্তির জন্ম দিতে পারে। সম্প্রতি জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সরকারের উদ্যোগে নির্মিত তথ্যচিত্র (ডকুমেন্টারি) এবং জাতীয় পর্যায়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানকে ঘিরে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

৫ আগস্ট ঢাকার চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত জাতীয় অনুষ্ঠানে যে হট্টগোল ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্যকে ম্লান করে দিয়েছে। যে আয়োজন শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, আহতদের সম্মাননা এবং জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হওয়ার কথা ছিল, তা শেষ পর্যন্ত বিতর্ক ও মতবিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, এ পরিস্থিতি কি এড়ানো যেত না? যুক্তিসংগতভাবে বলা যায়, সংবেদনশীল বিষয়গুলো আগেভাগে বিবেচনায় নিয়ে সত্যনিষ্ঠা ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যদি তথ্যচিত্রটি নির্মাণ করা হতো তাহলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। বিশেষ করে যে ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অসংখ্য মানুষের রক্ত, ত্যাগ এবং সংগ্রামের ঘটনা জড়িয়ে আছে, সেখানে কোনো ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীর অবদান অতিরঞ্জিত করা যেমন উচিত নয়, তেমনি কারও অবদান উপেক্ষা করাও সঠিক নয়।

সেদিনের সেই অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত তথ্যচিত্রটি প্রায় সোয়া দুই মিনিটের ছিল। তাতে এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নাম উল্লেখ করে বলা হয়, তার আহ্বানেই বিএনপির নেতা-কর্মীরা ছাত্র-জনতাকে সঙ্গে নিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। হাজারের ওপর শহীদের আত্মত্যাগে অর্জিত হয় ৫ আগস্ট। তথ্যচিত্রের অন্য একটি দৃশ্যে দেখানো হয়, তারেক রহমান বলছেন, ‘দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষায়, মানুষকে রক্ষায় এ মুহূর্তের স্লোগান হোক দফা এক, দাবি এক-খুনি হাসিনার পদত্যাগ’। এ তথ্যচিত্র প্রচারের সঙ্গে সঙ্গেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। এ পর্যায়ে আরও একটি ঘটনা ঘটে, যা প্রত্যাশিত ছিল না। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন উত্তেজিত কণ্ঠে বক্তব্য দিয়ে বসেন। তার এ বক্তব্যে প্রতিবাদকারীরা আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। শেষ পর্যন্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী; জুলাই আন্দোলনের অন্যতম নেতা ও এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেনকে মঞ্চে এসে পরিস্থিতি শান্ত করতে বক্তব্য দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন।

সেদিনের মতো পরিস্থিতি সামাল দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ করা গেলেও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এ কর্মকাণ্ডে মূলধারার গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বাংলাদেশ সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজউদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমও সেদিন তথ্যচিত্রের ভুলত্রুটি তুলে ধরে সমালোচনা করেন। অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা তৈরির জন্যও তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এখানে ডকুমেন্টারিতে কিছু ভুল ছিল। প্রথমত, আমি দেখেছি সেখানে আবু সাঈদের কোনো ছবিই রাখা হয়নি। অথচ আবু সাঈদ এ বিপ্লবের মূল প্রতিচ্ছবি। তার ছবি না থাকলে সেটি পূর্ণাঙ্গ ডকুমেন্টারি হতে পারে না। সেখানে আরও ঘাটতি ছিল; দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছবিও স্থান পায়নি।’

বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও এ সমালোচনার অংশী হয়েছেন। এ তথ্যচিত্র নিয়ে এনসিপির নেতাদের সবচেয়ে বেশি সোচ্চার হতে দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘জুলাই তথ্যচিত্রে ‘একদফা’র ঘোষক বানানো হয়েছে তারেক রহমানকে। যে নাহিদ ইসলাম ২০২৪-এর ৩ আগস্ট নিজের মৃত্যু পরোয়ানায় সাইন করে একদফার ঘোষণা দিলেন তিনি বিএনপির ইতিহাসে নেই, যেই আসিফ মাহমুদ মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ ঘোষণা করলেন তিনি তাদের ইতিহাসে নেই। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নামচিহ্ন পর্যন্ত নাই। তথ্যচিত্র দেখলে মনে হতে পারে, জুলাইয়ে কোনো গণ-অভ্যুত্থান হয় নাই, হয়েছে বিএনপির দলীয় অভ্যুত্থান।’

জানা গেছে, তাদের কর্মকাণ্ড প্রধানমন্ত্রীর একেবারেই পছন্দ হয়নি। পরদিন তিনি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খানকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। তারপরই আমরা জানতে পারি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় তাদের কৃতকর্মের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। এখন তারা বলছেন, ‘প্রদর্শিত তথ্যচিত্রে জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ভূমিকা, ৯ দফা কর্মসূচি, ৩ আগস্ট ঘোষিত একদফা এবং সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনাবলির যথাযথ প্রতিফলন না হওয়া ছিল ‘সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত’। কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা গণ-অভ্যুত্থানে অবদান রাখা কোনো পক্ষের ভূমিকা খাটো করা, উপেক্ষা করা বা ইতিহাসের কোনো অংশকে আড়াল করার কোনো উদ্দেশ্য মন্ত্রণালয়ের ছিল না এবং নেই। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাসকে নির্ভুল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও তথ্যভিত্তিকভাবে সংরক্ষণে অঙ্গীকারবদ্ধ। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, গবেষক এবং আন্দোলনের প্রতিনিধিদের মতামত গ্রহণ করে তথ্যচিত্রটি প্রয়োজনীয় সংশোধন ও পরিমার্জন করবেন। সংশোধিত তথ্যচিত্র দ্রুত পুনরায় জনসমক্ষে উন্মুক্ত করা হবে, যাতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রকৃত ইতিহাস, ঘটনাপ্রবাহ, সংশ্লিষ্ট সবার গুরুত্বপূর্ণ অবদান, যথাযথ মর্যাদা ও ঐতিহাসিক সত্যতা নিষ্ঠার সঙ্গে উপস্থাপিত হয়।

জুলাই তথ্যচিত্র নিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এমন কর্মকাণ্ড দেখে একটি পুরোনো বাংলা প্রবাদ বাক্যের কথা মনে পড়ে গেল। প্রবাদ বাক্যটি হলো, ‘সেই তো নথ খসালি, তবে কেন লোক হাসালি?’ আমাদের বাল্যকালে গ্রামের বাড়িতে দেখেছি, নিজের ইচ্ছায় বা ভুলের কারণে কেউ যদি লজ্জাকর কিছু ঘটিয়ে পরে যখন নিজেই লজ্জিত বা মানুষের হাসির পাত্র হন, তখন গ্রামের মুরুব্বিরা ওই ব্যক্তির উদ্দেশে এই প্রবাদটি ব্যবহার করেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এ ক্ষেত্রে কতটুকু লজ্জিত হয়েছেন জানি না, তবে সমালোচনার পাত্র যে তারা হয়েছেন তা বলা যায়।

দেশের সচেতন মানুষ তাদের এ কর্মকাণ্ডের মধ্যে ক্ষমতাসীন দল ও দলীয় প্রধানকে খুশি করার জন্য এক ধরনের চাটুকারিতার গন্ধ পেয়েছেন। মনে রাখতে হবে, এ ধরনের চাটুকারিতা কারও কারও ব্যক্তিস্বার্থের হাতিয়ার হতে পারে, তবে তা সরকারের জন্য আত্মঘাতী ফাঁদও তৈরি করে। চাটুকাররা গুরুতর পদায়ন, সুযোগ-সুবিধা কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য সরকারের প্রতি অন্ধ আনুগত্য প্রদর্শন করতে গিয়ে যখন সত্য ও বাস্তবতাকে আড়াল করেন, তখন সেই চাটুকারিতা শুধু দল বা সরকারের নৈতিক ভিত্তিকেই দুর্বল করে না, শেষ পর্যন্ত দলীয় প্রধানেরও মারাত্মক ক্ষতি করে। ফলে বিরোধী পক্ষ দল ও দলীয় প্রধানের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনার সুযোগ পেয়ে যায়। প্রশ্ন হচ্ছে, তাদের এসব কর্মকাণ্ডে আখেরে কারা লাভবান হলেন?

ইতিহাসের শিক্ষা হলো-শাসকের চারপাশে চাটুকারদের ভিড় যত বৃদ্ধি পায়, বাস্তবতা থেকে শাসকের দূরত্বও তত বাড়ে। সত্য বলা কখনো দল বা সরকারের বিরোধিতা নয়; বরং সঠিক সময়ে সত্য বলা দল এবং সরকারের প্রতি সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ও আনুগত্য। তাই সরকারেরও উচিত চাটুকারিতাকে প্রশ্রয় না দিয়ে ভুল যদি কিছু থাকে তা সংশোধন করে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই কাজটিই করেছেন। তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে ডেকে তথ্যচিত্র সংশোধনের যে নির্দেশ দিয়েছেন; এর জন্য তিনি প্রশংসার দাবি রাখেন।

একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, কলাম লেখক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

হালফিল বয়ান রোহিঙ্গা সংকটের চেইন-রিঅ্যাকশন

রোহিঙ্গা সংকটের চেইন-রিঅ্যাকশন

অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের সন্ধানে বাংলাদেশ

অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের সন্ধানে বাংলাদেশ

নারীর বিদেশযাত্রা ও ইমিগ্রেশনের দায়িত্বশীলতা

নারীর বিদেশযাত্রা ও ইমিগ্রেশনের দায়িত্বশীলতা

পুঁজির বৃত্তে বন্দি বাজার : করণীয় কী

পুঁজির বৃত্তে বন্দি বাজার : করণীয় কী

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম