|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দুনিয়ার আর দশ ভাষার মতন বাংলা ভাষারও কিছু আপন প্রকাশভঙ্গি আছে, অন্যত্র যাহার অনুকরণ দুষ্কর মনে হয়। তিনি কি করেন এই সওয়ালের জওয়াবে আমরা বলি তিনি পড়ান। তাঁহার কাজ পড়া নয়, পড়ানো। অন্যকে পড়িতে বলা, সাহায্য করা, এমনকি বাধ্য করা পর্যন্ত তাঁহার বৃত্তি বা পেশা। তিনি বৃত্তের মতো ঘুরিয়া ঘুরিয়া এই কাজে নিরত থাকেন। তাঁহার বৃত্তির নাম তাই পড়ানো। প্রশ্ন যখন কি করেন, উত্তর তখন পড়াই। ছাত্র পড়ে, শিক্ষক পড়ান। এখানেই তাঁহাদের কাজ শেষ হয় না। ছাত্র-ছাত্রী ঠিকমতো পড়িল কিনা তাহার প্রমাণও দিতে হয় তাঁহাদের। ইহাকেই বলে পরীক্ষা।
বাংলা ভাষার ‘ছাত্র’ শব্দটাও কম মজার নয়। ছত্র মানে সারি অথবা ছাতা দুইটাই। ছত্র কিংবা ছাতার তলায় আসিয়া যে বসে সে ছাত্র। কিংবা সারিবদ্ধ হইয়া যে বসিল তাহাকেও ছাত্র কহে। এই অর্থের স্মৃতি এখনও পাওয়ার উপায় আছে, যেমন ছত্রভঙ্গ শব্দে। যুদ্ধরত সৈনিকের দল ছত্রভঙ্গ মানে পরাভূত হইল।
আবার যখন শুনিতাম ছাতার তলায় আইসো ছায়া পাইবে তখন কি আর করি! এই অর্থোপার্জনের মাহাত্ম্য একদা ছাতার তলায় সমবেত পড়ুয়াদের নাম দাঁড়াইয়াছিল ছাত্র। সেই ছাতা আর নাই, ভদ্রলোকের ভাষায় ছাত্রের জায়গাও এখন দখল করিতেছে শিক্ষার্থী পদবন্ধ। নিছক সাংস্কৃতিক বা ব্যাকরণের কারণে সুবিধা করিতে পারিতেছে না।
এদিকে পণ্ডিতেরাও আজ ছত্রভঙ্গ। তাঁহারা হইয়াছেন স্কুল-মাদ্রাসা-কলেজের শিক্ষক। তাঁহারা চাকরি করেন। চাকরির কারণেও তাঁহারা উৎপীড়িত। শিক্ষা-ব্যবস্থার কারণে শিক্ষক-সমাজ আজিকার ভদ্রসমাজে সবার নীচে, সবার পিছে, প্রায় সবহারাদের মাঝে। প্রতিবছর যখন একবার করিয়া পরীক্ষার ফল প্রকাশ পাওয়ার উপক্রম হয়, তখন শিক্ষকদের নিম্নচাপ বাড়িতে থাকে।
বর্তমান বাংলাদেশের স্কুল-কলেজে পরীক্ষায় কৃতকার্যতা বা পাশ-মাপের হিসাব দুই ধরনের। একধরনের পাশকে বলা চলে আম বা মোটাদাগের পাশ, অন্যটা খাস, যাহার চলিত নাম জিপিএ-পাঁচ। ২০২৬ সালের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট ও সমতল সকল পরীক্ষায় আম পাশের হার দাঁড়াইয়াছে শতে ৬২ (মোটের উপর ১১ লাখের কিছু বেশি); আর খাস পাশের পরিমাপ দাঁড়াইয়াছে ১ লাখ ১৭ হাজারের মতন। আমেরও আবার আম আছে, এইগুলি মাদ্রাসা বোর্ড ও কারিগরি বোর্ডের অধীনে পরিচালিত হয়।
এই ধারার ফলাফল বিচার করিলে আরও বেশি খারাপ চিত্র মিলিবে। এইবার মাদ্রাসা বোর্ডে পাশ করিয়াছে শতে ৫৫ জন ছাত্র-ছাত্রী, আর কারিগরি বোর্ডে এই সংখ্যা ৫৮ জন। এই ফলাফল অকারণ নয়। ফলাফল লইয়া আমাদের যত বিলাপ; কারণ লইয়া আলাপ বলিতে গেলে কোথায়ও নাই।
ফলাফলের এই পাইকারী অকৃতকার্যতার কারণ কি? এই প্রশ্নের একটা উত্তর, অন্তত ইঙ্গিত, পাওয়া যাইবে কয়েকটি ঘটনার মধ্যে। যদি দেখি এই বছর ৩১২টি স্কুল বা মাদ্রাসার কোন ছাত্র-ছাত্রীই পাশ করে নাই, তবে প্রশ্ন জাগিবে এইসব প্রতিষ্ঠান দেশের কোন কোন অঞ্চলের বা এইগুলির পড়ুয়ারা সমাজের কোন শ্রেণী হইতে আসে। যদি দেখি অকৃতী তালিকাভুক্ত ৩১২ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৫৫টি (মানে শতে ৮২টি) প্রতিষ্ঠানই হয় মাদ্রাসা বোর্ডের, নয় কারিগরি বোর্ডের অধীনে, তখন কি ইশারা মেলে না কাহারা এইসব প্রতিষ্ঠানের মক্কেল!
পত্রিকান্তরে বিশেষজ্ঞদের যে সব অভিমত লেখা হইতেছে এককথায় তাহার সারমর্ম এই ধরনের অকৃতকার্যতা কিছুতেই একান্ত ছাত্র-ছাত্রীর অকৃতকার্যতা নয়। যে স্কুল বা মাদ্রাসার সব ছাত্র-ছাত্রীই অকৃতকার্য, তাহার কারণ তো শুদ্ধ ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে পাওয়া যাইবে না। খুঁজিতে হইবে অন্যত্র।
বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, কোন প্রতিষ্ঠানের সকলেই যখন অকৃতকার্য তখন বুঝিতে হইবে সরিষার মধ্যেই ভূত। জানিতে হইবে কোন স্কুলে বা মাদ্রাসায় কতজন শিক্ষক, আর তাঁহাদের শিক্ষার মানই বা কেমন! তাঁহারা কি নিয়মিত (ভদ্রলোকের ভাষায়) ‘পাঠদান’ করিয়া থাকেন? তদন্তের আওতায় আনিতে হইবে আরো অনেক সঙ্গ ও প্রসঙ্গ। ইহাদের মধ্যে ছাত্র-ছাত্রীদের উপস্থিতি, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও লেখাপড়ার তত্ত্বাবধান এবং সর্বোপরি দায়িত্ত্ব পাওয়া সরকারি কর্মকর্তাদের পরিদর্শন প্রভৃতিও পড়িবে।
বিশেষজ্ঞরা আরো মনে করেন, পাশের হার দিয়া কোন দেশের শিক্ষা-ব্যবস্থার চিত্রটা ষোল আনা বোঝা যাইবে না। ৩১২টি স্কুল আর মাদ্রাসায় পাশের হার শূন্য কিংবা তুচ্ছ, অথচ বহু প্রতিষ্ঠানে পাশের হার উচ্চ বা অত্যুচ্চ। এই বৈষম্যের ব্যাখ্যা কোথায়? মাদ্রাসা শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষার সকরুণ দশা লইয়া সাংবাদিক ও বিশেষজ্ঞগণ কম বিলাপ করিতেছেন না। বলিতেছেন, কারিগরি শিক্ষার লক্ষ্য শুদ্ধমাত্র পাশ করান নয়, ইহার লক্ষ্য ছাত্রছাত্রীদের শ্রমবাজারের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতার যোগানদারি। বুঝিলাম। কিন্তু ১২ বছরের ন্যূনতম শিক্ষার সুযোগ সর্বজনীন না করিয়া, অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়া তড়িঘড়ি সারিয়া আপনি যাহাদের কারিগরি ধারায় ঠেলিয়া দিয়াছেন তাহাদের কি তাত্ত্বিক শিক্ষা হইল? তাঁহারা কাহারা সে পরিচয় কি আদতে লইয়াছেন?
শ্রমিক, চাষী ও নিম্নবিত্ত মজুর শ্রেণীর জন্য শিক্ষার বন্দোবস্ত যে অধরা, অনিশ্চিত ও অকিঞ্চন তাহার নতুন নতুন করুণ প্রমাণ তো প্রতিবছর পরীক্ষা আসিলেই পাওয়া যাইতেছে।
আমরা এখন কি করিব? ১৯৪৭ সালের নতুন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশ পাকিস্তানে আর ভারতে পুরাতন শিক্ষা-বন্দোবস্ত বদলাইবার একটা সুযোগ আসিয়াছিল। আশা করা গিয়াছিল শিক্ষাকাণ্ডে একটা জাতীয় নীতি গ্রহণ করা হইবে যাহার কল্যাণে ‘বিজাতীয় স্বার্থে বিজাতীয় হাতে বানানো’ শিক্ষা-ব্যবস্থার একটা রূপান্তর সম্ভব হইবে। যাহাতে শিক্ষার আয়োজন গুণে ধনশালী ও এবং পরিমাণে বলশালী হইবে। তাহা শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয় নাই।
সকলেই জানেন, বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষা-ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপিত হয় ব্রিটিশ শাসনের যুগে আর পাকিস্তান আমলে তাহার উপর নতুন পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আদর্শে কয়েকটা নতুন অধ্যায় যুক্ত হইয়াছিল মাত্র। কোন মৌলিক পরিবর্তন হয় নাই। ১৯৮০ সালের পর দেশের শিক্ষানীতিতে নতুন একটা ঝোঁক যুক্ত হইয়াছে। এই নীতির দুইটি বৈশিষ্ট্য। এই নীতিতে একে জনকল্যাণের চাহিতে ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের সুযোগটাই বেশি গুরুত্ব পাইতেছে। এই নীতির দুই নম্বর লক্ষণ লেখাপড়ায় বিদেশি ভাষার প্রাধান্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ অবারিত হইতেছে। বিদেশি সাংস্কৃতিক ও সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব সীমা ছাড়াইয়া যাইতেছে।
তাস খেলিয়া পড়া নষ্ট পরীক্ষার্থীর অকৃতকার্যতা বিচারের আগে এই অকৃতকার্যতার অর্থবিচার করাও আমাদের পুরাকর্তব্য নয় কি!
১৩ আগস্ট ২০২৬
সলিমুল্লাহ খান : অধ্যাপক, ইতিহাস ও দর্শন বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
(লেখকের বানান ও ভাষারীতি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে)
