সাফল্য, সীমাবদ্ধতা ও করণীয়
Advertisement
মে. জে. (অব.) এইচআরএম রোকন উদ্দিন
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
প্রতীকী ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। ২০২৪-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা, অন্তর্বর্তী শাসন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং গভীর রাজনৈতিক মেরুকরণের পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রায় ছয় মাসের কার্যক্রম এখন একটি প্রাথমিক মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ছয় মাস কোনো সরকারের চূড়ান্ত সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ধারণের জন্য যথেষ্ট সময় নয়; তবে সরকারের গতিপথ, অগ্রাধিকার, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা বোঝার জন্য এ সময় একেবারে কমও নয়। নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক অর্জন হলো নির্বাচিত রাজনৈতিক শাসনের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার পর একটি নির্বাচিত সংসদ ও সরকার কার্যকর হওয়া দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারের আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো-শুরুতেই অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা ও সুশাসনকে অগ্রাধিকার হিসাবে চিহ্নিত করা। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থান, কৃষি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার সমস্যা মোকাবিলায় বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণের উদ্যোগ দেখা গেছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ সামাজিক সহায়তামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে সরাসরি সুবিধা পৌঁছানোর প্রচেষ্টা ইতিবাচক। তবে এসব কর্মসূচির প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে স্বচ্ছতা, সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বাস্তবায়নের ওপর। অর্থনীতির ক্ষেত্রে সরকারের ছয় মাসের চিত্র অবশ্য মিশ্র। সরকার এমন একটি অর্থনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে যেখানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বিনিয়োগে স্থবিরতা, রাজস্ব ঘাটতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক অস্থিরতা, জ্বালানি ও পরিবহণ ব্যয় এবং আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে।
এ বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখা ইতিবাচক। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের বাংলাদেশের প্রতি আস্থা ধরে রাখা জরুরি। তবে বিদেশি ঋণ গ্রহণই অর্থনৈতিক সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না। ঋণের অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, সেই বিনিয়োগ কতটা উৎপাদনশীল এবং ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কতটা বাড়ছে-এসব প্রশ্ন অধিক গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যস্ফীতি সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। একজন সাধারণ নাগরিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিংবা সামষ্টিক অর্থনীতির জটিল হিসাবের চেয়ে চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, ওষুধ, বাসা ভাড়া ও পরিবহণ ব্যয়ের মাধ্যমে অর্থনীতিকে বিচার করেন। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য যদি মানুষের আয়ের তুলনায় বেশি থাকে, তাহলে সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্যের দাবি সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।
ব্যাংকিং খাতেও সমস্যা গুরুতর। বছরের পর বছর রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়মিত ঋণ প্রদান, খেলাপি ঋণ, দুর্বল তদারকি এবং কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সুবিধা গ্রহণ ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে। ছয় মাসে এ সংকট দূর করা সম্ভব নয়। তবে নতুন সরকারকে স্পষ্টভাবে প্রমাণ করতে হবে যে, ব্যাংকিং সংস্কারের ক্ষেত্রে দলীয় বা ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। অতীতে যারা অনিয়ম করেছে তাদের বিচার যেমন প্রয়োজন, তেমনই বর্তমান সরকারের ঘনিষ্ঠ কেউ একই কাজ করলে তাকেও একই আইনের আওতায় আনতে হবে।
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ শনাক্ত ও ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও ইতিবাচক। কিন্তু এখানেও আইনের শাসন এবং যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। রাজনৈতিক অভিযোগ আর প্রমাণিত আর্থিক অপরাধ এক বিষয় নয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নতুন সরকারের জন্য আরেকটি বড় পরীক্ষা। জনগণ পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং স্বাভাবিক জীবন প্রত্যাশা করে। কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটলেও চাঁদাবাজি, দখলদারি, রাজনৈতিক সংঘর্ষ, সন্ত্রাস, মব বা জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়া এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ এখনো উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
সুশাসনের প্রশ্নেও সরকারের সামনে বড় সুযোগ রয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়া তুলনামূলক সহজ; নিজের দলের দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই প্রকৃত পরীক্ষা। মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, দলীয় নেতা, ব্যবসায়ী কিংবা আমলা-যেই হোক না কেন, দুর্নীতির বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ থাকলে স্বাধীন তদন্তের ব্যবস্থা করতে হবে। মন্ত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ, সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা, ই-প্রকিউরমেন্ট সম্প্রসারণ এবং স্বাধীন অডিট ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা যেতে পারে।
গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘদিনের দুর্ভাগ্য হলো ক্ষমতায় গিয়ে প্রতিপক্ষকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করার প্রবণতা। এ রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে শুধু সরকার বদল হবে, শাসনের চরিত্র বদলাবে না। যারা হত্যা, গুম, দুর্নীতি কিংবা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য অভিযুক্ত, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে। বিচার ও প্রতিশোধের মধ্যকার সীমারেখা সরকারকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে রক্ষা করতে হবে।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। সাংবাদিকদের হয়রানি, ভয়ভীতি, রাজনৈতিক মামলা কিংবা মতপ্রকাশের কারণে শাস্তি দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার অর্থ মিথ্যা তথ্য প্রচার বা অপরাধের দায়মুক্তিও নয়। পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন সরকারকে এখন পর্যন্ত তুলনামূলক বাস্তববাদী অবস্থান নিতে দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান এমন যে কোনো একটি শক্তির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হওয়া দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় স্বার্থের অনুকূল নয়। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌমত্ব, ন্যায্যতা ও স্বার্থের ভারসাম্যের ভিত্তিতে। পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য ভারসাম্য এবং পারস্পরিক নিরাপত্তার মতো দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর বাস্তবসম্মত সমাধান দরকার। একই সঙ্গে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য এবং অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণ করা উচিত। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল কথা হওয়া দরকার-কোনো দেশের বিরোধিতা বা অন্ধ অনুসরণ নয়; বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থই হবে চূড়ান্ত বিবেচনা।
সবশেষে সরকারকে মনে রাখতে হবে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা শুধু একটি সরকারকে সরিয়ে আরেকটি সরকার প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। মানুষের প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতিতে পরিবর্তন-কম দুর্নীতি, বেশি জবাবদিহি; কম দমন-পীড়ন, বেশি স্বাধীনতা; কম দলীয়করণ, বেশি প্রতিষ্ঠানভিত্তিক শাসন এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পরিবর্তে আইনের শাসন। নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসকে তাই আশাব্যঞ্জক কিন্তু অসম্পূর্ণ বলা যায়। নির্বাচিত শাসন ফিরে এসেছে, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ শুরু হয়েছে, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সক্রিয় রয়েছে এবং সংস্কারের অঙ্গীকারও দৃশ্যমান। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং সংকট, আইনশৃঙ্খলা, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক মেরুকরণ, দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্ন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
সরকারকে জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করার কথা বিবেচনা করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সার্বিক প্রতিরক্ষা কাঠামো আধুনিকায়ন ও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। দেশের চতুর্দিকে বহিঃসীমান্ত পরিস্থিতির ক্রমবর্ধমান অবনতির কারণে এ বিষয়টির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সরকার যদি নিজের বিপুল রাজনৈতিক ম্যান্ডেটকে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করতে ব্যবহার করে, নিজের দলের অপরাধীদের বিরুদ্ধেও কঠোর হয়, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে দৃশ্যমান সাফল্য অর্জন করে এবং প্রতিহিংসার পরিবর্তে ন্যায়বিচার ও রাজনৈতিক সহাবস্থানের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে বর্তমান সময় বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক সুযোগ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু পুরোনো দলীয়করণ, পৃষ্ঠপোষকতা, দুর্নীতি ও প্রতিহিংসার রাজনীতি নতুন নামে ফিরে এলে জনগণের আশা আবারও হতাশায় পরিণত হবে। সামনে তাই মূল পরীক্ষা একটিই-দলের আগে দেশ, ব্যক্তির আগে প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক স্বার্থের আগে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে স্থান দেওয়া।
মে. জে. (অব.) এইচআরএম রোকন উদ্দিন : নিরাপত্তা বিশ্লেষক
