Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

বাইফোকাল লেন্স

বাংলাদেশ সমমর্যাদার ভিত্তিতেই সম্পর্ক রাখবে

Advertisement

Icon

একেএম শামসুদ্দিন

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ সমমর্যাদার ভিত্তিতেই সম্পর্ক রাখবে

Advertisement

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় কূটনীতিক, সাংবাদিক, বিশ্লেষক ও গণমাধ্যমের একটি অংশের বক্তব্য ও মন্তব্য দুই দেশের সম্পর্কের স্বাভাবিক কূটনৈতিক শিষ্টাচার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। একটি প্রতিবেশী দেশের নির্বাচিত সরকারপ্রধানের সম্ভাব্য রাষ্ট্রীয় সফর নিয়ে মতপার্থক্য, উদ্বেগ কিংবা কঠোর বিশ্লেষণ থাকতেই পারে। কিন্তু সেই মতপ্রকাশ যখন ব্যক্তিগত কটাক্ষ, তুচ্ছতাচ্ছিল্য, বিদ্রুপ, একতরফা প্রচারণা কিংবা পরোক্ষ হুমকির সুর ধারণ করে, তখন তা আর সুস্থ কূটনৈতিক বিতর্কের সীমায় থাকে না। সাম্প্রতিক আলোচনায় এমন কিছু বক্তব্যও এসেছে, যেখানে বাংলাদেশের সফরসংক্রান্ত অবস্থানকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করা হচ্ছে।

অথচ বাস্তবতা হলো, ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক কোনো ব্যক্তি বা একটি সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের নয়; এটি দুই সার্বভৌম রাষ্ট্রের সম্পর্ক। সেই সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান, সমতা, জাতীয় স্বার্থ এবং একে অপরের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা। তারেক রহমান ভারত সফরে যাবেন কিনা, কখন যাবেন এবং কোন পরিবেশে যাবেন, এটি বাংলাদেশের একটি সার্বভৌম সিদ্ধান্ত। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, সফরের আগে একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ প্রয়োজন এবং প্রত্যর্পণসহ কিছু দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে ভারতের কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছে।

আগেই উল্লেখ করেছি, ভারতের কয়েকজন সাংবাদিক, সাবেক আমলা ও কূটনীতিকের বক্তব্যে তারেক রহমান এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থানকে এমনভাবে বিশেষ বিশেষণে উপস্থাপন করা হচ্ছে; যা দুই দেশের পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌম মর্যাদা ও কূটনৈতিক শিষ্টাচার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত বীণা সিক্রির সাম্প্রতিক মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। ইদানীং তিনি প্রায়ই বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে যেসব মন্তব্য করছেন, তা শুনে অবাক হতে হয়। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের জন্য বাংলাদেশ ভারতকে একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি যুক্ত করায় তিনি একে ‘অত্যন্ত রূঢ়’ ও ‘অহংকারী’ বলে মন্তব্য করেছেন। শুধু তাই নয়, তারেক রহমানকে দ্বিপাক্ষিক সফরের আমন্ত্রণ জানানোর ছয় মাস পেরিয়ে যাওয়ায় এবং ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিতে দ্বিতীয়বার আমন্ত্রণের পরও কোনো জবাব না দিয়ে বাংলাদেশ এক ধরনের ‘খেলা’ শুরু করেছে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। একজন সাবেক কূটনীতিকের কাছ থেকে এমন শব্দচয়ন দুই সার্বভৌম রাষ্ট্রের মধ্যে সুসম্পর্কের ক্ষেত্রে কতটা উপযোগী, সেটিও বিবেচনার দাবি রাখে। কথিত আছে, সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ওয়ান-ইলেভেন সরকার গঠনে যে ক’জন বিদেশি কূটনীতিক নেপথ্যে থেকে মইন উ আহমেদকে উৎসাহ জুগিয়েছিলেন, বীণা সিক্রি তাদের অন্যতম। যদিও সামরিক অভ্যুত্থানের ঠিক আগে আগে দায়িত্ব শেষ করে তিনি নিজ দেশে ফিরে গিয়েছিলেন।

ওদিকে, ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব কানওয়াল সিবাল মন্তব্য করেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের সঙ্গে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণকে শর্ত হিসাবে জুড়ে দেওয়া এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করছে, যেখানে তিনি নিজেই নিজের জন্য গর্ত খুঁড়ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ভারতের সাবেক এ শীর্ষ কূটনীতিক লিখেছেন, ‘তারেক রহমান এমন এক গর্ত খুঁড়ছেন, যেখান থেকে আর বের হতে পারবেন না।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘তারেক রহমানের ভারত সফরকে হাসিনার প্রত্যর্পণের সঙ্গে যুক্ত করাটা কঠোর অবস্থান। এটি কূটনীতি নয়, এটি খামখেয়ালিপনা।’ এমন বক্তব্যের কেমন জবাব হওয়া উচিত? জবাবে, শুধু এতটুকুই বলা যায়, বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম দেশ এবং সেই দেশ ও সরকারপ্রধানকে নিয়ে ভারতীয় কূটনৈতিকদের এ ধরনের কুরুচিপূর্ণ ও অভদ্রচিত মন্তব্য কেবল তাদের ব্যক্তিগত শিষ্টাচারের পরিচয়ই বহন করে।

ইদানীং বিভিন্ন গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভারতীয় কিছু মুখচেনা সাংবাদিক বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের নিয়ে লাগাতার যে ভাষায় বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন, তা শুনতেও রুচিতে বাধে। আমরা প্রায়ই এমন দুজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিককে আওয়ামী ঘরানার কিছু ব্যক্তির ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কথা বলতে দেখি। তাদের একজন একসময় দিল্লি প্রেস ক্লাবের সভাপতি ছিলেন এবং অপরজন দীর্ঘদিন রয়টার্স ও বিবিসিতে কাজ করেছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ভারতবিষয়ক একটি মন্তব্যে তারা উভয়েই খুব আপত্তিজনকভাবে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। তাদের একজন সালাহউদ্দিন আহমদকে ‘কোথাকার কোন হরিদাস পাল’ বলে সম্বোধন করতেও দ্বিধা করেননি। অপরজন নোংরা বাচনভঙ্গিতে সালাহউদ্দিন আহমদের উদ্দেশে বলেছেন, গুম হয়ে যখন শিলংয়ে আটক ছিলেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দিতে চাইলে তিনি নাকি ‘র’ প্রধানের হাত-পা ধরে সেখানে থেকে গিয়েছিলেন। সালাউদ্দিন আহমদ যদি বেশি বাড়াবাড়ি করেন, তাহলে ‘সবকিছু ফাঁস’ করে দেবেন বলে তিনি প্রকাশ্যে হুমকিও দেন। এ ভদ্রলোকই ২০১৭ সালে ভারতের ডিজিটাল পত্রিকা দি কুইন্টে রোহিঙ্গা সংকট ও বাংলাদেশে রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে লিখতে গিয়ে দাবি করেছিলেন, তারেক রহমান লন্ডনে পাকিস্তানি মেজর জেনারেল ও ব্রিগেডিয়ার পদবির দুই সামরিক কর্মকর্তার সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছেন। অপরদিকে বেগম খালেদা জিয়া বিএনপির অন্য নেতাদের ভারতে বিজেপি নেতাদের কাছে পাঠিয়ে বোঝাপড়া করছেন। এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি আপত্তিকর এক উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছিলেন, ‘Khaleda is keen to hunt with the hound and swim with the crocodile.’ তিনি ২০২৪ সালের আগস্ট, ইন্ডিয়া টুডে পত্রিকায় তারেক রহমানের রাজনৈতিক উত্থানকে ভারতের জন্য সম্ভাব্য ‘কাঁটা’ উল্লেখ করেছিলেন।

বাংলাদেশ নিয়ে ভারতীয় সাংবাদিকদের সমালোচনার অধিকার অবশ্যই আছে। তারা বাংলাদেশের সরকার, রাজনৈতিক দল, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী কিংবা বিরোধী নেতাদের সমালোচনা করতেই পারেন। কিন্তু তাই বলে সাংবাদিকতার আদর্শ ভুলে গিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের মতো বাগাড়ম্বর করতে পারেন না। একই অধিকার বাংলাদেশের সাংবাদিকদেরও রয়েছে। মনে রাখতে হবে, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা মানে ব্যক্তিগত অপমান বা প্রমাণহীন অভিযোগের লাইসেন্স নয়। বিশেষ করে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক যখন অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে, তখন দুই দেশের সাংবাদিকদের ব্যবহৃত ভাষা জনমত গঠনে বড় ভূমিকা রাখে। ভারতীয় একজন সাংবাদিক যদি বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের ধারাবাহিকভাবে ভারতের নিরাপত্তাঝুঁকি, ষড়যন্ত্র বা নেতিবাচক রাজনৈতিক চরিত্রের সঙ্গে যুক্ত করেন, তাহলে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, তিনি কি সাংবাদিক হিসাবে বিশ্লেষণ করছেন, নাকি ভারতের কৌশলগত অবস্থানের পক্ষে রাজনৈতিক ভাষ্য নির্মাণ করছেন?

এসব ভারতীয় সাংবাদিক দীর্ঘদিন ধরেই গণমাধ্যমের সঙ্গে জড়িত এবং তাদের অনেকেই বাংলাদেশবিষয়ক পর্যবেক্ষক। তাই তাদের বক্তব্যের গুরুত্বও রয়েছে। তাদের বিশ্লেষণকে অগ্রাহ্য করার পরিবর্তে বরং প্রশ্ন করা উচিত, তারা যে তথ্য ব্যবহার করছেন তা কতটা যাচাই করা, তাদের বিশ্লেষণ কতটা ভারসাম্যপূর্ণ এবং কোথায় তথ্য শেষ হয়ে ব্যক্তিগত মতামত শুরু হচ্ছে। এখানেই সাংবাদিকতার মূল পরীক্ষা। আমি সাংবাদিকতার কোনো ছাত্র নই, তবে পত্রিকায় লেখালেখির সুবাদে এতটুকু বুঝি, সাংবাদিকদের ভাষা হতে হবে মার্জিত, নিরপেক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ। বাংলাদেশের রাজনীতিকদের বক্তব্য নিয়ে ভারতের সংবাদমাধ্যমে কঠোর প্রশ্ন উঠতেই পারে। শেখ হাসিনা, তারেক রহমান, বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াত বা বাংলাদেশের সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন কেউই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু সমালোচনা হওয়া উচিত নীতি, সিদ্ধান্ত, বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিয়ে। ব্যক্তিকে অপমান করা সাংবাদিকতার শক্তি নয়।

কোনো রাষ্ট্র যদি তার প্রতিবেশী দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি সিদ্ধান্তকে নিজের পছন্দ-অপছন্দের মাপকাঠিতে বিচার করে এবং সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য গণমাধ্যম, কূটনৈতিক ভাষ্য কিংবা জনমতকে চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে, তাহলে সেটি পারস্পরিক আস্থার পরিবেশকে আরও দুর্বল করে। বিশেষ করে একজন সাবেক কূটনীতিকের কাছ থেকে যখন এমন ভাষা আসে, তখন তার প্রভাব সাধারণ রাজনৈতিক মন্তব্যের তুলনায় অনেক বেশি। কূটনীতির মূল শক্তি হলো সংযম; সাংবাদিকতার শক্তি হলো তথ্য ও যুক্তি; আর রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ভিত্তি হলো পারস্পরিক মর্যাদা।

তারেক রহমান ভারত সফরে যাবেন কিনা, সেটি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত। ভারত চাইলে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করে সেই সফরকে অর্থবহ করার চেষ্টা করতে পারে; কিন্তু কটাক্ষ, অপপ্রচার কিংবা চাপ প্রয়োগের ভাষা দিয়ে একটি সার্বভৌম দেশের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করলে প্রশ্ন উঠবেই, ভারত কি বাংলাদেশের সঙ্গে সমমর্যাদার সম্পর্ক চায়, নাকি এখনো এমন একটি সম্পর্ক প্রত্যাশা করে, যেখানে দিল্লির পছন্দই হবে ঢাকার সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত মানদণ্ড? এ প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের প্রকৃত চরিত্র নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তবে, ভারতকে নতুন করে আর মনে করিয়ে দিতে হবে না, স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসাবে বাংলাদেশ সর্বদা সমমর্যাদার ভিত্তিতেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখবে।

একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, কলাম লেখক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

হালফিল বয়ান রোহিঙ্গা সংকটের চেইন-রিঅ্যাকশন

রোহিঙ্গা সংকটের চেইন-রিঅ্যাকশন

অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের সন্ধানে বাংলাদেশ

অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের সন্ধানে বাংলাদেশ

নারীর বিদেশযাত্রা ও ইমিগ্রেশনের দায়িত্বশীলতা

নারীর বিদেশযাত্রা ও ইমিগ্রেশনের দায়িত্বশীলতা

পুঁজির বৃত্তে বন্দি বাজার : করণীয় কী

পুঁজির বৃত্তে বন্দি বাজার : করণীয় কী

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম