সব নাগরিকের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক
Advertisement
মে. জে. (অব.) এইচআরএম রোকন উদ্দিন
প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শুরু হয়েছে। এতদিন তিনি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন এবং কয়েক দশক ধরে সেই দলের কর্মসূচি, সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে তিনি আর শুধু বিএনপি, সরকার কিংবা সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রতিনিধি নন। তিনি এখন প্রায় ১৭ কোটি বাংলাদেশির রাষ্ট্রপতি-বিএনপির সমর্থক, বিরোধী দলের সমর্থক, দলনিরপেক্ষ নাগরিক, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং দেশের ভেতরে ও বাইরে অবস্থানকারী সব বাংলাদেশির অভিভাবকসুলভ রাষ্ট্রপ্রধান।
রাষ্ট্রপতির প্রধান দায়িত্বগুলোর একটি হওয়া উচিত সংবিধান ও সাংবিধানিক নৈতিকতার অভিভাবক হিসাবে কাজ করা। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান এবং সংবিধান ও আইন তাকে যেসব ক্ষমতা ও দায়িত্ব দিয়েছে, তিনি সেগুলো প্রয়োগ ও পালন করবেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হলেও তার অর্থ এই নয় যে, রাষ্ট্রপতির পদটি সম্পূর্ণ গুরুত্বহীন বা শুধু আনুষ্ঠানিক। রাষ্ট্রপতি সংবিধান সংরক্ষণ, রক্ষা ও সমর্থনের শপথ গ্রহণ করেন। এ শপথ শুধু আনুষ্ঠানিক বাক্য নয়; এটি একটি গুরুতর নৈতিক ও সাংবিধানিক অঙ্গীকার। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হলেও রাষ্ট্রপতি প্রস্তাবিত কোনো সিদ্ধান্তের আইনগত ভিত্তি, সাংবিধানিক গ্রহণযোগ্যতা এবং সম্ভাব্য জাতীয় পরিণতি সম্পর্কে প্রশ্ন তুলতে পারেন।
রাষ্ট্রপতিকে সরকার ও সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে মনে করিয়ে দিতে হবে, নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া কিংবা সংসদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা সীমাহীন ক্ষমতার অনুমোদন নয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দল রাষ্ট্রের শত্রু নয়; বরং বিরোধী দল জবাবদিহি, ভারসাম্য ও বিকল্প রাজনৈতিক চিন্তার অপরিহার্য অংশ। একইভাবে, সরকারের সমালোচনা করা রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়। একজন কার্যকর রাষ্ট্রপতি এ ধরনের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষায় নৈতিক নেতৃত্ব দিতে পারেন। বিভিন্ন সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। যেসব নিয়োগে তার আনুষ্ঠানিক, সাংবিধানিক কিংবা পরামর্শমূলক ভূমিকা রয়েছে, সেখানে দলীয় আনুগত্যের চেয়ে যোগ্যতা, সততা, দক্ষতা ও নিরপেক্ষতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরকে প্রতিটি সরকারি প্রস্তাবের স্বয়ংক্রিয় অনুমোদনে পরিণত করা উচিত নয়। সাংবিধানিকভাবে কোনো পরামর্শ মানতে বাধ্য হলেও তিনি তার আইনগত ভিত্তি ও জনস্বার্থের দিকটি পরীক্ষা করতে পারেন। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসে তার দায়িত্ব শুধু নথিতে স্বাক্ষর করা নয়; তার দায়িত্ব হলো নিশ্চিত হওয়া যে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তগুলো সংবিধান, আইন ও জনস্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমা প্রদর্শন, দণ্ড স্থগিত, হ্রাস বা পরিবর্তনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষমতা অত্যন্ত সতর্কতা, স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। দলীয়ভাবে প্রভাবশালী অপরাধী, ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক কিংবা বিশেষ মহলের স্বার্থ রক্ষায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের সুযোগ ব্যবহার করা হলে বিচারব্যবস্থা ও আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রতিটি আবেদন অপরাধের প্রকৃতি, আদালতের পর্যবেক্ষণ, মানবিক পরিস্থিতি এবং সামগ্রিক জনস্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে পরীক্ষা করা উচিত।
সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসাবে রাষ্ট্রপতিকে বাহিনীগুলোর পেশাদারত্ব, শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা রক্ষায় ভূমিকা রাখতে হবে। কোনোভাবেই সশস্ত্র বাহিনীকে দলীয় রাজনীতিতে জড়ানো কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। রাষ্ট্রপতির ভূমিকা হবে বাহিনীর সাংবিধানিক আনুগত্য, পেশাগত দক্ষতা, আধুনিকায়ন ও গণতান্ত্রিক বেসামরিক কর্তৃত্বের প্রতি সম্মান নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রপতির উচিত প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা এবং সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী অন্য দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা। গুরুতর রাজনৈতিক সংকট দেখা দিলে তিনি বঙ্গভবনকে নিরপেক্ষ আলোচনার স্থান হিসাবে ব্যবহার করতে পারেন। তিনি হয়তো নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারবেন না, কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধ সহিংসতায় রূপ নেওয়ার আগেই পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেন। সব পক্ষের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং সমঝোতার পথ খুঁজতে সহায়তা করা একজন রাষ্ট্রপতির অত্যন্ত মূল্যবান অবদান হতে পারে।
নতুন রাষ্ট্রপতিকে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হতে হবে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক বিভাজনে আক্রান্ত। এখানে অনেক জাতীয় প্রশ্নকেও দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা হয়। রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলের উচিত মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা এবং দেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে স্বীকৃত জাতীয় অবদানকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা। ইতিহাসকে কোনো নির্দিষ্ট দলের সম্পত্তিতে পরিণত না করে মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক এবং সাধারণ মানুষের ত্যাগকে সম্মান জানাতে হবে। জাতীয় দিবস ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানগুলো যেন বিভাজনের পরিবর্তে নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ করে, সেদিকে তাকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, গণপিটুনি, রাজনৈতিক সন্ত্রাস, দুর্নীতি, বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাতের বিরুদ্ধে তাকে সুস্পষ্ট ও দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা সম্প্রদায় আক্রান্ত হলে তাদের রাজনৈতিক, ধর্মীয়, জাতিগত কিংবা সামাজিক পরিচয় বিবেচনা না করে রাষ্ট্রপতির উচিত পাশে দাঁড়ানো। নির্বাহী ক্ষমতা অন্যত্র, এ অজুহাতে নীরব থাকলে চলবে না। রাষ্ট্রপতির সময়োচিত বক্তব্য জনগণকে আশ্বস্ত করতে, প্রশাসনকে দায়িত্বশীল করতে এবং জাতির সামনে একটি নৈতিক মানদণ্ড স্থাপন করতে পারে।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো-সক্রিয় থাকবেন, কিন্তু ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করবেন না; স্বাধীন বিবেচনার পরিচয় দেবেন, কিন্তু অযথা সংঘাত সৃষ্টি করবেন না; প্রভাবশালী হবেন, কিন্তু দলীয় পক্ষপাত করবেন না। এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করতে পারলেই তিনি রাষ্ট্রপতি পদের প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবেন। একজন রাষ্ট্রপতিকে কার্যকর হতে সীমাহীন নির্বাহী ক্ষমতার প্রয়োজন হয় না। নৈতিক কর্তৃত্ব, সাংবিধানিক জ্ঞান, ব্যক্তিগত সততা, মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা এবং সংকটময় মুহূর্তে সত্য কথা বলার সাহস-এসব গুণ রাষ্ট্রপতির পদকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলতে পারে। যে রাষ্ট্রপতি কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া শুধু কাগজে স্বাক্ষর করেন, তিনি হয়তো ‘কাগুজে বাঘ’ হিসাবেই বিবেচিত হবেন। কিন্তু একজন বিবেকবান ও সাহসী রাষ্ট্রপতি জাতির সাংবিধানিক বিবেক হয়ে উঠতে পারেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার রাজনৈতিক জীবনের বড় একটি সময় গণতন্ত্র, সুষ্ঠু নির্বাচন, জবাবদিহিমূলক সরকার এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে কাটিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি হিসাবে এখন তার সামনে সেই নীতিগুলো দলমত-নির্বিশেষে বাস্তবে ধারণ করার সুযোগ ও দায়িত্ব এসেছে। তিনি বঙ্গভবনের জাঁকজমক, আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে উপস্থিতি কিংবা দীর্ঘ বক্তৃতার জন্য ইতিহাসে মূল্যায়িত হবেন না। মানুষ তাকে বিচার করবে-তিনি সংবিধান ও ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন কিনা, দলীয় প্রভাবের ঊর্ধ্বে থাকতে পেরেছিলেন কিনা, সংকটে মানুষের পাশে ছিলেন কিনা এবং জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছিলেন কিনা। তিনি প্রমাণ করতে পারেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত সরকারের প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো নির্বাহী ক্ষমতাকেন্দ্র নন; আবার রাষ্ট্রের নীরব অলংকার কিংবা শুধুই আনুষ্ঠানিক পদধারীও নন। তিনি সংবিধানের সম্মানিত অভিভাবক, জাতীয় সংকটে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী এবং বাংলাদেশের সব নাগরিকের সম্মিলিত মর্যাদা, আশা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
মে. জে. (অব.) এইচ আর এম রোকন উদ্দিন : নিরাপত্তা বিশ্লেষক
