অন্যমত
বিদেশি শ্রমবাজার : গড়ে তুলতে হবে শিক্ষিত জনশক্তি
Advertisement
আবু আহমেদ
প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একটি জাতীয় দৈনিকে দেখলাম, ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিদেশে উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৫২ হাজারে পৌঁছেছে। একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশে শিক্ষা খাতে বাংলাদেশিদের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৬৬ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৮ হাজার ৭৯ কোটি টাকা, যা এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ। তবে বিদেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে কতজন দেশে ফিরে আসেন এবং কতজন বিদেশে থেকে যান, সে বিষয়ে সরকারি কোনো পরিসংখ্যান নেই। অন্যদিকে যারা নিজ উদ্যোগে স্কলারশিপ বা ব্যক্তিগত অর্থায়নে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যান, তাদের ক্ষেত্রে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। উন্নত কর্মসংস্থান, গবেষণার সুযোগ এবং স্থায়ী বসবাসের যথেষ্ট সম্ভাবনার কারণে এই শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ৬০ শতাংশেরও বেশি পড়াশোনা শেষে আর দেশে ফিরে আসে না বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা দেন। তাদের মতে, এদের উল্লেখযোগ্য অংশই বিদেশে থেকে যায়। বলতে গেলে, মেধাবীদের একটা বিশাল অংশ না ফেরার কারণে দেশে মেধার ঘাটতি থেকে যাচ্ছে, যাকে অনেকেই মেধা পাচার বলছেন।
আসলে মেধা পাচার আগে থেকেই হচ্ছে। সব দেশ থেকেই হয়। বিশ্বের অনুন্নত দেশগুলো থেকেই এসব মেধা পাচার বেশি হচ্ছে। এখন যেহেতু পুরো বিশ্বই একটি গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হয়েছে, সেহেতু বিশ্বের যেখানে মানুষ তার রুটি-রুজির উৎস খুঁজে পায়, সেখানেই চলে যায়। আমার মতে, এটাকে পাচার বলা ঠিক নয়। কারণ, তারা নিজের ইচ্ছায় বিদেশে জীবিকার সন্ধানে যাচ্ছে। তবে মানব পাচার যে একেবারেই হচ্ছে না, তা বলব না। কারণ দালালদের মাধ্যমে নিম্নবিত্ত ও নিরক্ষর একশ্রেণির মানুষ পাচার হচ্ছে এখনো। এখন প্রশ্ন হলো, দেশের মেধাবীরা পড়াশোনা শেষ করে কেন দেশে ফিরছে না? এর জবাবে বলতে হয়, দেশে সীমিত গবেষণা, দক্ষতাসম্পন্ন কর্মসংস্থান সংকট, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং মেধার যথাযথ মূল্যায়নের ক্ষেত্র না থাকার কারণে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশে থাকা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ফিরে না আসার সিদ্ধান্ত শুধু বেশি বেতনের জন্য নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত নিরাপত্তা, গবেষণার সুযোগ এবং জীবনমানের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। সুতরাং যেহেতু আমরা এসব মেধাবীর জন্য নিরাপদ কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারছি না, গবেষণার সুযোগ দিতে পারছি না, উন্নত জীবনমানের ব্যবস্থা করতে পারছি না, সেহেতু তারা এদেশে ফিরবে কেন? আজ যদি আমাদের দেশ অনেক উন্নত হতো, সবাইকে উন্নত কর্মপরিবেশ দিতে পারত, তাহলে এসব মেধাবীর বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন হতো না।
বিদেশে কারা যাচ্ছে? একেবারে গরিবের পক্ষে বিদেশে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বলতে গেলে, উচ্চমধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত শ্রেণির সন্তানরাই যাচ্ছে। তবে এটারও একটা রুট আছে। কেউ যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে, কেউ যাচ্ছে কানাডায়, অস্ট্রেলিয়ায়, আবার কেউ কেউ যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয়। কেউ পড়তে যাচ্ছে, আবার কেউ কেউ পড়ার ছলে কাজ করার উদ্দেশ্য নিয়েও যাচ্ছে। কাজের উদ্দেশ্যে ইউরোপীয় রাষ্ট্রেও যাচ্ছে অনেকে। যেহেতু বাংলাদেশ অধিক জনসংখ্যার দেশ, সেহেতু এখান থেকে মানুষ যাবেই। অনেকে উন্নত জীবনযাপনের জন্যও বিদেশে যাচ্ছে। বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য শুধু যে বাংলাদেশ থেকেই যাচ্ছে তা নয়, পাকিস্তান থেকেও যাচ্ছে, ভারত থেকেও লাখ লাখ মানুষ যাচ্ছে। বরং আমাদের দেশ থেকে এক কোটি গেলে ভারত থেকে যায় পাঁচ কোটিরও বেশি। পাকিস্তানেরও প্রায় দুই কোটি মানুষ বিদেশে কাজ করছে। যেসব দেশে সস্তায় লোক পাওয়া যায়, সেসব দেশ থেকেই লোক নিয়োগ করে থাকে উন্নত রাষ্ট্রগুলো। কারিগর বলি আর শ্রমিকই বলি, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমাদের মতো অনুন্নত দেশ থেকেই যাচ্ছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশ থেকে শ্রমিক শ্রেণির লোকেরাই বিদেশে যাচ্ছে বেশি। ইঞ্জিনিয়ার, টেকনিশিয়ানের মতো দক্ষ জনশক্তি আমরা বিদেশে সরবরাহ করতে পারছি না। ছোট ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো করার জন্য আমাদের এখান থেকে যাচ্ছে বেশি। এসব কাজে পরিশ্রম ও ঝুঁকি বেশি থাকে, অথচ পারিশ্রমিক খুবই কম। কারিগরি জ্ঞান এবং ভাষাগত শিক্ষার অভাবের কারণে আমাদের এসব কাজ করতে হচ্ছে। অথচ পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারত এর ব্যতিক্রম। তাদের একটা সুবিধা হলো, তারা ইংরেজি ভালো জানে এবং তাদের যথেষ্ট কারিগরি জ্ঞান রয়েছে। ফলে আমাদের থেকে তিন-চারগুণ বেশি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে তারা। আমাদের দেশ থেকে আমরা যাদের পাঠাচ্ছি, তারা না ইংরেজি জানে, না কারিগরি জ্ঞান আছে তাদের। ফলে নিম্ন-পর্যায়ের কাজগুলোই তাদের করতে হচ্ছে। দেশের ১ কোটি লোক বাইরে কাজ করার পর আমাদের যে রেমিট্যান্স আসে, তার কমপক্ষে আরও ৩০ শতাংশ বেশি আসা উচিত ছিল। কিন্তু তা সম্ভব হচ্ছে না কারিগরি জ্ঞান ও ইংরেজি না জানার কারণে।
অপরদিকে যারা যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, কিংবা যুক্তরাজ্যের মতো দেশে আছে, তাদের অনেকেই নিজ দেশে কোনো টাকাপয়সা পাঠায় না। কারণ, তারা সেখানে গাড়ি-বাড়ি করে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। তাদের মধ্যে কিছু অংশ দেশে টাকা পাঠায়, যাদের পরিবার বাংলাদেশে থেকে গেছে। আরব দেশ যেমন : সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব-আমিরাত, কুয়েত থেকে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে। তারপর কাতার, দুবাই, মালয়েশিয়া-এসব দেশ থেকেও ভালো রেমিট্যান্স আসছে। ইন্দোনেশিয়া, জাপান এবং ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোও আমাদের দেশ থেকে লোক চাচ্ছে। কিন্তু কারিগরি ও ভাষাগত জ্ঞান না থাকায় আমরা সেখানে লোক দিতে পারছি না।
আরেকটি বিষয় না বললেই নয়, তা হলো, কোথাও কোথাও বাংলাদেশিরা দেশের সম্মানহানি করছে। তারা সেখানে তাদের স্বাধীনতার অপব্যবহার করছে। যেমন, ইউরোপীয় দেশ ইতালিতে কিছু বাংলাদেশি তাদের দেওয়া সুযোগের অপব্যবহার করছে, দুর্নীতি করছে। ফলে তাদের কারণে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। তাদের এসব অসদাচরণের জন্য ওইসব দেশ বাংলাদেশ থেকে লোক নিতে চায় না। তারা বলে, এরা ডিসিপ্লিন মানে না, যা খুশি তা-ই করে, দুর্নীতি করে-তাই বাংলাদেশ থেকে লোক নেওয়া যাবে না। এ বিষয়গুলোকে বিদেশে আমাদের দূতাবাসগুলোর দেখা উচিত এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা উচিত।
যেহেতু জনশক্তি রপ্তানি আমাদের দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তিগুলোর একটি, তাই এ ব্যাপারে আমাদের সচেতন হতে হবে। আমাদের নীতিনির্ধারকদের এ বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, বিদেশে কর্মরত আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধারা দেশে টাকা পাঠাচ্ছে বলে আমাদের অর্থনীতি বেঁচে আছে। তা না হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দুর্ভিক্ষ লাগত। দেশে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ৩৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। তারা বিশাল অঙ্কের এ ডলার পাঠিয়েছে বলেই বিদেশিরাও এখানে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। মানে বাংলাদেশে কোনো ব্যবসা করা যায় কি না, তারা তা খতিয়ে দেখছে। সবচেয়ে বড় কথা, তাদের পাঠানো এ রেমিট্যান্সের কারণে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলারের উপরে রাখা যাচ্ছে। তারা যদি বিদেশে না যেত, এদেশে তাদের পরিবারের কাছে অর্থকড়ি না পাঠাত, তাহলে বাংলাদেশ বাঁচত না। দেশের অর্থনীতি মরে যেত। কারণ, দেশের লোকসংখ্যা বিশাল। এ বিশাল জনসংখ্যার দেশে অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখা সহজ নয়। একটা সময় আমাদের লোকসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। তখন বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক কিছু সাহায্য দিলে তা দিয়ে চলা যেত। কিন্তু এখন তা সম্ভব হবে না। কেউ সাহায্য দিয়ে আমাদের বাঁচাতে পারবে না। কারণ, এখান লোকসংখ্যা বিশাল। আমাদের রোজগার করেই বাঁচতে হবে। দেশে যা কিছু উন্নয়ন করতে হয়, তা নিজের প্রচেষ্টায়ই করতে হবে। আর সে প্রচেষ্টার পথ হচ্ছে জনশক্তি আর পোশাকশিল্প। আপাতত পোশাকশিল্পকেই এর অন্তর্ভুক্ত করব। তবে পোশাকশিল্পে ভ্যালু রেট এত নয়। পোশাকশিল্পে ভ্যালু রেট বড়জোর ২০ বা ২৫ শতাংশের মতো রয়েছে। কারণ, পোশাকশিল্পের কাঁচামাল বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়। আমরা শুধু সেলাই করে পোশাক তৈরি করে তা রপ্তানি করছি। সেলাই করার পর আমাদের যেটা যোগ হচ্ছে, তা ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। সুতরাং আমরা পোশাকসামগ্রী যদি ৫০ বিলিয়ন ডলারও রপ্তানি করি, তার নেট এডিশন আসছে মাত্র ২০ শতাংশের মতো। মানে পাঁচভাগের একভাগ। ওটাই শুধু আমরা পাচ্ছি, বাকিটা তো আমদানিতে চলে যায়। কিন্তু জনশক্তির ক্ষেত্রে রেমিট্যান্সের ১০০ ভাগই আমরা পেয়ে থাকি। কারণ তারা তাদের জীবিকাও তো ওই বিদেশি রোজগারের টাকায় করছে। সুতরাং তারা এখানে আমাদের জন্য কোনো খরচের বোঝা হচ্ছে না।
এখন আমাদের যেটা করতে হবে তা হলো, শিক্ষিত জনশক্তি গড়ে তুলতে হবে। বিভিন্ন কারিগরি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে, ভাষা শিখিয়ে তবেই তাদের বিদেশে পাঠাতে হবে। এগুলো বিনা পয়সায় করতে হবে। রাষ্ট্র থেকে ভর্তুকি দিয়ে এগুলো করা উচিত। তাহলে সবাই এতে আগ্রহী হবে। তখন আমাদের এ লোকগুলো বিদেশের মাটিতে দ্বিগুণ আয় করতে পারবে। শুধু তাই নয়, বিদেশে আমাদের জনশক্তির চাহিদাও বাড়বে।
আবু আহমেদ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ; চেয়ারম্যান, আইসিবি
অনুলিখন : জাকির হোসেন সরকার
