Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

বাইফোকাল লেন্স

প্রতিবাদ ও জবরদস্তির সীমারেখা ভুলে গেলে চলবে না

Advertisement

Icon

একেএম শামসুদ্দিন

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিবাদ ও জবরদস্তির সীমারেখা ভুলে গেলে চলবে না

Advertisement

একটি রাষ্ট্রের সভ্যতা শুধু তার অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অবকাঠামো কিংবা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; মানুষের ভিন্নমত, ভিন্ন রুচি, ভিন্ন জীবনাচরণ ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজ কতটা সহনশীল, সেটিও তার সভ্যতার অন্যতম প্রধান মাপকাঠি। বাংলাদেশ একটি ধর্মপ্রাণ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশ। একই সঙ্গে এটি ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, নাটক, খেলাধুলা ও লোকসংস্কৃতির সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের দেশ। তাই ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি সম্মান এবং সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার সুরক্ষা, দুটিকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসাবে দাঁড় করানো বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতার জন্য যেমন বিপজ্জনক, তেমনই রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্রের জন্যও উদ্বেগজনক।

কিন্তু বর্তমানে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন ক্রমেই বড় হয়ে উঠছে-এ রাষ্ট্রে কোনো অনুষ্ঠান বন্ধ হবে কি হবে না, তা কি শেষ পর্যন্ত আইন ও প্রশাসনিক বিধিবিধান নির্ধারণ করবে, নাকি কোনো সংগঠিত গোষ্ঠীর আপত্তি, হুমকি কিংবা রাস্তায় শক্তি প্রদর্শনই হয়ে উঠবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের নিয়ামক? প্রশ্নটি কেবল কোনো কনসার্ট, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা কোনো ফুটবল ম্যাচ নিয়ে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব, নাগরিক স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সামাজিক চরিত্র।

সাম্প্রতিক সময়ে কিশোরগঞ্জের একটি কনসার্ট বাতিলের ঘটনা সেই প্রশ্নকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। জনপ্রিয় ব্যান্ড অ্যাশেজ ও সংগীতশিল্পী নোবেলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়েছিল। স্থানীয় ইমাম-উলামা পরিষদ এবং নিজেদের ‘তৌহিদি জনতা’ হিসাবে পরিচয় দেওয়া একটি পক্ষ এর বিরোধিতা করে। প্রশাসন শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠানটি বাতিল করে। প্রশাসনের ব্যাখ্যায় আয়োজক প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন না থাকা এবং সম্ভাব্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকেও কারণ হিসাবে দেখানো হয়েছে; কিন্তু একই সঙ্গে স্থানীয় ধর্মীয় সংগঠনের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানটিকে শরিয়াহবিরোধী আখ্যা দেওয়া এবং অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হলে পরিস্থিতি ‘অস্থিতিশীল’ হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশের বিষয়টিও প্রকাশ্যে এসেছে।

এখানেই মূল প্রশ্নটি। কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজক যদি আইনগত শর্ত পূরণ না করে থাকে, সেটি বন্ধ করার পূর্ণ অধিকার প্রশাসনের আছে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিত আইন, নিবন্ধন, অনুমতি ও নিরপেক্ষ প্রশাসনিক বিধিব্যবস্থা; কোনো গোষ্ঠীর সামাজিক চাপ নয়। কারণ আজ যদি একটি কনসার্টকে ‘ধর্মীয় অনুভূতির’ প্রশ্নে বন্ধ করা হয়, কাল অন্য কোনো গোষ্ঠী নাটক, চলচ্চিত্র, মেলা, বইমেলা, খেলাধুলা কিংবা অন্য কোনো সামাজিক আয়োজনকে নিজেদের বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করতে পারে। তখন রাষ্ট্র কোনটি গ্রহণ করবে, আর কোনটি নিষিদ্ধ করবে, তার নিরপেক্ষ মানদণ্ড কোথায় থাকবে?

আরও উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। জেলা পুলিশের আয়োজিত একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উচ্চস্বরে গান-বাজানোকে কেন্দ্র করে স্থানীয় একটি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে অনুষ্ঠানস্থলে বাধা, ভাঙচুর, সংঘর্ষ এবং আহত হওয়ার কথা এসেছে। পরে ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন এবং কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহারের কথাও জানানো হয়েছে।

এখানে পুলিশ ভুল করেছে কিনা, অনুষ্ঠানের শব্দের মাত্রা বিধিসম্মত ছিল কি না-এসব প্রশ্নের তদন্ত হওয়া অবশ্যই প্রয়োজন; কিন্তু একটি বিষয় কোনোভাবেই অস্পষ্ট থাকা উচিত নয়-কোনো অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে অভিযোগ জানানোর পথ আছে, প্রশাসনের কাছে আবেদন করার পথ আছে, আদালতে যাওয়ার পথ আছে; কিন্তু হামলা ও ভাঙচুর করে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া কোনো সভ্য সমাজের বৈধ প্রতিবাদের পদ্ধতি হতে পারে না। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিপদ এখানেই; আমরা যেন ধীরে ধীরে প্রতিবাদ ও জবরদস্তির সীমারেখা ভুলে যাচ্ছি।

প্রতিবাদ গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু ‘আমার বিশ্বাসের সঙ্গে মেলে না, তাই তোমার অনুষ্ঠান হতে দেব না’ এটি প্রতিবাদ নয়; এটি অন্যের স্বাধীনতার ওপর নিজের বিশ্বাসের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। একটি ধর্মীয় সমাজে ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান থাকা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই সম্মান কখনোই রাষ্ট্রীয় আইনের বিকল্প হতে পারে না। এ প্রবণতার শিকড় অবশ্য সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় সীমাবদ্ধ নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় আপত্তির নামে সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধের অভিযোগ উঠেছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণগুলোর একটি ছিল নারী ফুটবল ম্যাচে বাধা। দিনাজপুর ও জয়পুরহাটে নারীদের ফুটবল ম্যাচে ‘তৌহিদী জনতা’র নামে বাধা দেওয়ার ঘটনা নিয়ে প্রতিবাদ ও দোষীদের শাস্তির দাবি উঠেছিল।

আজ নারী ফুটবল, কাল হয়তো মেয়েদের ক্রিকেট, পরশু কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। তার পরদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অনুষ্ঠান। একসময় হয়তো পোশাক, ছবি আঁকা, নাটক, গান কিংবা সাহিত্য নিয়েও একই ধরনের সামাজিক ‘ভেটো’ দাবি উঠবে। তখন প্রতিবারই যদি রাষ্ট্র বলে ‘পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে, তাই অনুষ্ঠান বন্ধ’, তাহলে আইনের শাসন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? রাষ্ট্রের কাজ হলো আইন ভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া; আইন ভাঙার ভয় দেখিয়ে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া নয়।

এখানে ধর্মকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোরও কোনো যুক্তি নেই। বাংলাদেশের কোটি কোটি ধর্মপ্রাণ মানুষ গান শোনেন, খেলাধুলা উপভোগ করেন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যান, সন্তানদের স্কুলে পাঠান এবং একই সঙ্গে ধর্মীয় মূল্যবোধও ধারণ করেন। তাই কিছু ব্যক্তি বা সংগঠনের আচরণকে বাংলাদেশের ইসলাম কিংবা সব আলেম-উলামার অবস্থান হিসাবে দেখানো যেমন অন্যায়, তেমনি ধর্মের নাম ব্যবহার করে অন্যের অধিকার সংকুচিত করার চেষ্টাকেও প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়। বরং প্রকৃত ধর্মীয় নেতৃত্বের দায়িত্ব হওয়া উচিত সমাজে নৈতিকতা, সংযম ও সহনশীলতার শিক্ষা দেওয়া। কেউ গান পছন্দ না করলে তিনি না শুনতে পারেন। কোনো অনুষ্ঠান তার মূল্যবোধের সঙ্গে না মিললে তিনি সেখানে না যেতে পারেন; কিন্তু নিজের পছন্দ-অপছন্দকে অন্যের ওপর আইন হিসাবে চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার তার নেই।

একইভাবে সাংস্কৃতিক সমাজেরও দায়িত্ব আছে। ‘স্বাধীনতা’ মানে অন্যের বিশ্বাসকে ইচ্ছাকৃতভাবে অপমান করার স্বাধীনতা নয়। কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যদি শব্দদূষণ সৃষ্টি করে, জনদুর্ভোগ তৈরি করে, অনুমতির শর্ত ভঙ্গ করে কিংবা আইন লঙ্ঘন করে, প্রশাসন অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে; কিন্তু সেই ব্যবস্থা হবে নিরপেক্ষ আইনের ভিত্তিতে; ধর্মীয় চাপের ভিত্তিতে নয়।

এখানে সরকারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সরকার যদি একটি সংগঠিত গোষ্ঠী রাস্তায় নামলেই আইনগতভাবে অনুমোদিত কোনো অনুষ্ঠানও বন্ধ করে দেয়, তাহলে দেশে একটি ভয়ংকর নজির তৈরি হবে। তখন মানুষের মনে এ ধারণাই তৈরি হবে, আইনের পথে দাবি আদায় করার চেয়ে দলবদ্ধ হয়ে চাপ সৃষ্টি করাই বেশি কার্যকর। এটি তখন রাষ্ট্রের জন্য হয়ে উঠবে অত্যন্ত বিপজ্জনক শিক্ষা।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি তার পুলিশ, সেনাবাহিনী কিংবা প্রশাসনিক ক্ষমতায় যতটা, তার চেয়েও বেশি নিহিত থাকে তার নিরপেক্ষতায়। সরকারকে একইসঙ্গে ধর্মপ্রাণ নাগরিকের অধিকার এবং সংস্কৃতিপ্রেমী নাগরিকের অধিকার রক্ষা করতে হবে। বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকদের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা যেমন নিশ্চিত করে, তেমনি মত প্রকাশ, সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক জীবনেরও জায়গা তৈরি করে। এ অধিকারগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একটি অধিকারকে অন্যটির বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিলে সমাজে বিভাজন আরও বাড়বে।

আজ তাই প্রশ্নটি কোনো ব্যান্ডের কনসার্ট হবে কিনা, সেটি নয়। প্রশ্নটি আরও মৌলিক-এ দেশে শেষ কথা বলবে কে? আইন, নাকি সংঘবদ্ধ চাপ? যদি উত্তর হয় আইন, তাহলে সরকারকে স্পষ্টভাবে সেই নীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ধর্মীয় আপত্তি জানানোর অধিকার থাকবে, কিন্তু ধর্মীয় পরিচয়ের জোরে অনুষ্ঠান বন্ধ করার অধিকার থাকবে না। সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু আইন ভাঙার স্বাধীনতা থাকবে না। প্রতিবাদের অধিকার থাকবে, কিন্তু হামলা-ভাঙচুরের অধিকার থাকবে না।

আর যদি প্রশাসন আইন প্রয়োগের পরিবর্তে কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করে এবং ক্রমাগত এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয় যে, সংগঠিত হুমকি বা উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারলে বৈধ অনুষ্ঠানও বন্ধ করে দেওয়া যায়, তাহলে ভবিষ্যতে শুধু কনসার্ট নয়-নাটক, মেলা, খেলাধুলা, নারী ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। বাংলাদেশের সামনে সেই পথ বেছে নেওয়ার কোনো কারণ নেই।

অতএব, ধর্ম থাকবে ধর্মের মর্যাদায়, সংস্কৃতি থাকবে সংস্কৃতির স্বাধীনতায়, প্রতিবাদ থাকবে আইনের সীমার মধ্যে; আর রাষ্ট্র থাকবে সবার উপরে, কিন্তু কারও পক্ষ হয়ে নয়।

একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, কলাম লেখক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

দৃষ্টিপাত সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হোক

সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হোক

ফ্রান্সের উত্তাল বিক্ষোভের আঁচ প্রবাসীদেরও লাগছে

ফ্রান্সের উত্তাল বিক্ষোভের আঁচ প্রবাসীদেরও লাগছে

নিষেধাজ্ঞা কি ইলিশ বাঁচাতে পারছে

নিষেধাজ্ঞা কি ইলিশ বাঁচাতে পারছে

রাজনীতির ভাষা

রাজনীতির ভাষা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম