Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

অন্যমত

অকেজো শিল্পগুলো কেন টিকিয়ে রাখতে হবে?

Advertisement

Icon

আবু আহমেদ

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

অকেজো শিল্পগুলো কেন টিকিয়ে রাখতে হবে?

Advertisement

দেশের মানুষের মধ্যে যে পারস্পরিক বিদ্বেষভাব প্রকাশ পাচ্ছে, এর মূল কারণ দারিদ্র্য। মানুষ যখন দরিদ্র থাকে, তখন তাদের ভাগ করতে সুবিধা হয়। দরিদ্র মানুষকে যেভাবে ধর্মীয় নেতারা ভাগ করতে পারে, তেমনই রাজনৈতিক নেতারাও ভাগ করতে পারে। আর এভাবে সমাজে বিভাজন সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষ দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং একে অপরের বিষোদ্গার করে। মানুষের ভেতরে যে শক্তি, সেটা তখন তারা তাদের দৃষ্টিতে যাদের বিপক্ষ শক্তি মনে হয়, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে থাকে। ফলে সমাজে সৃষ্টি হয় হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা। আর এ থেকেই সমাজে সৃষ্টি হয় অস্থিরতা, যা দেশ ও জাতির জন্য ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনে। এর পরিণতি কখনো কখনো দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর হুমকি হিসাবেও দেখা দিতে পারে।

একটি দেশের অর্থনৈতিক দীনতা বেকারত্বের অভিশাপকে দীর্ঘ করে। যত বেকারত্ব বাড়বে, ততই সমাজ বিভক্ত হতে থাকবে। বেকার লোকদের যেহেতু কোনো কাজ থাকে না, তাই তাদের মস্তিষ্কে নানা ধরনের কুমন্ত্রণা প্রভাব বিস্তার করে। ফলে তারা তাদের পাশের লোকগুলোকেও ক্ষতিকর মনে করে। যেহেতু বেকারদের সৃষ্টিশীল কোনো কাজ করার উপায় থাকে না, এবং তারা সমাজের আট-দশজন সচ্ছল মানুষের চেয়ে নিচে পড়ে থাকে, সেহেতু তারা অন্যকে শত্রু মনে করে এবং তার বিপক্ষে কাজ করা শুরু করে দেয়। এ কারণে সমাজে বিভক্তি শুরু হয় এবং অস্থিরতা দানা বাঁধতে থাকে। বাংলাদেশও এ দর্শনের বাইরে নয়। দেশ স্বাধীন হয়েছে অর্ধশতাব্দীরও অধিককাল পার হয়ে গেছে। কিন্তু যে গতিতে আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হওয়া উচিত ছিল, সে গতিতে উন্নয়ন হয়নি। স্বাধীনতার পর প্রথম ১০ বছর এক ধরনের কাল্পনিক সমাজতন্ত্র কায়েম করার চেষ্টা করা হয়েছিল। শুরুতেই পাকিস্তান আমলে গড়া দেশের সব শিল্পকারখানাগুলো জাতীয়করণ করা হয়। বাঙালিদেরও যেসব কলকারখানা ছিল যেমন-পাটকল, বস্ত্রক-সেগুলোও জাতীয়করণ করা হয়। জাতীয়করণ করে কল্পিত সমাজতন্ত্র ধারার অর্থনীতি যে সমস্যার সমাধান দিতে পারবে না, সে কথা বলার জন্য তেমন কোনো লোকও ছিল না। ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। রাষ্ট্রের শাসনক্ষমতা তখন একধরনের একনায়কতন্ত্রের দিকে ধাবিত হচ্ছিল। বিকল্প চিন্তাধারাকে আমলে নেওয়া হয়নি। কল্পিত সমাজতন্ত্রের গতিধারার ফলে দেশে অর্থনৈতিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। বেকার সমস্যা বাড়তে থাকে।

প্রশাসন সমাজতন্ত্রের গতিধারায় চলার ফলে কলকারখানাগুলোকে যে পর্যায়ে চালানো দরকার ছিল, সে পর্যায়ে চালানো হয়নি। সেগুলোয় প্রচুর লুটতরাজ হয়েছে। কোথাও কোথাও কলকারখানার মেশিনগুলোর যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে গেছে। সেসব মেশিন ধীরে ধীরে অকেজো হয়ে পড়ে। ফলে উৎপাদনে ধস নামে। দেশের অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মোদ্দা কথা, একটা ভালো অবস্থান থেকে আমরা খারাপ অবস্থানের দিকে চলে যাই। পরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর দেশকে কল্পিত সমাজতন্ত্র থেকে বের করে আনার চেষ্টা করেন। প্রথমেই তিনি ব্যক্তি বিনিয়োগের ব্যাপারে উদ্যোগ নেন। দেশ যখন সমাজতান্ত্রিক ডামাডোলে চলছিল, তখন ব্যক্তি বিনিয়োগের একটা সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছিল সে সময়কার সরকার। আমার স্মরণমতে, ব্যক্তি বিনিয়োগের সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল ২৫ লাখ টাকার মধ্যে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এ ব্যক্তি বিনিয়োগের সীমাটা অনেক বাড়িয়ে দেন। একপর্যায়ে ব্যক্তি বিনিয়োগের সীমা পুরোপুরি উঠিয়ে দেন। অর্থাৎ যে কোনো ব্যক্তি যত খুশি বিনিয়োগ করতে পারবে। যা হোক, আশির দশকে দেশের পুরো অর্থনীতিকে উদারীকরণ (লিবারালাইজ্ড) করা হচ্ছিল। মানে রাষ্ট্রীয় মালিকানার খপ্পর থেকে এটাকে মুক্ত করে দেওয়া হচ্ছিল। আশির দশকে অনেক শিল্পকারখানাকে ব্যক্তি খাতে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনোটি আংশিকভাবে শেয়ারবাজারের মাধ্যমে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তান আমলে বেশকিছু ভালো শিল্পকারখানা ছিল, যেগুলো আজও আছে। আজও আছে ঠিকই, তবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলো এখন আর কোনো কাজ করছে না। আয় করার মতো অবস্থানে নেই। অলস পড়ে আছে। এসব শিল্পকারখানার মেশিনারিজগুলো বিশাল জায়গাও দখল করে আছে। কিন্তু সেগুলো এখনো সরকারের মালিকানায় রয়ে গেছে। আশির দশকে বিশেষ করে বাংলাদেশিদের টেক্সটাইল আর জুট মিলগুলো বাংলাদেশিদের কাছে দিয়ে দেওয়া হয়। আর আংশিকভাবে ব্যক্তি পুঁজিকে রাষ্ট্রীয় কলকারখানায় লাগানো হয়। কিন্তু এগুলো যেহেতু পুরোপুরি ব্যক্তি মালিকানায় দেওয়া হয়নি, আংশিক দেওয়া হয়েছিল এবং কোনো কোনোটি মোটেই দেওয়া হয়নি, সেহেতু এসব শিল্পকারখানা যে অবদান অর্থনীতিতে রাখতে পারত, সেটা পারেনি। গত ১৫-২০ বছর ধরে এগুলোকে ভর্তুকি দিয়ে চালানো হচ্ছে। এসব কলকারখানা আংশিক চালু আছে, কোনো কোনোটি বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু বন্ধ হওয়া এসব প্রতিষ্ঠানে কিছু লোকবল এখনো আছে-পাহারাদার আছে, কিছু কর্মী আছে। যাদের এখনো সরকার বেতন দিয়ে যাচ্ছে। যেহেতু এসব কলকারখানা অকেজো হয়ে গেছে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে আর কোনো অবদান রাখছে না, বরং ক্ষয় করছে-সেহেতু প্রশ্ন হলো, কেন এসব টিকিয়ে রাখতে হবে? সরকারকে বিশাল অঙ্কের টাকা কেন ভর্তুকি দিতে হবে, আমার জানা নেই। পাকিস্তান আমলে গড়ে ওঠা বিজেএমসি, বিটিএমসি, স্টিল ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন, কেমিক্যাল করপোরেশন, ফুড অ্যান্ড সুগার করপোরেশনকে বিভিন্ন সেক্টরে ভাগ করে এগুলোকে জাতীয়করণ করে কারখানাগুলো এদের অধীনে দেওয়া হয়েছিল চালানোর জন্য। কিন্তু এগুলোতে কোনো গতি আসেনি। আমার দৃষ্টিতে এসব করপোরেশনের মাধ্যমে শিল্পকারখানা চালানোর ধারণাটা ভুল ছিল।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে অনেক ত্যাগের বিনিময়ে পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে আমরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পেয়েছি। কিন্তু পাকিস্তানের ফেলে যাওয়া জিনিসগুলো কয়েক বছর রেখে সেগুলোকে ব্যক্তি মালিকানায় দিয়ে দেওয়ার বন্দোবস্ত করা উচিত ছিল। ব্যক্তি পুঁজিকে উৎসাহিত করা উচিত ছিল। কিন্তু সেটা হয়নি। ফলে সত্তরের দশকের প্রথম ৫-৬ বছর আমরা নষ্ট করেছি এবং আমাদের অর্থনীতিকে পেছনে ঠেলে দিয়েছি। আশির দশকে এ বলয় থেকে আমরা কিছুটা বের হতে পেরেছি। কারণ তখন ব্যক্তি পুঁজিকে উৎসাহিত করা হয়, প্রাইভেট সেক্টরে ব্যাংক দেওয়া হয়। ’৮৫ বা ৮৬ সাল থেকে বিমা কোম্পানিও প্রাইভেট সেক্টরে দেওয়া হয়। তখন ব্যক্তি খাতে একটা উৎসাহ বা অগ্রগতি আমরা লক্ষ করি। কিন্তু পুরোনো শিল্পকারখানাগুলোর অধিকাংশই সরকারি মালিকানায়ই থেকে যায়। যেমন-কর্ণফুলী পেপার মিল্স, রেয়ন মিল্স, ইস্টার্ন ক্যাবল্স, খুলনা ড্রাই ডক, মেশিন টুল্স ফ্যাক্টরি, এটলাস বাংলাদেশ, ন্যাশনাল টিউবস্, গান্দারা ইত্যাদি রাষ্ট্রের হাতেই রয়ে যায়। গাড়ি সংযোজন, অ্যাসেম্বলিং ও নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান গান্দারা পরে ‘প্রগতি’ নাম ধারণ করে। এটি চট্টগ্রামে অবস্থিত। প্রগতিও সরকারের অধীনেই আছে, এমনকি এসব সেক্টর করপোরেশন এখনো সরকারই চালাচ্ছে। আজ স্বাধীনতার ৫৬ বছর পর এসে এই করপোরেশনগুলো, যেগুলোর কোনো কাজই নেই, সেগুলোতে চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে সরকারি কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হচ্ছে, বেতন দেওয়া হচ্ছে, বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। অথচ তাদের কোনো কাজ নেই আর। কারণ শিল্পকারখানাগুলো অকেজো হয়ে অলস বসে আছে। জাতীয় অর্থনীতিতে এগুলোর কোনো অবদান নেই। এ বিষয়গুলোর ফয়সালা করা উচিত ছিল আরও ২০-২৫ বছর আগেই। কিন্তু আমরা যে কারণেই হোক, মনোযোগ সেখানে দেইনি। না দেওয়ার কারণে বিশাল বোঝা এখন দেশের অর্থনীতির ঘাড়ে বসে আছে। ভর্তুকি দিয়ে চালাতে হচ্ছে। শত শত কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে চলে যাচ্ছে। এগুলো যদি সময়মতো ব্যক্তিখাতে চলে যেত, তাহলে এর সঠিক ব্যবহার হতো। জায়গাগুলোরও সঠিক ব্যবহার হতো, কলকারখানাগুলো যেগুলো চালানোর মতো ছিল, সেগুলোতে একটা গতি আসত। ওগুলোর সঙ্গে নতুন নতুন সংযোজন হতো, আধুনিকায়ন হতো। দেশের সার্বিক উৎপাদনে গতি আসত। বেকারত্বের অভিশাপ থেকে রক্ষা পেত দেশ। কিন্তু এর কিছুই করা হয়নি।

যা হোক, আমার মতে, যা থেকে ভালো কোনো কিছু প্রত্যাশা করা সম্ভব নয় ভর্তুকি দেওয়া ছাড়া, সেগুলোকে রাষ্ট্রের মুষ্টিবদ্ধ করে না রেখে বিক্রি করে দেওয়া উচিত। এগুলো বিক্রি করে যে টাকা আসবে, সেগুলো উন্নয়ন বাজেটের জন্য বরাদ্দ দিতে হবে। এসব কলকারখানার অলস পড়ে থাকা জায়গাগুলোর ব্যাপারেও একটা সিদ্ধান্তে আসা উচিত। দেশের অর্থনীতির স্থবিরতাকে কাটাতে হবে। বেকার সমস্যাকে আমলে নিতে হবে। হাত গুটিয়ে বসে থাকলে তো চলবে না। আমরা আর খাদের কিনারে যেতে চাই না।

আবু আহমেদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ; চেয়ারম্যান, আইসিবি

অনুলিখন : জাকির হোসেন সরকার

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

দৃষ্টিপাত সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হোক

সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হোক

ফ্রান্সের উত্তাল বিক্ষোভের আঁচ প্রবাসীদেরও লাগছে

ফ্রান্সের উত্তাল বিক্ষোভের আঁচ প্রবাসীদেরও লাগছে

নিষেধাজ্ঞা কি ইলিশ বাঁচাতে পারছে

নিষেধাজ্ঞা কি ইলিশ বাঁচাতে পারছে

রাজনীতির ভাষা

রাজনীতির ভাষা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম