Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

নতজানু হয়ে সমঝোতা নয়

Advertisement

Icon

মেজর (অব.) মনজুর কাদের

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

নতজানু হয়ে সমঝোতা নয়

Advertisement

পূর্ব বাংলা ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের অংশ হওয়ার পেছনে মুসলিম বাঙালি জাতীয়তাবাদ ছিল প্রধান রাজনৈতিক ভিত্তি। বিশেষ করে ১৯৪০-এর দশকে মুসলিম লীগের পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলনকে পূর্ব বাংলার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী সমর্থন দিয়েছিল। ১৯৪১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী এখানে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। দ্বিজাতিতত্ত্ব ও মুসলিম জাতীয়তাবাদ মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবির রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করে। এছাড়া ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকারের অধীনে ১৯৪৬ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পূর্ব বাংলায় মুসলিম লীগের ব্যাপক সাফল্য পাকিস্তান গঠনের পক্ষে জনসমর্থনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

রাজনীতিতে স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাব

১৯৫০ সালে স্নায়ুযুদ্ধ দ্রুত তীব্রতর হয়, যদিও এর সূচনা ১৯৪৬ সাল থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে ১৯৫০ সালকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় বলা যায়; কারণ, ১৯৪৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা করে, একই বছর চীনে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে বিপ্লব সফল হয়। ১৯৫০ সালে কোরীয় যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত-চীনসমর্থিত কমিউনিস্ট বিশ্বের মধ্যে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা সরাসরি বেড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪৯ সালে গঠিত ন্যাটোকে শক্তিশালী করে এবং পশ্চিম ইউরোপে সামরিক প্রতিরক্ষা জোরদার করে। সোভিয়েত নেতৃত্ব পূর্ব ইউরোপে নিজেদের প্রভাব আরও সুসংহত করে। ফলে বিশ্ব ক্রমশ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা ব্লক এবং সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট ব্লকে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এর প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেও পড়ে।

ন্যাটোকে মোকাবিলায় ওয়ারশ প্যাক্ট

স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে ওয়ারশ প্যাক্ট নামে একটি সম্মিলিত সামরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি ১৯৫৫ সালের ১৪ মে পোল্যান্ডের ওয়ারশ শহরে স্বাক্ষরিত হয়। পশ্চিম জার্মানির সামরিকীকরণ ও ন্যাটোতে যোগদানের প্রতিক্রিয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়ন এ জোট গঠন করে। ১৯৫০-এর দশকে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা, সামরিক জোট, গোয়েন্দা যুদ্ধ ও প্রক্সি যুদ্ধ স্নায়ুযুদ্ধকে আরও তীব্র করে। এভাবে ১৯৪৬-৪৯ সালে গড়ে ওঠা স্নায়ুযুদ্ধের কাঠামো ১৯৫০ সালের কোরীয় যুদ্ধের পর তা প্রকৃত অর্থে বৈশ্বিক ও সামরিকভাবে তুঙ্গের দিকে এগিয়ে যায়। এ সময় পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে পড়ে, আর ভারত আশ্রয় নেয় সোভিয়েত ইউনিয়নের ছাতার নিচে।

নতুন ইতিহাস সৃষ্টি

স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাবে পূর্ব বাংলার পরবর্তী ইতিহাস নতুন করে গড়ে উঠতে থাকে। একটি বড় বৈপরীত্য তৈরি হয় : ১৯৪৭ সালে মুসলিম বাঙালি জাতীয়তাবাদ পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করলেও ১৯৫২-১৯৭১ সময়কালে ভাষা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন ক্রমে সেই পাকিস্তানি জাতীয় পরিচয়কে চ্যালেঞ্জ করে এবং এর সুযোগ নেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। ভারত সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে বন্ধুত্ব ঘনিষ্ঠ করে এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান বিভক্ত করে পূর্ব বাংলায় মুসলিম বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনীতির কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের লেবাস পরিয়ে দেওয়া হয়। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে গণতন্ত্র হত্যা করে একদলীয় রাজনীতির পথ উন্মুক্ত করা হয় এবং ২৪ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে বাকশাল গঠন করা হয়।

ক্রান্তিকালের রাজনীতি

দেশের এ চরম ক্রান্তিকালে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হলে বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ বদলে যায়। অভ্যুত্থান সম্পর্কে মেজর শরিফুল হক ডালিমের দেওয়া ঘোষণার পর বাংলাদেশ জিন্দাবাদ এবং ‘বাংলাদেশ বেতারে’র পরিবর্তে ‘রেডিও বাংলাদেশ’ ঘোষণার পর সর্বস্তরের মানুষ আবার দেশে মুসলিম বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনীতির আবহ দেখতে পান। আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে থাকে বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক জনতা।

পালটা অভ্যুত্থান ব্যর্থ : জিয়াউর রহমানের পুনরুত্থান

ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে ৩ নভেম্বর পালটা অভ্যুত্থান ঘটলে তা ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ব্যর্থ হয় এবং জনপ্রিয় সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তম বন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে ৭ নভেম্বর ভোরবেলায় ভাষণ দেওয়ার সময় স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করার পর বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বলায় রাজনীতি আবার নির্ধারিত হয়ে যায় এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদী শক্তি প্রমাদ গুনতে থাকে।

প্রতিবেশীও বদলে যায়

প্রতিবেশী সাধারণত বদলানো যায় না; কিন্তু বিগত স্নায়ুযুদ্ধের সময় অনেক দেশ ভেঙে টুকরো টুকরো হওয়ার কারণে প্রতিবেশী বদলে গেছে। প্রতিবেশীর অন্যায়, চাপ বা আধিপত্য মেনে নিয়েই বসবাস করতে হবে-এমন কোনো নিয়ম নেই। গ্রামের সাধারণ মানুষও খারাপ প্রতিবেশীর সঙ্গে বসবাস করতে গিয়ে নিজের সীমানা নির্ধারণ করে, প্রয়োজনে সীমানায় দেওয়াল তোলে এবং পারস্পরিক দূরত্ব বজায় রেখে জীবনযাপন করে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও এ পার্থক্য মনে রাখা জরুরি

সমঝোতা করতে হবে, কিন্তু নতজানু হয়ে নয়। বন্ধুত্ব করতে হবে, কিন্তু আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে নয়। প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে হবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থ বন্ধক রেখে নয়। বাংলাদেশ কোনো বৃহৎ শক্তির শত্রু হতে চায় না; কিন্তু কোনো শক্তির অধীনস্থ রাষ্ট্রও হতে পারে না। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান হওয়া উচিত স্পষ্ট-আমরা বন্ধুত্ব চাই, সহযোগিতা চাই, পারস্পরিক স্বার্থে সমঝোতা চাই; কিন্তু চাই সমমর্যাদার ভিত্তিতে।

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে কথা

সম্প্রতি বাংলাদেশের আত্মমর্যাদা রক্ষা করার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফরের আগে শর্ত জুড়ে দিয়েছেন; যা সর্বস্তরের মানুষ দ্ব্যর্থহীনভাবে সমর্থন দিয়েছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে ভারতের বর্তমান সরকার যে ঔদ্ধত্য দেখিয়েছে, তাতে ভুক্তভোগী দেশের নেতার সফরের অর্থ হলো পালিয়ে থাকা ফ্যাসিস্টকে বুঝেশুনে আলিঙ্গন করা।

ভারতের গণমাধ্যম এবং কূটনীতিকদের প্রতিক্রিয়া

২০২৬-এর ১৭ আগস্ট ভারতের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক টাইমস অব ইন্ডিয়া ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে ঢাকার এ অবস্থানকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, তারেক রহমানের সফরের জন্য বাংলাদেশ কঠিন শর্ত জুড়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বিষয়টিকে সফরের ক্ষেত্রে ঢাকার ‘চূড়ান্ত সীমারেখা’ বা ‘রেড লাইন’ হিসাবে বর্ণনা করে বলেছে, শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোই এখন প্রধান শর্ত।

তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসাবে দেখছেন সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক বিদ্যাভূষণ সোনি। তিনি বলেছেন, তারেক রহমান ভারতে না এলে এ সুযোগ হারিয়ে যেতে পারে এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের পথ খোলা না-ও থাকতে পারে।

জেনেশুনে বিষপান করা

এদিকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের সম্প্রতি চ্যানেল ২৪-এর নিয়মিত আয়োজন ‘যত কথা’ অনুষ্ঠানে বলেন, ‘ভারতের রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত এবং রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে আমি ভারতকে কিছুটা ভালোভাবে জানি। কাউকে আমন্ত্রণ জানানোর পর তিনি যদি সেই আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন, ভারতীয়রা বিষয়টি সহজভাবে নেয় না।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভারতীয়রা নিজেদের দেশ, দেশের মর্যাদা এবং জাতীয় সম্মানের ব্যাপারে অত্যন্ত সংবেদনশীল। সেখানে দল-মত নির্বিশেষে ভারতীয়রা নিজেদের ভারতীয় হিসাবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করে।’

ভারতীয় আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে অবস্থান নিয়েছেন, তার প্রতি সমর্থন রয়েছে দেশের সব রাজনৈতিক দলের এবং সর্বস্তরের মানুষের। জনাব জিএম কাদেরের এবং ভারতীয় কূটনীতিকদের পরামর্শ শুনলে বিএনপির জাতীয় পার্টির মতো যে ভাগ্যবরণ করতে হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাই ওয়াকিবহাল আছেন।

জাতীয় পার্টি ২০১৪ সালে বিষপান করেছিল

২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচন ঘিরে যখন রাজনীতিতে ভীষণ উত্তেজনা, তখন ঝটিকা সফরে ঢাকায় আসেন ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং। তিনি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে তার বাসায় একান্ত সাক্ষাৎ করেন। সুজাতা সিং দিল্লিতে ফিরে যাওয়ার পরপরই এরশাদ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, সুজাতা সিং তাকে নির্বাচনে যেতে বলেছেন। আধিপত্যবাদী ভারতের কাছে আত্মসমর্পণ করার পরিণতি জাতীয় পার্টি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। বিএনপি জেনেশুনে সেদিকে পা বাড়ানোর অর্থ হলো, রাজনৈতিক আত্মহত্যার শামিল।

সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস নয়

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস হতে পারে না। আর সেই সার্বভৌমত্বকে অক্ষুণ্ন রেখেই আধিপত্যবাদী যে কোনো শক্তির সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে, নইলে নয়-এ নীতিটিই আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। বাংলাদেশের প্রশ্নে ভারত এ প্রথম মানকের চিপায় পড়েছে। বাংলাদেশের স্বার্থে সরকার এবং বিরোধী দল এক হয়েছে, যেমন ভারত নিজ স্বার্থে সবাই এক থাকে। তাই ভয় পেয়ে সমঝোতা নয়; আবার সমঝোতা করতে ভয় পাওয়া নয়।

নতজানু হয়ে নয়, মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হবে সমঝোতার প্রশ্নে।

মেজর (অব.) মনজুর কাদের : সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও সাবেক সংসদ সদস্য

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

ধূসর রাষ্ট্রের কাছে এক বিষণ্ন শালিকের গান

ধূসর রাষ্ট্রের কাছে এক বিষণ্ন শালিকের গান

প্রাণহানির দায় কি শুধুই চালকের

প্রাণহানির দায় কি শুধুই চালকের

মৃত গাদ্দাফি আজও বিভক্ত লিবিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে

মৃত গাদ্দাফি আজও বিভক্ত লিবিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে

হালফিল বয়ান পাহাড়ের ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন উদ্বেগ

পাহাড়ের ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন উদ্বেগ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম