জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বাড়বে দুর্ভোগ
Advertisement
ড. তৌফিক আহমেদ চৌধূরী
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গত ২০ সেপ্টেম্বর সরকার সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্য লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়েছে। এমন এক সময় এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটল, যখন আন্তর্জাতিক বাজারে এর দাম কিছুটা কমতির দিকে রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের ওপর আক্রমণ করার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়। একপর্যায়ে জ্বালানি তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ১২৬ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। বর্তমানে তা একশ মার্কিন ডলারের নিচে নেমে এসেছে।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এ পর্যন্ত মোট তিনবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলো। এপ্রিলে প্রথম দফায় প্রতি লিটার জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়ানো হয়েছিল। সেই সময় প্রতি লিটার ডিজেলের মূল্য ১৫ টাকা, কেরোসিনের মূল্য ১৮ টাকা এবং পেট্রোলের মূল্য ১৯ টাকা এবং অকটেনের মূল্য বাড়ানো হয়েছিল ২০ টাকা। দ্বিতীয় দফা গত জুন মাসে ডিজেলের মূল্য অপরিবর্তিত রেখে প্রতি লিটার কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের মূল্য লিটারপ্রতি ৫ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। তৃতীয় দফায় সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্য লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাজারে সব ধরনের পণ্যের মূল্য আরেক দফা বেড়েছে। সবচেয়ে লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে কোনো স্বচ্ছতা ছিল না। সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্য লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। নিশ্চয়ই দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের চাহিদা একই রকম নয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। মূল্যস্ফীতির অভিঘাতে সাধারণ মানুষ, বিশেষ নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ খুবই অসহায় অবস্থার মধ্যে রয়েছে। সম্প্রতি সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন পে-স্কেলের ঘোষণার কারণে বাজারে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য একদফা বৃদ্ধি পাওয়ার মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। দেশে সরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা ১৮ লাখের মতো। এ ১৮ লাখের জীবনে আর্থিক সচ্ছলতা আনার বিনিময়ে ১৮ কোটি মানুষের জীবনযাত্রাকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আবার সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়েছে।
জ্বালানি তেল এমনই এক উৎপাদন উপকরণ, যার কোনো বিকল্প এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। সব ধরনের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হয়। আমাদের দেশের পরিবহণ সেক্টরে কোনো শৃঙ্খলা নেই। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে জ্বালানি খাত আরও বিশৃঙ্খল হয়ে পড়বে। এতে মানুষের জীবনযাত্রা আগের চেয়ে ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে। আমাদের কৃষি খাত বর্তমানে নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে আছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত সরাসরি কৃষি খাতের ওপর পড়বে। সার, কীটনাশকের মূল্য বেড়ে যাবে; ফলে সার্বিকভাবে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। কৃষক বেশকিছু দিন ধরে সারের জন্য আন্দোলন করছে। কোনো কোনো স্থানে সারের দাবিতে কৃষক রাস্তা অবরোধ করছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে কৃষি উপকরণের মূল্য যেমন বাড়বে, তেমনি প্রাপ্যতাও কমে যাবে। কৃষক যেহেতু সংগঠিত নন এবং তারা আর্থিকভাবে দুর্বল, তাই তারা কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে পারেন না। আর্থিক দীনতার কারণে কৃষক তার উৎপাদিত পণ্য তাৎক্ষণিকভাবে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। মাঝখান থেকে যারা মধ্যস্বত্বভোগী, তারাই লাভবান হবেন। তারা কৃষকের কাছ থেকে স্বল্পমূল্যে পণ্য ক্রয় করে শহরে এনে ভোক্তাদের কাছে উচ্চ মূল্যে বিক্রি করবেন। ফলে তৃণমূল পর্যায়ের কৃষক এবং ভোক্তা উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
গত প্রায় ৪ বছর ধরে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। করোনা-উত্তর বিশ্ব অর্থনীতি যখন উত্তরণের পর্যায়ে ছিল, তখন শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এ যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ-শৃঙ্খল ভেঙে পড়ে। ফলে বিশ্বব্যাপী দেশে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি প্রবণতা দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশ নানা ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতিকে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে পারলেও বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই এমনটি হয়েছে বলে অনেকে বিশ্বাস করেন। বাংলাদেশের মতো একটি উদীয়মান অর্থনীতিতে ৫ থেকে সাড়ে ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি সহনীয় বলে ধরা যেতে পারে। এ পরিমাণ মূল্যস্ফীতি হলে তা ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের জন্য মুনাফার সুযোগ বজায় থাকে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ হিসাব মোতাবেক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ৪২২টি পণ্যকে বিবেচনায় নিয়ে মূল্যস্ফীতি নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে এমন কিছু পণ্য আছে, যা সাধারণ মানুষ খুব একটা ব্যবহার করে না। বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেলে প্রতিটি পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে। আমাদের দেশে একটি প্রবণতা প্রত্যক্ষ করা যায়, তা হলো-পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পেলে সমাজের বিত্তবান শ্রেণির ওপর তার অভিঘাত পড়ে তুলনামূলকভাবে কম। তারা যে কোনোভাবেই এটি ম্যানেজ করে নিতে পারেন। শুধু তাই নয়, উচ্চ মূল্যস্ফীতি বরং সমাজের বিত্তবান শ্রেণির জন্য অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়ে বরং লাভবান হন। যেমন যে ব্যক্তি পরিবহণ ব্যবসায়ের সঙ্গে যুক্ত, তিনি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে পরিবহণ ভাড়া উচ্চ হারে বাড়িয়ে লাভবান হতে পারেন। অর্থাৎ যিনি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকেন বা সেবা প্রদানকারী তাকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয় না। ক্ষতিগ্রস্ত হন যিনি সেবা গ্রহণ করেন। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে গরিব মানুষ তাদের ব্যয় সাশ্রয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করবে। এতে তাদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষা বা অন্যান্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত হবে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি আরও ঊর্ধ্বমুখী হলে তার প্রভাবে ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। ব্যালেন্স অব পেমেন্টের উদ্বৃত্ত হ্রাস পেতে পারে। স্থানীয়ভাবে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যমান কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আমদানি পর্যায়ে একক পণ্য হিসাবে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আসে ডিজেল থেকে। গত অর্থবছরে ডিজেল আমদানি বাবদ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সরকারকে ১১ হাজার ২২৮ কোটি টাকা শুল্ক-কর প্রদান করেছে। ২০১৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে শুল্ক বাবদ বিপিসি বাংলাদেশ সরকারকে ১ লাখ ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব দিয়েছে। ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত সময়ে বিপিসি মাত্র এক বছর লোকসান দিয়েছে। প্রশ্ন হলো, সরকার কি মুনাফা অর্জনকারী কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান? জনগণের সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সর্বোত্তম জনকল্যাণ সাধন করা।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিজনিত কারণে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি হলে সাধারণ মানুষ বিপর্যস্ত হবে; কিন্তু যারা বিত্তবান, তারা এতে তেমন কোনো ক্ষতির মুখে পড়বেন না; বরং তারা লাভবান হবেন। তারাই উৎপাদন যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। তারা জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি অজুহাতে তাদের উৎপাদিত পণ্যের মূল্য ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে লাভবান হবেন; কিন্তু নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ চাইলেও তাদের আয় বাড়াতে পারবেন না।
ড. তৌফিক আহমেদ চৌধূরী : বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশে ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)
অনুলিখন : এম এ খালেক
