Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

সাইবার নিরাপত্তা নাকি সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা

Advertisement

Icon

শামসুল আলম

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের পথে দ্রুত এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের জন্য সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি অপরিহার্য বিষয়। তবে এ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে প্রণীত আইনগুলো-বিশেষ করে বহুল সমালোচিত ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮’ (ডিএসএ) এবং পরবর্তীকালে তার প্রতিস্থাপক ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩’ (সিএসএ)-নাগরিক অধিকারের চেয়ে রাষ্ট্রের নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসাবেই বেশি ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। রাষ্ট্র যখন নাগরিকদের মৌলিক মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে শুধু সাইবার নজরদারির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তখন তা সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে। গবেষণা ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, শুধু কঠোর আইন দিয়ে সাইবার অপরাধ নির্মূল সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে, নিপীড়নমূলক আইনের চেয়ে নাগরিকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সাইবার ঝুঁকি হ্রাসে অধিকতর কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।

১. প্রেক্ষিত ও তথ্য-উপাত্ত : আইনের অপপ্রয়োগ বনাম সামাজিক বাস্তবতা

৫ আগস্টের আগের কয়েক বছরে ডিজিটাল স্পেসে ভিন্নমত দমন, সাংবাদিক হয়রানি এবং সাধারণ নাগরিকদের হেনস্তার অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে, যার মূল হাতিয়ার ছিল বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। যদিও সেই সরকার ২০১৮ সালের আইনটি বাতিল করে ২০২৩ সালে ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন’ পাশ করেছিল, কিন্তু মানবাধিকার সংস্থা ও আইনজ্ঞদের মতে, এটি অনেকটা ‘পুরান বোতলে নতুন মদ’।

মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর তথ্যমতে, ডিএসএ কার্যকর থাকাকালে কয়েক হাজার মামলা হয়েছে, যার উল্লেখযোগ্য অংশই ছিল সরকার সমালোচক, সাংবাদিক এবং সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে। সাইবার ট্রাইব্যুনালগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, খালাসের হার একেবারেই নগণ্য, যা প্রমাণ করে যে আইনটি মূলত হয়রানি এবং গ্রেপ্তারের ভয় দেখানোর হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। এ পরিস্থিতি সমাজে এক ধরনের ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করেছে, যা প্রকৃত সামাজিক নিরাপত্তার পরিপন্থি।

অপরদিকে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে ডিজিটাল সাক্ষরতা এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি, সেখানে সাইবার অপরাধের একটি বড় অংশ অসচেতনতা বা অর্থনৈতিক অভাব থেকে উৎসারিত। কর্মসংস্থানের অভাব এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য সাইবার অপরাধের উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে।

২. সাইবার নিরাপত্তা ও সামাজিক নিরাপত্তার পারস্পরিক নির্ভরশীলতা : তাত্ত্বিক ভিত্তি ও ঝুঁকি

সাইবার নিরাপত্তা এবং সামাজিক নিরাপত্তা একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। সামাজিক সুরক্ষা বা নিরাপত্তা ছাড়া শুধু সাইবার আইন দিয়ে সাইবার ঝুঁকি কমানো অসম্ভব। সামাজিক সুরক্ষা না থাকলে তা সরাসরি সাইবার ঝুঁকি বাড়ায়। যখন রাষ্ট্রে সুশাসন এবং মতপ্রকাশের অবাধ স্বাধীনতা থাকে না, তখন সৃষ্ট সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা নাগরিকদের রাষ্ট্রের মূলধারার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রতি আস্থাহীন করে তোলে।

অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অপরাধ : আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) গবেষণা অনুযায়ী, যুব বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য সাইবার অপরাধের ঝুঁকি বাড়ায়। যখন একজন শিক্ষিত তরুণ বা যুবকের কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকে না, তখন তারা দ্রুত উপার্জনের আশায় অনলাইনে হ্যাকিং, ফিশিং বা অন্যান্য সাইবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। রাষ্ট্র যদি নাগরিকদের ন্যূনতম অর্থনৈতিক নিরাপত্তা (যেমন-চাকরি, বেকার ভাতা, জীবনবিমা, আইনি সহায়তা) দিতে ব্যর্থ হয়, তবে কঠোর আইন করেও তাদের অপরাধ জগৎ থেকে ফেরানো কঠিন।

রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও ডার্ক ওয়েবের ঝুঁকি : যদি একটি দেশে সরকারের সমালোচনা করলে সাইবার আইনে গ্রেফতার হওয়ার ভয় থাকে, তখন নাগরিকরা নিজেদের সুরক্ষার জন্য এনক্রিপ্টেড যোগাযোগমাধ্যম বা ভিপিএন ব্যবহার করতে বাধ্য হন। এর ফলে রাষ্ট্রের নজরদারি এড়িয়ে ‘ডার্ক ওয়েব’ বা অপরাধ জগতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। সামাজিক ভীতি থেকে মানুষ যখন মূলধারার ডিজিটাল মাধ্যম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন সাইবার অপরাধীরা সহজেই তাদের ভুল পথে পরিচালিত করতে পারে।

৩. দেশি-বিদেশি অভিজ্ঞতার তুলনা

ইউরোপীয় অভিজ্ঞতা (স্ক্যান্ডিনেভিয়ান মডেল) : নরওয়ে বা সুইডেনের মতো দেশগুলোতে সামাজিক নিরাপত্তা এবং নাগরিকদের ডিজিটাল লিটারেসি এত বেশি যে, সেখানে সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় খুব বেশি দমনমূলক আইনের দরকার হয় না। তারা ‘প্রিভেনশন’ বা অপরাধের পূর্ব-প্রতিরোধের ওপর জোর দেয়, যা আসে সামাজিক সুশাসন, অর্থনৈতিক সচ্ছলতা এবং উচ্চমানের ডিজিটাল শিক্ষা থেকে।

এস্তোনিয়া : অন্যতম ডিজিটাল দেশ এস্তোনিয়া সাইবার নিরাপত্তাকে শুধু আইনের বিষয় মনে করে না, বরং একে জাতীয় নিরাপত্তা ও সামাজিক অংশীদারত্বের অংশ হিসাবে দেখে। সেখানে নাগরিকদের ডিজিটাল পরিচয় সুরক্ষিত এবং তারা জানে তাদের তথ্য কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা তাদের মধ্যে এক ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা তৈরি করেছে।

ভারতের অভিজ্ঞতা : ভারতের ‘ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যাক্ট’-এর ৬৬(এ) ধারা, যা বাংলাদেশের ডিএসএ-এর অনুরূপ ছিল, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দিয়েছিল। কারণ এটি বাকস্বাধীনতার পরিপন্থি ছিল। ভারত এখন সাইবার অপরাধ দমনে দমনমূলক আইনের চেয়ে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি ও জনসচেতনতার ওপর জোর দিচ্ছে।

৪. বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিত : সাংবিধানিক অধিকার ও বাজেট বরাদ্দ

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪, ১৫, ১৬, ১৭ এবং ১৮ অনুচ্ছেদে নাগরিকদের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তার বিধান নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। রাষ্ট্র যখন এ মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়ে উলটো সাইবার আইনের মাধ্যমে নাগরিকদের বাকস্বাধীনতা হরণ করে, তখন সংবিধানের মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হয়।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাইবার নিরাপত্তার নামে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ বেড়েছে, কিন্তু সাইবার বুলিং বা ফিশিংয়ের শিকার ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসন বা রাষ্ট্রীয় আইনি সহায়তার জন্য সুনির্দিষ্ট ও পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দের ঘাটতি রয়েছে। এর অর্থ হলো, সরকার অপরাধ দমনের চেয়ে অপরাধীকে চিহ্নিত করা ও দমনের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, যা ‘প্রিভেন্টিভ’ বা প্রতিরোধমূলক সামাজিক সুরক্ষার ধারণার সঙ্গে বেমানান।

৫. সুপারিশমালা

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে দমনমূলক আইনের পরিবর্তে একটি জনকল্যাণমুখী ও সামাজিক নিরাপত্তাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে। নিচে কিছু গবেষণাভিত্তিক সুপারিশ দেওয়া হলো :

আইন সংস্কার বা বাতিল : ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩’-এর যে ধারাগুলো (যেমন : ২৫, ২৮, ২৯ ধারা যা ডিএসএ থেকে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে) বাকস্বাধীনতাকে সংকুচিত করে এবং অহেতুক হয়রানির সুযোগ দেয়, তা অবিলম্বে বাতিল বা সংশোধন করা প্রয়োজন। সাইবার অপরাধের সংজ্ঞা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট করতে হবে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সুশাসনসংক্রান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বচ্ছ আইন বিনিয়োগ ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বাড়ায়।

ডিজিটাল সাক্ষরতা ও লিটারেসি বৃদ্ধি : বিশ্বব্যাংকের ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট অনুযায়ী, ডিজিটাল অর্থনীতির সুফল পেতে হলে ডিজিটাল সাক্ষরতা অপরিহার্য। শুধু আইন প্রয়োগ না করে, স্কুল-কলেজ এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে দেশব্যাপী ব্যাপক ডিজিটাল লিটারেসি ক্যাম্পেইন চালাতে হবে। নাগরিকরা যেন ফিশিং, বুলিং বা অনলাইন স্ক্যাম চিনতে পারে, সেই সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।

সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ ও পুনর্বাসন : তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সাইবার অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের জন্য রাষ্ট্রীয় আইনি ও মানসিক সহায়তা বা পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। অর্থনৈতিক বৈষম্য কমালে সাইবার অপরাধের প্রবণতা প্রাকৃতিকভাবেই কমে যাবে।

প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি ও নজরদারিতে স্বচ্ছতা : আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সাধারণ মানুষকে হয়রানি না করে, বরং প্রকৃত সাইবার অপরাধীদের (যেমন : ব্যাংক হ্যাকার, ডেটা চোর) ধরার জন্য প্রযুক্তিগতভাবে আরও দক্ষ ও আধুনিক করতে হবে। নজরদারি ব্যবস্থায় বিচার বিভাগীয় তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।

মতামতের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা : রাষ্ট্রকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মৌলিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের সংগঠিত হওয়ার এবং মতপ্রকাশের অধিকার সামাজিক সংলাপের পূর্বশর্ত।

উপসংহার

বাংলাদেশের জন্য সাইবার নিরাপত্তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি গণতান্ত্রিক ও নিরাপদ সমাজব্যবস্থা। কঠোর আইন দিয়ে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে সাময়িক ‘শৃঙ্খলা’ আনা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে তা ডিজিটাল নিরাপত্তাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। রাষ্ট্র যদি নাগরিকদের বাকস্বাধীনতা এবং মৌলিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, তবে নাগরিকরাই সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সহযোগী হয়ে উঠবে। তাই সাইবার নিরাপত্তা আইন নয়, বাংলাদেশের এখন দরকার সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা।

শামসুল আলম : সরকারের সাবেক সিনিয়র সচিব

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

অন্যমত দেশের জ্বালানি খাত শক্তিশালী করতে হবে

দেশের জ্বালানি খাত শক্তিশালী করতে হবে

র-মোসাদ আঁতাত : বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর করণীয়

র-মোসাদ আঁতাত : বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর করণীয়

সাইবার নিরাপত্তা নাকি সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা

সাইবার নিরাপত্তা নাকি সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা

দৃষ্টিপাত এ পদক্ষেপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে

এ পদক্ষেপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম