র-মোসাদ আঁতাত : বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর করণীয়
Advertisement
মোদাসসের হোসেন খান
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকাশ্য তথ্যপ্রমাণে স্পষ্ট, ভারত ও ইসরাইলের প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা এবং সাইবার সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে গভীর হচ্ছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশ তাদের সম্পর্ককে ‘বিশেষ কৌশলগত অংশীদারত্বে’ উন্নীত করেছে। এর আওতায় রয়েছে প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় দুই দেশের একটি আনুষ্ঠানিক যৌথ কার্যদলও রয়েছে। ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ভারতকে ‘প্রথম সারির কৌশলগত অংশীদার’ হিসাবে অভিহিত করে প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা সম্প্রসারণের কথা জানিয়েছে।
যদিও এসব তথ্য থেকে সরাসরি প্রমাণিত হয় না যে, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা র এবং ইসরাইলের মোসাদ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান পরিচালনা করছে, তা সত্ত্বেও তাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এবং অভিন্ন উদ্দেশ্য বাংলাদেশের মতো একটি বর্ণবাদবিরোধী মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের জন্য তার গভীর উদ্বেগের কারণ। আর তাই বাংলাদেশের নিরাপত্তা মূল্যায়নে এ বিষয়টি অনুধাবন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অতএব, ভারত-ইসরাইল গোয়েন্দা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ঘনিষ্ঠতাকে বাংলাদেশের সম্ভাব্য নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসাবে বিবেচনা করা যুক্তিসংগত; প্রমাণিত বৈরী ষড়যন্ত্র হিসাবে উপস্থাপন করা নয়। উদ্বেগকে কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতিতে রূপান্তর করতে হলে কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার।
প্রথমত, গোয়েন্দা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ব্যবধান। সাইবার নিরাপত্তা, নজরদারি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেন্সর ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে ইসরাইলের দক্ষতা প্রতিবেশী অঞ্চল সম্পর্কে ভারতের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের ক্ষমতা বাড়াতে পারে। দুই দেশ সাইবার সহযোগিতা গভীর করা এবং বহুবর্ষীয় সাইবার কর্মসূচি গড়ে তোলার বিষয়েও সম্মত হয়েছে। বাংলাদেশের উচিত সরকারি ও সামরিক যোগাযোগে শক্তিশালী এনক্রিপশন নিশ্চিত করা, সাইবার প্রতিরক্ষা কেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়ানো এবং নিয়মিত ইলেকট্রনিক নিরাপত্তা নিরীক্ষা পরিচালনা করা। প্রতিষ্ঠানের ভেতরের ব্যক্তিকে কাজে লাগিয়ে গোপন তথ্য সংগ্রহ বা নিরাপত্তাব্যবস্থা ভাঙার ঝুঁকিও গুরুত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সীমান্ত ও সামরিক তৎপরতায় উন্নত নজরদারি। আধুনিক সেন্সর, চালকবিহীন আকাশযান এবং চিত্র বিশ্লেষণ প্রযুক্তি বাংলাদেশের সীমান্ত ও সামরিক কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণে ভারতের সক্ষমতা বাড়াতে পারে। এর জবাব প্রতিটি অস্ত্রের বিপরীতে সমজাতীয় অস্ত্র কেনা নয়। প্রয়োজন নিজস্ব গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি ও অনুসন্ধান সক্ষমতা; ড্রোন প্রতিরোধব্যবস্থা; ইলেকট্রনিক যুদ্ধের প্রস্তুতি; নিরাপদ যোগাযোগ এবং কার্যকর সীমান্ত পর্যবেক্ষণ। সীমিত সম্পদ কোথায় ব্যয় করলে সর্বাধিক নিরাপত্তা অর্জিত হবে, সেটিই হওয়া উচিত মূল বিবেচনা।
তৃতীয়ত, সাইবার ও তথ্যগত দুর্বলতা। আক্রমণকারী যে-ই হোক, সরকারি নেটওয়ার্ক, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, আর্থিকব্যবস্থা ও টেলিযোগাযোগ গোয়েন্দা তৎপরতার সম্ভাব্য লক্ষ্য। এসব ক্ষেত্রে নিয়মিত অনুমোদিত অনুপ্রবেশ পরীক্ষা, সংবেদনশীল নেটওয়ার্ক পৃথক রাখা এবং প্রযুক্তিপণ্য ও সেবার সরবরাহব্যবস্থার নিরাপত্তা যাচাই জরুরি। পাশাপাশি প্রয়োজন এমন একটি সক্ষম জাতীয় ব্যবস্থা, যা সাইবার ঘটনা দ্রুত শনাক্ত করবে, ক্ষতি সীমিত রাখবে এবং আক্রান্ত সেবা পুনরুদ্ধার করবে।
চতুর্থত, প্রতিগোয়েন্দা ব্যবস্থার পেশাগত সংস্কার। সংবেদনশীল পদে নিয়োগ ও দায়িত্ব প্রদানের আগে যথাযথ যাচাই, শ্রেণিবদ্ধ তথ্যের সুরক্ষা এবং বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার নিয়োগ প্রচেষ্টা শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বেসামরিক ও সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ও অপরিহার্য। তবে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হতে হবে সুস্পষ্ট আইন, জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক তদারকির অধীনে। প্রতিগোয়েন্দা তৎপরতার লক্ষ্য হবে তথ্যপ্রমাণসমর্থিত বৈরী কর্মকাণ্ড; কারও জাতীয়তা বা রাজনৈতিক মতামত নয়। নির্বিচার সন্দেহ নিরাপত্তা বাড়ায় না, বরং প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকের মধ্যে আস্থা দুর্বল করে।
পঞ্চমত, নিরাপত্তার সঙ্গে কূটনীতি। ভারত এবং ইসরাইল-উভয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি নিরাপত্তা সংলাপের পথ রাখা উপকারী হতে পারে। বাংলাদেশের বক্তব্য হওয়া উচিত স্পষ্ট : তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে সহযোগিতা তাদের সার্বভৌম অধিকার; কিন্তু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়। এমন যোগাযোগ ভুল হিসাব ও অযাচিত উত্তেজনার ঝুঁকি কমাতে পারে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে সীমান্ত ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন থাকলেও সরকারি পর্যায়ে নিরাপত্তা আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এ পথকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা প্রয়োজন।
ষষ্ঠত, প্রতিপক্ষের জোটে যোগ দেওয়ার পরিবর্তে সম্পর্কের বহুমুখীকরণ। একাধিক অংশীদারের সঙ্গে প্রতিরক্ষা, সাইবার ও গোয়েন্দা সহযোগিতা গড়ে তোলার পাশাপাশি নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ভারত-ইসরাইল সহযোগিতার প্রতিক্রিয়ায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো বিরোধী গোয়েন্দা বা সামরিক বলয়ে প্রবেশ করলে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে পারে। বাংলাদেশের স্বার্থ হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা বজায় রাখা এবং একক অংশীদারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো।
বাংলাদেশের লক্ষ্য র বা মোসাদকে ‘নিষ্ক্রিয়’ করা হতে পারে না; তার দরকারও নেই। বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হওয়া উচিত নিজের দুর্বলতাগুলো দূর করা। শক্তিশালী প্রতিগোয়েন্দা ব্যবস্থা, সাইবার নিরাপত্তা, সুরক্ষিত সামরিক যোগাযোগ, নিজস্ব নজরদারি সক্ষমতা, কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং বহুমুখী আন্তর্জাতিক সহযোগিতাই সার্বভৌমত্ব রক্ষার ভিত্তি।
প্রশ্নটি তাই শুধু অন্যের গোয়েন্দা শক্তি কতটা বাড়ছে, তা নয়-আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি কতটা বাড়ছে? আশঙ্কাকে উত্তেজনায় রূপান্তর করা সহজ; তাকে সক্ষমতা, শৃঙ্খলা ও দূরদর্শিতায় রূপান্তর করাই দায়িত্বশীল রাষ্ট্রনীতির পরীক্ষা।
লে. কর্নেল (অব.) মোদাসসের হোসেন খান, বীরপ্রতীক : বীর মুক্তিযোদ্ধা; সামরিক, নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক
