Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

অন্যমত

দেশের জ্বালানি খাত শক্তিশালী করতে হবে

Advertisement

Icon

আবু আহমেদ

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

দেশের জ্বালানি খাত যদি শক্তিশালী করা না যায়, তাহলে আমাদের অর্থনীতি থমকে যাবে। জ্বালানি খাত বলতে আমরা বিদ্যুৎ, গ্যাস, তেল বা পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্টকেই বুঝে থাকি। এই তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ নিয়ে আমাদের জ্বালানি খাত তেমন কোনো সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারছে না। বলতে গেলে কোনোটিই পর্যাপ্ত সার্ভিস দিতে পারছে না। ফলে জ্বালানি ঘাটতির কারণে আমাদের কলকারখানাগুলোয় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। রপ্তানি বাণিজ্য আলোর মুখ দেখছে না। সুতরাং জ্বালানি খাত নিয়ে আমাদের বিশেষভাবে ভাবা উচিত। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হবে-হবে করেও হচ্ছে না। কেন হচ্ছে না, এটা অজানাই রয়ে গেছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করতে কেন দেরি হচ্ছে, বিষয়টি জনসমক্ষে আনা উচিত। কারণ, এ নিয়ে জনগণের মাঝে একটা বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।

আসলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে বাংলাদেশের স্বপ্ন দীর্ঘদিনের। এটা নিয়ে মানুষের মনে অনেক আগ্রহ-উদ্দীপনা রয়েছে। সরকার ইন্টিগ্রেটেড এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার মাস্টার প্ল্যান অনুসারে একটি মিশ্র জ্বালানি নীতি গ্রহণ করেছে, যা ধীরে ধীরে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা থেকে নবায়নযোগ্য শক্তি ও পারমাণবিক শক্তিসহ পরিচ্ছন্ন ও টেকসই উৎসের দিকে স্থানান্তরিত হচ্ছে। এ স্বপ্নের পথে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র (রূপপুর এনপিপি) একটি যুগান্তকারী প্রকল্প হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। এটি ১৯৬১ সালে প্রথম প্রস্তাবিত এবং দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন থেকে বাস্তবে রূপ লাভ করতে যাচ্ছে। ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট নির্ভরযোগ্য ও কার্বনমুক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য নির্মিতব্য রূপপুর এনপিপি বাংলাদেশকে বিশ্বের পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর কাতারে শামিল করছে।

কিন্তু এটা চালু করতে আমাদের অনেক বেশি সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। এ সময়ক্ষেপণের মাশুলও আমাদের গুনতে হয়েছে কয়েকগুণ। এটা সময়মতো চালু করা গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে একটা গতি আসত, অর্থনৈতিকভাবে দেশ এগিয়ে যেত। কিন্তু যতই কালক্ষেপণ হচ্ছে, ততই এর খরচ বাড়ছে। কেননা এ প্রকল্পের বিপরীতে এর দায় দেনাগুলো তো বাংলাদেশকেই সুদে-আসলে পরিশোধ করতে হবে। সুতরাং যত দ্রুত সম্ভব রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে উৎপাদনে দাঁড় করাতে হবে।

বিদ্যুতের জ্বালানি হিসাবে কয়লার গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের দেশে কয়লা খনি থাকা সত্ত্বেও বিদেশ থেকে কয়লা আমদানি করতে হচ্ছে। কেন হচ্ছে? আমার বোধগম্য নয়। কারণ দিনাজপুরে বড়পুকুরিয়ার কয়লা আন্ডারগ্রাউন্ডে পড়ে রয়েছে। সঠিক মাত্রায় উত্তোলন করা হচ্ছে না। কেন হচ্ছে না বা সরকার কেন পিছিয়ে রয়েছে, তার জবাব খোঁজা প্রয়োজন। শোনা যাচ্ছে, পরিবেশবাদীদের নিষেধাজ্ঞা এবং এলাকাবাসীর বাধার মুখে সেখান থেকে কয়লা উত্তোলন করা যাচ্ছে না। ওপেন ফিল্ডে বা উন্মুক্ত ব্যবস্থায় উত্তোলন করলে স্থানীয় এলাকাবাসীর জমি নষ্ট হবে কি না বা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হবে কি না, সেটা খতিয়ে দেখতে পারে সরকার। আমি বলছি না যে, ওপেন ফিল্ডেই কয়লা উত্তোলন করতে হবে। আসলে বিষয়টি পর্যালোচনা করে এটার ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। এটাকে ফেলে রেখে দিয়ে বিদেশ থেকে কয়লা আমদানি করা সরকারের জন্য কোনো সামাধান নয়। পরিবেশবাদীরা বলছেন, এটা ক্ষতিকর। কিন্তু এটা কতটুকু ক্ষতিকর হবে এবং আমাদের রাষ্ট্রের কতটুকু লাভ হবে, এটা আমরা সার্ভে করে বা নতুন করে স্টাডি করে দেখতে পারি। ওপেন ফিল্ডে কয়লা উত্তোলন করলে উৎপাদন খরচ অনেক কম পড়ে। শুধু তাই নয়, ওপেন ফিল্ড বা উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করলে কয়লার উৎপাদনও বাড়ে।

আসলে পরিবেশের কতটুকু ক্ষতি হতে পারে এবং সেখানকার স্থানীয় জনগণের কতটুকু ক্ষতি হতে পারে-এ বিষয়গুলোকে খতিয়ে দেখা যেতে পারে। একটা সার্ভের মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলেই বোঝা যাবে এর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণটা কী এবং লাভের পরিমাণটিই বা কী। পর্যালোচনার পর যদি ক্ষতির চেয়ে লাভের পরিমাণ খুব বেশি হয়, তাহলে একটা সিদ্ধান্তে আসা যাবে। হাত গুটিয়ে বসে থাকলে তো চলবে না। সুতরাং বড় পুকুরিয়াসহ অন্যান্য কয়লা খনির ব্যাপারে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ অনেক কম পড়ে। তাছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অন্য দেশ থেকে কয়লা আমদানির ক্ষেত্রে অনেক সমস্যাও রয়েছে। দেখা যায়, প্রায়ই সঠিক সময় কয়লা এসে পৌঁছে না, বিভিন্ন কারণে দেরি হয়। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা স্বল্পতার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়। কয়লার অভাবে পাওয়ার প্ল্যান্টগুলো অলস বসে থাকে। সুতরাং দেশে কয়লার মজুত থাকা সত্ত্বেও আমরা কেন বিদেশ থেকে কয়লা আমদানি করব? দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় গতি ফেরাতে কয়লা উত্তোলনের ব্যাপারে সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্তে আসতে হবে।

আরেকটি বিষয়ে না বললেই নয়, তা হলো, সরকার কর্তৃক সরাসরি নিজে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার যে রেওয়াজ, এটা বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে অনেক আগেই উঠে গেছে। কিন্তু আমরা এটাকে এখনো ধরে রেখেছি। আর এভাবে ধরে রাখার কারণে ইতোমধ্যেই আমরা একটা বিরাট সংকটের মুখে পড়ে গেছি। ঘনঘন লোডশেডিং হচ্ছে, কলকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার ফলে দেশের অর্থনীতিতে এর একটা ধাক্কা আসছে। আবার আদানি থেকে যে বিদ্যুৎ আসছে তা নিরবচ্ছিন্ন নয়, তারা কখনো কখনো বিদ্যুৎ দিতে ব্যর্থ হয়। আদানির সঙ্গে চুক্তিতে বিশাল দুর্নীতি হয়েছে। তাছাড়া এটার এক্সিট ক্লজ নেই। পত্র-পত্রিকায় এ নিয়ে রিপোর্টও হয়েছে। শুধু তাই নয়, আমরা তাদের থেকে বিদ্যুৎ না পেলেও তাদের বিশাল অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ দিয়ে যেতে হয়। এটা একটা বিশাল লিগ্যাল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব সমস্যা থেকে বের হতে হলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে দ্রুত উৎপাদনের আওতায় আনতে হবে।

পত্রিকা থেকে জানতে পারলাম, বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগে সরকার স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত বদল করেছে। এর পরিবর্তে ব্যয়সাশ্রয়ী স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় ডিসেম্বর পর্যন্ত এলএনজি সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিত করে ফেলেছে সরকার। ফলে এক কার্গোতেই ৫০০ কোটি টাকারও বেশি সাশ্রয় হবে বলে আশা করা যায়। সরকারের এ সিদ্ধান্তকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাতে হয়।

পত্রিকায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে কাতার, ওমান এবং যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জি কম দামের এলএনজি সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। কারণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় এলএনজির কার্গো বের হতে পারছে না। স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে গিয়ে বাংলাদেশ বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে। অনেক অনুরোধের পর কাতার এনার্জি ২৬ অক্টোবর এক কার্গো এলএনজি দিতে রাজি হয়েছে। এ অবস্থায় স্পট মার্কেটের বদলে আপাতত জেকেএম সূচকের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশকে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। এতে করে প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম কমপক্ষে ২ ডলার কম পড়ছে। এই ২ ডলার কম হওয়ার কারণে প্রতি কার্গোতে সাশ্রয় হচ্ছে ৬৪ লাখ ৪০ হাজার ডলারের মতো। ডিসেম্বরে তিনটি স্পট খালি আছে। সেগুলো স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় কার্গো কেনার সমঝোতা চলছে। আগে প্রতি মাসে কমপক্ষে ৫-৬টি স্পট মার্কেট থেকে কার্গো কেনা হয়েছে। এ হিসাবে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত আর স্পট মার্কেট থেকে কোনো কার্গো কিনতে না হলে সরকারের সাশ্রয় হবে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা।

গ্যাসের চাহিদা মেটাতে বছরে ১১২ থেকে ১১৪টি কার্গো আমদানি করে থাকে পেট্রোবাংলা। স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির কারণে ২০২৭ সালে স্পট মার্কেট থেকে তেমন কোনো কার্গো কিনতে হবে না। বড়জোর ৩-৪টি কার্গো স্পট মার্কেট থেকে কিনতে হতে পারে। তবে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পরিস্থিতি আরও ভয়ানক হলে এলএনজির জন্য বাংলাদেশকে আরও বড় মাশুল দিতে হতে পারে। সুতরাং এ ব্যাপারে আমাদের আগে থেকেই সচেতন থাকতে হবে।

আবু আহমেদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ; চেয়ারম্যান, আইসিবি

অনুলিখন : জাকির হোসেন সরকার

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

অন্যমত দেশের জ্বালানি খাত শক্তিশালী করতে হবে

দেশের জ্বালানি খাত শক্তিশালী করতে হবে

র-মোসাদ আঁতাত : বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর করণীয়

র-মোসাদ আঁতাত : বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর করণীয়

সাইবার নিরাপত্তা নাকি সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা

সাইবার নিরাপত্তা নাকি সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা

দৃষ্টিপাত এ পদক্ষেপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে

এ পদক্ষেপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম