বিএনপির সামনে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
Advertisement
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) জিয়াউল হাসান
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে ১৭ ফেব্রুয়ারি। এর মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপে এসেছে বড় পরিবর্তন। নির্বাচনের পরপরই বিএনপির উচিত ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করা, যার লক্ষ্য হতো আগামী পাঁচ বছরের শাসনের ‘ক্রিটিক্যাল ভালনারেবিলিটিজ’ বা চরম দুর্বলতার জায়গাগুলো চিহ্নিত করা এবং তার ভিত্তিতে দুটি স্পষ্ট কৌশলপত্র তৈরি করা : রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কৌশলপত্র ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার কৌশলপত্র। আজ সরকার গঠনের ২৩৪তম দিন। এখনো যদি এ কৌশলপত্র তৈরি না হয়ে থাকে, তবে দেশ সুস্থিরভাবে পরিচালনার প্রস্তুতিতে বিএনপি ২৩৪ দিন পিছিয়ে আছে।
কৌশলপত্র তৈরি শুরুটা করতে হয় আত্মসমালোচনা দিয়ে, যা সেই কৌশলপত্রের দার্শনিক উপাদান। ক্ষমতায় আসার আগে, নিদেনপক্ষে সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গে একটি দলকে পূর্ববর্তী সরকারের এবং নিজের অতীত শাসনের চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে হয় : কোন ভুল শাসনকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল, কোন পদক্ষেপ দেশকে অস্থির করেছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতাই অস্থিতিশীলতা ডেকে আনে, যা একটি নির্বাচিত সরকারকে কাজ করতে বাধা দেয় এবং শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ প্রমাণ করে। সেই ভুলগুলোই হয়ে ওঠে সব অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দু। কৌশলপত্র তৈরির দার্শনিক উপাদান নির্ধারণের পর ফিজিক্যাল উপাদান ঠিক করা স্ট্র্যাটেজিক অভিধানে একে বলে ‘সেন্টার অব গ্রাভিটি’ বা ভরকেন্দ্র : এটি সেই মূল উপাদান, যা রক্ষা বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে সামগ্রিক অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা অর্জন সম্ভব।
এ ভরকেন্দ্র রক্ষার পরিকল্পনাই সরকারের রাজনৈতিক কৌশল। এর উপাদান হতে পারে আইনগত সংস্কার, প্রশাসনিক সংস্কার, গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও পদায়নের স্বচ্ছ পদ্ধতি, বিচার বিভাগের সংস্কার এবং সাধারণ মানুষের ন্যূনতম চাওয়াগুলো মাথায় রেখে কর্মকৌশল সাজানো। সরকার এটুকু পারলে তার শাসনকাল নির্বিঘ্নে শুরু হওয়ার অপার সম্ভাবনা থাকে। আর বিএনপির জন্য সবচেয়ে সহজ পথ ছিল একটাই : আওয়ামী লীগের ভুলগুলো না করার কৌশল।
সরকার গঠনের পর প্রথম প্রশ্ন উদ্দেশ্য নির্ধারণ : বিএনপি কোন পরিবেশে দেশ চালাতে চায়, জনগণ ও অন্য অংশীজনের সঙ্গে তার সম্পর্ক কেমন হবে। শান্ত পরিবেশ চাইলে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের নীতি ঠিক করতে হবে : ‘পলিটিক্স অব কনসেনসাস’, নাকি ‘পলিটিক্স অব কনফ্রন্টেশন’। বাংলাদেশের জন্য এটি আরও বেশি জরুরি, কারণ গত ৫৫ বছরে সরকারি বা বিরোধী কোনো দলের কাছ থেকেই দেশ দায়িত্বশীল ও সহনশীল আচরণ দেখেনি। চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের পর মানুষ সব দলের কাছে নতুন ধরনের দায়িত্বশীলতা আশা করেছিল। কারণ, স্থিতিশীল পরিবেশ পেলে অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয়, প্রশাসন গতিশীল হয়, সরকার কল্যাণমুখী হয় এবং কোনো ছলচাতুরী ছাড়াই আবার নির্বাচন জিতে ক্ষমতায় ফেরা যায়। মনে রাখতে হবে, শাসক যখন ভরকেন্দ্র রক্ষায় ব্যস্ত, বিরোধীরা তখন সেই ভরকেন্দ্রেই আঘাত করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার সুযোগ খুঁজে। এটাই রাজনৈতিক কৌশল।
বিএনপির দুই মেয়াদেই আওয়ামী লীগের চরম অসহযোগিতা ও দায়িত্বজ্ঞানহীন ধ্বংসাত্মক আচরণ ছিল : প্রথম মেয়াদের শেষ দুই বছর এবং দ্বিতীয় মেয়াদের প্রায় তিন বছর দেশ কেটেছে হরতাল, অবরোধ আর অস্থিরতায়। বিএনপি একটু ভাবলেই বুঝবে, এ অস্ত্রগুলো তারা নিজেরাই বিরোধীদের হাতে তুলে দিয়েছিল। রাজনীতিতে এগুলোকেই বলে আত্মঘাতী পদক্ষেপ। এর মূল্যও ছিল চরম। এক-এগারোর সরকারের হাতে বিএনপি নির্মমভাবে নির্যাতিত হয়েছে; আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চিরতরে পঙ্গু করে রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পরিবারকে মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে। দ্বিতীয় মেয়াদের সেই ভুলই বাংলাদেশকে উপহার দিয়েছিল হাসিনার স্বৈরশাসন। পনেরো বছরের সেই চসেস্কু-ধরনের শাসনের অবসান ঘটিয়েছে ‘জেন-জি’ আর সাধারণ মানুষের শ্বাসরুদ্ধকর, সাহসী অভ্যুত্থান।
নির্বাচন-পরবর্তী অস্থিরতা আসতে পারে অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক অশান্তি ও আন্তর্জাতিক চাপ থেকে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বসেছেন একটি অকেজো, বিধ্বস্ত রাষ্ট্রের চালকের আসনে। বাংলাদেশকে একটি গাড়ির সঙ্গে তুলনা করলে, তিনি এমন গাড়ির চালক, যার জ্বালানি শূন্য, জ্বালানি কেনার টাকাও নেই, অথচ গাড়ি বোঝাই যাত্রী, যারা শুধু বিএনপির নয়, সারা দেশের। সেই যাত্রীদের মধ্যে আছে রাজনীতির বাইরে থাকা প্রায় ছয় কোটি তরুণ, যারা জানে না তাদের ভবিষ্যৎ কোথায়, এরাই তারেক রহমানের সরকারের জন্য আসল ভরকেন্দ্র। এ তরুণদেরই একটি অংশ জীবনবাজি রেখেছিল; প্রাণ দিয়েছে প্রায় ১,৪০০ মানুষ, পঙ্গু হয়েছে প্রায় ২০ হাজার, যাদের প্রায় দুই হাজার দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে। বিএনপির কাণ্ডারিদের প্রতি অনুরোধ, মিত্র আর শত্রু চিনুন।
জুলাই সনদে প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার, যেমন প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা ও দ্বিকক্ষ সংসদ, বাস্তবায়ন বিএনপির জন্য মোটেই কঠিন নয়; এর চেয়েও কঠোর সংস্কারের সক্ষমতা তাদের আছে। সংস্কার করলে দেশ শাসন কঠিন হবে, এ ধারণা অবান্তর। রাষ্ট্রে সরকারের চেয়ে শক্তিশালী কেউ নেই, আর সরকার যত স্বছ, তার শক্তি তত বেশি। বিএনপির মতো বড় দলকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে কেবল বিএনপি নিজেই, এ প্রশ্নে : ‘আমরা নিজেদের আর কত স্বছ রেখে, কত কঠোর জবাবদিহির মধ্যে এনে দেশ শাসন করতে পারি?’ এ সাহস দেখালেই অতীতের অভিযোগ থেকে বেরোনোর পথ মিলবে। মন্ত্রিসভা ও গুরুত্বপূর্ণ পদে মেধা ও দক্ষতাকে মানদণ্ড করাই হতে পারে, সেই সাহসের প্রথম প্রমাণ।
এখন পর্যন্ত সরকারের সবচেয়ে সফল ক্ষেত্র আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও পররাষ্ট্রনীতি, আর তার কারণও একটি: সাহস করে বুক চিতিয়ে এগোনোর প্রতিজ্ঞা। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও স্থিতিশীলতা আন্তর্জাতিক সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল, আর সেই সমর্থন নির্ভর করে আমাদের সফট পাওয়ারের ওপর। পশ্চিমা বিশ্বের অকুণ্ঠ সমর্থন পেতে সুশাসনের মান বাড়াতে হবে, কারণ ইউরোপ ও আমেরিকার সঙ্গে আমাদের স্বার্থ শুধু বৈদেশিক মুদ্রা নয়, বিপুল কর্মসংস্থানও। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্যের, বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকট ও প্রবৃদ্ধির জন্য। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সংযোগও অপরিহার্য : জ্বালানি, শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা ও রেমিট্যান্সের প্রবাহের জন্য; কিন্তু ঘরের অস্থিরতা ঠেকাতে না পারলে বিদেশি অংশীজনের আস্থা আসবে না, বিনিয়োগও আসবে না। এর প্রথম আঘাত পড়বে চাকরির বাজারে, অর্থাৎ সেই ছয় কোটি তরুণের ওপর, যারা তারেক রহমানকে তাদের আইকন হিসাবে দেখতে চায়।
সবশেষে, দলের অভ্যন্তরীণ মেধাশক্তি বাড়ানোকে প্রধানমন্ত্রীর এখনই অগ্রাধিকার দিতে হবে। ২০০১ সাল থেকে দল গোছানোর যে পরিশ্রম তিনি করেছিলেন, তার ফলেই ১৭ বছরের নির্বাসনেও দল এক সুতায় গাঁথা ছিল; কিন্তু চব্বিশের পর রাজনীতিতে এসেছে একঝলক মেধাবী, বুদ্ধিমান তরুণ, যারা নিজেদের স্বচ্ছ রাজনীতিক হিসাবে উপস্থাপন করছে; তারাই ছিল আন্দোলনের ‘ফাইনাল অফেন্সিভ’-এর মূল শক্তি। নির্যাতনের ১৭ বছরে বিএনপি মেধাবীদের নিয়ে এগোতে পারেনি; এখনই সেই কাজ শুরুর সময়। মেধাবী তরুণ নেতা সংগ্রহ ও গড়ে তোলায় দ্রুত হাত না দিলে মাসলম্যান দিয়ে প্রতিপক্ষের জ্ঞানভিত্তিক রাজনীতি মোকাবিলা করা যাবে না। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ইস্যুতে বিরোধী নেতাদের যুক্ত করতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের একটি প্ল্যাটফর্ম জরুরি। এটিই হবে রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলে তারেক রহমানের প্রথম চমক। পলিটিক্স অব কনসেনসাস অনুসরণ করতে না পারলে অভ্যন্তরীণ বিভেদ অস্থিরতা ডেকে আনবে, যা বিএনপি বা জনগণ কারও জন্যই সুখকর নয়।
ভরকেন্দ্রগুলো রক্ষা করতে পারলে বিএনপি দেশকে স্থিতিশীল করতে পারবে, তবে সেই স্থিতিশীলতা আসবে কাজে, শুধু ঘোষণায় নয়। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন ধরনের রাজনীতি না করলে, নতুন এক চক্র শুরু হতে পারে, যার অশনিসংকেত বাংলাদেশের আকাশে ইতোমধ্যেই উঁকি দিচ্ছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) জিয়াউল হাসান : রাজনীতি বিশ্লেষক
