আফগানিস্তান যেভাবে পাকিস্তানের জন্য কাঁটা হয়ে উঠছে
Advertisement
আহমদ সাকিব বকশি
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
‘মস্কো ফরম্যাটের’ আওতায় রাশিয়ার প্রত্যাশা-চীন, ভারত, ইরান, রাশিয়া এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে একই মঞ্চে এনে একটি ‘কূটনৈতিক বোঝাপড়ায়’ পৌঁছাতে উদ্বুদ্ধ করা।
বর্তমান বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)। তবে এর তাৎপর্য সাধারণ আফগানিস্তান-পাকিস্তান সংকটের চেয়ে অনেক গভীর। ইসলামাবাদ একইসঙ্গে দুটি কৌশলগত মোড় অতিক্রম করছে : তালেবান-নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তান একদিকে পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা হুমকিতে পরিণত হয়েছে; অন্যদিকে, সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বিস্তারের মাধ্যমে সুদূর পশ্চিমে পাকিস্তান তার নিজের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়াচ্ছে।
এ দুটি ঘটনা যে একটির সূত্রে অন্যটি ঘটেছে-তা নয়। তবে দুটি বিষয়ই শেষ পর্যন্ত এসে মিলছে একই বিন্দুতে-যা পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা ও কৌশলগত হিসাব-নিকাশকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।
“পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা বলয়ে ‘প্রধান সেতু’ হিসাবে কাজ করছে, আর আফগানিস্তান হয়ে উঠছে সেই কাঠামোর ‘দুর্বলতম স্থান’।”
আফগান নীতিতে পাকিস্তানের এ ‘বিপরীত মোড়’ অত্যন্ত লক্ষণীয়। ২০২১ সালে তালেবানের নতুন করে ক্ষমতা দখল ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা তৎকালীন কাবুল সরকারকে উৎখাত করে এবং এমন এক রাজনৈতিক শক্তিকে প্রতিষ্ঠিত করে, যাদের ওপর পাকিস্তানের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে বলে ধারণা করা হতো; কিন্তু টিটিপি সংকট সেই সুবিধাজনক অবস্থানকেই আজ এক ভয়াবহ দুর্বলতায় বদলে দিয়েছে।
আফগান তালেবান ও টিটিপি দুটি পৃথক সংগঠন হলেও দীর্ঘদিনের যৌথ লড়াই আর মাঠপর্যায়ের গভীর সম্পর্ক তাদের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ের চেয়েও বেশি একসূত্রে গেঁথে ফেলেছে। জাতিসংঘের একটি নজরদারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানে টিটিপি ধারাবাহিকভাবে রসদ সরবরাহ, সশস্ত্র কার্যক্রম চালানোর জায়গা এবং আর্থিক সাহায্য পেয়ে আসছে।
ফলে ইসলামাবাদ কাবুলের কাছে শুধু একটা সিদ্ধান্ত বদল নয়, বরং তার চেয়েও অনেক বেশিকিছু দাবি করছে। টিটিপির সঙ্গে চূড়ান্ত সম্পর্কছেদ করতে গেলে তালেবানের এমন কিছু নেটওয়ার্ক ও পরিপার্শ্বিকতার মুখোমুখি হতে হবে, যেখান থেকে একসময় তাদের নিজেদের সশস্ত্র আন্দোলনও শক্তি ও সমর্থন পেয়েছিল।
দুপক্ষের এ দ্বন্দ্বে বরং ভারতেরই সুবিধা হচ্ছে। তালেবানশাসিত আফগানিস্তানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি না দিলেও নয়াদিল্লি তাদের সঙ্গে কাজের সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। কাবুলের জন্য ভারত এমন একটি বিকল্প, যার মাধ্যমে তারা পাকিস্তানের বাইরে একটি আলাদা কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক দরজা পাচ্ছে। আর ভারতের জন্যও এটি ভালো একটি সুযোগ-পাকিস্তান ও তালেবানের মধ্যকার এ দূরত্বকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান আবার শক্ত করার।
পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, পাকিস্তান এক বিড়ম্বনায় পড়েছে : চাপ দিয়ে তালেবানের নিরাপত্তা ইস্যুতে লাইনে আনতে গিয়ে, উলটো তারা কাবুলকে ভারতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে-যা পাকিস্তান কখনোই চায়নি।
আফগানিস্তানের ভেতরের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি অবশ্য নতুন একটা প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসছে। এখানকার সশস্ত্রবিরোধী গোষ্ঠীগুলোর লড়াইয়ের কৌশলে কিছু বদল স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যেমন-জুলাই মাসে ‘সিপাহিয়ান-ই-মিহান’ বদখশানের ইয়াফতাল-ই পায়িনের প্রশাসনিক কেন্দ্রটি কিছু সময়ের জন্য দখল করে নিয়েছিল, আবার জেবা অঞ্চলে ‘আফগানিস্তান ফ্রিডম ফ্রন্ট’ তালেবানের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে লড়াই চালিয়ে গেছে। আর অতি সম্প্রতি নুরিস্তানেও সংঘর্ষ বেশ তীব্র হয়ে উঠেছে।
তালেবানের অভিযোগ, সাবেক আফগান সেনাসদস্যসহ নানা সশস্ত্র গোষ্ঠীকে মদদ দিচ্ছে পাকিস্তান। তবে পাকিস্তান এ অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছে। তাছাড়া, ইসলামাবাদ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে সুসংগঠিত কোনো আফগানবিরোধী অভিযান চালাচ্ছে-এমনটি প্রমাণের মতো নিরপেক্ষ কোনো তথ্য-প্রমাণও কিন্তু নেই।
তবে নিজেদের প্রভাব বা দরকষাকষির জোর বাড়াতে আফগানিস্তানে সরকার বদলে ফেলা পাকিস্তানের জন্য একেবারেই জরুরি নয়। বিভিন্ন অঞ্চলে মাথাচাড়া দেওয়া বিরোধী দলগুলো তালেবানের একচ্ছত্র ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দিতে পারে, তাদের সামরিক শক্তিকে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দিকে ঘোরাতে বাধ্য করতে পারে-আর এমন এক চাপ তৈরি করতে পারে, যা সীমান্তে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেও পাকিস্তান হাসিল করতে পারেনি।
এখন দেখার বিষয় হলো, এসব বিরোধী গোষ্ঠী দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ আশ্রয়, রসদ, অস্ত্র ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ ধরে রাখতে পারছে কিনা। প্রকাশ্যে কোনো মদদ না দিয়েও পাকিস্তান যদি এ দলগুলোকে প্রশ্রয় না দেওয়ার কৌশল থেকে সরে এসে কেবল নীরবে সহ্য করাও শুরু করে, তাতেই আফগান রাজনীতির হিসাব-নিকাশ বদলে যেতে পারে।
তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, এসব বিষয় মধ্যপ্রাচ্যের জন্য কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? কারণ খুব স্পষ্ট-সেখানেও কিন্তু ঠিক একই সময়ে পাকিস্তানের কৌশলগত প্রভাব বাড়ছে।
সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিটি এখন একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পাচ্ছে। তিন দেশ মিলে একটি রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটি গঠন করেছে এবং সৌদি আরবে একটি স্থায়ী সচিবালয় গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে-যার প্রথম প্রধান হবেন একজন পাকিস্তানি। পাশাপাশি নিজেদের সামরিক নিরাপত্তা জোরদার করা, প্রতিরক্ষা শিল্পে সাহায্য করা এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নে তারা একসঙ্গে কাজ করতে রাজি হয়েছে।
তবে এ সমঝোতাকে অতিরঞ্জিত করে এমন কোনো জোট হিসাবে দেখা ঠিক হবে না, যা সব সংকটে একইভাবে সাড়া দেবে। কারণ পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক-তিন দেশেরই নিরাপত্তা ঝুঁকি ও বৈদেশিকনীতি পুরোপুরি আলাদা। কিন্তু এ চুক্তিটি যে এখন আর শুধু নামকাওয়াস্তে নেই, তার প্রমাণ মিলতে শুরু করেছে। পাকিস্তান জানিয়েছে, সৌদি আরবে হামলা জোরদার হওয়ার পর ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে রাজনৈতিক আলাপের বিষয়ে ইরানের প্রস্তাব খতিয়ে দেখতে তিন দেশ জরুরি বৈঠকে বসতে যাচ্ছে।
দেখা যাচ্ছে, এখানে একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব কেবল আফগানিস্তানেই সীমাবদ্ধ নয় : সুদূর পশ্চিমে পাকিস্তান অন্যতম প্রধান নিরাপত্তা জোগানদার হিসাবে জায়গা করে নিচ্ছে, আবার অন্যদিকে নিজেরই পশ্চিম সীমান্তে এসে সে নিজেই নিরাপত্তার মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছে।
আফগানিস্তান কিন্তু নতুন কোনো উপসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলেনি কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতাও তালেবানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক ভাঙনের মূল কারণ নয়। তবে যে কোনো রাষ্ট্রেরই সামরিক সক্ষমতা, গোয়েন্দা নজরদারি, কূটনৈতিক শক্তি আর কৌশলগত পরিধি তো সীমিত। ফলে আফগানিস্তানের দিক থেকে আসা এ চাপ এখন এমন এক রাষ্ট্রের ওপর গিয়ে পড়ছে, যার নিরাপত্তা ভূমিকা সুদূর পশ্চিমে দিনে দিনে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এ কারণেই আফগানিস্তানের অস্থিতিশীলতাকে আর কেবল দক্ষিণ এশিয়ার গণ্ডিতে আটকে রেখে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, ভারত ও পাকিস্তানের বৈরিতা আগের মতোই রয়ে গেছে; চীন আর ভারতের প্রতিযোগিতাও থামেনি; ইরান হাঁটছে তার নিজস্ব আঞ্চলিক কৌশলে, আর রাশিয়া তো তালেবান সরকারকে ইতোমধ্যে স্বীকৃতিই দিয়ে দিয়েছে। এতসব মতপার্থক্য সত্ত্বেও পাকিস্তান-তালেবান সংঘাত যাতে আর বড় আকার ধারণ না করে-সে বিষয়ে কিন্তু সবপক্ষই একমত।
এটি মূলত আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির এমন এক নিবিড় সম্পর্কের চিত্র-যেখানে দেশগুলো একইসঙ্গে এক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করছে, অন্য ক্ষেত্রে সহযোগিতার হাত বাড়াচ্ছে, আবার অন্য কোথাও কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রেখে চলছে। ফলে কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট বা নির্দিষ্ট কোনো কৌশল না থাকলেও এক অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আর তার প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ছে অন্য অঞ্চলে।
আফগান জনগণের জন্য এ তফাতটা খুব দরকারি : নিজেদের ভেতরের পরিবর্তন মানে এই নয়, এক প্রতিবেশীর প্রভাব থেকে বেঁচে অন্য কোনো শক্তির ওপর ভর করতে হবে। একটা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা তখনই মান্যতা পাবে, যখন তা আফগানদের নিজেদের অংশগ্রহণ থেকে গড়ে উঠবে এবং একইসঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকিগুলোকেও সামাল দিতে পারবে।
পশ্চিমের দিকে পাকিস্তানের নিরাপত্তা ভূমিকা যত বাড়ছে, এ প্রশ্নের উত্তরও কেবল দক্ষিণ এশিয়ার গণ্ডিতে আটকে থাকছে না। পাকিস্তান যেখানে দুই অঞ্চলের মূল সংযোগবিন্দু হয়ে উঠছে, আফগানিস্তান সেখানে তৈরি করছে প্রধান চাপের জায়গা।
মিডল ইস্ট মনিটর থেকে অনুবাদ : পরম ওয়াজেদ শিকদার
আহমদ সাকিব বকশি : আফগানিস্তানের সাবেক উপর্যুপরি চার ভাইস প্রেসিডেন্টের সিনিয়র অর্থনৈতিক উপদেষ্টা, আফগানিস্তানবিষয়ক ইউএনএএমএর পরিচালনা কর্মকর্তা হিসাবে সাত বছর দায়িত্ব পালনকারী
