কিরিলের ল্যাপটপ চুরি বনাম আমাদের ভাবমূর্তি
Advertisement
সুমন জিহাদী
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কিছুদিন আগেই বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষ্যে আমরা পত্রপত্রিকায় অনেক নিবন্ধ পড়েছি, পর্যটনশিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের কথা জেনেছি। একইসঙ্গে জেনেছি পর্যটন নিয়ে সরকারের প্রকল্প ও নীতিমালাবিষয়ক উদ্যোগগুলো। কিন্তু বাংলাদেশে একটা অদ্ভুত ‘সোশ্যাল প্যারাডক্স’ বা সামাজিক দ্বৈরথ আছে। যখন কোনো একটি ঘটনা আমাদের স্বপ্ন দেখায়, ঠিক তখন আরেকটি বিপরীত অঘটন আমাদের স্বপ্ন দেখাকে তাচ্ছিল্য করে; হতাশায় পরিণত হয় আমাদের আকাঙ্ক্ষাগুলো। অতিসম্প্রতি দুটি ঘটনা সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনভাবে ছড়িয়ে গেছে যে, আমাদের ভাবমূর্তি বিশ্ববাসীর কাছে ক্ষুণ্ন হওয়ার প্রবল আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একটি ভিডিওতে একজন মাঝিকে এক বিদেশি পর্যটকের কাছে টাকা চাইতে দেখা যায়। একবার না, বারবার। বিদেশি ফটোগ্রাফার বেশ বিব্রত হন এবং অস্বস্তির মধ্যেই তাকে ফিরিয়ে দেন। আরেকটি ভিডিও আরও বেশি অবমাননাকর। জার্মান যুবক কিরিল ল্যান্ডারের ল্যাপটপ ও ক্যামেরাসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র নাটোর রেলস্টেশন থেকে চুরি করে নিয়ে গেছে বাংলাদেশি এক প্রতারক। কিরিল ল্যান্ডারকে এ সময় রেলওয়ে থানায় বসে কাঁদতে দেখা গেছে।
এই ভিডিও দুটি পৃথিবীর মানুষের কাছে আমাদের বিষয়ে কী ধারণা তৈরি করবে? যারা সাধারণ পর্যটক, তারা বড় বড় পত্রিকার কলাম, গবেষণা বা সরকারের প্রতিবেদন পড়ে গন্তব্য নির্ধারণ করে না। তারা গন্তব্য ঠিক করার আগে প্রথমত সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়মিত ও পরিচিত ব্লগারদের ভিডিওগুলো দেখে। ট্রিপ অ্যাডভাইজার, বুকিং ডটকম বা আগোডার মতো বড় বড় ট্রাভেল প্ল্যানার প্ল্যাটফর্মের রিভিউ দেখে। কিরিল এখন বাংলাদেশের ব্যাপারে কেমন রিভিউ দিতে পারেন, বা কেমন দেওয়া উচিত? আসলে কিরিল তো একজন নন। কক্সবাজারের রিকশাওয়ালা কর্তৃক এক বিদেশি যুগলকে হয়রানি করার ভিডিও দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল বছর দুই আগে। বেশ আলোচনা হয়েছিল এক অস্ট্রেলিয়ান নারী পর্যটক কক্সবাজারের হোটেলকক্ষে ধর্ষণের শিকার হওয়ায়। অনেক বছর আগে একবার এক কানাডিয়ান গবেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ক্যাফেটেরিয়ায় হারিয়েছিলেন তার ল্যাপটপ আর ক্যামেরা, যেখানে তার গবেষণার জন্য সংগৃহীত সব তথ্য আর ছবি ছিল। কদিন আগেই রাজশাহীতে কিছু কিশোর টিকটকার হয়রানি করেছিল কয়েকজন বিদেশি ভ্রমণপিপাসুকে। যদিও পরে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করেছিল; কিন্তু বাস্তবতা হলো, ততক্ষণে আমাদের যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গেছে। এ ঘটনাগুলোই প্রবাসীদের কাছে আমাদের সম্মিলিত প্রতিচ্ছবি তৈরি করে, বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নির্মাণ করে।
অনেকেই মনে করতে পারেন, এগুলো কেবল বিদেশি পর্যটকদের বাংলাদেশ ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করে। বিষয়টি এর থেকেও বহুমাত্রিক ও গুরুতর। এ ধরনের নেতিবাচক রিভিউ ও ব্লগের সংখ্যা যত বাড়তে থাকে, এর প্রভাবও চক্রবৃদ্ধি আকারে বাড়ে। তিন ধরনের ক্ষতি স্বল্পমেয়াদে বা তৎক্ষণাৎ ঘটে। প্রথমত, বিদেশি পর্যটকরা এ দেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। পর্যটক অনুপ্রবেশের ফলে আমাদের যে আর্থিক লেনদেনগুলো হওয়ার কথা ছিল, সেগুলো হয় না, কর্মসংস্থানের গতি হ্রাস পায়। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশিদের সম্পর্কে এমন ধারণা বিদেশে আমাদের অনুপ্রবেশ সংকুচিত করে, পাসপোর্টের ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং বিমানবন্দরগুলোতে বর্ধিত যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয় বাংলাদেশি নাগরিকদের। তৃতীয়ত, ইতোমধ্যে যারা প্রবাসে আছেন, তাদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা কমে, কর্মসংস্থান ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়। এখন অনেক দেশ আমাদের নাগরিকদের চাকরি দেওয়ার ব্যাপারে নিরুৎসাহী। তারা সেটি কাগজে-কলমে প্রকাশ করে না। কাগজে-কলমে তারা সমান সুযোগ, সবার প্রতি সম্মান প্রদর্শন-এ ধরনের মূল্যবোধের পক্ষে থাকলেও বাস্তবে সবাই চিন্তা করে, নিয়োগকৃত নাগরিক কোন দেশের, সেদেশের মানুষের গড় আচরণ সন্তোষজনক কিনা। এটিকে অন্যায় বা অনুচিত বলারও সুযোগ নেই। বসতবাড়িতে কাজের লোক নিয়োগ দিতেও আমরা কর্মীর গ্রামের বাড়ি, আচার-ব্যবহার বিবেচনা করি। বেসরকারি চাকরিতে পূর্ববর্তী কর্মসংস্থানে তার সম্পর্কে তথ্য নেওয়ার সংস্কৃতি প্রচলন আছে। আর সরকারি চাকরি হলে তো সে আয়োজন আরও বৃহৎ-পুলিশ ভেরিফিকেশন, গোয়েন্দা তথ্য ইত্যাদি। সেক্ষেত্রে একজন বিদেশি নাগরিককে চাকরি দেওয়ার ক্ষেত্রে আমেরিকান বা ইউরোপিয়ানরা সেদেশের মানুষের সাধারণ আচরণ, কান্ট্রি প্রোফাইলের খোঁজখবর তো নিতেই পারে। দীর্ঘমেয়াদে এসব ঘটনার ফলে আমাদের বহুপাক্ষিক সম্পর্ক দুর্বল হয়। বৈদেশিক রেমিট্যান্সের গতি কমতে থাকে, ফরেন রিজার্ভ হ্রাস পায়, বৈদেশিক ঋণনির্ভরতা বাড়াতেও পরোক্ষভাবে এর অবদান আছে। আমরা ক্রমেই হয়ে উঠতে পারি বিচ্ছিন্ন ও অপ্রাসঙ্গিক।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ওয়েবসাইট, ট্রাভেল প্ল্যাটফর্ম ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন যাচাই করার পর এটিই অনুমেয় যে, বাংলাদেশ সম্পর্কে পর্যটকদের বর্তমান পর্যালোচনা বেশ নেতিবাচক। দেশের পর্যটনশিল্পকে উন্নত করতে কেবল পর্যটনকেন্দ্রিক বিনিয়োগ, প্রশিক্ষিত শ্রমিক সৃষ্টি বা গন্তব্য তৈরি করাই যথেষ্ট নয়, বরং সমগ্র সমাজটাকেই আন্তরিকতা ও উষ্ণতার আবহে নির্মাণ করতে হবে। নিউমার্কেট থেকে শুরু করে গাবতলী বা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার চায়ের দোকানদার পর্যন্ত একটি সরল, একমুখী ও নির্ভরযোগ্য আচরণের সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও ভদ্রতার কোনো নীতিমালা হয় না। তবুও জাতি হিসাবে তো আমরা মন্দ ছিলাম না কোনোকালেই। দারিদ্র্য, যুদ্ধ, বিপ্লব ও আন্দোলন আমাদের মানবিক আচরণকে ছাপিয়ে, ভালোবাসা ও আন্তরিকতাকে ঝাপসা করে কখনো কখনো মুখ্য করে তুলেছে টিকে থাকার সংগ্রামকে। টিকে থাকার সেই গল্পে অনেক সময় প্রাথমিক ভুক্তভোগী বিদেশি নাগরিক হলেও দিনশেষে তা আবর্তিত হয়ে বুমেরাংয়ের মতো আমাদের সমাজের সবাইকেই আঘাত করেছে। কিন্তু এখনই সময়, যে যেখানে আছি সেখান থেকেই উষ্ণতা, আন্তরিকতা আর সততার চর্চার পাশাপাশি সেই গল্পগুলো চারদিকে ছড়িয়ে দেওয়ার। কিরিলের মতো বিদেশি নাগরিকদের ইতিবাচক রিভিউ আমাদের প্রয়োজন।
সুমন জিহাদী : পিএইচডি ফেলো, এশিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি, থাইল্যান্ড
