বাংলাদেশে কেন বিদেশি পর্যটক আসে না
Advertisement
ড. একেএম আহসান উল্লাহ
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটক কেন আসে না-এ প্রশ্নের সবচেয়ে সহজ উত্তর হলো, আমাদের দেখানোর মতো কিছু নেই বলে নয়; বরং যা আছে, তা দেখানোর মতো একটি পর্যটনব্যবস্থা আমরা এখনো গড়ে তুলতে পারিনি। পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকতগুলোর একটি সুন্দরবন; পাহাড়, হাওড়, নদী, চা-বাগান, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, শত শত বছরের ইতিহাস, অসাধারণ খাবার, লোকসংস্কৃতি, বৈচিত্র্যময় জাতিগোষ্ঠী এবং মানুষের সহজাত আতিথেয়তা-সবই আছে। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড নিজেই দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান পর্যটন গন্তব্য হওয়ার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। কিন্তু পর্যটন শুধু দর্শনীয় স্থান দিয়ে তৈরি হয় না, তৈরি হয় একটি অভিজ্ঞতা দিয়ে। আর সেই অভিজ্ঞতার জায়গাতেই বাংলাদেশ বারবার হেরে যায়।
একজন বিদেশি পর্যটক বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার মুহূর্ত থেকেই একটি দেশকে পড়তে শুরু করেন। অভিবাসন ডেস্কের ব্যবহার, লাগেজ নেওয়ার ব্যবস্থা, ট্যাক্সির শৃঙ্খলা, রাস্তার পরিচ্ছন্নতা, চালকের আচরণ, দামের স্বচ্ছতা-সবই তার কাছে দেশের পরিচয়। আমাদের এখানে অনেক ক্ষেত্রে প্রথম অভিজ্ঞতাটিই হয় অনিশ্চয়তার। কে বৈধ ট্যাক্সিচালক, কত ভাড়া হওয়া উচিত, কোথায় অভিযোগ করতে হবে, কে সত্যিকার গাইড-এসব বিষয়ে পর্যটকের সামনে পরিষ্কার ব্যবস্থা নেই। এর সঙ্গে যোগ হয় যানজট, শব্দদূষণ, ফুটপাত দখল, অপরিচ্ছন্ন গণপরিসর এবং অবিরাম মানুষের ভিড়। এগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ বলে আমরা অভ্যস্ত; কিন্তু পর্যটকের কাছে এগুলো ‘এক্সোটিক’ নয়, নিছক ক্লান্তিকর।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো পর্যটক দেখলেই তাকে যেন একটি চলমান এটিএম মেশিন মনে করা। ‘বিদেশি পেয়েছি, এখন যত পার দাম বলো’-এ মানসিকতা পর্যটনের সবচেয়ে ক্ষতিকর শত্রুদের একটি। রিকশা থেকে দোকান, স্থানীয় পরিবহণ থেকে ছোটখাটো পণ্য-কখনো কখনো বিদেশি দেখলে মূল্য কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। পর্যটক হয়তো একবার ঠকবেন, কিন্তু ফিরে গিয়ে তিনি দশজনকে বলবেন। আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একটি খারাপ অভিজ্ঞতা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। পর্যটনশিল্পে সবচেয়ে মূল্যবান মুদ্রা ডলার নয়-বিশ্বাস।
এর সঙ্গে আছে অনাহূত বিক্রেতা, দালাল, গাইড এবং অতিরিক্ত কৌতূহলের সমস্যা। একজন বিদেশি সমুদ্রসৈকতে হাঁটছেন, তার পেছনে বিক্রেতা; প্রত্নস্থলে গেছেন, ঘিরে ধরছে অননুমোদিত গাইড; বাজারে ঢুকেছেন, দরদামের বদলে শুরু হচ্ছে চাপ সৃষ্টি। আবার বিদেশিকে দেখলেই ছবি তুলতে চাওয়া, অনুমতি ছাড়া ভিডিও করা, তাকিয়ে থাকা, ব্যক্তিগত প্রশ্ন করা-এসব আমাদের কাছে নিরীহ কৌতূহল মনে হতে পারে, কিন্তু একজন পর্যটকের কাছে তা ব্যক্তিগত পরিসরে হস্তক্ষেপ। আতিথেয়তা আর অনধিকারচর্চার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা আছে। আমরা অনেক সময় সেই সীমাটি বুঝি না।
আরও গভীর সমস্যা হলো সেবা খাতে পেশাদারত্বের ঘাটতি। পর্যটন মানে শুধু পাঁচতারকা হোটেল নয়। একজন ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা, ট্যাক্সিচালক, ওয়েটার, দোকানি, ট্যুর গাইড, পুলিশ সদস্য, সৈকতকর্মী-সবাই পর্যটনশিল্পের অংশ। পর্যটককে সম্মানজনক ভাষায় কথা বলা, সময় মেনে সেবা দেওয়া, নির্ধারিত মূল্য রাখা, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার নিশ্চিত করা, ইংরেজিতে মৌলিক যোগাযোগ করতে পারা এবং অভিযোগকে বিরক্তি হিসাবে না দেখা-এসব পর্যটন অবকাঠামোরই অংশ। শুধু রাস্তা বানিয়ে পর্যটন তৈরি হয় না; আচরণের অবকাঠামোও নির্মাণ করতে হয়।
নিরাপত্তার প্রশ্নটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে শুধু বড় অপরাধের কথা নয়। একজন একাকী নারী পর্যটক রাতে হাঁটতে পারবেন কিনা, একজন বিদেশি ক্যামেরা নিয়ে নির্বিঘ্নে ঘুরতে পারবেন কিনা, প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত সাহায্য পাবেন কিনা-এসবই নিরাপত্তার অংশ। শ্রীলংকা পর্যটকদের হয়রানি, প্রতারণা, চুরি ও অন্য সমস্যায় সহায়তার জন্য বিশেষ পর্যটন পুলিশ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশেও পর্যটন পুলিশ আছে, কিন্তু তার দৃশ্যমানতা, সহজপ্রাপ্যতা, বহুভাষিক সহায়তা এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
এরপর আসে একটি অস্বস্তিকর কিন্তু এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই এমন বিষয়-বিনোদনের সংকীর্ণ ধারণা। সব পর্যটক সমুদ্র দেখে সন্ধ্যা ৭টায় হোটেলে গিয়ে ঘুমাতে চান না। পর্যটন মানে রাতের খাবার, সংগীত, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নদীর ধারে বসার জায়গা, ক্যাফে, হাঁটার পথ, পারিবারিক বিনোদন, নিরাপদ নাইট মার্কেট, শিল্পকলা, উৎসব, সংগঠিত নাইট লাইফ-বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা। আমাদের অনেক পর্যটনকেন্দ্রে সন্ধ্যার পর করার মতো প্রায় কিছুই থাকে না।
এ জায়গায় মদ্যপানের প্রশ্নটিও আসে। বিষয়টি ‘মদ ভালো না খারাপ’-এ বিতর্ক নয়। মূল প্রশ্ন হলো, একটি রাষ্ট্র তার নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ বজায় রেখেও কি বিদেশি পর্যটকের জন্য নিয়ন্ত্রিত, আইনসম্মত ব্যক্তিগত পরিসর তৈরি করতে পারে? সংযুক্ত আরব আমিরাত মুসলিমপ্রধান দেশ হয়েও পর্যটনকে ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে সংঘাত হিসাবে দেখেনি। মালয়েশিয়াতেও তাই। দুবাইয়ে নির্ধারিত ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত হোটেল, রেস্তোরাঁ ও প্রতিষ্ঠানে অমুসলিম প্রাপ্তবয়স্কদের মদ্যপানের সুযোগ রয়েছে, একইসঙ্গে জনপরিসরে আচরণের জন্য স্পষ্ট নিয়মও আছে। অর্থাৎ উদারতা মানে নিয়মহীনতা নয়, নিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতাই পর্যটনের কার্যকর মডেল হতে পারে।
থাইল্যান্ডও একইভাবে পর্যটকের চাহিদা এবং স্থানীয় আইন-দুটিকে সমন্বয় করেছে। সেখানে অ্যালকোহল বিক্রির সময়, লাইসেন্সপ্রাপ্ত স্থান, ধর্মীয় ও সরকারি জায়গায় নিষেধাজ্ঞা-সবই পরিষ্কারভাবে নির্ধারিত। ২০২৬ সালেও দেশটি পর্যটকের অভিজ্ঞতা সহজ করার পাশাপাশি দায়িত্বশীল নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। তাদের শিক্ষা হলো-কোনো বিষয় নিষিদ্ধ বা অনুমোদিত, সেটি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো নিয়মটি স্পষ্ট, পূর্বানুমানযোগ্য ও পর্যটকবান্ধব কিনা।
এখানে ধর্মের চেয়েও বড় সমস্যা ধর্মের নামে সামাজিক নজরদারি ও নৈতিক পুলিশিং। কোনো পর্যটকের পোশাক, খাবার, নারী-পুরুষের একসঙ্গে চলাফেরা বা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে যদি মানুষ প্রকাশ্যে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে, তাহলে দেশটি পর্যটকের কাছে অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। নিজের ধর্মীয় মূল্যবোধ পালন করা এক বিষয়; অন্যের জীবনযাপন নিয়ন্ত্রণ করতে যাওয়া আরেক বিষয়। পর্যটনশিল্পে এ পার্থক্য বুঝতে হবে। একজন পর্যটক বাংলাদেশে এসে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে সম্মান করবেন-এটি যৌক্তিক প্রত্যাশা। কিন্তু তাকেও সম্মান করতে হবে।
শ্রীলংকা বাংলাদেশের জন্য আরও কাছের উদাহরণ। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের পরও দেশটি পর্যটনকে পুনরুদ্ধারের কেন্দ্রীয় খাত হিসাবে ধরে রেখেছে। ২০২৫ সালে দেশটিতে ২৩ লাখের বেশি আন্তর্জাতিক পর্যটক গেছে, আগের বছরের তুলনায় যা প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি। তারা শুধু সমুদ্র বিক্রি করেনি; চা-বাগান, বৌদ্ধ ঐতিহ্য, বন্যপ্রাণী, ট্রেনযাত্রা, সার্ফিং, আয়ুর্বেদ, খাবার-সবকিছুকে পৃথক পর্যটনপণ্য বানিয়েছে। বাংলাদেশ সুন্দরবনকে সুন্দরবন হিসাবেই রেখেছে, হাওড়কে হাওড়, পাহাড়কে পাহাড়। এগুলোকে এখনো আন্তর্জাতিক মানের অভিজ্ঞতায় প্যাকেজ করতে পারেনি।
বাংলাদেশের করণীয় তাই শুধু নতুন পর্যটন স্লোগান তৈরি করা নয়। প্রথমত, বিমানবন্দর থেকে পর্যটনকেন্দ্র পর্যন্ত ‘ট্যুরিস্ট এক্সপেরিয়েন্স চেইন’ পুনর্গঠন করতে হবে। নির্ধারিত ভাড়া, ডিজিটাল পেমেন্ট, স্বীকৃত গাইড, বহুভাষিক হেল্পলাইন, পর্যটক পুলিশ, দ্রুত অভিযোগ ব্যবস্থা দরকার। দ্বিতীয়ত, কক্সবাজার, সুন্দরবন, সিলেট, পার্বত্য চট্টগ্রাম, পুরান ঢাকা, পাহাড়পুর, মহাস্থানগড়ের মতো স্থানকে আলাদা আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, সৈকত ও পর্যটন এলাকায় হয়রানিমুক্ত অঞ্চল তৈরি করে অননুমোদিত বিক্রেতা ও দালাল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। চতুর্থত, পর্যটনকর্মীদের শুধু প্রশিক্ষণ নয়, আচরণগত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। পঞ্চমত, সংস্কৃতি, খাবার, সংগীত, নদী, লোকশিল্প, উৎসব এবং নিয়ন্ত্রিত বিনোদনকে রাতের পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি অবশ্য অবকাঠামোয় নয়, মানসিকতায়। একজন বিদেশি আমাদের দেশে এসেছেন মানে তিনি ধনী শিকার নন, চলমান প্রদর্শনীও নন। তিনি একজন অতিথি, একজন ভোক্তা এবং একইসঙ্গে বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক রাষ্ট্রদূত। তিনি ভালো অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরলে আমাদের জন্য বিনা পয়সায় প্রচারণা করবেন; খারাপ অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরলে সেই ক্ষতিও বহুগুণে ছড়াবে।
বাংলাদেশের পর্যটনের সমস্যা প্রকৃতির অভাব নয়, পরিকল্পিত সভ্যতার অভাব। আমাদের পাহাড় আছে, সমুদ্র আছে, বন আছে, ইতিহাস আছে, খাবার আছে, গল্প আছে-শুধু এগুলোকে ঘিরে স্বস্তি, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, পেশাদারত্ব ও সম্মানের একটি পরিবেশ এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি। পর্যটক কোনো দেশে শুধু কী দেখবেন তা বিবেচনা করে যান না; তিনি ভাবেন, সেখানে গিয়ে আমি কেমন অনুভব করব? বাংলাদেশ যেদিন এ প্রশ্নটির উত্তর বদলাতে পারবে, সেদিন বিদেশি পর্যটক আনার জন্য আর খুব বেশি বিজ্ঞাপনের প্রয়োজন হবে না।
ড. একেএম আহসান উল্লাহ : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক, নিরাপত্তা ও অভিবাসন, ইউনিভারসিটি অফ ব্রুনেই দারুসসালাম, ব্রুনেই
