Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

ঘোষণা ছাড়াই বিশ্বযুদ্ধ, দাম গুনছে বাংলাদেশ

Advertisement

Icon

ড. মোহাম্মদ ইমরান হোসাইন আনসারী

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ঘোষণা ছাড়াই বিশ্বযুদ্ধ, দাম গুনছে বাংলাদেশ

Advertisement

ইরান যুদ্ধে বাংলাদেশ একটি গুলিও ছোড়েনি। উপসাগরে আমাদের কোনো সেনা নেই। তেহরান বা জেরুজালেমে কে ক্ষমতায় থাকবে, তাতেও আমাদের কিছু বলার নেই। তবু গত আট মাসে দেশে পাম্পে তেল বিক্রির সীমা বেঁধে দিতে হয়েছে, জ্বালানির দাম বেড়েছে, মধ্যপ্রাচ্যগামী প্রায় ৯০০ ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। কফিনে করে ফিরেছেন প্রবাসী শ্রমিকরা। ঢাকায় বসে দেখলে এটা আর দূরের কোনো যুদ্ধ নয়। এটা বিশ্বযুদ্ধেরই চেহারা। অনেকে বলবেন, বড় শক্তিগুলো সরাসরি একে অপরের সঙ্গে না লড়লে তাকে বিশ্বযুদ্ধ বলা যায় না। কথাটা বইয়ের পাতায় ঠিক। কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলে। ১৯১৪ বা ১৯৩৯ সালেও শুরুর দিনে কেউ ‘বিশ্বযুদ্ধ’ নাম দেয়নি। জোটের টানে একের পর এক দেশ জড়িয়ে পড়ার পরেই নামটা এসেছে ‘বিশ্বযুদ্ধ’। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি হামলা দিয়ে যে যুদ্ধের শুরু, তাতে এখন সেই লক্ষণগুলো স্পষ্ট।

বড় শক্তিরা আসলে আগেই ঢুকে পড়েছে : প্রমাণ মিলছে খোদ ওয়াশিংটনের গোয়েন্দা তথ্যেই। রয়টার্স জানিয়েছে, রাশিয়া ও চীন ইরানকে স্যাটেলাইট ছবি দিচ্ছে বলে মার্কিন গোয়েন্দারা দেখেছেন। এ ছবি দিয়ে হামলার লক্ষ্য ঠিক করা হয়। অস্ত্রের যন্ত্রাংশও যাচ্ছে। জুলাইয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সিনেটে স্বীকার করেছেন, মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে ইরানের লড়াইয়ে এ দুই দেশ সাহায্য করছে। ইউক্রেনে শেখা ড্রোন কৌশলও রাশিয়া ইরানকে দিয়েছে বলে খবর। ফলে দুটি আলাদা যুদ্ধ এখন এক সুতোয় গাঁথা।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য বলছেন, মস্কো বা বেইজিং তেহরানকে সাহায্য করছে না। কিন্তু তার নিজের কর্মকর্তারাই বলছেন উলটোটা। পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলো যখন একে অপরের সেনাদের নিশানা ঠিক করে দিচ্ছে, তখন সরাসরি সংঘাতের জন্য একটা দুর্ঘটনাই যথেষ্ট। ভুল সময়ে ভুল জায়গায় একটা চীনা রাডার দল কিংবা একটা রুশ তেলবাহী জাহাজ থাকলেই হলো। মনে রাখা দরকার, ১৯৩৬ সালে স্পেনের যুদ্ধকে বলা হয়েছিল গৃহযুদ্ধ। অথচ জার্মানি, ইতালি আর সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে সেটা ছিল বড় যুদ্ধের মহড়া।

যুদ্ধ ছড়াচ্ছে, জোট পাকা হচ্ছে

যুদ্ধ এখন আর ইরানের ভেতরে আটকে নেই। ইয়েমেনের হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নতুন ফ্রন্ট খুলেছে। আগস্টে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান সই করেছে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। এ চুক্তি অনুযায়ী এক সদস্যের ওপর হামলা মানে সবার ওপর হামলা। অক্টোবরে তুরস্ক, কাতার, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়া আরেকটি প্রতিরক্ষা শিল্প চুক্তি করেছে।

এ হিসাবে তুরস্ককে আলাদা করে দেখতে হবে। দেশটি ন্যাটোর সদস্য। আবার এখন চুক্তি করে এমন এক উপসাগরীয় দেশের পাশে দাঁড়িয়েছে, যার ওপর ইরানের মিত্ররা হামলা চালাচ্ছে। ইসরাইলের সঙ্গেও তুরস্কের সম্পর্ক তিক্ত। এরদোগান বলছেন, তার দেশ চারপাশে ‘আগুনের বলয়ে’ ঘেরা। নেতানিয়াহুর ধারণা, এরদোগান ক্ষমতায় থাকতে সম্পর্ক ভালো হবে না। ঘরেও চাপ কম নয়। তুরস্কে বিস্তৃত অর্থে বেকারত্ব ৩১ শতাংশ ছাড়িয়েছে, রাস্তায় চলছে বিক্ষোভ। ঘরে চাপে থাকা সরকার অনেক সময় বাইরে শক্তি দেখাতে চায়। তবে তুরস্ক তেহরানের সঙ্গে আলোচনার পথও খোলা রেখেছে। ২৬ অক্টোবর তুরস্কের গোয়েন্দাপ্রধান ইব্রাহিম কালিন, সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও পাকিস্তানের সেনাপ্রধান তেহরানে গিয়েছিলেন নতুন লড়াই ঠেকানোর চেষ্টায়। খবরটা আশার। আবার এটাও দেখায়, যুদ্ধের টান এখন কত দূর পৌঁছেছে। যে জোট গড়া হয় যুদ্ধ ঠেকাতে, সেই জোটই সদস্যদের যুদ্ধে টেনে নিতে পারে। ১৯১৪ সালের আগস্টে ইউরোপ ঠিক এ শিক্ষাই পেয়েছিল।

পরের আঘাত দরজায় : ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ভোটের পর মার্কিন ও ইসরাইলি কর্মকর্তারা নতুন করে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অভিযান চলতে পারে টানা এক সপ্তাহ। নভেম্বরের শেষে ইরানের আশপাশে থাকবে তিনটি বিমানবাহী রণতরি আর দুটি উভচর বাহিনী। আলোচনাও আটকে আছে। ইরান প্রস্তাব দিয়েছিল, মার্কিন অবরোধ তুলে নিলে তারা হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে। ওয়াশিংটন সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছে।

ইসরাইলের ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনও কোনো সমাধান দেয়নি। ১২০ আসনের সংসদে বিরোধীরা পেয়েছে ৬৭টি, নেতানিয়াহুর জোট ৫৩টি। কিন্তু বিরোধীদের এ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আরব দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল। গ্যাদি আইজেনকোটের অনেক মিত্রই তাদের সঙ্গে সরকার গড়তে রাজি নন। ফলে জোট গঠনের আলোচনা চলবে মাসের পর মাস, আর এ সময়ে নেতানিয়াহুই সম্ভবত তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী থাকবেন।

বাংলাদেশ যে মূল্য দিচ্ছে : জ্বালানি দিয়েই শুরু করা যাক। আমাদের তেল আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। অথচ এলএনজির কোনো কৌশলগত মজুত আমাদের নেই। দেশের বিদ্যুতের প্রায় ৪০ শতাংশ তৈরি হয় এলএনজি দিয়ে, আর তার প্রায় ৭০ শতাংশ আসে কাতার থেকে। মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর, এ সাত মাসেই যুদ্ধের কারণে আমদানি খরচ বেড়েছে আনুমানিক ৪১২ কোটি ডলার। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে জিডিপির ৩ শতাংশ পর্যন্ত হারাতে পারি আমরা।

মানুষের ঝুঁকি আরও বড়। ২০২৫ সালে দেশে আসা ৩,২০০ কোটি ডলার রেমিট্যান্সের মধ্যে ১,৫০৭ কোটি ডলারই এসেছে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। আমাদের শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি যান সৌদি আরবে। সেই সৌদি আরব এখন হুথিদের হামলার মুখে। শ্রম মন্ত্রণালয়ের হিসাবে এরই মধ্যে ছয়জন বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত, আহত ৪৭ জন। কাজ হারিয়েছেন বা বেতন পাননি আরও অনেকে।

তবে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাটা কূটনীতির। ইরান বাংলাদেশের ছয়টি তেলবাহী জাহাজকে হরমুজ পার হতে দিয়েছে। কিন্তু যুদ্ধ নিয়ে ঢাকার বক্তব্যে অসন্তোষও জানিয়েছে। অন্যদিকে ফেব্রুয়ারির বাণিজ্য চুক্তির সুবাদে বিএনপি সরকার যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি জ্বালানি কিনছে। মানে আমাদের এক জীবনরেখা তেহরানের হাতে থাকা প্রণালি দিয়ে, আরেকটা ওয়াশিংটন দিয়ে। আঞ্চলিক যুদ্ধে ছোট দেশ দুই দিক সামলে চলতে পারে। কিন্তু জোটে জোটে যুদ্ধ বাঁধলে কোনো একটা পক্ষ বেছে নেওয়ার চাপ আসে।

এখনই ঢাকার যা করা দরকার : এক. জ্বালানির মজুত গড়া। দরকার পড়লে তবেই কেনার যে পুরোনো অভ্যাস, সেটাই মার্চে আমাদের বিপদে ফেলেছিল। তেল ও এলএনজির জন্য একটা আনুষ্ঠানিক কৌশলগত মজুত চাই। টাকার উৎসও আছে। এপ্রিলে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। সেই অর্থ শুধু ভর্তুকিতে না ঢেলে মজুতাগার বানাতেও খরচ করা উচিত। আর দীর্ঘমেয়াদে দেশে উৎপাদিত প্রতিটি মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ এমন শক্তি, যা হরমুজ বন্ধ হলেও হারাবে না।

দুই. শ্রমিকদের সুরক্ষা। আবার ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার আগেই এটা করতে হবে। রিয়াদ, আবুধাবি ও দোহার দূতাবাসে লোক সরিয়ে আনার পরিকল্পনা আগে থেকে তৈরি রাখতে হবে। কোন পথে যাওয়া হবে, কোথায় জড়ো হতে হবে, সব ঠিক করা থাকবে। শ্রম চুক্তিতে লিখে নিতে হবে, জরুরি অবস্থায় নিয়োগকর্তা পাসপোর্ট ফেরত দেবেন এবং যুদ্ধের সময়ও বেতন দেবেন। ফিরে আসা শ্রমিকদের পুনর্বাসন তহবিল তারা দেশে নামার আগেই তৈরি থাকা চাই।

তিন. সবার সঙ্গে নীরব কূটনীতি। হরমুজ নিয়ে তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ ধরে রাখতে হবে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির শর্তও মানতে হবে। আবার কোনো শিবিরে নাম না লিখিয়ে আঙ্কারা, রিয়াদ ও ইসলামাবাদের সঙ্গে কথা চালাতে হবে। বাংলাদেশ বড় একটি মুসলিমপ্রধান গণতান্ত্রিক দেশ, এ যুদ্ধে যার একজন সেনাও নেই। এ কারণেই উত্তেজনা কমানোর কথা বলার নৈতিক জোর আমাদের আছে।

১৯১৪ সালের আগস্টে যুদ্ধ যখন শুরু হয়, ইউরোপের ছোট দেশগুলো প্রস্তুত ছিল না। তার চড়া দাম দিতে হয়েছিল তাদের বেশিরভাগকেই। বাংলাদেশের হাতে এখনো কয়েক সপ্তাহ সময় আছে। সেই সময়টা হেলায় হারানো চলবে না।

ড. মোহাম্মদ ইমরান হোসাইন আনসারী : নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (বিআইআইডিএস); সহকারী অধ্যাপক, স্টেইট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক-ডাচেস

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

দৃষ্টিপাত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে

হাম ও ডেঙ্গুতে ঝরে যাওয়া প্রাণগুলো কি মূল্যহীন

হাম ও ডেঙ্গুতে ঝরে যাওয়া প্রাণগুলো কি মূল্যহীন

ঘোষণা ছাড়াই বিশ্বযুদ্ধ, দাম গুনছে বাংলাদেশ

ঘোষণা ছাড়াই বিশ্বযুদ্ধ, দাম গুনছে বাংলাদেশ

সংসদ থেকে রাস্তায় : রাজনীতির অনিশ্চিত যাত্রা

সংসদ থেকে রাস্তায় : রাজনীতির অনিশ্চিত যাত্রা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম