হাম ও ডেঙ্গুতে ঝরে যাওয়া প্রাণগুলো কি মূল্যহীন
Advertisement
মোদাসসের হোসেন খান
প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মানুষের জীবন অমূল্য। অথচ বাংলাদেশে বছরের পর বছর ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হামের ব্যাপক সংক্রমণ ও শিশুদের মর্মান্তিক মৃত্যু। এসব মৃত্যু কি শুধুই দুর্ভাগ্য, নাকি দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অবহেলা, পরিকল্পনার দুর্বলতা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যর্থতারও পরিণাম?
একটি মানবিক রাষ্ট্রে প্রতিরোধযোগ্য রোগে নাগরিকের মৃত্যু স্বাভাবিক ঘটনা হিসাবে মেনে নেওয়া যায় না। তাই হাম ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জরুরি, সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ অপরিহার্য।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২৯ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ১,৩২,১০৫ জন হাসপাতালে ভর্তি এবং ৪১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ৩,২১,১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি ও ১,৭০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
অন্যদিকে, ১৫ মার্চ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত হামের ২,২৬,৩৫৭ জন সন্দেহভাজন রোগী, যাদের মধ্যে ২৩,৬৯৫ জন পরীক্ষায় নিশ্চিত; এবং ১০৫টি নিশ্চিত ও ১,১৪৪টি সন্দেহভাজন হামসংশ্লিষ্ট মৃত্যুসহ মোট ১,২৪৯টি মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে। উপরোক্ত পরিসংখ্যান দেশের শিশুস্বাস্থ্য, টিকাদান, রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসাব্যবস্থার জন্য গুরুতর সতর্কবার্তা।
রোগ দুটি বিস্তারের প্রধান কারণ
ডেঙ্গু : এডিস মশার বংশবিস্তার, জমে থাকা পানি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলবায়ুগত প্রভাব এবং নিয়মিত বিজ্ঞানভিত্তিক মশা নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি।
হাম : প্রয়োজনীয় দুই ডোজ টিকার আওতা অপর্যাপ্ত থাকা, ২০২৪-২০২৫ সালে টিকার সরবরাহে ঘাটতি, টিকাবঞ্চিত শিশুদের শনাক্তকরণে দুর্বলতা, ঘনবসতি এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের দ্রুত পৃথকীকরণে বিলম্ব। উভয় রোগে মৃত্যুঝুঁকি বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ কারণ যথাসময়ে রোগ শনাক্ত, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় হাসপাতালে স্থানান্তরের সীমাবদ্ধতা।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশের তুলনা : ব্রাজিলে ২০২৪ সালে এক কোটির বেশি ডেঙ্গু রোগী এবং ছয় হাজারের বেশি মৃত্যু নথিভুক্ত হয়। অন্যদিকে, সিঙ্গাপুরে বিজ্ঞানভিত্তিক মশা নিয়ন্ত্রণ ও ‘উলবাকিয়া’ প্রযুক্তি প্রয়োগের নির্দিষ্ট গবেষণা এলাকায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি ৭০ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে। ভুটান ও মালদ্বীপ হাম নির্মূলের স্বীকৃতি অর্জন ও বজায় রাখার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তবে শ্রীলংকার অভিজ্ঞতা দেখায়, নির্মূলের পরও টিকাদান ও নজরদারি দুর্বল হলে হাম ফিরে আসতে পারে।
শিক্ষা : ধারাবাহিক টিকাদান, বৈজ্ঞানিক নজরদারি, দক্ষ প্রশাসন ও জনসম্পৃক্ততা ছাড়া স্থায়ী সফলতা অসম্ভব।
সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের ২০২৪-২০২৫ সালের হাম-রুবেলা টিকার ঘাটতি এবং নিয়মিত টিকাদানের দুর্বলতাকে বর্তমান প্রাদুর্ভাবের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসাবে চিহ্নিত করেছে। অন্যদিকে, ডেঙ্গুর পুনরাবৃত্তি প্রাদুর্ভাব স্থানীয় সরকারের মশা নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বয় আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। টিকা সংগ্রহে বিলম্ব, প্রতিরোধ কার্যক্রমের কার্যকারিতা, সরকারি ব্যয়ের ফলাফল এবং চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা স্বাধীনভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
প্রস্তাব : ৩০ দিনের মধ্যে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন এবং ১২০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ। প্রমাণিত অবহেলা বা অনিয়মের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ।
জরুরি ও স্বল্পমেয়াদি করণীয়
প্রথম ৩০ দিনে :
১. স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে জাতীয় জরুরি সমন্বয় কেন্দ্র শক্তিশালী করা; ২. বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকাবঞ্চিত শিশু শনাক্ত এবং নির্ধারিত নিয়মে হাম-রুবেলা টিকাদান নিশ্চিত করা; ৩. আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত, পৃথকীকরণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া; ৪. ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে বিশেষ অভিযান; ৫. জেলা-উপজেলা হাসপাতালে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, অক্সিজেন, চিকিৎসাসামগ্রী ও প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করা।
পরবর্তী ৯০ দিনে :
৬. প্রতিটি এলাকায় রোগ নজরদারি ও আগাম সতর্কব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা; ৭. গুরুতর রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তরের ব্যবস্থা; ৮. হাম ও ডেঙ্গুসংশ্লিষ্ট প্রতিটি মৃত্যু যথাযথভাবে পর্যালোচনা; ৯. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধি।
দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় মহাপরিকল্পনা : ২০২৬-২০৩৫ : প্রথমত প্রতিটি এলাকায় দুই ডোজ হাম-রুবেলা টিকার অন্তত ৯৫ শতাংশ আওতা নিশ্চিত করা; দ্বিতীয়ত টিকার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, জরুরি মজুত এবং প্রতিটি শিশুর টিকাদানের নির্ভরযোগ্য তথ্য সংরক্ষণ; তৃতীয়ত সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় বছরব্যাপী বিশেষজ্ঞনির্ভর মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা; চতুর্থত পানি নিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নগর পরিকল্পনার স্থায়ী উন্নয়ন; পঞ্চমত জেলা-উপজেলায় সংক্রামক রোগের চিকিৎসা, গবেষণা ও নজরদারির সক্ষমতা বৃদ্ধি; ষষ্ঠত আন্তর্জাতিক নির্দেশনা অনুসারে নতুন মশা নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি ও ডেঙ্গু টিকার উপযোগিতা মূল্যায়ন; সপ্তমত পৃথক জাতীয় তহবিল গঠন এবং ব্যয় ও ফলাফলের স্বাধীন নিরীক্ষা; অষ্টমত প্রতি তিন মাসে অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং প্রতিবছর জনসমক্ষে প্রতিবেদন প্রকাশ; চূড়ান্ত লক্ষ্য : ২০৩০ সালের মধ্যে হামের স্থানীয় ধারাবাহিক সংক্রমণ নির্মূলের লক্ষ্যে অগ্রসর হওয়া এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা।
হাম নির্মূল বৈজ্ঞানিকভাবে সম্ভব। তবে ডেঙ্গু চিরতরে বিলুপ্তির নিশ্চয়তা বর্তমানে দেওয়া যায় না; এর জন্য স্থায়ী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা অপরিহার্য।
সরকারের প্রতি আবেদন : হাম ও ডেঙ্গু প্রতিরোধ শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং নাগরিকের জীবনরক্ষার প্রশ্ন। একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একটি সংখ্যা নয়-একটি পরিবারের স্বপ্নের মৃত্যু। একজন নাগরিকের অকালমৃত্যু শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়-জাতির অপূরণীয় ক্ষতি। অতএব, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা এবং জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রস্তাবিত মহাপরিকল্পনা অবিলম্বে বাস্তবায়নের আহ্বান জানাচ্ছি।
ঝরে যাওয়া প্রাণগুলো মূল্যহীন নয়। প্রতিটি প্রাণ অমূল্য। মানুষের জীবন রক্ষাই হোক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
লে. কর্নেল মোদাসসের হোসেন খান (অব.) বীর প্রতীক : বীর মুক্তিযোদ্ধা; সামরিক, নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক
