Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

ওয়াকফ বিল : মুসলমানদের অধিকার কেড়ে নিতে চান মোদি

Advertisement

Icon

অনিকেত চট্টোপাধ্যায়

প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ওয়াকফ বিল : মুসলমানদের অধিকার কেড়ে নিতে চান মোদি

Advertisement

কলকাতা থেকে

মুসলমান মানুষজন সময়ে সময়ে তাদের সম্পত্তির কিছু অংশ বা পুরোটাই মুসলমান মানুষজনের উন্নতি, তাদের শিক্ষা বা তাদের বিভিন্ন সামাজিক কাজের জন্য, সাহায্যের জন্য এক অছি বা ট্রাস্টের কাছে দিয়ে যান, দিয়ে গেছেন। এই সম্পত্তিই হলো ওয়াকফ। এই সম্পত্তি দেখাশোনা করার জন্য যেমন ওই অছি আছে, তেমনি জেলা বা রাজ্যজুড়ে ওয়াকফ বোর্ড আছে, যারা সেই সম্পত্তির ঠিকঠাক দেখভাল হচ্ছে কিনা বা যে উদ্দেশ্যে এই জমি-সম্পত্তি দেওয়া হয়েছে, তা যথাযথভাবে পালন হচ্ছে কিনা সেসব দেখাশোনা করেন এবং তা নিয়ে দেশের আইন আছে। দেখাশোনা কি ঠিকঠাক করে হয়? না, বহু অভিযোগ আছে, বহু ক্ষেত্রে ওই সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আছে, বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও আছে, তা নিয়ে ঝুটঝামেলাও আছে আর আইনি লড়াই তো আছেই। কিন্তু বিষয়টা তো সেই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের, অর্থাৎ সেই মুসলমান মানুষজনই এটা ঠিক করবেন কেন এই লুটপাট হচ্ছে বা তারাই সেটা বন্ধ করবেন বা তারা এটা নিয়ে ওয়াকফ বোর্ডের কাছে যাবেন, তাদের একটা আইনি লড়াইয়ের জায়গা আছে, সেটা তারা লড়বেন।

এবার সেই আইনে মোদি সরকার কিছু সংশোধন আনতে চায়। আর তা নিয়ে এক বড়সড় গোলযোগ বেধেছে। সে গোলযোগের স্বাভাবিক আর মূল কারণই হলো মুসলমান মানুষজনের কাছে মোদি, শাহ, বিজেপি, আরএসএসের বিশ্বাসযোগ্যতার বিরাট অভাব। যে দল, যে সংগঠন মনেই করে না মুসলমানরা এ দেশের নাগরিক; তারা তো খুব স্পষ্ট বলে দিয়েছে, এই দেশের যারা নাগরিক, এই দেশের যারা বাসিন্দা, তাদের তিনটি জিনিস থাকতে হবে-১. তাদের এই দেশে জন্ম হতে হবে, তাদের বাবা-মার এ দেশে জন্ম হতে হবে; ২. এ দেশ তার কর্মের জায়গা হতে হবে; ৩. এ দেশ তার পুণ্যভূমি হতে হবে অর্থাৎ একজন মুসলমান যার পুণ্যভূমি মক্কা বা মদিনা, একজন খ্রিস্টান যার পুণ্যভূমি বেথলেহেম বা ভ্যাটিকান সিটি, তিনি এ দেশের নাগরিকই নন। এটা তারা বলে দিচ্ছেন, ঘোষণা করছেন। কাজেই বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব তো নতুন কিছু নয়, থাকবেই। সে বিশ্বাসযোগ্যতা নেই বললেও ভুল বলা হয় না।

আসুন একটু সেই গোলমেলে আইন সংশোধনের বিষয়টাকে বুঝে নিই আমরা। ২০২৪ সালের ওয়াকফ সংশোধনী বিলে প্রধান প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো কী কী। ২০২৪ সালের ওয়াকফ সংশোধনী বিলে কিন্তু খুব মামুলি কোনো সংশোধন নয় বরং যে আইন ছিল তাতে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিলে তিনটি নতুন ধারা যোগ করা হয়েছে : ৩এ, ৩সি এবং ৩সি২। ধারা ৩এ : এতে বলা হয়েছে, যে কেউ শুধু তখনই ওয়াকফ তৈরি করতে পারবে, যদি সে সম্পত্তির আইনি হেফাজতকারী হয় এবং তার কাছে সম্পত্তি হস্তান্তর বা উৎসর্গ করার অধিকার থাকে। মানে সাধারণ ভাষায় সম্পত্তিটা যেন তার দখলে থাকে আর সেই সম্পত্তি তার বিক্রি বা দান করার অধিকার থাকে। এবার সমস্যা হলো-ধরুন দিল্লির জামা মসজিদ, যেখানে মূল মোতোওয়াল্লি পরিবার, মানে যারা আদতে দেখরেখ করত, যারা অছি হিসাবে থাকত, যাদের কাছে বিক্রি করার, দান করার অধিকার ছিল, তারা পাকিস্তানে চলে গেছেন বা দিল্লির জোরবাগের মসজিদ, যেটি বাহাদুর শাহ জাফরের মা তৈরি করেছিলেন, সেই পরিবারের আজ আর কেউ বেঁচেই নেই। বা যারা সেই দাবি করছেন, তা নিয়ে প্রচুর ডিসপিউট আছে। তাহলে সেই সম্পত্তিগুলো কী হবে? আইন বলছে, তাহলে সেই সম্পত্তি সরকারের কাছে চলে যাবে। হ্যাঁ, এখানেই সমস্যার সূত্রপাত। মুসলমান মানুষজন ভাবছেন যে, তাদের এতদিনের ওয়াকফ সম্পত্তি সরকার নিয়ে নিতে চাইছে।

এই যে বিলে পরিবর্তন আনা হচ্ছে, তার ৩সি ধারায় বলা হচ্ছে, সরকারি সম্পত্তি যা আগে বা পরে ওয়াকফ সম্পত্তি হিসাবে চিহ্নিত বা ষোষিত হয়েছে, তা আর ওয়াকফ সম্পত্তি থাকবে না, সরকারি সম্পত্তি হয়ে যাবে। ধারা ৩সি২ সরকারকে এই ক্ষমতা দিচ্ছে যে, ওয়াকফ বোর্ডের বদলে তারাই ঠিক করতে পারবে কোনো ওয়াকফ সম্পত্তি সরকারি জমি কিনা এবং জেলা কালেক্টর এ রকম সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জেলা কালেক্টরের ভূমিকা। মুসলমান ধর্মীয় সংগঠনগুলো এর বিরোধিতা করছে। কারণ তারা মনে করে, সরকার এমন সব জমি দখল নেওয়ার চেষ্টা করতেই পারে, যেগুলোর মালিকানা নিয়ে মামলা চলছে। যেখানে যেখানে মামলা চলছে, সবকটা জমি নিয়ে নেবে সরকার, এই ধারণা থেকে সংশয় আরও বাড়ছে। এছাড়া এই সংশোধনী বিলে ১৯৯৫ সালের আইনে থাকা ‘ওয়াকফ বাই ইউজ’ ধারণাটা বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমান আইনে কোনো সম্পত্তি যদি মুসলমানরা ধর্মীয় কাজে বিনা বাধায় দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করে, তাহলে সেটা ওয়াকফ হিসাবে গণ্য হবে। যেমন জামা মসজিদ। এ রকম অনেক সম্পত্তি আছে, যেগুলো বাবরের সময় থেকে রয়েছে; ৩০০, ৪০০, ৫০০ বছরের পুরোনো ওয়াকফ সম্পত্তি আছে। যেগুলো দলিল বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়াই চলছে। এই বিলে বলে দেওয়া হচ্ছে, না, ওয়াকফ বাই ইউজ হবে না, তার কাগজ থাকতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তার জন্মের কাগজ দেখাবেন না; কিন্তু এখানে কাগজ দেখাতে হবে। মানে বাবরের সময়ের কোনো ওয়াকফ সম্পত্তির পুরো কাগজ চাই।

প্রস্তাবিত আইনে রাজ্য ওয়াকফ বোর্ড গঠনেও পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। এখানে অমুসলিম ব্যক্তিদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এবং রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, তারা বোর্ডের কমপক্ষে দুজন অমুসলিম সদস্য রাখবে। আচ্ছা, তিরিপতি মন্দিরের ট্রাস্ট, জগন্নাথদেব মন্দিরের যে ট্রাস্টি বোর্ড, অযোধ্যার যে ট্রাস্টি বোর্ড, সেখানে মুসলমান সদস্য ক’জন আছেন? ক’জন রাখার বিধান আছে? তারাও তো দেশের ১৭-১৮ শতাংশ মানুষ। ক’জন খ্রিস্টান আছেন? ক’জন বৌদ্ধ আছেন?

এই বিলে কেন্দ্রীয় ওয়াকফ কাউন্সিলের সদস্য সংখ্যা ১৪ থেকে বাড়িয়ে ২৩ করা হয়েছে। বর্তমানে শুধু চেয়ারম্যান অমুসলিম হতে পারেন, বাকিরা মুসলিম হবেন। নতুন প্রস্তাবে দুজন অমুসলিম থাকতেই হবে এবং ১৩ জন পর্যন্ত অমুসলিম হতে পারে। অর্থাৎ ২৪ জনের মধ্যে ১৩ জন হওয়া মানে কেন্দ্রীয় ওয়াকফ কাউন্সিলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য অমুসলিম হতে পারে। এমন অদ্ভুত কথা কেউ শুনেছেন?

এই বিলে ওয়াকফ আইন নামটাও পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে-ইউনিফায়েড ওয়াকফ ম্যানেজমেন্ট টেম্পারমেন্ট এফিসিয়েন্সি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যাক্ট। বিরাট বড় নাম। কিন্তু এতগুলো বিষয় জুড়ে দিয়ে দেখানো হচ্ছে যে, এটা ওয়াকফ নয়, ওয়াকফ সম্পত্তির যে এফিসিয়েন্সি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যাক্ট, তাই নিয়ে করা হচ্ছে। ম্যানেজমেন্ট এফিসিয়েন্সি বাড়ানো হচ্ছে। ওয়াকফ সম্পত্তি যিনি দেখাশোনা করেন, তাকে মোতোয়াল্লি বলা হয়। এই বিলে মোতোয়াল্লির সংজ্ঞা এবং ওয়াকফ আইনের ধারা ৪০-দুটোকেই তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। ধারা ৪০ অনুযায়ী আগে ওয়াকফ কমিশনারের ওয়াকফ সম্পত্তি চিহ্নিত ও তদন্ত করার ক্ষমতা ছিল। এখন সেই ক্ষমতা আর থাকবে না।

খুব স্বাভাবিকভাবেই এই প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো মুসলিম ধর্মীয় সংগঠনগুলোর মধ্যে তীব্র বিরোধিতার জন্ম দিয়েছে। তারা মনে করছেন, সরকার তাদের ওয়াকফ সম্পত্তির অধিকার কেড়ে নিতে চায়। প্রাচীন ঐতিহাসিক মসজিদ, অন্যান্য প্রাচীন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক উদ্বেগ রয়েছে যে, সেগুলোর কী হবে? যেখানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ দলিল নেই, আংশিক দলিল আছে বা কিছুই নেই, কিন্তু বছরের পর বছর ধরে তা চলছে।

এটা এক ধরনের পলিটিক্যাল এজেন্ডা হয়ে উঠেছে। দেশের ১৭-১৮ শতাংশ সংখ্যালঘু মুসলমান মানুষজনের কোনো কথা না শুনে দেশের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে আরও চওড়া করা হচ্ছে।

বাংলা বাজার ইউটিউব চ্যানেলের সৌজন্যে

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র পরিচালক

Advertisement

ওয়াকফ বিল

Advertisement

আরও পড়ুন

এমন সম্প্রীতি ও শান্তির পরিবেশ আগামীতেও অটুট থাকুক

এমন সম্প্রীতি ও শান্তির পরিবেশ আগামীতেও অটুট থাকুক

বিশ্বে সংঘাত বাড়ছে, শান্তির সন্ধান ব্যাহত

বিশ্বে সংঘাত বাড়ছে, শান্তির সন্ধান ব্যাহত

মুক্ত বিনিয়োগ নীতিই হতে পারে সেরা কৌশল

মুক্ত বিনিয়োগ নীতিই হতে পারে সেরা কৌশল

ধূসর রাষ্ট্রের কাছে এক বিষণ্ন শালিকের গান

ধূসর রাষ্ট্রের কাছে এক বিষণ্ন শালিকের গান

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম