Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

ছাত্র রাজনীতি : প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

Advertisement

Icon

রাহমান চৌধুরী

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ছাত্র রাজনীতি : প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

Advertisement

নাট্যকার ব্রেখট মনে করতেন, মানুষ যে রাজনীতি করতে চায় না সেটা একটা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। কারণ মানুষের প্রতিটি পদক্ষেপই রাজনীতির অন্তর্ভুক্ত। চাল, ডাল, আটা, লবণ ইত্যাদির দাম কমা-বাড়া-এর কিছুই রাজনীতির বাইরে নয়। কথাটা তো সত্যি। মানুষ রাজনৈতিক দল না করতে পারে, কিন্তু রাজনীতিবিমুখ হলে চলবে কেন? রাজনৈতিক দলের সদস্য না হলেও সবাইকে রাজনীতি করতেই হবে। রাষ্ট্র এবং তার সব কর্মসূচিতে জনগণকে নাক গলাতেই হবে। বাংলাদেশে কয়েক বছর আগে বা সাম্প্রতিক সময়ের কিছু আন্দোলনের কথা ধরা যেতে পারে। ঠিক যেমন আবরার ফাহাদের হত্যা নিয়ে ছাত্রদের আন্দোলন বা তারপরের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন কিংবা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলন এগুলো কি রাজনীতি নয়? দাবি-দাওয়া কার কাছে সরকারের কাছে। শিক্ষার্থীরাই কিন্তু এসব আন্দোলনে মাঠে নেমেছিল। যদি দাবি-দাওয়ার আন্দোলন মানেই রাজনীতি হয়, তাহলে সড়ক দুর্ঘটনার বা বিভিন্ন দুর্ঘটনার কারণে বৃহত্তর ছাত্রসমাজের ক্ষোভ প্রকাশ করার রাজনীতিই তো ছিল; নাকি? কথাটা কিন্তু তবুও প্রায় শোনা যায়, ছাত্র কেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনীতি করবে?

সংকটটা বরং উলটো। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররা কম রাজনীতি করে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রাজনীতি দখল করে রাখে বিভিন্ন দলের একদল গুন্ডা। সব ছাত্র রাজনীতিতে অংশ নিলে এ গুন্ডাদের রাজত্ব শেষ হতো। বিভিন্ন সময়ে সাধারণ মানুষ বা অভিভাবক বা শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দাবি নিয়ে মাঠে নামছে, সেটা রাজনীতিই। কিন্তু এই রাজনীতি বিশেষ দলের নয়, স্বতঃস্ফূর্ত। মানুষ তার অধিকার আদায় করতে চায় এইভাবে। কিছু স্বার্থান্বেষীও ঢুকে পড়ে এর মধ্যে, সেটাও মনে রাখতে হবে। নাট্যকার ব্রেখট তাই বলেছিলেন, সাধারণ মানুষের রাজনীতি করতে না চাওয়াটা হাস্যকর। রাজনীতি করতে তারা বাধ্য।

যদি নিজেরা তারা রাজনীতি না করে, অন্যরা তাদের সব ধরনের অধিকার দখল করে নেবে। লুটেরা ক্ষমতাবানদের বা তাদের পোষ্য গুন্ডাদের দখলে চলে যাবে সবকিছু। জনগণ সবাই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত না হয়, রাজনীতি নিয়ে ভাবনাচিন্তা না করে, তাহলে কয়েকটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় গিয়ে বারবার জনগণকে বোকা বানাবে। দুর্ঘটনা ঘটতে থাকবে, দালান ধসে পড়বে, কারখানায় আগুন লাগবে। মানুষ কিছুদিন পরপর বিক্ষুব্ধ হয়ে তাৎক্ষণিক আন্দোলনে নামবে। বারবার আন্দোলনের নামে রক্তপাত ঘটবেই। জনগণ তাদের সন্তানদের রাজপথের আন্দোলনে বলি দিতে বাধ্য হবেন। বহু বছর ধরে কি তাই ঘটছে না রাজনীতি করা মানে তাই কেবল দলবাজি করা নয়, বিশেষ দলের লেজুড়বৃত্তি বা বিশেষ দলের সদস্য হওয়া নয়। রাজনীতি হচ্ছে রাষ্ট্রের, সমাজের প্রতিটি বিষয়ে সচেতন থাকা এবং তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করার শিক্ষা লাভ।

যারা বলছেন ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হোক, সর্বত্র রাজনীতি বন্ধ করা হোক, সেটা কি তবে সঠিক বার্তা? রাজনীতি তবে কারা করবে, একদল গুন্ডা? যদি তাই হয়, হাসিনার মতো শাসন কিছুদিন পরপরই আসবে। সমাজের সবচেয়ে সচেতন অগ্রগামী বিশ্ববিদ্যালয়ের তারুণ্য যদি রাজনীতি না করে, রাজনীতি তবে কারা করবে? ছাত্ররা যদি সবাই রাজনীতি করতে আরম্ভ করে গুন্ডাতন্ত্র ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাবে। যারা ভোটাধিকার আছে তাকেই সচেতনভাবে রাজনীতি করতে হবে। ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করার কথা বলে, জুলাই আন্দোলনের পক্ষে কি দাঁড়ানো সম্ভব? বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর সংকটটা কোথায় বুঝতে হবে। রাষ্ট্রের সব নাগরিক রাজনীতি সচেতন না হওয়ায় বড় দলগুলো নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে সুবিধাভোগী গুন্ডাদের মাধ্যমে।

বরং বলা যেতে পারে যে, রাজনীতি চলে গেছে গুন্ডাতন্ত্রের হাতে। মনে রাখতে হবে, বড় বড় দলের নেতাদের গাল দিলেও সংকটের সমাধান হবে না, যতক্ষণ না নাগরিকরা দলবাজি বাদ দিয়ে রাজনৈতিকভাবে সচেতন হবেন। যখন জনগণ সবাই একসঙ্গে রাজনীতির মাঠে থাকে, তখন কি গুন্ডারা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় না। জনগণ মাঠ ছেড়ে দিলেই কি আবার তারা বারবার ফিরে আসে না?

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনা নিজের মুখে যেদিন বলেছিলেন, তার বাসার কাজের লোক চারশ কোটি টাকার মালিক, বিশ্বের যে কোনো পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক দেশে সেই দিনেই প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করতেন। পদত্যাগ না করলে সংসদে বা গণমাধ্যমে হইচই পড়ে যেত। প্রধানমন্ত্রী নিজ দলের চাপেই তখন পদত্যাগ করতেন। হাসিনার মতো একজন প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য কি এর চেয়ে আর বড় অভিযোগ দরকার আছে? হাসিনা সরকারকে যে এ ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে দেওয়া গেল না, বরং হাসিনা যে বড় বড় নানারকম লুটপাট করতে পারলেন, তার প্রধান কারণ এই জনগণ রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল না। হাসিনাকে হাসিনা হয়ে উঠানোর জন্য তাই নাগরিক সমাজের দায় রয়েছে। নাগরিক সমাজকে সেজন্য কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

সাম্রাজ্যবাদ, দেশীয় শাসকচক্র, বহুজাতিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এমনভাবে সারা বিশ্বে দাবার গুটি সাজাচ্ছে, যাতে সাধারণ মানুষ রাজনীতিবিমুখ থাকে। জনতা বলে কিছু না থাকে। সুশীল সমাজ, শাসক, বিদেশি পরামর্শকরা মনে করছেন, প্রশাসন দিয়ে রাজনীতির কাজ চালিয়ে নেওয়া যাবে। হাসিনা সরকার সেই পথ ধরেই এগিয়ে ছিল। হাসিনা মনে করছেন, তিনি রাস্তা আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দখল রাখবেন ছাত্রলীগ নামক গুন্ডাদের দিয়ে, বাকি সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হবে প্রশাসনের মাধ্যমে। হাসিনার কাছে কি দলের প্রবীণ নেতাদের, ত্যাগী কর্মীদের কারও কথার গুরুত্ব ছিল? গত দশ বছর ছাত্রলীগ আর প্রশাসন ছাড়া দল হিসাবে আওয়ামী লীগ কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল হাসিনার কাছে?

বর্তমানে একটা কথা চালু আছে বাজারে, রাজনীতি থেকে টাকা আয় করা বন্ধ হয়ে গেলে মানুষ আর রাজনীতি করবে না। কথাটা আজকের পরিপ্রেক্ষিতে কিছুটা সত্যি হলেও চিরকাল সত্য ছিল না। মানুষ বা ছাত্রসমাজ আগে রাজনীতি করেছে পাওয়ার জন্য নয়, মতাদর্শের কারণে। রাষ্ট্রের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে। বায়ান্নর বা ঊনসত্তরের আন্দোলনে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমেছিল কি টাকার জন্য সত্যি বলতে রাজনীতি ক্রয় করা বা রাজনীতিতে টাকা ঢালা, এসব চালু করে বিভিন্ন সময়ে সামরিক শাসকরা। কারণ সে ক্ষমতা চেয়েছিল, তার কোনো মতাদর্শ ছিল না। স্বভাবতই মতাদর্শের জন্য কেউ তার সঙ্গে রাজনীতি করতে যায়নি, গিয়েছিল সুবিধা নিতে। পরে সেই ধারাটাই নানা কারণে স্থায়িত্ব পেল। সেই ধারাটা ভাঙতে হবে।

রাজনীতিতে অংশ নিতে হবে খুব সচেতনভাবে। বিশেষ দলের অন্ধ সমর্থক হিসাবে নয়। না হলে হঠাৎ পরিকল্পনা ছাড়া রাজনৈতিক ঘটনায় সরকার হটিয়ে দেওয়ার মধ্যে কিছু সংকটের দিক রয়েছে। প্রধান সংকট হলো, বৃহত্তর জনসাধারণের এ তাৎক্ষণিক অংশগ্রহণ আন্দোলনকে সফল করলেও, রক্তক্ষয়ী আন্দোলন শেষে সত্যিকারের প্রাপ্তি আসে না। বলতে গেলে যেসব লক্ষ্য নিয়ে আন্দোলন শুরু হয়, বিজয় লাভের পর সেসব লক্ষ্য অর্জিত হয় না। কখনো কখনো প্রতিবিপ্লব মাথাচাড়া দেয়। কারণ সমাজ, রাজনীতি ইতিহাস এসব সম্পর্কে গভীর জ্ঞান না থাকলে আন্দোলনে সাফল্য লাভের পর জনগণ আর তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। যখন আন্দোলনের পর কতিপয় লোক আন্দোলনের সুফল লুটপাট করতে চায়, জনগণ রাজনৈতিকভাবে সচেতন না থাকায় তখন দিশেহারা হয়ে পড়ে। নানা মত এবং পথের নানা প্রচারে তারা বিভ্রান্ত হতে থাকে, নিজেরাও অনেক ভুল করতে থাকে।

স্বভাবতই আন্দোলন তখন বেহাত হয়ে যায়। যাতে বারবার আন্দোলন বেহাত না হয়, দেশের ভেতরে কখনো দানব সরকার মাথাচাড়া দিতে না পারে, বিদেশি শক্তি দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে, মানুষের অধিকার যাতে ভূলুণ্ঠিত না হয়, যাতে সর্বদা তার বাকস্বাধীনতা থাকে; সেজন্য ছাত্র-জনতাকে খুব সচেতনভাবে রাজনীতিতে অংশ নিতে হবে এবং দ্রুত রাজনীতি থেকে সবরকম গুন্ডাতন্ত্র হঠাতে হবে।

রাহমান চৌধুরী : সমাজচিন্তক, গবেষক এবং শিক্ষক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

হালফিল বয়ান ধর্ষণ বৃদ্ধি কীসের আলামত

ধর্ষণ বৃদ্ধি কীসের আলামত

ক্ষমা চাওয়ার আগে পুনর্মিলন হতেই পারে না

ক্ষমা চাওয়ার আগে পুনর্মিলন হতেই পারে না

নেতানিয়াহুর লক্ষ্য বিরোধীদের পথ রুদ্ধ করাও

নেতানিয়াহুর লক্ষ্য বিরোধীদের পথ রুদ্ধ করাও

প্রক্রিয়াজাতকরণ ছাড়া প্রাকৃতিক সম্পদে মূল্য সংযোজন ঘটে না

প্রক্রিয়াজাতকরণ ছাড়া প্রাকৃতিক সম্পদে মূল্য সংযোজন ঘটে না

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম