Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

লেবাননের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ : হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার প্রকল্প

Advertisement

Icon

ড. মোহাম্মদরেজা মোরাদি

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

লেবাননের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ : হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার প্রকল্প

Advertisement

জটিল সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর দেশ লেবানন আবারও বহিরাগত ও কূটনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে। হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার বিষয়টি আগের চেয়েও বেশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এ প্রকল্পটি, যা যুক্তরাষ্ট্র এবং এর কিছু আঞ্চলিক ও পশ্চিমা মিত্রদের সমর্থনে চালিত হচ্ছে, এমন একসময়ে উত্থাপিত হয়েছে, যখন লেবাননের কিছু অংশ এখনো ইসরাইলের দখলে রয়েছে। একই সঙ্গে লেবানিজ সেনাবাহিনী আর্থিক ও লজিস্টিক দুর্বলতার কারণে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রকরণের ফলে সৃষ্ট সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা শূন্যতা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা রাখে না। এ পরিস্থিতি অনেক বিশ্লেষককে প্রশ্ন করতে বাধ্য করেছে : হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করা কি লেবাননের স্থিতিশীলতাকে শক্তিশালী করবে, নাকি দেশটিকে অস্থিরতা ও বৃহত্তর হুমকির মুখে ঠেলে দেবে?

সাম্প্রতিক মাসগুলোয় বৈরুত অসংখ্য কূটনীতিকের আসা-যাওয়ার সাক্ষী হয়েছে। ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক থেকে শুরু করে মার্কিন প্রতিনিধি দলের সফর পর্যন্ত সবকিছুই লেবাননে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার তীব্রতা নির্দেশ করে। যুক্তরাষ্ট্র বারবার লেবানিজ কর্মকর্তাদের হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার বিষয়ে সুস্পষ্ট পদক্ষেপ নিতে বলেছে, যখন ইসরাইল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন এবং সীমান্ত আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে। এ দাবিগুলো স্পষ্টতই একপাক্ষিকতা প্রদর্শন করে : লেবানন তার প্রধান প্রতিরোধ শক্তিকে ত্যাগ করবে বলে আশা করা হচ্ছে, অথচ ইসরাইল তার দখল এবং আগ্রাসন বন্ধ করার কোনো প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে না। এ প্রেক্ষাপটে নাবিহ বেরির মতো কিছু লেবানিজ নেতা জোর দিয়ে বলেছেন, নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে কোনো আলোচনা ইসরাইলের লেবাননের ভূখণ্ড থেকে সরে আসার বাধ্যবাধকতা থেকে আলাদা করা যাবে না।

এসব চাপের মুখে হিজবুল্লাহর অবস্থান ছিল সুস্পষ্ট ও দৃঢ়। হিজবুল্লাহ নেতারা বারবার বলেছেন, যে কোনো পরিস্থিতিতেই তারা অস্ত্র ত্যাগ করবে না; কারণ এ অস্ত্রগুলোই ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একমাত্র প্রতিরোধক। বাস্তবতা হলো, বাজেট সংকট, সরঞ্জামের অভাব এবং বিদেশি সাহায্যের ওপর গভীর নির্ভরশীলতায় ভোগা লেবাননের সেনাবাহিনীর দুর্বলতা বুঝিয়ে দিচ্ছে, একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরক্ষামূলক বিকল্প তৈরি না করে হিজবুল্লাহকে অপসারণ করলে লেবানন সম্পূর্ণরূপে অরক্ষিত হয়ে পড়বে।

এ বিষয়টি শুধু লেবাননেই সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল কর্তৃক হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার প্রকল্পটি এ অঞ্চলে পরিচালিত একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরাইল লেবানন ও সিরিয়ায় হিজবুল্লাহর অবকাঠামোগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে তাদের দুর্বল করার চেষ্টা করেছে। একই সময়ে সিরিয়া এবং ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীকে প্রতিরোধের লজিস্টিক রুটগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। এসব পদক্ষেপ স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করা কেবল একটি দেশীয় বিষয় নয়, বরং প্রতিরোধ বাহিনীর সক্ষমতা সীমিত করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য নতুন করে সাজানোর একটি আঞ্চলিক পরিকল্পনার অংশ।

এ ধরনের পরিকল্পনার সম্ভাব্য পরিণতি ব্যাপক। প্রথমত, লেবাননের জাতীয় প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে। গত দুই দশকে, ২০০০ সালে দক্ষিণ লেবানন মুক্ত করা থেকে শুরু করে ২০০৬ সালের যুদ্ধে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর প্রতিরোধ এবং আইএসআইএস ও জাবহাত আল-নুসরার মতো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যখন লেবানিজ সেনাবাহিনী এ শূন্যতা পূরণ করতে পারে না, তখন এ ধরনের একটি শক্তিকে নির্মূল করা দেশের নিরাপত্তাকে মারাত্মকভাবে বিপন্ন করতে পারে। দ্বিতীয়ত, গুরুতর অভ্যন্তরীণ সংঘাতের ঝুঁকি ব্যাপক। লেবাননের সাম্প্রদায়িক কাঠামো এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে হিজবুল্লাহপন্থি বাহিনীর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতির কারণে জোরপূর্বক নিরস্ত্রীকরণের যে কোনো প্রচেষ্টা আরেকটি গৃহযুদ্ধের সূচনা করতে পারে; যে যুদ্ধের পরিণতি শুধু লেবানন নয়, সমগ্র অঞ্চলকে গ্রাস করবে। তৃতীয়ত, লেবাননের পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীলতা অনিবার্যভাবে গভীর হবে। হিজবুল্লাহর অনুপস্থিতিতে লেবানিজ সেনাবাহিনী আগের চেয়েও বেশি পশ্চিমা আর্থিক ও সামরিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে; যা জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।

কিন্তু এ বিষয়টির গুরুত্ব লেবানন বা এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের স্তরে থেমে থাকে না। হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার প্রচেষ্টাকে একটি বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে দেখতে হবে, যা গ্লোবাল নর্থ এবং গ্লোবাল সাউথের মধ্যে সম্পর্ক সম্পর্কিত। আমরা যেমন ফিলিস্তিন, ইয়েমেন এবং গ্লোবাল সাউথের অন্যান্য অংশে দেখি, পশ্চিমা শক্তিগুলো তাদের পছন্দের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বাইরে পরিচালিত যে কোনো প্রতিরোধ শক্তিকে নির্মূল বা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সচেষ্ট। এটি কেবল লেবাননে একটি রাজনৈতিক-সামরিক গোষ্ঠীকে দুর্বল করা নয়, বরং পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করার জন্য গ্লোবাল সাউথের সক্ষমতাকে সীমিত করা। এ দৃষ্টিকোণ থেকে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ একটি বৈশ্বিক নীতির উদাহরণ; যেখানে ‘জাতীয় সার্বভৌমত্ব’ এবং ‘অস্ত্রের একচেটিয়া অধিকার’ শুধু তখনই আহ্বান করা হয়, যখন তারা প্রভাবশালী শক্তিগুলোর স্বার্থের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হয়।

এ কারণে বলা যায়, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার প্রকল্পের অধীনে লেবাননের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত অনিশ্চিত এবং বিপদাপন্ন। এ প্রকল্পটি যদিও বাহ্যিকভাবে কেন্দ্রীয় সরকার এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বকে শক্তিশালী করার মতো স্লোগান দিয়ে প্রচারিত, বাস্তবে এটি দেশটিকে বাহ্যিক আগ্রাসনের কাছে আরও দুর্বল করে তুলতে পারে এবং এটিকে বৃহত্তর আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কৌশল বাস্তবায়নের একটি মঞ্চে পরিণত করতে পারে। দক্ষিণ লেবানন মুক্ত করা, ২০০৬ সালের যুদ্ধের সময় প্রতিরোধ এবং সিরিয়ায় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে হিজবুল্লাহর ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, এ আন্দোলন কেবল একটি রাজনৈতিক-সামরিক শক্তি নয়; এটি আঞ্চলিক প্রতিরোধের সমীকরণের একটি অংশ, যার অপসারণের পরিণতি লেবাননের বাইরেও প্রসারিত হতে পারে। যদি এ প্রকল্পটি কার্যকর করা হয়, তাহলে শুধু লেবাননের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাই বিপন্ন হবে না, বরং এটি গ্লোবাল সাউথের অন্যান্য প্রতিরোধ শক্তিকেও একটি বার্তা দেবে: বিদ্যমান ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে এমন যে কোনো শক্তিকে sooner or later (শিগ্গির হোক বা দেরিতে হোক) নির্মূল করার লক্ষ্যবস্তু করা হবে।

আজ লেবানন কেবল একটি অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখোমুখি নয়; এটি এমন একটি সংগ্রামের মাঝে আটকা পড়েছে, যার মূল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অসম কাঠামোতে নিহিত। হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার চাপ লেবাননে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন করার নিছক একটি প্রচেষ্টা নয়; এ ধরনটি বিশ্বের বিভিন্ন অংশে বারবার পুনরাবৃত্ত হয়েছে। মোসাদ্দেগের ইরানের তেল শিল্পের জাতীয়করণ থেকে শুরু করে ফিলিস্তিন এবং লেবাননের আজকের প্রতিরোধ পর্যন্ত প্রভাবশালী শক্তিগুলো একটি একক বার্তা দিয়েছে : বৈশ্বিক পুঁজিবাদ এবং পশ্চিমা আধিপত্যের কাঠামোর বাইরে পরিচালিত যে কোনো বিকল্পকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ বা নির্মূল করতে হবে।

এ প্রেক্ষাপটে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার প্রকল্পটি কেবল লেবাননের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি হুমকি নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক নীতির প্রতীক, যা গ্লোবাল সাউথের স্বাধীনতা এবং প্রতিরোধকে সহ্য করতে পারে না। পুঁজিবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদ ঐতিহাসিকভাবে দেখিয়েছে যে, তারা তাদের স্বার্থরক্ষার জন্য নিষেধাজ্ঞা এবং অভ্যুত্থান থেকে শুরু করে যুদ্ধ এবং অবরোধ পর্যন্ত কোনো কিছুতেই পিছপা হবে না। আজ একই যুক্তি পুনরাবৃত্তি করা হচ্ছে : লেবাননে প্রতিরোধ নির্মূল করা, অঞ্চলে বৃহত্তর আধিপত্যের পথ প্রশস্ত করা এবং বিশ্বজুড়ে সব অনুরূপ আন্দোলনকে একটি প্রতিরোধমূলক বার্তা পাঠানো।

এ দৃষ্টিকোণ থেকে লেবাননের ভবিষ্যৎ কেবল পূর্ব ভূমধ্যসাগরের একটি ছোট দেশের ভবিষ্যৎ নয়, বরং পশ্চিমা আধিপত্য এবং স্বাধীনতা ও ন্যায়ের জন্য গ্লোবাল সাউথের প্রচেষ্টার মধ্যে একটি বৃহত্তর সংগ্রামের প্রতিফলন। লেবানন এ চাপগুলো মোকাবিলা করতে পারে কিনা, এটি এমন একটি প্রশ্ন, যার উত্তর কেবল লেবাননের ভাগ্যই নির্ধারণ করবে না, বরং এটিও ইঙ্গিত দেবে যে, বিশ্বব্যবস্থা সত্যিই সত্যিকারের বহু-মেরূকরণের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, নাকি পুঁজিবাদী একপাক্ষিকতার অধীনে থাকবে।

* মিডল ইস্ট মনিটর থেকে ভাষান্তরিত

ড. মোহাম্মদরেজা মোরাদি : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক, ইরানের পররাষ্ট্রনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ

Advertisement

লেবানন হিজবুল্লাহ

Advertisement

আরও পড়ুন

হালফিল বয়ান রোহিঙ্গা সংকটের চেইন-রিঅ্যাকশন

রোহিঙ্গা সংকটের চেইন-রিঅ্যাকশন

অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের সন্ধানে বাংলাদেশ

অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের সন্ধানে বাংলাদেশ

নারীর বিদেশযাত্রা ও ইমিগ্রেশনের দায়িত্বশীলতা

নারীর বিদেশযাত্রা ও ইমিগ্রেশনের দায়িত্বশীলতা

পুঁজির বৃত্তে বন্দি বাজার : করণীয় কী

পুঁজির বৃত্তে বন্দি বাজার : করণীয় কী

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম