জুলাই সনদ : আইনি গ্যাঁড়াকলে অন্তর্বর্তী সরকার
Advertisement
মোবায়েদুর রহমান
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জুলাই সনদ নিয়ে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার বেশ বড় গ্যাঁড়াকলে পড়েছে। সরকার তো ঘোষণা করেছে, আগামী পবিত্র রমজানের আগেই অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন হবে। একটি সরকার নির্বাচন দিচ্ছে, তাতে সবারই মোটামুটি খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু তার আগে কতগুলো সমস্যা রয়েছে, যেগুলো কেউ মুখ ফুটে বলছেন না। সেগুলো মূলত সংবিধান সংস্কারের সমস্যা। এসব সমস্যার সমাধান না করে ইলেকশনে গেলে ইলেকশনের পরও ঝামেলা সৃষ্টি হবে। স্মরণ রাখা দরকার, পাকিস্তান ভেঙে গেছে সাংবিধানিক সংকটের কারণে। আমার এ বক্তব্য অনেকের কাছে ধোঁয়াটে মনে হতে পারে। তবে আমি কিছুক্ষণ পর দেখাব, কেন সাংবিধানিক সংকটের কারণে পাকিস্তান ভেঙে গেছে।
অতবড় সমস্যা না হলেও সাংবিধানিক সংকট ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে দেখা গেছে। বর্তমানে ড. ইউনূসের যে সরকার, সেটি কোন ধরনের সরকার? সেটি কি সাংবিধানিক সরকার? নাকি বিপ্লবী সরকার? এসব প্রশ্ন এজন্য করতে হচ্ছে যে, এখন এ মুহূর্তে তো দেশে কোনো পার্লামেন্ট নেই। পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া হয়েছে। যে সংবিধানটি এখনো বিদ্যমান রয়েছে, সেই সংবিধানে বলা আছে, প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে জাতীয় সংসদ বাতিল করা যেতে পারে। এখানে তো সেটির কোনো সুযোগ ছিল না। গত বছরের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনরোষের ভয়ে ভারতে পালিয়ে যান। বলা হয়, তিনি পদত্যাগ করেছেন।
দৈনিক মানবজমিনের সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে বৈঠক করেছেন। মতিউর রহমান রাষ্ট্রপতিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগপত্রটি কোথায়? উত্তরে তিনি বলেন, সেটি তিনি জানেন না। তাকে আবারও প্রশ্ন করা হয়, এ পদত্যাগপত্রটি কি প্রধান উপদেষ্টার সচিবালয়ে আছে? আরও প্রশ্ন করা হয়, এটি কি কেবিনেট ডিভিশনে আছে? একই উত্তর, তিনি জানেন না। এরপর আর বিষয়টি নিয়ে অগ্রসর হওয়া যায় না।
শেখ হাসিনাকে যেভাবে তাড়িয়ে দেওয়া হলো, সেটি তো বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী হয়নি। কারণ, সংবিধান মোতাবেক সরকার অপসারণের মাত্র দুটি পথ আছে। একটি হলো নির্বাচন। অপরটি হলো জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো। এ দুটি পথের কোনো পথ ধরেই শেখ হাসিনাকে অপসারণ করা হয়নি। তাই বলে তার অপসারণ কি অবৈধ হয়েছে? অবশ্যই অবৈধ হয়নি।
যখন কোনো গণ-অভ্যুত্থান হয়, গণ-অভ্যুত্থানের কারণে জনগণের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশের মাধ্যমে যে সরকার গঠিত হয়, সেই সরকার চাইলেই প্রোক্লামেশন কিংবা রেফারেন্ডামের মাধ্যমে সংবিধান স্থগিত করে নতুন সংবিধান জারি করতে পারেন। এ হিসাবে Doctrine of necessity-এর মার্শাল ল’র চেয়েও গণ-অভ্যুত্থানের শক্তি অনেকগুণ বেশি। কিন্তু জনগণের অভ্যুত্থানের শক্তি সামরিক আইনের চেয়েও অনেক বেশি। এর কার্যকারিতা ঘটেছিল ফ্রান্সে। ৫ম রিপাবলিকের মাধ্যমে। এর কার্যকারিতা ঘটেছে আমেরিকায়। এর কার্যকারিতার সবেচেয়ে ভালো উদাহরণ হলো ফ্রান্সে। ফ্রান্সে প্রথম রিপাবলিক, দ্বিতীয় রিপাবলিক, তৃতীয় রিপাবলিক, চতুর্থ এবং পঞ্চম। এ ৫ম রিপাবলিকের মাধ্যমে অভ্যুত্থানের ভিত্তিতে তারা তাদের নতুন সংবিধান প্রণয়ন করেছিল।
বাংলাদেশেও গত বছরের জুলাই-আগস্টে গণ-অভ্যুত্থান ঘটেছিল। অবশ্য সম্প্রতি মাননীয় হাইকোর্ট জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানকে অভ্যুত্থান না বলে বিপ্লব বলার নির্দেশ দিয়েছেন এবং এ মর্মে গেজেট নোটিফিকেশনের আদেশ দিয়েছেন। এ আদেশ তিন মাসের মধ্যে কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছেন।
২.
আসল ঘটনা হলো, লক্ষ-কোটি মানুষ যে বিপ্লব করেছেন, সেই লক্ষ-কোটির অভিপ্রায় অনুযায়ী জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আমরা আগেই বলেছি, সংবিধানে ইন্টেরিয়ম গভর্নমেন্ট বলে কিছু নেই। আর সংবিধানের কোথাও ডকট্রিন অব নেসেসিটি নেই। অতীতে পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে সামরিক আইন জারির পর ডকট্রিন অব নেসেসিটি প্রয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু বিপ্লব জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। এ সার্বভৌম ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ হলো সবচেয়ে বড় আইন, সবচেয়ে বড় সংবিধান।
মনে হচ্ছে, বিপ্লবের সীমাহীন ক্ষমতা সম্পর্কে কারও কোনো ধারণা নেই। অভ্যুত্থান নিজেই সংবিধান। সলেমন এক্সপ্রেশন অব দ্য উইল অব দ্য পিপল’স পাওয়ার ইজ ইটসেলফ অ্যা কনস্টিটিউশন। এ কনস্টিটিউশন অ্যাসেম্বলি সম্পর্কে যাদের ধারণা নেই, কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ার অব দ্য পিপল সম্পর্কে যাদের ধারণা নেই, তারা সংবিধান ও বিপ্লবকে নিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ার অব দ্য পিপল কীভাবে গঠিত হয়? ক্ষমতার উৎস কোত্থেকে আসে? Grund Norms কাকে বলে? ক্যালসনের থিওরি কাকে বলে? ক্যালসনের থিওরি কীভাবে জন্ম নেয়, এ সম্পর্কে যাদের ধারণা নেই, তারাই শুধু কথায় কথায় সংবিধান বলে।
প্রশ্ন হলো, বিপ্লব নিজেই যেখানে সব আইনের উৎস, সেখানে সেই বিপ্লবের পর সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ মোতাবেক সুপ্রিমকোর্টে রেফারেন্স পাঠানো হলো কেন? কে পাঠিয়েছিলেন? কেন পাঠিয়েছিলেন? কবে পাঠিয়েছিলেন? কী জন্য পাঠিয়েছিলেন? বলা হচ্ছে যে, ইউনূস সরকারের বৈধতা আনার জন্য। সরকারি বক্তব্য মোতাবেক যখন এ রেফারেন্স পাঠানো হয়, তখন তো সরকার গঠিতই হয়নি। আর রেফারেন্স পাঠানোর অর্থ কী দাঁড়ায়? সহজ-সরল অর্থ হলো এই যে, ১০৬ অনুচ্ছেদ মোতাবেক সুপ্রিমকোর্টের বৈধতা চাওয়া হলো, ৫ আগস্ট যে বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছিল, সেটিকে ৮ আগস্ট সংবিধানের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। অন্য কথায় সেদিন থেকেই এ সরকার সাংবিধানিক সরকার হয়ে গেল।
৩.
সেজন্যই রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে অপসারণের জন্য যখন ছাত্ররা দাবি তোলে, তখন বিএনপির তরফ থেকে বলা হয়, চুপ্পুকে সরালে সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি হবে। কোন সংবিধানের সংকট? অবশ্যই বর্তমান সংবিধানের। তাই যদি হয়, তাহলে এ বর্তমান সংবিধান মোতাবেক নির্বাচন তো ৩ মাস পরে হওয়ার কথা। অর্থাৎ নভেম্বরে হওয়ার কথা। কারণ যে সংবিধান এখন মানা হচ্ছে, সেই সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ মোতাবেক মেয়াদ অবসান ছাড়া অন্য কোনো কারণে মেয়াদ অবসানের পূর্বেই যদি সংসদ ভেঙে যায়, তাহলে ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হবে।
আলোচ্য ক্ষেত্রে সংসদ ভেঙে গেছে ৬ আগস্ট ২০২৪ সালে। তাই সংবিধান মোতাবেক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত ছিল ২০২৪ সালের ৬ নভেম্বরের মধ্যে। ২০২৪ সালের ৬ নভেম্বরের পর আরও ৯ মাস গত হয়েছে। এ ৯ মাস সরকার কোন আইনের বলে ক্ষমতায় রয়েছে? এর কোনো সাংবিধানিক উত্তর নেই। এর উত্তর রয়েছে Grund Norms বা Basic Norms থিওরি অনুযায়ী। অর্থাৎ জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা অনুযায়ী এ সরকার ক্ষমতায় আছে এবং আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন দিচ্ছে। যদি জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা বা Basic Norms অনুযায়ী সরকার ক্ষমতায় থাকে, তাহলে সেখানে সংবিধান Redundant বা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। সংবিধান এবং বিপ্লবের জগাখিচুড়ি অনেক পাকানো হয়েছে। আর নয়।
৪.
শুরুতে বলেছি, সাংবিধানিক সংকটের কারণেই পাকিস্তান ভেঙেছে। এ নিয়ে আমি অনেক কলাম লিখতে পারি। তবে আজ স্থানাভাবে সেটি অতি সংক্ষেপে বর্ণনা করব।
১৯৪৭ সালের আগস্টে পাকিস্তান কায়েম হলেও ১৯৫৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাকিস্তানের কোনো শাসনতন্ত্র তৈরি হয়নি। এ ৯ বছর পাকিস্তান শাসিত হয়েছে ইংরেজদের তৈরি ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন অনুযায়ী। ১৯৫৬ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তানে শাসনতন্ত্র কার্যকর হয়। এ শাসনতন্ত্রে বহুদলীয় পার্লামেন্টারি সরকারের ব্যবস্থা রাখা হয়। ভারতে ১৯৫০ সালে শাসনতন্ত্র কার্যকর হয়।
১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান সারা পাকিস্তানে সামরিক আইন জারি করেন এবং শাসনতন্ত্র বাতিল করেন। অতঃপর তিনি একটি শাসনতন্ত্র জারি করেন, যেটি ছিল প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির। ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান ঘটে পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলে। পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বে এবং বাংলাদেশে ১১ দফার ভিত্তিতে ছাত্রনেতাদের নেতৃত্বে। এ অভ্যুত্থানের পিঠে সওয়ার হয়ে জেনারেল ইয়াহিয়া খান মার্শাল ল’ জারি করেন। ইয়াহিয়া খান আইয়ুব খানের প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির শাসনতন্ত্র বাতিল করেন।
পাকিস্তানের জন্য একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়নের উদ্দেশ্যে জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালে লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার বা এএফও’র অধীনে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করেন। এ নির্বাচনে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় এবং সারা পাকিস্তানে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। পশ্চিম পাকিস্তানে জেড এ ভুট্টো একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পান।
নির্বাচন শেষে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের শাসনতন্ত্রের একটি খসড়া রচনা করে। এ খসড়া নিয়ে আলোচনার জন্য মিলিটারি শাসক ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন। ঢাকায় ১৯৭১ সালের ১৪ মার্চ থেকে ইয়াহিয়া এবং শেখ মুজিবের মধ্যে দিনের পর দিন ম্যারাথন বৈঠক হয়। আওয়ামী লীগের খসড়া শাসনতন্ত্র সম্পর্কে ইয়াহিয়া বলেন, এ শাসনতন্ত্র গ্রহণের পূর্বে নির্বাচনে পশ্চিম পাকিস্তানের নেতা হিসাবে স্বীকৃত জেড এ ভুট্টোর সঙ্গে শেখ মুজিবের কথা বলা উচিত।
তদনুযায়ী ভুট্টো ঢাকায় আসেন। ঢাকায় তিনি শেখ মুজিবের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে তিনি আওয়ামী লীগের খসড়া শাসনতন্ত্র দেখেন এবং মন্তব্য করেন, এ শাসনতন্ত্র তার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, আওয়ামী লীগের খসড়া শাসনতন্ত্র কোনো ফেডারেশনের নয়। এটি একটি কনফেডারেশনের শাসনতন্ত্র। কিন্তু পাকিস্তান তো একটি ফেডারেল রাষ্ট্র। আর কনফেডারেশন গঠিত হয় দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রকে নিয়ে।
তিনি ওই শাসনতন্ত্র সংশোধনের জন্য মুজিবকে অনুরোধ করেন। মুজিব বলেন, তিনি ওই শাসনতন্ত্রের দাঁড়ি, কমা, এমনকি সেমিকোলন পর্যন্ত পরিবর্তন করতে রাজি নন। এরপর ইয়াহিয়া এবং ভুট্টো পশ্চিম পাকিস্তান ফিরে যান। তার পরের ইতিহাস সবাই জানেন। ২৫ মার্চ ১৯৭১, মিলিটারি ক্র্যাকডাউন। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়।
সেজন্যই বলেছিলাম, সাংবিধানিক সংকটের কারণেই পাকিস্তান ভেঙে গেছে। আজ জুলাই সনদ একটি সাংবিধানিক সংকটে পড়েছে। একটি পক্ষ চাচ্ছে, নির্বাচনের আগেই জুলাই সনদকে আইনি ভিত্তি এবং সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হোক। অন্যপক্ষ বলছে, নির্বাচনের পর যে পার্লামেন্ট গঠিত হবে, তারাই সেই বিষয়টি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবে। এখানেই সৃষ্টি হয়েছে গুরুতর সাংবিধানিক সংকট। তাই ড. আলী রীয়াজকে জুলাই সনদ চূড়ান্ত করার জন্য বারবার সময় নিতে হচ্ছে।
কথায় বলে, Better late than never. সংস্কারের নামে কোনো গোঁজামিল দেবেন না। কোনো জগাখিচুড়ি পাকাবেন না। আজ হোক, আর কাল হোক, বা ১০-২০ বছর পরে হোক, এগুলো কিন্তু আদালতে চ্যালেঞ্জন্ড হবে। তাতে দেশ ভয়াবহ অস্থিতিশীলতায় নিক্ষিপ্ত হবে।
মোবায়েদুর রহমান : সিনিয়র সাংবাদিক
