Logo
Logo
×

Advertisement

বাতায়ন

হুন্ডির দুষ্টচক্র ভাঙতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

Advertisement

Icon

ড. বখতিয়ার উদ্দিন

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

দক্ষিণ এশিয়ার আর্থসামাজিক কাঠামোয় অনানুষ্ঠানিকভাবে অর্থ স্থানান্তরের ব্যবস্থা নতুন নয়। বিংশ শতাব্দীর ৫০ ও ৬০-এর দশকেও ভারতীয় উপমহাদেশে আর্থিক লেনদেনের একটি বড় অংশ হুন্ডির মতো অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন হতো। সময়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা বিস্তৃত হয়েছে, ডিজিটাল আর্থিক সেবার প্রসার ঘটেছে এবং আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তর অনেক সহজ হয়েছে। তারপরও হুন্ডি বিলুপ্ত হয়নি। বরং আন্তর্জাতিক অভিবাসন, প্রযুক্তির প্রসার এবং আন্তর্দেশীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এর ধরন ও কার্যপ্রণালি বদলেছে।

বিদেশে কর্মরত অভিবাসী শ্রমিকদের একটি অংশ এখনো দেশে রেমিট্যান্স পাঠাতে হুন্ডির ওপর নির্ভর করেন। এর ফলে শুধু আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না; দেশে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ, বৈদেশিক মুদ্রাবাজার, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং অর্থ পাচার নিয়ন্ত্রণও কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই হুন্ডিকে শুধু অবৈধ অর্থ স্থানান্তরের একটি পদ্ধতি হিসাবে দেখলে সমস্যাটির গভীরতা বোঝা যাবে না। এটি একইসঙ্গে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার কিছু সীমাবদ্ধতা এবং অবৈধভাবে অর্থ বিদেশে নেওয়ার চাহিদারও প্রতিফলন।

হুন্ডি সাধারণত কয়েকটি ধাপে কাজ করে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে সম্পন্ন হয়। বিদেশে কর্মরত একজন শ্রমিক স্বাগতিক দেশে কোনো হুন্ডি অপারেটরের (হুন্ডিওয়ালা) কাছে বৈদেশিক মুদ্রা দেন। এরপর বাংলাদেশে ওই অপারেটরের স্থানীয় এজেন্ট সমপরিমাণ বাংলাদেশি টাকা প্রবাসীর পরিবারের কাছে পৌঁছে দেন। ফলে প্রবাসীর দেওয়া বৈদেশিক মুদ্রা আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রবেশ করে না এবং তা বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যের চলতি হিসাবে রেমিট্যান্স হিসাবে পরিগণিত হয় না।

বাংলাদেশে হুন্ডির মাধ্যমে কত অর্থ স্থানান্তরিত হয়, তার সঠিক হিসাব করা কঠিন। বিভিন্ন গবেষণায় মোট রেমিট্যান্সের ২২ থেকে ৫৬ শতাংশ পর্যন্ত হুন্ডির মাধ্যমে আসতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময়ের অভিজ্ঞতা অবশ্য হুন্ডির ব্যাপকতা সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। ২০২০ সালে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৬৯ শতাংশ কমে গেলেও দেশে আনুষ্ঠানিক রেমিট্যান্স প্রবাহ ১৮.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। একই সময়ে বিশ্বব্যাপী রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রায় ২০ শতাংশ কমেছিল। মহামারির সময়ে অনেক প্রবাসী শ্রমিকের আয় কমে গিয়েছিল। ফলে পরিবার পর্যায়ে রেমিট্যান্স উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সুনির্দিষ্ট কারণ ছিল না। এর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, লকডাউন ও সামাজিক দূরত্বের কারণে হুন্ডির কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ায় অনেক প্রবাসী আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে বাধ্য হয়েছিলেন। অথবা ব্যবসা-বাণিজ্যে ভাটা পড়ার কারণে হুন্ডির চাহিদা কমে গিয়েছিল। মহামারির সময়ে বৈধ পথে রেমিট্যান্সের পরিমাণ বাড়া ইঙ্গিত করে যে, হুন্ডির পরিসংখ্যান ধারণার চেয়ে অনেক বেশি।

তবে হুন্ডির জনপ্রিয়তার পেছনে বাস্তব কিছু কারণ রয়েছে। আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে হুন্ডিতে ভালো বিনিময় হার পাওয়া যায়, অর্থ দ্রুত পৌঁছে যায় এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঝামেলাও কম। প্রত্যন্ত গ্রামেও হুন্ডির নেটওয়ার্ক রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বাড়িতে গিয়ে টাকা পৌঁছে দেওয়ার সুবিধাও পাওয়া যায়। বিপরীতে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অর্থ পাঠাতে সময় লাগা, বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা, পরিচয়পত্র বা অন্যান্য নথির প্রয়োজনীয়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা অনেক প্রবাসীকে নিরুৎসাহিত করতে পারে।

এখানে আস্থার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। হুন্ডি শুধু অর্থ স্থানান্তরের একটি পদ্ধতি নয়; এটি দীর্ঘদিনের সামাজিক ও কমিউনিটিভিত্তিক নেটওয়ার্কের ওপরও প্রতিষ্ঠিত। পরিচিত ব্যক্তি, আত্মীয়স্বজন, একই এলাকার মানুষ কিংবা দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্কের মাধ্যমে এটি পরিচালিত হওয়ায় এর প্রতি অনেকের আস্থা তৈরি হয়েছে। ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যাংকের চেয়ে হুন্ডি অপারেটরকে প্রবাসীরা বেশি সুবিধাজনক মনে করেন।

হুন্ডির সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো, এর মাধ্যমে যে বৈদেশিক মুদ্রা স্থানান্তরিত হয়, তার একটি অংশ আনুষ্ঠানিক রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রতিফলিত হয় না। এর আরও বড় ক্ষতি অর্থ পাচারের সঙ্গে হুন্ডির যোগসূত্রে। বাণিজ্যে মিথ্যা চালান বা ট্রেড মিসইনভয়েসিং, কর ফাঁকি, অবৈধভাবে বৈদেশিক মুদ্রা স্থানান্তর এবং দেশের বাইরে সম্পদ গড়ার ক্ষেত্রে হুন্ডি ব্যবহৃত হতে পারে। একইভাবে দুর্নীতি, মাদক পাচারসহ বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডের অর্থ স্থানান্তরেও এ ধরনের নেটওয়ার্ক ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। ফলে হুন্ডি শুধু আনুষ্ঠানিক রেমিট্যান্স ব্যবস্থার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; এটি বৃহত্তর অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ অর্থনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।

হুন্ডি মোকাবিলায় বিভিন্ন সময়ে সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স বাড়াতে ২ শতাংশ নগদ প্রণোদনা চালু করা হয়। পরে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে কাগজপত্রের প্রয়োজনীয়তা শিথিল করা হয় এবং ২০২২ সালের জানুয়ারিতে প্রণোদনার হার বাড়িয়ে ২.৫ শতাংশ করা হয়। এসব পদক্ষেপ আনুষ্ঠানিক চ্যানেলকে আরও আকর্ষণীয় করতে ভূমিকা রেখেছে।

তবে শুধু নগদ প্রণোদনা দিয়ে হুন্ডির বিস্তার বন্ধ করা সম্ভব নয়। কারণ প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে হুন্ডির ব্যবস্থাও বদলে গেছে। এখন অনেক ক্ষেত্রে এজেন্টরা সরাসরি নগদ অর্থ পৌঁছে দেওয়ার পরিবর্তে মোবাইল ব্যাংকিং কিংবা ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে বাংলাদেশে অর্থ পরিশোধ করেন। অর্থাৎ প্রযুক্তি যেমন আনুষ্ঠানিক রেমিট্যান্স ব্যবস্থাকে সহজ করেছে, তেমনি অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থাকেও আরও দ্রুত, নমনীয় ও বিস্তৃত করেছে। মোবাইলভিত্তিক অর্থ লেনদেনের সুবিধা চালু হওয়ার পর অনেক প্রবাসী শ্রমিক হুন্ডিওয়ালাদের মাধ্যমে তুলনামূলকভাবে ছোট অঙ্কের অর্থ পাঠাতে শুরু করেছেন। এর প্রধান সুবিধা হলো, পারিবারিক বা আকস্মিক প্রয়োজনের সময় খুব দ্রুত দেশে টাকা পাঠানো যায়। অর্থের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে হুন্ডিওয়ালারা প্রবাসী শ্রমিককে বিনাসুদে স্বল্পমেয়াদি ঋণও দিয়ে থাকেন। প্রবাসী শ্রমিক পরে তার সুবিধাজনক সময়ে সেই অর্থ পরিশোধ করেন। ফলে হুন্ডি শুধু অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যম হিসাবে নয়, এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক ঋণসুবিধা হিসাবেও কাজ করছে।

অন্যদিকে, মোবাইলভিত্তিক অর্থ পরিশোধের সুযোগ হুন্ডি নেটওয়ার্কের সরবরাহ সক্ষমতাও বাড়িয়েছে। আগে যেখানে হুন্ডিওয়ালাদের স্থানীয়ভাবে নগদ অর্থ সংগ্রহ ও বিতরণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হতো, এখন মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে দ্রুত ও সহজে অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে হুন্ডি ব্যবসায় নতুন নতুন ব্যক্তি যুক্ত হচ্ছে। এমনকি তুলনামূলকভাবে বেশি আয়ের প্রবাসী শ্রমিকদের একটি অংশও হুন্ডি ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে হুন্ডি নেটওয়ার্কের বিস্তার ঘটছে এবং এর মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের পরিমাণ ও ব্যাপকতা উভয়ই বাড়ছে।

অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানকালে আমি কয়েকজন হুন্ডি এজেন্টের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। তাদের অধিকাংশই ছিলেন বাংলদেশি দোকান মালিক। তাদের বক্তব্য থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে-বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের চাহিদা বাড়লে বিদেশ থেকেও হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর চাহিদা বাড়ে। বাংলাদেশে হুন্ডির চাহিদাকারীদের মধ্যে রয়েছেন বিদেশে পড়াশোনা করতে আগ্রহী শিক্ষার্থী, চিকিৎসার জন্য বিদেশগামী ব্যক্তি, ভ্রমণকারী, বিদেশে সম্পত্তি ক্রয়কারী, ব্যবসায়ী এবং অবৈধভাবে অর্থ পাচারকারীরা। একজন শিক্ষার্থী আমাকে জানিয়েছিলেন, তিনি বাংলাদেশ থেকে একজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের মাধ্যমে তার প্রাথমিক অর্থ অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল অনেকটাই ‘ওপেন সিক্রেট’, এমনকি হুন্ডিওয়ালা তাকে লেনদেনের রসিদও দিয়েছিলেন। অর্থাৎ হুন্ডির সমস্যা শুধু বিদেশে থাকা প্রবাসীদের আচরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। বাংলাদেশে অবৈধভাবে বিদেশে অর্থ পাঠানোর চাহিদাও হুন্ডি ব্যবস্থার অন্যতম চালিকাশক্তি।

এ দিকটি নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যদি শুধু প্রবাসীদের বলি যে তারা হুন্ডি ব্যবহার করবেন না, কিন্তু একই সময়ে দেশের ভেতর থেকে অবৈধভাবে অর্থ বিদেশে পাঠানোর জন্য হুন্ডির চাহিদা অব্যাহত থাকে, তাহলে সমস্যার মূল উৎসটি অক্ষত থেকে যাবে। তাই হুন্ডি মোকাবিলায় সমস্যাটিকে দুদিক থেকে দেখতে হবে। একদিকে প্রবাসীদের জন্য আনুষ্ঠানিক চ্যানেলকে আরও সস্তা, দ্রুত, সহজ ও নিরাপদ করতে হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে অর্থ পাচারের সুযোগ ও চাহিদা কমাতে হবে।

বিদেশে চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা অন্যান্য বৈধ প্রয়োজনে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে অপ্রতুল বৈধ সুযোগও অনেক সময় মানুষকে অনানুষ্ঠানিক পথে যেতে উৎসাহিত করতে পারে। তাই নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বৈধভাবে বিদেশে অর্থ পাঠানোর সুযোগ আরও বাস্তবসম্মত করা যেতে পারে। উদাহরণ হিসাবে, ভারতের আবাসিক ব্যক্তিরা প্রতি অর্থবছরে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বৈধভাবে বিদেশে অর্থ পাঠাতে পারেন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার আলোকে অনুরূপ একটি কাঠামো বিবেচনা করা যেতে পারে। এর ফলে বৈধ প্রয়োজন মেটানোর জন্য মানুষকে অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হবে না এবং একইসঙ্গে বৈধ বৈদেশিক অর্থপ্রবাহও নজরদারির আওতায় রাখা সম্ভব হবে।

উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশি প্রবাসীরা একটা সময়ে তাদের দেশে অবস্থিত বৈধ সম্পত্তি বিক্রি করে বিদেশে নিয়ে যান, বিশেষ করে তারা যখন বিদেশে সম্পদ গড়েন। এ শ্রেণীও অধিকাংশ ক্ষেত্রে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর করেন। বৈধভাবে সম্পত্তি স্থানান্তরের সুযোগ হুন্ডির চাহিদা কমাতে পারে।

একইসঙ্গে নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসনের সুযোগ নিশ্চিত করা এবং অভিবাসন ব্যয় কমানোও জরুরি। একজন শ্রমিক বিদেশে যাওয়ার জন্য যখন বিপুল অর্থ ব্যয় করেন, তখন তার উপার্জন থেকে পরিবারের কাছে পাঠানো প্রতিটি টাকার মূল্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যদি বৈধভাবে রেমিট্যান্স পাঠাতে তুলনামূলকভাবে বেশি খরচ হয় বা কম বিনিময় হার পাওয়া যায়, তাহলে হুন্ডির বাড়তি সুবিধা আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। অধিক অভিবাসন ব্যয় উঠিয়ে আনার জন্য অনেক শ্রমিক ইচ্ছাকৃতভাবে অবৈধ হয়ে যান, কারণ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে একজন বৈধ শ্রমিককে প্রতিবছর আকামা নবায়নের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হয়। আর অবৈধ শ্রমিক ধরা পড়ার ভয়ে কখনো বৈধ পথে অর্থ পাঠান না। তাই অভিবাসন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচও কমাতে হবে।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এখানে আরও সক্রিয় হতে হবে। শুধু শাখা বাড়ালেই হবে না; প্রবাসীদের প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত, সহজ ও ডিজিটাল সেবা দিতে হবে। রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়া যত কম ধাপের এবং স্বচ্ছ হবে, আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও তত বাড়বে। প্রবাসীর পরিবার যাতে দ্রুত ও নিরাপদে অর্থ গ্রহণ করতে পারে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।

হুন্ডি একটি পুরোনো ব্যবস্থা হলেও এর সমস্যা পুরোনো নয়। বরং ডিজিটাল প্রযুক্তি, বৈশ্বিক অভিবাসন এবং আন্তঃদেশীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে এর কার্যক্রম আরও জটিল হয়েছে। তাই এর সমাধানও হতে হবে সমন্বিত। শুধু আইন কঠোর করা কিংবা নগদ প্রণোদনা দেওয়া যথেষ্ট নয়। প্রবাসীদের জন্য আনুষ্ঠানিক রেমিট্যান্সকে আরও আকর্ষণীয় করার পাশাপাশি ব্যাংকিং ব্যবস্থার জটিলতা কমাতে হবে, বৈধভাবে বিদেশে অর্থ পাঠানোর সুযোগ বাড়াতে হবে এবং বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের উৎস ও চাহিদা বন্ধ করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হুন্ডিকে শুধু সরবরাহের দিক থেকে দেখলে হবে না; এর চাহিদার দিকটিও মোকাবিলা করতে হবে। বিদেশে থাকা শ্রমিক কেন হুন্ডি ব্যবহার করছেন, সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বাংলাদেশে কারা এবং কেন অনানুষ্ঠানিকভাবে বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে পাঠাতে চাইছেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ দুই দিকের সমন্বিত মোকাবিলা ছাড়া হুন্ডির দুষ্টচক্র ভাঙা কঠিন।

হুন্ডির দুষ্টচক্র ভাঙতে হলে তাই প্রবাসী শ্রমিককে সমস্যার অংশ হিসাবে নয়, সমাধানের অংশ হিসাবে দেখতে হবে। তাদের জন্য আনুষ্ঠানিক চ্যানেলকে যদি হুন্ডির চেয়ে সস্তা, দ্রুত, সহজ ও নিরাপদ করা যায় এবং একইসঙ্গে দেশের ভেতর থেকে অবৈধ অর্থ পাচারের সুযোগ ও চাহিদা কমানো যায়, তাহলেই হুন্ডির ওপর নির্ভরতা টেকসইভাবে কমানো সম্ভব হবে। তখন শুধু রেমিট্যান্সের আনুষ্ঠানিক প্রবাহই বাড়বে না; দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজার, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক আর্থিক শৃঙ্খলাও আরও শক্তিশালী হবে।

প্রফেসর ড. বখতিয়ার উদ্দিন : বিভাগীয় প্রধান, অর্থনীতি বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ

[email protected]

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

বিশ্বরাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ আনছেন শি জিনপিং

বিশ্বরাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ আনছেন শি জিনপিং

আত্মসমীক্ষার রাজনীতি : ব্যারিস্টার রাজ্জাকের দৃষ্টিতে জামায়াতে ইসলামী

আত্মসমীক্ষার রাজনীতি : ব্যারিস্টার রাজ্জাকের দৃষ্টিতে জামায়াতে ইসলামী

সাক্ষাৎকার মনস্তাত্ত্বিক সংকট থেকে বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা: অধ্যাপক ডা. সাইফুন নাহার

মনস্তাত্ত্বিক সংকট থেকে বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা: অধ্যাপক ডা. সাইফুন নাহার

হুন্ডির দুষ্টচক্র ভাঙতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

হুন্ডির দুষ্টচক্র ভাঙতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম