Logo
Logo
×

Advertisement

বাতায়ন

অভিজ্ঞতার সরকারি ব্যবস্থাপনা

Advertisement

Icon

সিকদার আনোয়ার

প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

অভিজ্ঞতার সরকারি ব্যবস্থাপনা

Advertisement

‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’ এটি সেই যৌবন যাকে বয়সের ফ্রেমে বাঁধা যায় না, পরিমাপ করা যায় না- এটি কবির কথা। সত্যি কথা।

কিন্তু যুদ্ধে সেনাপতির দরকার আছে, যে সেনাপতি শৌর্যে-বীর্যে, শক্তি-সামর্থ্য, সাহসিকতায়, অভিজ্ঞতায়, বুদ্ধিমত্তায় পাকা, সেরা। শক্তি আর উদ্যম যতই থাক, অভিজ্ঞতা আর বুদ্ধিমত্তাহীন যৌবনের ধারককে সেনাপতি করা সঙ্গত হবে না।

অর্থাৎ যুদ্ধে জয় করতে হলে উভয় দিকেই নজর দিতে হবে। যারা পথপ্রদর্শক, নীতিনির্ধারক, পরিকল্পনাকারী, উপদেষ্টা; তাদের অভিজ্ঞতা-বুদ্ধিমত্তা থাকতেই হবে। তা না হলে তীরে তরী ভিড়বে না, কর্মসম্পাদন হবে না, উদ্দেশ্য সাধন হবে না। অর্থাৎ কোনো কাজে সফলতার জন্য নবীন-প্রবীণ, শক্তি-বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা, উদ্যম- সবকিছুরই দরকার আছে।

বয়সের সঙ্গে সঙ্গে অভিজ্ঞতা বাড়ে। তবে সবার অভিজ্ঞতা একই গতিতে, একই দিকে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় না। যাদের ইচ্ছাশক্তি, কর্মস্পৃহা প্রবল, চিন্তাশক্তি তীক্ষ্ণ, পর্যবেক্ষণ ইচ্ছা বেশি, গতিময়তা বেশি, ঝুঁকিগ্রহণ প্রবণতা বেশি, তাদের অভিজ্ঞতা বেশি বা বৈচিত্র্যময় হয়। দেখা গেছে, একই পরিবেশে বা একই কর্মে নিয়োজিত থাকলেও কারও অভিজ্ঞতা বেশি, কারও বা কম। তবে সাধারণ্যে ধারণা, যার বয়স বেশি তার অভিজ্ঞতা বেশি, যা সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

এ অভিজ্ঞদের তথা অভিজ্ঞতার যথাযথ ব্যবহার করা সমাজের বা রাষ্ট্রের জন্য মঙ্গলজনক। ক্রমপুঞ্জীভূত অভিজ্ঞতা একটি অক্ষয়িষ্ণু সম্পদ, উৎপাদনের উপকরণ, উৎকর্ষের ধারক। এর ব্যবহার যতই বাড়বে বা সঠিক ক্ষেত্রে প্রয়োগ হবে, এর ভাণ্ডার ততই সমৃদ্ধি লাভ করবে। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে রাষ্ট্রকে তার সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে হবে, এ ছাড়া গত্যন্তর নেই।

অন্যদিকে এটি অভিজ্ঞদের জন্য সুখকর। তাদের সন্তুষ্টির কারণ হতে পারে, আত্মতৃপ্তির কারণ হতে পারে, প্রাপ্তির সংযোগে মনোবেদনা তিরোহিত হতে পারে, সামাজিক সম্মান অর্জিত হতে পারে। আর অভিজ্ঞতা অর্জনের প্রচেষ্টা দৃঢ়তর হবে, উৎসাহিত হবে।

সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে অন্তর্ভুক্তিকালে, দায়িত্ব প্রদানে বা পদায়নে অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। গুরুত্বপূর্ণ, স্পর্শকাতর জটিল দায়িত্ব প্রদানের আগে দেখা হয় তার অভিজ্ঞতা। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে আবার চাকরির বয়সকে অভিজ্ঞতার বিবেচনায় একটু বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। পদোন্নতির ক্ষেত্রে ফিডার পদে অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট নিুতম পদে নির্ধারিত সময়কাল চাকরি পূরণ না হলে সে কেইস বিবেচনা করা হয় না।

বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে পদায়ন বা পদোন্নতির জন্য কমিটি থাকে অভিজ্ঞতা, কৃতকর্মের মূল্যায়ন / মান বিচার-বিবেচনা করার জন্য। বলার অপেক্ষা রাখে না, কমিটির মাধ্যমে যোগ্যতা মূল্যায়ন বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে একক ব্যক্তির মাধ্যমে মূল্যায়নের চেয়ে ঢের বেশি নির্ভুল, গ্রহণযোগ্য ও যুক্তিসঙ্গত।

একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। আইন, বিধি বা নীতিমালায় উল্লেখ না থাকলেও একটা প্রচলিত পদ্ধতি অনুসারে বহুদিন ধরে প্রশাসনে অতিরিক্ত সচিবদের কম-বেশি ছয় মাসের জন্য ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসাবে পদায়ন করা হতো। এ ক্ষেত্রে কোনো বোর্ড বা কমিটির মাধ্যমে সুপারিশ নেওয়ার ব্যবস্থা ছিল না। ছয় মাস পর সেই কর্মকর্তাকে সচিব হিসাবে পদোন্নতি দেওয়া হতো।

এক্ষেত্রেও কোনো বোর্ড বা কমিটির সুপারিশ নেওয়ার ব্যবস্থা ছিল না। ব্যতিক্রম ছাড়া সবাইকে ভারপ্রাপ্ত সচিব থেকে সচিব হিসাবে পদোন্নতি দেওয়া হতো। অর্থাৎ ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসাবে পদায়ন হলেই ধরে নেওয়া হতো যে, তাকে সচিব হিসাবে পদোন্নতি দেওয়া হবে। বর্তমানে সেই প্রচলিত প্রথার পরিবর্তে কেবিনেট সচিবের সভাপতিত্বে একটি কমিটির সুপারিশের মাধ্যমে ‘সচিব ফিটলিস্ট’ করা হয় এবং সেই তালিকার ওপর ভিত্তি করে অতিরিক্ত সচিব থেকে সচিব হিসাবে পদোন্নতি দেওয়া হয়।

যদিও ডিসি ফিটলিস্টের মতো এখানেও ফিটলিস্টভুক্ত হলেই সচিব হিসাবে পদোন্নতির নিশ্চয়তা নেই। যা হোক, এতে প্রশাসনে এবং সাধারণ্যে একটা আস্থাভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে যে, সচিব পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা, নিয়মনীতি পালিত হচ্ছে এবং যোগ্যরাই সচিব হিসাবে পদোন্নতির বিবেচনায় আসছেন।

সরকারি চাকরি আইন ২০১৮-এর ৪৯ ধারা অনুযায়ী অবসরে যাওয়ার পর সরকার অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি জনস্বার্থে যে কোনো কর্মচারীকে সরকারি চাকরিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে কোন পদে কোন যোগ্যতার প্রয়োজন, কোন পদ্ধতিতে নির্বাচন করা হবে, কোনোভাবে সুপারিশের প্রযোজন আছে কিনা, সার্চ কমিটির মাধ্যমে হবে কিনা- সেসবের কোনো উল্লেখ নেই। বিধি দ্বারা বর্ণিত বিধানমতে করা হবে মর্মেও উল্লেখ নেই। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ক্ষেত্রবিশেষে সংশ্লিষ্ট আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত কোনো কোনো কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা নির্বাচনের ক্ষেত্রে সার্চ কমিটির মাধ্যমে সরকারের কাছে সুপারিশ পেশ করার বিধান রয়েছে।

সরকারি চাকরি আইনে অবসরপ্রাপ্তদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে কর্মকর্তা নির্বাচন করার পদ্ধতি কী? বাংলাদেশের সংবিধানের ১৯(১) অনুচ্ছেদে বিবৃত রয়েছে, ‘সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হবে’ কিংবা ২০(১) অনুচ্ছেদে বর্ণিত আছে, ‘কর্ম হইতেছে কর্মক্ষম প্রত্যেক নাগরিকের পক্ষে অধিকার, কর্তব্য ও সম্মানের বিষয়’ কিংবা অনুচ্ছেদ ২৯(১) মতে, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে।’ সংবিধানের এসব বিধানকে কার্যকর করা অবশ্যকর্তব্য। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ যোগ্যতার মাপকাঠিতে সমতা ও ন্যায়ভিত্তিক হওয়া প্রয়োজন।

সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব বা যে কোনো পদমর্যাদার কর্মকর্তাই হোক না কেন, অবসরের পর তাদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা যথাযথভাবে, পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করে রাষ্ট্র উপকৃত হতে পারে। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা না হলে মেধা বা অভিজ্ঞতার অপচয় ও অপপ্রয়োগ হতে পারে। নিয়মিত চাকরিকালীন কর্মজীবন পরিকল্পনা (ক্যারিয়ার প্ল্যানিং) যেমন সরকার বা কর্তৃপক্ষকে অধিকতর সুফল দিতে পারে, তেমনি এ ক্ষেত্রেও অভিজ্ঞতার পরিপূর্ণ প্রয়োগের নিশ্চয়তা বিধান করতে পারলে সমাজ কিংবা রাষ্ট্র উপকৃত হতে পারে। এ ব্যাপারে একটি প্রস্তাবনা বিবেচনা করা যেতে পারে।

অবসরের নির্ধারিত সময়ের এক মাস আগে কর্মকর্তারা তাদের নিজ নিজ কর্তৃপক্ষের কাছে অবসরের বিষয়ে যে আবেদন দেন, তার সঙ্গে তার জীবনবৃত্তান্ত জমা দেবেন। এ জীবনবৃত্তান্তে তার চাকরি জীবনের বাইরের যাবতীয় অর্জন, প্রাপ্তি, অ্যাওয়ার্ড, কৃতিত্ব, বিশেষ আগ্রহ, পারদর্শিতা- সবকিছুর বর্ণনা থাকবে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সে কর্মকর্তার পিএসিসি থেকে সংগৃহীত পিডিএস এবং প্রদত্ত জীবনবৃত্তান্ত একীভূত করে আগেই ডিজাইন করা ফরমেট অনুযায়ী সম্পূর্ণ জীবনবৃত্তান্ত প্রস্তুত করবে। এ কাজ করার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে নির্ধারিত একটি সেল থাকতে পারে।

অন্যদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব, পিএসসির চেয়ারম্যান, সিএজি, জনপ্রশাসন সচিবকে (সদস্য সচিব) নিয়ে ‘চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সুপারিশ কমিটি’ গঠন করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবকেও অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। যেমন প্রতিযোগিতা কমিশনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগসংক্রান্ত বিষয়ে বাণিজ্য সচিবকে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

সেক্ষেত্রে সব মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্ট চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে হতে পারে এবং সব চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পদগুলোর তালিকা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সংরক্ষণ করবে। পদগুলোর কর্মপরিধি এবং পদ সংশ্লিষ্ট বেতন / সম্মানী ও ভাতাদি নিজ নিজ মন্ত্রণালয় নির্ধারণ করে কমিটি তথা কমিটির সচিবালয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করবে। যথাসময়ে নিয়োগ সম্পন্ন করার লক্ষ্যে পদ / পদগুলো শূন্য হওয়ার ন্যূনতম এক মাস আগে কমিটি কার্যক্রম শুরু করবে।

কমিটি প্রতিটি পদের বিপরীতে দু’জনের নাম প্রস্তাব করবে, যেখান থেকে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়ে একজনকে নিয়োগ দেওয়া হবে। এ প্রক্রিয়া অনুসরণের লক্ষ্যে প্রয়োজনবোধে সরকারের কার্যবিধিমালার তফশিল এক (Allocation of Business among the Different Ministries and Divisions)-এর সংশোধন করা যেতে পারে।

এটি একেবারেই প্রাথমিক প্রস্তাব। এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চূড়ান্ত নীতিমালা করা যেতে পারে। এতে একদিকে মেধা ও অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন হবে, রাষ্ট্র ও সমাজ উপকৃত হবে, অধিকতর জনসেবা নিশ্চিত হবে; অন্যদিকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে।

সিকদার আনোয়ার : কলাম লেখক ও সাবেক সচিব

Advertisement

অভিজ্ঞতা সরকারি ব্যবস্থাপনা

Advertisement

আরও পড়ুন

শহরমুখী জনস্রোত থামানোর নতুন রূপরেখা

শহরমুখী জনস্রোত থামানোর নতুন রূপরেখা

সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কেমন প্রতিরক্ষানীতি চাই

সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কেমন প্রতিরক্ষানীতি চাই

বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের ভূমিকা

বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের ভূমিকা

চল্লিশের পরে মানসিক স্বাস্থ্য এবং এর যত্ন

চল্লিশের পরে মানসিক স্বাস্থ্য এবং এর যত্ন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম