৪১০ কোটি বছর আগের উল্কাপিণ্ড মিলল সাহারা মরুভূমিতে
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৫৬ এএম
সাহারা মরুভূমিতে পাওয়া উল্কাপিণ্ডটির বয়স অন্তত ৪১০ কোটি বছর।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সাহারা মরুভূমিতে পাওয়া একটি উল্কাপিণ্ডের বয়স অন্তত ৪১০ কোটি বছর বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ২০২২ সালে আফ্রিকার দেশ মালির সাহারা অঞ্চলে পাওয়া এই উল্কাপিণ্ডটি মঙ্গলগ্রহের ভূত্বক থেকে এসেছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবীতে শনাক্ত হওয়া মঙ্গলগ্রহের ৪৩৫টি উল্কাপিণ্ডের মধ্যে এটি সম্ভবত সবচেয়ে প্রাচীন।
‘তেঘাজা ০০১’ নামের এই উল্কাপিণ্ডের গঠন ও রাসায়নিক উপাদান বিশ্লেষণ করে মঙ্গলগ্রহের প্রাচীন পরিবেশ সম্পর্কে নতুন তথ্য পেয়েছেন গবেষকেরা। বিশেষ করে, গ্রহটির পৃষ্ঠে একসময় তরল পানির অস্তিত্ব ছিল—এমন ধারণার পক্ষে নতুন প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, প্রাচীন মঙ্গলগ্রহে ক্ষুদ্র জীবের বসবাসের উপযোগী পরিবেশও থাকতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির গ্রহবিজ্ঞানী ইয়াং লিউ বলেন, উল্কাপিণ্ডটি এমন এক সময়ের সাক্ষী, যখন মঙ্গলগ্রহ তার ইতিহাসের অধিকাংশ সময়ের তুলনায় উষ্ণ ও আর্দ্র ছিল।
গবেষকদের ভাষ্য, তেঘাজা ০০১ এক ধরনের মোটা দানার আগ্নেয় শিলা, যার নাম গ্যাব্রো। মঙ্গলগ্রহের ভূগর্ভে ধীরে ধীরে শীতল হয়ে ম্যাগমা জমাট বাঁধার সময় শিলাটির সঙ্গে পানির মিথস্ক্রিয়া হয়েছিল। এটি গ্রহটির ভূত্বকের অংশ হলেও এর উৎপত্তি হয়েছিল আরও গভীরে অবস্থিত ম্যান্টল থেকে আসা গলিত শিলার মাধ্যমে।
বর্তমানে মঙ্গলগ্রহ শীতল, শুষ্ক ও প্রায় প্রাণহীন পরিবেশের একটি গ্রহ। তবে বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া প্রমাণ বলছে, কয়েকশ কোটি বছর আগে সেখানে নদী, হ্রদ এমনকি উত্তর গোলার্ধে একটি মহাসাগরও ছিল।
মালির বির চালি গ্রামের প্রায় ৩৪ কিলোমিটার দূরের মরুভূমি থেকে আটটি খণ্ডে উল্কাপিণ্ডটি উদ্ধার করা হয়। এর সবচেয়ে বড় খণ্ডটি প্রায় একটি মানুষের মুষ্টির সমান। উল্কাপিণ্ডটির প্রধান খনিজ উপাদান ফেল্ডস্পার ও পাইরোক্সিন। এতে ইউরেনিয়ামসমৃদ্ধ জিরকন স্ফটিকও রয়েছে। ইউরেনিয়াম সময়ের সঙ্গে ক্ষয় হয়ে সিসায় পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করে এর বয়স নির্ধারণ করেছেন গবেষকেরা।
গবেষণাটির প্রধান লেখক ইয়াং লিউ বলেন, মঙ্গলগ্রহ থেকে পাওয়া উল্কাপিণ্ডগুলোই এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে থাকা মঙ্গলগ্রহের একমাত্র সরাসরি নমুনা। এসব নমুনা থেকে গ্রহটির প্রাথমিক গঠন ও বিবর্তন সম্পর্কে জানা যায়। একই সঙ্গে প্রাচীন মঙ্গলগ্রহে প্রাণের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ ছিল কি না, তা পরীক্ষাগারে যাচাই করার সুযোগ পাওয়া যায়।
তিনি আরও বলেন, উল্কাপিণ্ডের নমুনা থেকে পাওয়া বিস্তারিত তথ্য মঙ্গলগ্রহে স্যাটেলাইট, ল্যান্ডার ও রোভার পাঠিয়ে পরিচালিত অনুসন্ধানকে আরও সমৃদ্ধ ও যাচাই করতে সহায়তা করে।
গবেষকদের মতে, পৃথিবী ও মঙ্গলগ্রহের প্রাথমিক বিবর্তনের পথ কীভাবে আলাদা হয়ে গেল, সেই বিষয়েও উল্কাপিণ্ডটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে। প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে পৃথিবী, মঙ্গলগ্রহসহ সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহের সৃষ্টি হয়েছিল।
এখন পর্যন্ত মঙ্গলগ্রহের প্রাচীন ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত মাত্র তিনটি উল্কাপিণ্ড শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৮৪ সালে অ্যান্টার্কটিকায় পাওয়া একটি উল্কাপিণ্ডের বয়স প্রথমে প্রায় ৪৫০ কোটি বছর বলে ধারণা করা হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে সেটির বয়সও তেঘাজা ০০১-এর কাছাকাছি বলে জানা গেছে। নতুন গবেষণা অনুযায়ী, দুটি উল্কাপিণ্ডের মধ্যে তেঘাজা ০০১ সম্ভবত বেশি প্রাচীন।
মঙ্গলের ভূগর্ভেও ছিল পানির প্রবাহ
উল্কাপিণ্ডটিতে থাকা অক্সিজেন ও হাইড্রোজেনের বিভিন্ন আইসোটোপ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছেন, মঙ্গলগ্রহের পৃষ্ঠ থেকে পানি ভূগর্ভের গভীর স্তরে প্রবেশ করছিল। পৃথিবীতে যেমন পানি মাটির নিচে প্রবেশ করে গভীরের গলিত শিলার সঙ্গে মিশে যায়, মঙ্গলগ্রহেও তেমন ঘটনা ঘটেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইয়াং লিউ বলেন, তেঘাজা ০০১-এর একাধিক বৈশিষ্ট্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, ৪১০ কোটি বছরেরও আগে মঙ্গলগ্রহের পৃষ্ঠে পানির অস্তিত্ব ছিল। উল্কাপিণ্ডের ফসফেট ও বিভিন্ন খনিজ উপাদানে থাকা হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের আইসোটোপেও এর প্রমাণ পাওয়া গেছে।
প্রাণের অস্তিত্বের জন্য পানি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত। তবে এই আবিষ্কার প্রাচীন মঙ্গলগ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব নিশ্চিত করে না।
গবেষণার সহলেখক এবং নাসার অ্যামস রিসার্চ সেন্টার ও বিএইআর ইনস্টিটিউটের গ্রহবিজ্ঞানী লি স্যাপার বলেন, গবেষণার ফলাফল প্রাচীন মঙ্গলগ্রহে প্রাণের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান ও পরিবেশ থাকার ধারণাকে সমর্থন করে। তবে সেখানে সত্যিই প্রাণের অস্তিত্ব ছিল কি না, সেই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেয় না।
তিনি আরও বলেন, উল্কাপিণ্ডটি মঙ্গলগ্রহের অতীত পরিবেশের একটি নির্দিষ্ট সময়ের চিত্র তুলে ধরে। তখন গ্রহটিতে ঘন বায়ুমণ্ডল ও বেশি পানির উপস্থিতি ছিল, যা প্রাণের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হতে পারত। তবে গ্রহটির অস্তিত্বের প্রথম ১০০ কোটি বছরের মধ্যেই এসব পরিবেশ দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে। একপর্যায়ে মঙ্গলগ্রহ বর্তমানের শুষ্ক ও প্রাণের জন্য প্রতিকূল পরিবেশে রূপ নেয়।
তেঘাজা ০০১-এর রাসায়নিক গঠন অন্য মঙ্গলগ্রহের উল্কাপিণ্ডগুলোর চেয়ে আলাদা। গবেষকদের ধারণা, এটি মঙ্গলগ্রহের দক্ষিণের উচ্চভূমি অঞ্চল থেকে এসেছে। বিশেষ করে গ্রহটির অন্যতম বৃহৎ আঘাতজনিত গর্ত হেলাস বেসিনের কাছাকাছি কোনো এলাকা এর সম্ভাব্য উৎস হতে পারে।
উল্কাপিণ্ডটির পৃথিবীতে আসার ঘটনাও বেশ চমকপ্রদ। ইয়াং লিউ জানান, মঙ্গলগ্রহের পৃষ্ঠে কোনো মহাজাগতিক বস্তুর আঘাতে শিলাটি মহাশূন্যে ছিটকে পড়ে। এরপর দীর্ঘ সময় মহাশূন্যে ভেসে থাকার পর এর গতিপথ পৃথিবীর সঙ্গে মিলে যায়। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় এটি উল্কায় পরিণত হয় এবং শেষ পর্যন্ত সাহারা মরুভূমিতে পড়ে উল্কাপিণ্ড হিসেবে টিকে থাকে।
তবে ঠিক কখন এটি পৃথিবীতে এসে পড়েছিল, তা এখনো জানা যায়নি।

-6ae731e3b7552.jpg)