নক্ষত্রের মৃত্যুর পর জন্ম নিতে পারে নতুন গ্রহ, বলছেন বিজ্ঞানীরা
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩৪ পিএম
মৃত একটি নক্ষত্রের ধ্বংসাবশেষ থেকে নতুন গ্রহ তৈরি হয়ে থাকতে পারে—দাবি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মৃত একটি নক্ষত্রের ধ্বংসাবশেষ থেকে নতুন গ্রহ তৈরি হয়ে থাকতে পারে—এমন সম্ভাবনার প্রথম শক্তিশালী প্রমাণ পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। তাদের ধারণা, পৃথিবী থেকে প্রায় ২৭০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত একটি শ্বেত বামন নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে গঠিত হয়েছে এই সম্ভাব্য গ্রহ।
গবেষণাটি সম্প্রতি নেচার অ্যাস্ট্রোনমি সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের মতে, গ্রহটি একটি গ্যাসীয় দৈত্য হতে পারে এবং এটি ‘এইচএস ০২০৯+০৮৩২’ নামের একটি শ্বেত বামন নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে।
গ্রহটির সন্ধানে বিজ্ঞানীরা হাবল মহাকাশ দূরবিনসহ বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করেন। পর্যবেক্ষণে তারা নক্ষত্রটির পৃষ্ঠে কিছু অস্বাভাবিক ভারী মৌলের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। এসব মৌল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, নক্ষত্রটির মৃত্যুর সময় ছড়িয়ে পড়া পদার্থ থেকেই নতুন গ্রহটির জন্ম হয়ে থাকতে পারে।
সাধারণভাবে সূর্যের মতো কোনো নক্ষত্রের জীবনাবসানের সময় সেটি প্রথমে ফুলে-ফেঁপে লাল দানবে পরিণত হয়। পরে এর বাইরের স্তরগুলো মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষে অবশিষ্ট থাকে অত্যন্ত ঘন ও উত্তপ্ত একটি কেন্দ্র, যাকে শ্বেত বামন বলা হয়।
এর আগে বিজ্ঞানীরা শ্বেত বামনের চারপাশে এমন কিছু গ্রহের সন্ধান পেয়েছেন, যেগুলো নক্ষত্রের মৃত্যুর পরও টিকে ছিল। এসব গ্রহকে ‘প্রথম প্রজন্মের গ্রহ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে মৃত নক্ষত্রের ধ্বংসাবশেষ থেকে গঠিত ‘দ্বিতীয় প্রজন্মের গ্রহ’-এর সম্ভাব্য প্রমাণ এবারই প্রথম পাওয়া গেল বলে দাবি গবেষকদের।
গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হলো শ্বেত বামনের পৃষ্ঠে শনাক্ত হওয়া ‘নিওবিয়াম’ নামের একটি ভারী মৌল। ইংল্যান্ডের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও গবেষণার প্রধান লেখক জেমি উইলিয়ামস বলেন, এর আগে কোনো শ্বেত বামনের পৃষ্ঠে এই মৌল পাওয়া যায়নি। তার মতে, এটি নক্ষত্রটির মৃত্যুর সময় সৃষ্টি হওয়া পদার্থ থেকে নতুন গ্রহ গঠনের ইঙ্গিত দিতে পারে।
বিজ্ঞানীরা জানান, সাধারণত ভারী মৌল শ্বেত বামনের ভেতরের দিকে দ্রুত নেমে যায়। ফলে এর বাইরের স্তরে প্রধানত হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের মতো হালকা মৌল থাকার কথা। তাই সেখানে ভারী মৌলের উপস্থিতি বাইরের কোনো উৎস থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গবেষকদের মতে, শ্বেত বামনটি অত্যন্ত উত্তপ্ত হওয়ায় এটি শক্তিশালী অতিবেগুনি বিকিরণ ছড়ায়। এই বিকিরণের কারণে কাছাকাছি কোনো গ্রহের বায়ুমণ্ডল ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে তার উপাদান নক্ষত্রটির পৃষ্ঠে জমা হতে পারে।
এদিকে নাসার ট্রানজিটিং এক্সোপ্ল্যানেট সার্ভে স্যাটেলাইট (টেস) থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করেও গুরুত্বপূর্ণ একটি সংকেত পেয়েছেন গবেষকরা। তারা দেখতে পেয়েছেন, প্রতি ৪ দশমিক ৪ দিন পরপর নক্ষত্রটির উজ্জ্বলতায় সামান্য পরিবর্তন ঘটছে। তাদের ধারণা, নক্ষত্রটিকে প্রদক্ষিণকারী একটি বিশাল গ্রহের কারণেই এই পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
তবে গবেষকরা এখনই এটিকে নিশ্চিত গ্রহ হিসেবে ঘোষণা করতে রাজি নন। জেমি উইলিয়ামসের ভাষায়, এটি আপাতত একটি ‘গ্রহ-প্রার্থী’। আরও পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের পরই এর অস্তিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
দ্বিতীয় প্রজন্মের গ্রহের ধারণা
মৃত নক্ষত্রকে ঘিরে নতুন গ্রহ তৈরির ধারণা একেবারে নতুন নয়। এর আগে পালসার নামে পরিচিত দ্রুত ঘূর্ণনশীল মৃত নক্ষত্রের চারপাশেও গ্রহের অস্তিত্ব শনাক্ত করা হয়েছে। যেহেতু পালসার তৈরির সময় বিশাল বিস্ফোরণে পুরোনো গ্রহগুলো ধ্বংস হওয়ার কথা, তাই সেসব গ্রহকে দ্বিতীয় প্রজন্মের বলে মনে করা হয়।
তবে শ্বেত বামন সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে তৈরি হয় না। লাল দানব থেকে শ্বেত বামনে রূপান্তরের সময় এর চারপাশে বিপুল পরিমাণ গ্যাস, ধূলিকণা ও ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এসব উপাদান পরবর্তীতে একত্রিত হয়ে নতুন গ্রহ গঠন করতে পারে।
গবেষক ডেভিড জে. উইলসনের মতে, কোনো কোনো পুরোনো গ্রহ নক্ষত্রের এই রূপান্তর প্রক্রিয়া থেকে বেঁচে যেতে পারে, আবার কিছু গ্রহ ধ্বংস হয়ে নতুন উপাদান সরবরাহ করতে পারে। সেই সঙ্গে নক্ষত্র থেকে ছিটকে আসা গ্যাস ও ধূলিকণাও নতুন গ্রহ তৈরির উপাদান হিসেবে কাজ করতে পারে।
তবে গ্রহটি ঠিক কীভাবে তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত নন গবেষকরা। তাদের একটি ধারণা হলো, নক্ষত্রটির সঙ্গে অন্য কোনো ছোট নক্ষত্র বা বাদামি বামনের মিথস্ক্রিয়ার ফলে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে থাকতে পারে।
গবেষকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী এক বছরে হাবল মহাকাশ দূরবিন ও নাসার চন্দ্র এক্স-রে মানমন্দিরের সাহায্যে এই নক্ষত্রব্যবস্থা আরও বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। পাশাপাশি জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবিন ব্যবহার করে গ্রহটির অস্তিত্ব ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আরও নির্ভুল তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হবে।
যদি শেষ পর্যন্ত গ্রহটির অস্তিত্ব নিশ্চিত হয়, তবে এটি হবে শ্বেত বামনের ধ্বংসাবশেষ থেকে জন্ম নেওয়া প্রথম পরিচিত দ্বিতীয় প্রজন্মের গ্রহ। একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যতে আমাদের সৌরজগতের পরিণতি সম্পর্কেও নতুন ধারণা দিতে পারে। কারণ কয়েকশ কোটি বছর পর সূর্যও একসময় শ্বেত বামনে পরিণত হবে।
সূত্র: সিএনএন

-6ac281ca39bac.jpg)