Logo
Logo
×

Advertisement

দৃষ্টিপাত

অনিশ্চিত গন্তব্যের পথে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, মিলছে না কোনো সমীকরণ

Advertisement

মো. মুখলেছুর রহমান

মো. মুখলেছুর রহমান

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৮ পিএম

অনিশ্চিত গন্তব্যের পথে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, মিলছে না কোনো সমীকরণ

Advertisement

মধ্যপ্রাচ্যে এমন এক যুদ্ধের সূচনা হয়েছে, ইতিহাসে যার নজির মেলা বেশ কঠিন।এটি শুধু আরব-ইসরাইল সংঘাত, ইরান-ইসরাইল উত্তেজনা বা যুদ্ধ কিংবা ফিলিস্তিন প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি এমন একটি বহুমাত্রিক ভূরাজনৈতিক সংঘর্ষ, যেখানে সামরিক শক্তি, প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তৎপরতা, সাইবার যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অবরোধ, কূটনৈতিক চাপ এবং তথ্যযুদ্ধ একই সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে অতি সূক্ষ্মভাবে, সুকৌশলে এবং সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে। 

ফলে যুদ্ধের প্রচলিত সংজ্ঞা, কৌশল ও ফলাফল—সবকিছুই নতুনভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা মূলত এই ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল যে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘের কাঠামো বৃহৎ যুদ্ধ প্রতিরোধ করবে। কিন্তু গত দুই দশকের অভিজ্ঞতা একেবারেই ভিন্ন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। 

ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেন, গাজা, লেবানন এবং ইরানকে ঘিরে ধারাবাহিক সংকট প্রমাণ করেছে যে সামরিক শক্তির ব্যবহার কমেনি; বরং তা আরও সূক্ষ্ম, জটিল, অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এবং বহুস্তরীয় হয়ে উঠেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে যুদ্ধের কোনো নির্দিষ্ট শুরু বা শেষ নেই। যুদ্ধ কখনো ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে শুরু হচ্ছে, আবার কখনো একটি সাইবার আক্রমণ, ড্রোন অভিযান, লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড কিংবা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা নতুন সংঘাতের সূচনা করছে। 

যুদ্ধক্ষেত্র এখন শুধু সীমান্ত নয়; মহাকাশের স্যাটেলাইট, ইন্টারনেট অবকাঠামো, জ্বালানি স্থাপনা, সমুদ্রপথ এবং এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও যুদ্ধের অংশ হয়ে উঠেছে।

ইসরাইল, ইরান, বিভিন্ন ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী, লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন, ইরাক ও সিরিয়ার বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী—প্রত্যেকে নিজস্ব কৌশল, সক্ষমতা ও লক্ষ্য নিয়ে সক্রিয়। 

একই সময়ে রাশিয়া, চীন এবং ইউরোপীয় শক্তিগুলোও পরোক্ষভাবে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও ক্ষমতার ভারসাম্যে প্রভাব বিস্তার করছে। আর যুক্তরাষ্ট্র তো অনেকটা প্রত্যক্ষভাবেই এ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। এটি এখন আর স্থানীয় সংঘর্ষ নয় বরং আঞ্চলিক, এমনকি বৈশ্বিক সংকটে রূপ পরিগ্রহণ করেছে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মত দিয়েছেন।

আজকের যুদ্ধে ট্যাংক ও যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর লক্ষ্য নির্ধারণ ব্যবস্থা, সাইবার সক্ষমতা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং তথ্য নিয়ন্ত্রণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও বা বিভ্রান্তিকর তথ্য কখনো কখনো যুদ্ধক্ষেত্রের একটি সামরিক অভিযানের সমান প্রভাব ফেলতে পারে। জনমতও এখন যুদ্ধের একটি কৌশলগত ক্ষেত্র।

এদিকে বৈশ্বিক অর্থনীতিও এই সংঘাতের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাবে অনেকটা বিপর্যস্ত। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি উৎপাদনকারী অঞ্চল। 

এই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে তেলের দাম, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, বীমা ব্যয়, সরবরাহব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য—সবকিছুই প্রভাবিত হয়। হরমুজ প্রণালি কিংবা লোহিত সাগরের নৌপথে সামান্য উত্তেজনাও আন্তর্জাতিক বাজারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।

সবচেয়ে করুণ বাস্তবতা হলো মানবিক বিপর্যয়। যুদ্ধের প্রতিটি পর্যায়ে সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ। শিশু, নারী, বয়স্ক, রোগী এবং উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠী দীর্ঘমেয়াদি সংকটের শিকার হচ্ছে। ধ্বংস হচ্ছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির ভিত্তি। যুদ্ধ শেষ হলেও এই ক্ষত বহু প্রজন্মকে বহন করতে হয়।

এই বাস্তবতা আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—বিশ্ব কি এমন এক যুগে প্রবেশ করেছে, যেখানে যুদ্ধ আর কোনো সুস্পষ্ট বিজয়-পরাজয়ের মাধ্যমে শেষ হবে না? বরং দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা, প্রক্সি সংঘাত, প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং অর্থনৈতিক চাপই কি নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার স্থায়ী বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠবে?

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকটের দিকে তাকালে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট—পুরোনো সামরিক তত্ত্ব, কূটনৈতিক ধারণা কিংবা ক্ষমতার প্রচলিত ভারসাম্য দিয়ে আর এই অঞ্চলের বাস্তবতা ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এখানে প্রতিটি সংঘর্ষের পেছনে রয়েছে বহুস্তরীয় স্বার্থ, জ্বালানি রাজনীতি, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা, নিরাপত্তা উদ্বেগ, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক শক্তির কৌশলগত হিসাব।

এই কারণেই বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্য আজ শুধু একটি যুদ্ধক্ষেত্র নয়; এটি ভবিষ্যতের যুদ্ধের পরীক্ষাগার। এখানে যে কৌশল, প্রযুক্তি ও রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম হচ্ছে, তা আগামী দশকগুলোতে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ককেও গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

অতএব, শান্তির প্রশ্নটি আর কেবল একটি অঞ্চলের সমস্যা নয়; এটি সমগ্র মানবসভ্যতার ভবিষ্যতের প্রশ্ন। যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণে ব্যর্থ হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্বাভাবিক ও নজিরবিহীন যুদ্ধ দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক অস্থিরতার অন্যতম প্রধান উৎস হয়ে থাকবে। 

তখন সত্যিই মনে হবে—এই যুদ্ধের কোনো সহজ সমীকরণ নেই; নেই সহজ কোনো সমাধানও।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তক, শিক্ষাবিদ ও মানবাধিকার কর্মী

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

২০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির প্রতিশ্রুতি নিয়ে ইরানে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী

২০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির প্রতিশ্রুতি নিয়ে ইরানে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল কি আবারও ইরানে হামলা চালাবে, নাকি শুধুই হুমকি?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল কি আবারও ইরানে হামলা চালাবে, নাকি শুধুই হুমকি?

নতুন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান

নতুন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান

ইরানে হামলা স্থগিতের ঘোষণা ট্রাম্পের

ইরানে হামলা স্থগিতের ঘোষণা ট্রাম্পের

যুক্তরাষ্ট্রকে যে কঠোর হুঁশিয়ারি দিলেন ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী

যুক্তরাষ্ট্রকে যে কঠোর হুঁশিয়ারি দিলেন ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী

ইরানের সঙ্গে সীমান্ত বাণিজ্য বন্ধ করল পাকিস্তান, বড় সংকটের আভাস

ইরানের সঙ্গে সীমান্ত বাণিজ্য বন্ধ করল পাকিস্তান, বড় সংকটের আভাস

আরও পড়ুন

চীনারা কি বাংলাদেশকে অনলাইন স্ক্যাম নেটওয়ার্কের নতুন ঘাঁটি বানাচ্ছে?

চীনারা কি বাংলাদেশকে অনলাইন স্ক্যাম নেটওয়ার্কের নতুন ঘাঁটি বানাচ্ছে?

ইরানের মিত্র নাকি নিজস্ব স্বার্থে চলে হুথিরা

ইরানের মিত্র নাকি নিজস্ব স্বার্থে চলে হুথিরা

ড. ইউনূসকে হেনস্তা করে কী অর্জন করল আওয়ামী লীগ?

ড. ইউনূসকে হেনস্তা করে কী অর্জন করল আওয়ামী লীগ?

অন্যমত স্থবির শেয়ারবাজারকে টেনে তুলতে যা প্রয়োজন

স্থবির শেয়ারবাজারকে টেনে তুলতে যা প্রয়োজন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম