বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পারেন প্রবাসীরা
Advertisement
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩৪ পিএম
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রবাসী, এই একটি শব্দের ভেতর লুকিয়ে আছে ত্যাগ, সংগ্রাম, স্বপ্ন আর গভীর দেশপ্রেম। যারা জন্মভূমি থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে গিয়ে হাড়ভাঙা পরিশ্রমে নিজের জীবন গড়ে তোলে, তারা কেবল নিজের পরিবারের মুখে হাসি ফোটায় না; একই সঙ্গে তারা নিজ দেশের অর্থনীতির ভিতকে শক্ত করে। বাংলাদেশের অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, গ্রামীণ উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতায় প্রবাসীদের অবদান অনস্বীকার্য। অথচ এই বিশাল শক্তিকে আমরা এখনো পূর্ণমাত্রায় পরিকল্পিত উন্নয়নের ধারায় যুক্ত করতে পারিনি।
প্রবাসীরা মূলত একেকজন নীরব দেশপ্রেমিক। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বা রাজনৈতিক ক্ষমতা ছাড়াই তারা দেশের জন্য কাজ করে যায়। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখে, দারিদ্র্য কমাতে সহায়তা করে, শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ায় এবং গ্রামবাংলার জীবনযাত্রার মানে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে; কিন্তু প্রবাসীদের ভূমিকা কেবল অর্থনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি ও কাঠামোর মাধ্যমে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেশের রাজনৈতিক সচেতনতা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, কৃষি উন্নয়ন এবং অবকাঠামোগত অগ্রগতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশের মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্য সমস্যা অন্যতম। চিকিৎসার অভাবে, ভুল চিকিৎসায় কিংবা উন্নত সেবা না পাওয়ার কারণে প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ অকাল মৃত্যুর শিকার হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য বিপুলসংখ্যক মানুষ ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর বা ইউরোপে চিকিৎসা নিতে যায়। এর ফলে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়, অন্যদিকে দেশের স্বাস্থ্য খাত কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত থাকে। এ বাস্তবতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—দেশে আন্তর্জাতিক মানের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠা করা এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি সময়ের দাবি।
আন্তর্জাতিক মানের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল, আধুনিক যন্ত্রপাতি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। এ জায়গাটিতেই প্রবাসীরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। বিশ্বের উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হওয়ার সুবাদে প্রবাসীদের অভিজ্ঞতা, নেটওয়ার্ক ও পুঁজির সমন্বয় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম। প্রবাসীরা চাইলে দেশের ভেতরে আন্তর্জাতিক মানের দেশি বা বিদেশি অংশীদারিত্বে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করতে পারে, যেখানে সেবা ও মানবিকতা হবে মূল দর্শন।
ধরা যাক, একটি আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করতে ১০০০ কোটি টাকা প্রয়োজন। এককভাবে এটি হয়তো অসম্ভব মনে হতে পারে, কিন্তু প্রবাসীরা যদি একটি সমিতি, ট্রাস্ট বা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান গঠন করে ১০০০ বা তার বেশি শেয়ার ইস্যু করে, তাহলে এ ‘অসম্ভব’ কাজটিই হয়ে উঠতে পারে সহজ ও বাস্তবসম্মত। প্রতিটি শেয়ারধারী হবে এ উদ্যোগের অংশীদার—আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি মানবিক সেবার অংশীদারও। এটি হবে এমন এক বিনিয়োগ, যেখানে মুনাফা ও মানবিকতা একে অপরের বিরোধী নয়, বরং পরিপূরক।
এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে দেশে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে একাধিক ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব। প্রথমত, দেশের মানুষ বিদেশে না গিয়ে দেশে চিকিৎসা করাতে পারবে, ফলে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে। দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্য পর্যটনের বিকাশ ঘটবে—বিদেশি রোগীরা বাংলাদেশে এসে চিকিৎসা নেবে, যা নতুন করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ খুলে দেবে। তৃতীয়ত, দেশের চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সর্বোপরি, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানে একটি দৃশ্যমান ও টেকসই পরিবর্তন আসবে।
প্রবাসীদের এই উদ্যোগ কেবল স্বাস্থ্য খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। একটি সফল মডেল হিসেবে এটি কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, মেডিকেল শিক্ষা, গবেষণা, ওষুধ শিল্প এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রেও প্রেরণা জোগাতে পারে। রাষ্ট্র যদি নীতিগত সহায়তা, স্বচ্ছতা ও প্রণোদনার মাধ্যমে এ উদ্যোগকে সমর্থন করে, তাহলে প্রবাসী-নির্ভর উন্নয়ন একটি শক্তিশালী জাতীয় কৌশলে পরিণত হতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, উন্নয়ন কেবল ইট-পাথরের অবকাঠামো নয়; উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনকে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও মানবিক করা। প্রবাসীরা সেই মানবিক উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী চালিকাশক্তি হতে পারে। দরকার শুধু মানবিক উদ্যোগ, সমবেত চিন্তা এবং দেশপ্রেমকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার সাহস। সৃষ্টি হোক মানবিক মানুষ, তৈরি হোক মানবিক উদ্যোগ—এই প্রত্যাশাই হোক আমাদের আগামীর পথচলার প্রেরণা।
লেখক: মহাসচিব, অল ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন

