Logo
Logo
×

Advertisement

দৃষ্টিপাত

প্রস্তাবিত সাইবার সিকিউরিটি আইন ২০২৬: অরওয়েলীয় ডিস্টোপিয়ার হাতছানি?

Advertisement

Icon

তাহমিদ জামান

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৩ পিএম

প্রস্তাবিত সাইবার সিকিউরিটি আইন ২০২৬: অরওয়েলীয় ডিস্টোপিয়ার হাতছানি?

ফাইল ছবি

Advertisement

জর্জ অরওয়েলের কালজয়ী উপন্যাস ১৯৮৪-এর পটভূমি যারা স্মরণ করতে পারেন, তারা জানেন একটি সর্বগ্রাসী রাষ্ট্র ব্যবস্থা কীভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নাগরিকদের চলাচল, কথা বলা এমনকি স্বাধীন চিন্তা করার অধিকারকেও নিয়ন্ত্রণ করে। উপন্যাসে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা রাষ্ট্র নাগরিককে একদম নিষ্পেষিত করে ফেলেছিল—যেখানে ব্যক্তির কোনো স্বাধীন ইচ্ছা বা ভিন্নমতের সুযোগ ছিল না। প্রস্তাবিত 'সাইবার সিকিউরিটি আইন (সংশোধন) ২০২৬'-এর আলোচিত বেশ কিছু ধারা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে ঠিক একই ধরনের অরওয়েলীয় শঙ্কা জেগে ওঠে। আইনটি নাগরিককে ডিজিটাল নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে এক ধরনের অদৃশ্যের নজরদারি ও ভয়ের সংস্কৃতির মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

অরওয়েলের উপন্যাসের তিনটি মৌলিক ধারণার আলোকে প্রস্তাবিত এই আইনের বিপজ্জনক দিকগুলো পর্যালোচনা করা যাক:

'বিগ ব্রাদার ইজ ওয়াচিং ইউ' এবং সর্বব্যাপী নজরদারি

অরওয়েলীয় ওশেনিয়া রাষ্ট্রে 'বিগ ব্রাদার' নামের এক অদৃশ্য শাসক, বিশাল আকৃতির ছবি এবং "Big Brother is Watching You" লেখা পোস্টারের মাধ্যমে পুরো শহরে তার উপস্থিতি ও ভয় টিকিয়ে রাখা হয়। প্রস্তাবিত সাইবার সিকিউরিটি আইনে 'সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল' গঠনের মাধ্যমে যে অবাধ ও সর্বাত্মক ডিজিটাল নজরদারির (Surveillance) ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে, তা আধুনিক যুগে রাষ্ট্রীয় নজরদারির সেই 'বিগ ব্রাদার' রূপকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।

কাউন্সিলের প্রধান বা নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গের হাতে যদি নাগরিকদের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট, ইন্টারনেট ব্রাউজিং, ব্যক্তিগত বার্তা কিংবা সোশ্যাল মিডিয়া কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা থাকে, তবে তা সংবিধানপ্রদত্ত ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারকে (Right to Privacy) চরম হুমকির মুখে ফেলবে। নিরাপত্তার অজুহাতে প্রতিটি নাগরিককে সম্ভাব্য অপরাধী হিসেবে দেখার এই মানসিকতা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।

সংজ্ঞার অস্পষ্টতা, 'নিউস্পিক' এবং ভিন্নমতের ভাষা সংকোচন

১৯৮৪ উপন্যাসে রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ছিল 'নিউস্পিক' নামক এক সংকুচিত ভাষা তৈরি করা। যার মূল উদ্দেশ্যই ছিল মানুষের শব্দভাণ্ডারকে এতটাই সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত করে ফেলা, যেন সরকারের নীতি বা কাজের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পাওয়া না যায়।

প্রস্তাবিত আইনের ২৬ক ধারায় 'গুজব ও অপতথ্য' ছড়ানোকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও, কোনটি 'অপতথ্য' কিংবা কোনটি 'গুজব'—তার কোনো নির্দিষ্ট, সর্বজনগ্রাহ্য ও বস্তুনিষ্ঠ আইনি সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি। তার ওপর বুলিং, মানহানি বা হেয়প্রতিপন্ন করার অপরাধগুলোকে নারী ও শিশু সুরক্ষার মতো সংবেদনশীল ধারার সাথে একীভূত করার কৌশল দেখা যাচ্ছে। ফলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই অস্পষ্ট ধারার অপব্যবহার ঘটিয়ে যে কোনো সুনির্দিষ্ট সমালোচনা, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কিংবা স্বাধীন মতামতকে 'অপতথ্য' হিসেবে চিহ্নিত করার পথ উন্মুক্ত থাকে। ক্ষমতাশালীরা যখন স্বকীয় বিবেচনায় ঠিক করবেন কোনটা সত্য আর কোনটা অপতথ্য, তখন স্বাধীন চিন্তার পরিসর 'নিউস্পিক'-এর মতোই সংকুচিত হতে বাধ্য।

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার-লাইক এবং 'থটক্রাইম'

অরওয়েলের রাষ্ট্রে শাসকের চিন্তার বাইরে গিয়ে ভিন্ন কিছু ভাবাও ছিল সবচেয়ে বড় অপরাধ, যাকে বলা হতো 'থটক্রাইম' (Thoughtcrime)।

প্রস্তাবিত আইনের ২৭ ধারায় ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি বা শেয়ার করাকে সরাসরি ফৌজদারি অপরাধের আওতায় আনার যে বিধান রাখা হয়েছে, তা সাংবাদিক, লেখক, গবেষক এবং সাধারণ নেটিজেনদের এক অভূতপূর্ব ঝুঁকির মুখে ফেলছে। বর্তমান যুগে একজন নাগরিক কোনো সংবাদ, বিশ্লেষণ বা সমালোচনামূলক লেখা শেয়ার করার মাধ্যমে মূলত নিজের মতামত বা চিন্তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটান। একটি ফেসবুক পোস্ট শেয়ার বা লাইক করাকে কেন্দ্র করে যদি কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা যায়, তবে তা ডিজিটাল যুগে নাগরিকদের স্বাধীন চিন্তা প্রকাশের পথ রুদ্ধ করে দেবে।

নাগরিক সুরক্ষা বনাম রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ

ডিজিটাল যুগে অর্থনৈতিক লেনদেন, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং সাইবার অপরাধ বা হ্যাকিং প্রতিরোধের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর সাইবার নিরাপত্তা আইনের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কিন্তু নিরাপত্তার মোড়কে যদি নাগরিকদের স্বাভাবিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারকে ক্ষুণ্ন করা হয়, তবে আইনটি তার মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে।

অতীতে 'ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন' (DSA) এবং পরবর্তীকালে 'সাইবার সিকিউরিটি আইন' (CSA)-এর যেসব বিতর্কিত ধারা মুক্তচিন্তা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও ভিন্নমত দমনে ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগ উঠেছিল, সংশোধিত আইনেও যদি সেই ধারাগুলো ভিন্ন নামে বা আরও কঠোর রূপে ফিরে আসে, তবে তা হবে অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

উপসংহার

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনি কাঠামোর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নাগরিককে সুরক্ষা দেওয়া, রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বারা নাগরিককে তটস্থ বা চুপ করিয়ে রাখা নয়। অরওয়েলীয় ডিস্টোপিয়ার মতো ভয় দেখিয়ে নাগরিকদের নিরব করে দেওয়ার নীতি কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজের পরিচয় হতে পারে না। প্রস্তাবিত 'সাইবার সিকিউরিটি আইন (সংশোধন) ২০২৬'-কে কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য করতে হলে এর বিতর্কিত ও সংকুচিত ধারাগুলোকে বাদ দিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মুক্তচিন্তার মানদণ্ডের সাথে সঙ্গতি রেখে পুনঃপর্যালোচনা করা জরুরি।

তাহমিদ জামান

মানবাধিকার কর্মী

ই-মেইলঃ [email protected]

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম