লোহা নয়, প্রযুক্তি ও মেধা কিনতে হবে
Advertisement
মো. আব্দুর রাজ্জাক
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২১ এএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাতের কুয়াশা কাটিয়ে বঙ্গোপসাগরের নোনা জলে যখন ইস্পাতের বিশাল শরীরটি ভেসে ওঠে, ঠিক তখনই চট্টগ্রাম বন্দরের ক্রেনগুলোর যান্ত্রিক গর্জনের মধ্যেই রাষ্ট্রীয় অর্জনের ঘোষণা শোনা যায়। নতুন জাহাজ এসেছে, নতুন প্রকল্প হয়েছে, নতুন যন্ত্রপাতি এসেছে— নথিপত্রে সাফল্যের তালিকা দীর্ঘ হয়। উদ্বোধন হয়, ফিতা কাটা হয়, সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়।
কিন্তু উন্নয়নের প্রকৃত হিসাব কি সেখানে শেষ হয়ে যায়?
একটি জাহাজ কেনা হলো— তার সঙ্গে কি জাহাজ নির্মাণের প্রযুক্তি এলো?
একটি উড়োজাহাজ কেনা হলো— তার সঙ্গে কি অ্যাভিয়েশন ইঞ্জিনিয়ার তৈরির ব্যবস্থা হলো?
একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হলো— তার সঙ্গে কি দেশীয় প্রকৌশলীদের এমন সক্ষমতা তৈরি হলো যে পরবর্তী প্রকল্পের নকশা, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন তারা নিজেরাই করতে পারবেন?
একটি হাসপাতাল নির্মিত হলো—তার সঙ্গে কি মেডিকেল ডিভাইস, বায়োমেডিকেল গবেষণা ও ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হলো?
এই প্রশ্নগুলোই এখন বাংলাদেশের উন্নয়ন-চিন্তার কেন্দ্রে থাকা উচিত।
উন্নয়নের প্রথম যুগে অবকাঠামো প্রয়োজন।
দ্বিতীয় যুগে অবকাঠামোর সঙ্গে উৎপাদন সক্ষমতা প্রয়োজন।
আর তৃতীয় যুগে প্রয়োজন—জ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা, মেধা ও উদ্ভাবনের ওপর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ।
বাংলাদেশ এখন এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শুধু রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, জাহাজ, বিমান, যন্ত্রপাতি কিংবা ভবন কিনে উন্নত দেশের সমপর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব নয়। আমাদের প্রশ্ন বদলাতে হবে—
‘আমরা কী কিনছি?’—এই প্রশ্নের পাশাপাশি ‘কেনার বিনিময়ে আমরা কী শিখছি, কী তৈরি করছি এবং আগামী ১০ বছরে কী নিজেরা উৎপাদন করতে পারব?’—এই প্রশ্ন করতে হবে।
ক্রয় নয়, সক্ষমতা অর্জন
বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলোর ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাদের কেউ-ই একদিনে সব প্রযুক্তি নিজেরা আবিষ্কার করেনি। বরং তারা বিভিন্ন সময় বিদেশ থেকে প্রযুক্তি, মেশিন, পেটেন্ট, লাইসেন্স, দক্ষতা ও জ্ঞান গ্রহণ করেছে। কিন্তু পার্থক্যটি ছিল— তারা আমদানিকে শেষ গন্তব্য হিসেবে নেয়নি; আমদানিকে নিজেদের সক্ষমতা তৈরির সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেছে।
জাপানের শিল্পায়নের ইতিহাস তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো আমেরিকা ও ইউরোপের প্রযুক্তি গ্রহণ করেছিল। কিন্তু সেই প্রযুক্তিকে দীর্ঘমেয়াদে নিজস্ব গবেষণা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। জাপানের শিল্পনীতি ও MITI ভিত্তিক ব্যবস্থায় প্রযুক্তি লাইসেন্সিং, বিদেশি প্রযুক্তি গ্রহণ, শিল্প গবেষণা এবং সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গবেষণায় দেখা যায়, জাপানি শিল্প বিদেশি প্রযুক্তি গ্রহণের পর ধীরে ধীরে নিজস্ব গবেষণা সক্ষমতা তৈরি করে এবং অনেক ক্ষেত্রে নিজস্ব পেটেন্ট ও প্রযুক্তির মাধ্যমে লাইসেন্সিং ব্যয় কমানোর চেষ্টা করে।
অর্থাৎ জাপানের শিক্ষা হলো—
বিদেশি প্রযুক্তি গ্রহণ করো, কিন্তু বিদেশি প্রযুক্তির স্থায়ী ভোক্তা হয়ে থেকো না।
চীনের শিক্ষা: প্রযুক্তি গ্রহণ থেকে প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা
চীনের অর্থনৈতিক উত্থানকে শুধু ‘সস্তা শ্রম’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা এখন আর যথেষ্ট নয়। দেশটি বিপুল পরিমাণ গবেষণা, শিল্প গবেষণা, অবকাঠামো, প্রকৌশল শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় বিনিয়োগ করেছে।
২০২৪ সালে চীনের গবেষণা ও পরীক্ষামূলক উন্নয়ন— R&D ব্যয় ছিল প্রায় ৩.৬৩ ট্রিলিয়ন ইউয়ান, যা GDP-এর প্রায় ২.৬৯ শতাংশ। একই বছরে দেশটির R&D ব্যয়ের বড় অংশ এসেছে ব্যবসা খাত থেকে;
অর্থাৎ গবেষণা শুধু সরকারি গবেষণাগারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, শিল্প-উৎপাদনের সঙ্গেও তা গভীরভাবে যুক্ত।
চীন বিদেশি জ্ঞান ও মেধা গ্রহণের ক্ষেত্রেও সক্রিয়। ২০২৪ সালে চীনের একাধিক সরকারি সংস্থা বিদেশে পড়াশোনা করা চীনা নাগরিকদের দেশে ফেরার পর কর্মসংস্থান, গবেষণা, উদ্যোক্তা কার্যক্রম ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের জন্য বিশেষ সহায়তা দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে। সেখানে গবেষণা, উদ্যোক্তা উদ্যোগ, পেটেন্ট, প্রযুক্তি এবং বিদেশি অভিজ্ঞতাকে দেশের অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
চীনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তাই ‘Thousand Talents Plan’-এর কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যাগত সাফল্যের দাবি নয়; বরং বৃহত্তর নীতিটি:
বিশ্বের যেখানে জ্ঞান আছে, সেখান থেকে জ্ঞান আহরণ করো; কিন্তু সেই জ্ঞানকে নিজের শিল্প, গবেষণা ও উৎপাদন ব্যবস্থায় রূপান্তর করো।
চীনকে বোঝার ক্ষেত্রে এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্র: সরকারের টাকা, গবেষণার ঝুঁকি, বেসরকারি উৎপাদন
যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু মুক্তবাজারের দেশ হিসেবে দেখলে তার প্রযুক্তিগত উত্থানের একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়।
ইন্টারনেট, GPS, উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ভাষা প্রযুক্তি, বিভিন্ন চিকিৎসা প্রযুক্তিসহ বহু ক্ষেত্রে সরকারি গবেষণা ও সরকারি অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। DARPA নিজেই বলে যে তাদের লক্ষ্য হলো— উচ্চঝুঁকির মৌলিক গবেষণা থেকে প্রযুক্তিকে প্রমাণিত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া এবং পরে তা বাস্তব প্রয়োগ ও বাণিজ্যিকীকরণের দিকে স্থানান্তর করা।
যুক্তরাষ্ট্রের SBIR/STTR ব্যবস্থাও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ছোট কোম্পানি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবনকে প্রথমে গবেষণা অনুদান, পরে prototype এবং শেষ পর্যন্ত commercialization-এর দিকে নেওয়া হয়। অর্থাৎ রাষ্ট্র শুধু গবেষণায় টাকা দেয় না; গবেষণার ফল যেন বাজারে পৌঁছায়, তার জন্যও ধাপ তৈরি করে।
এখানে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা অত্যন্ত পরিষ্কার:
গবেষণার জন্য টাকা দেওয়া যথেষ্ট নয়।
গবেষণা → prototype → পরীক্ষামূলক উৎপাদন → বাজারজাতকরণ—পুরো শৃঙ্খল তৈরি করতে হবে।
জার্মানি: বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কারখানায় জ্ঞান
জার্মানির Fraunhofer মডেল বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে শিক্ষণীয়।
Fraunhofer-এর কাজ মূলত গবেষণাগারে আবিষ্কার করে থেমে থাকা নয়; গবেষণার ফলকে শিল্পে প্রয়োগযোগ্য প্রযুক্তিতে রূপান্তর করা। প্রতিষ্ঠানটি শিল্প ও সরকারি খাতের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক গবেষণা, প্রযুক্তি স্থানান্তর, প্রশিক্ষণ, spin-off এবং intellectual property ব্যবস্থার মাধ্যমে কাজ করে।
২০২৫ সালের হিসাবে Fraunhofer-এর ৭৪টি প্রতিষ্ঠান ও স্বাধীন গবেষণা ইউনিটে ৩০ হাজারের বেশি কর্মী রয়েছে এবং এর বার্ষিক বাজেট প্রায় ৩.৬ বিলিয়ন ইউরো। তাদের contract research-এর বড় অংশ প্রতিযোগিতামূলকভাবে শিল্প ও সরকারি প্রকল্প থেকে আসে।
Fraunhofer-এর মূল দর্শনটি বাংলাদেশের জন্য একটি বাক্যে বলা যায়:
বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞান তৈরি হবে, গবেষণাগারে প্রযুক্তি তৈরি হবে, আর শিল্পে সেই প্রযুক্তির বাণিজ্যিক মূল্য তৈরি হবে।
বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পের মধ্যে যে দূরত্ব রয়েছে, সেটি কমানো ছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি তৈরি করা কঠিন।
ফ্রান্স: রাষ্ট্রীয় ক্রয়ও হতে পারে শিল্পনীতির হাতিয়ার
ফ্রান্সের অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্র শুধু ‘কোন পণ্য কত দামে কিনবে’—এভাবে procurement দেখে না; সরকারি ক্রয়কে উদ্ভাবন ও শিল্প উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করা যায়।
ফরাসি National Research Agency—ANR—মৌলিক গবেষণা, প্রয়োগমূলক গবেষণা, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বকে একই গবেষণা কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা করে।
ফ্রান্সের সরকারি procurement নীতিতেও innovative solution কেনাকে শিল্প ও উদ্ভাবন উৎসাহিত করার একটি উপায় হিসেবে দেখা হয়। অর্থাৎ সরকার যখন কিছু কিনছে, তখন তার অর্থনৈতিক প্রভাব—দেশীয় উদ্ভাবন, নতুন কোম্পানি, প্রযুক্তি ও বাজার তৈরির সম্ভাবনা—বিবেচনায় নেওয়া হয়।
বাংলাদেশও এই ধারণা গ্রহণ করতে পারে।
একটি হাসপাতাল যদি বিদেশ থেকে হাজার কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনে, তবে প্রশ্ন হওয়া উচিত—
যন্ত্রের কত শতাংশ দেশে তৈরি হবে?
স্থানীয় প্রকৌশলীরা কি প্রশিক্ষণ পাবেন?
পাঁচ বছরে স্থানীয় maintenance capability তৈরি হবে কি?
spare parts-এর কত অংশ স্থানীয়ভাবে তৈরি করা যাবে?
দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় যুক্ত হবে কি?
ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির কোনো অংশ বাংলাদেশ রপ্তানি করতে পারবে কি?
রাশিয়া: প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্বের জন্য প্রতিষ্ঠান নির্মাণ
রাশিয়াও বিভিন্ন সময়ে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে রাষ্ট্রীয় গবেষণা অবকাঠামো, innovation cluster, technology transfer centre, Skolkovo এবং শিল্পভিত্তিক গবেষণা ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। রুশ সরকারের নথিতে research centre, technology-transfer centre, science town, technopark ও innovation cluster-এর মাধ্যমে গবেষণা থেকে শিল্পে যাওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা উল্লেখ রয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়া ‘technological sovereignty’ বা প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর অধিক জোর দিচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য এখানে শিক্ষা হলো— প্রযুক্তি স্বাধীনতা শুধু পণ্য উৎপাদনের বিষয় নয়; গবেষণা প্রতিষ্ঠান, দক্ষ মানুষ, supply chain, standards, testing laboratory এবং financing ecosystem—সবকিছু একসঙ্গে তৈরি করতে হয়।
ইরানের অভিজ্ঞতা: নিষেধাজ্ঞার চাপ থেকে স্থানীয় সক্ষমতা
ইরানের অভিজ্ঞতা আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও বৈদেশিক প্রযুক্তি-অ্যাক্সেসের সীমাবদ্ধতা দেশটিকে বিভিন্ন খাতে স্থানীয় উৎপাদন ও বিকল্প প্রযুক্তি তৈরির দিকে ঠেলে দিয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য ইরানকে কোনো আদর্শ মডেল হিসেবে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং এখানে শিক্ষা হলো—
যে দেশ বৈদেশিক সরবরাহের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল, সে দেশ ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন, নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধ, supply-chain disruption বা বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে দ্রুত ঝুঁকিতে পড়ে।
তাই বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত— অপ্রয়োজনীয় আত্মনির্ভরতা নয়, বরং কৌশলগত প্রযুক্তিতে সক্ষমতা।
সবকিছু বাংলাদেশে তৈরি করতে হবে— এমন নীতি বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু কোন কোন প্রযুক্তিতে বিদেশি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, অর্থনীতি বা জনজীবন বিপন্ন হবে, সেসব ক্ষেত্রে অবশ্যই নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
তাহলে বাংলাদেশের সমস্যা কোথায়?
বাংলাদেশে উন্নয়ন হয়নি— এ কথা সত্য নয়। গত কয়েক দশকে অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, পোশাকশিল্প, মোবাইল যোগাযোগ, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন হয়েছে।
সমস্যা অন্য জায়গায়।
আমাদের উন্নয়ন-পরিকল্পনায় ‘সম্পদ সৃষ্টি’ এবং ‘সক্ষমতা সৃষ্টি’— এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়।
আমরা একটি প্রকল্পের সফলতা প্রায়ই পরিমাপ করি—
প্রকল্প শেষ হয়েছে কিনা
কত টাকা ব্যয় হয়েছে
কত কিলোমিটার রাস্তা হয়েছে
কতটি ভবন নির্মিত হয়েছে
কতটি গাড়ি বা যন্ত্র কেনা হয়েছে
কতটি বিমান বা জাহাজ বহরে যুক্ত হয়েছে।
কিন্তু আরও কিছু প্রশ্ন থাকা দরকার—
প্রকল্প শেষে আমাদের কতজন দক্ষ প্রকৌশলী তৈরি হলো?
কতটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান নতুন প্রযুক্তি শিখল?
কতটি পেটেন্ট হলো?
কতটি স্থানীয় কোম্পানি supply chain-এ ঢুকল?
কত শতাংশ maintenance দেশীয়ভাবে করা সম্ভব হলো?
প্রকল্পের প্রযুক্তিগত জ্ঞান কি বাংলাদেশে থেকে গেল?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না থাকলে বড় প্রকল্প হয়তো অবকাঠামো তৈরি করবে, কিন্তু সবসময় সক্ষমতা তৈরি করবে না।
বাংলাদেশের জন্য নতুন নীতি: ‘Purchase to Produce’
বাংলাদেশের উন্নয়ন-দর্শনে একটি নতুন ধারণা যুক্ত করা যেতে পারে—
Purchase to Produce
অর্থাৎ—
যা কিনব, তার সঙ্গে কীভাবে শিখব, কীভাবে স্থানীয়ভাবে তৈরি করব এবং কীভাবে ভবিষ্যতে রপ্তানি করব—সেটি ক্রয়ের সময়ই নির্ধারণ করতে হবে।
এটি শুধু জাহাজ বা বিমান কেনার ক্ষেত্রে নয়।
প্রযোজ্য হবে—
বিদ্যুৎকেন্দ্র
রেল
মেট্রোরেল
জাহাজ
বিমান
হাসপাতাল
মেডিকেল যন্ত্রপাতি
টেলিযোগাযোগ
সেমিকন্ডাক্টর
প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম
কৃষিযন্ত্র
ওষুধ
সার কারখানা
পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
ডেটা সেন্টার
নবায়নযোগ্য জ্বালানি
পারমাণবিক বিদ্যুৎ
মহাকাশ ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তি
সব ক্ষেত্রেই একই প্রশ্ন—
আমরা ক্রেতা থাকব, নাকি ধীরে ধীরে অংশীদার, তারপর উৎপাদক হব?
১. জাতীয় ‘Technology Acquisition Policy’ প্রণয়ন
বাংলাদেশের বড় প্রকল্প ও কৌশলগত ক্রয়ের জন্য পৃথক National Technology Acquisition and Transfer Policy প্রণয়ন করা যেতে পারে।
নীতির মূল বিষয় হবে—
ক. প্রযুক্তি স্থানান্তর
প্রতিটি বড় চুক্তিতে যেখানে সম্ভব সেখানে technology transfer-এর নির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকবে।
খ. প্রশিক্ষণ
বিদেশি কোম্পানিকে শুধু যন্ত্র সরবরাহ নয়—বাংলাদেশি প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী ও technicians প্রশিক্ষণের দায়িত্ব নিতে হবে।
গ. স্থানীয় maintenance capability
চুক্তির নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেশীয় maintenance, calibration ও repair সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
ঘ. স্থানীয় supply chain
সম্ভব হলে ধাপে ধাপে স্থানীয় component manufacturing বাড়াতে হবে।
ঙ. গবেষণা সহযোগিতা
দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ গবেষণার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
চ. যৌথ উন্নয়ন
শুধু বিদেশি প্রযুক্তি ব্যবহার নয়; ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি উন্নয়নে বাংলাদেশি গবেষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
২. বড় সরকারি ক্রয়ে ‘Knowledge Clause’ বাধ্যতামূলক করা
একটি বড় প্রকল্পের tender document-এ শুধু price, quality, delivery ও financial terms থাকবে—এমন ধারণা বদলাতে হবে।
নতুন একটি মূল্যায়ন কাঠামো হতে পারে—
Price + Quality + Lifecycle Cost + Local Capability + Technology Transfer + Human Capital + Research Collaboration
অর্থাৎ সবচেয়ে কম দামে পণ্য দেওয়া কোম্পানি সবসময় সবচেয়ে উপযুক্ত সরবরাহকারী হবে না।
কোনো কোম্পানি যদি কিছুটা বেশি দামে পণ্য দেয়, কিন্তু সঙ্গে—
training centre
local assembly
technology transfer
local supplier development
university research partnership
engineering support
maintenance ecosystem
তৈরি করে, তাহলে তার অর্থনৈতিক মূল্য আলাদাভাবে হিসাব করতে হবে।
৩. ‘১০-১৫ শতাংশ’—কিন্তু বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে
বড় ক্রয়ের ১০-১৫ শতাংশ বাধ্যতামূলকভাবে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানোর জন্য ব্যয় করতে হবে—এমন একক নিয়ম সব প্রকল্পে কার্যকর নাও হতে পারে।
বরং বলা যেতে পারে—
কৌশলগত বড় প্রকল্পে মোট contract value-এর একটি নির্ধারিত অংশ technology development, training, research collaboration, technology transfer, local supplier development ও human-capital formation-এর জন্য earmark করা হবে—তবে প্রকল্পভেদে শতাংশ নির্ধারণ করবে একটি স্বাধীন প্রযুক্তি মূল্যায়ন কমিটি।
কারণ বিমান কেনা এবং হাসপাতালের যন্ত্রপাতি কেনার প্রযুক্তিগত প্রয়োজন এক নয়।
কোনো প্রকল্পে ৫ শতাংশ যথেষ্ট হতে পারে, অন্য প্রকল্পে ১৫ শতাংশও প্রয়োজন হতে পারে।
৪. ‘পাঁচ হাজার মেধাবী’ নয়— ১০ বছরে ৫০ হাজার দক্ষ বিশেষজ্ঞ
বাংলাদেশের প্রয়োজন কেবল কয়েক হাজার PhD নয়।
আমাদের প্রয়োজন একটি National Strategic Skills Mission।
পরবর্তী ১০-১৫ বছরে পরিকল্পিতভাবে তৈরি করতে হবে—
aerospace engineer
nuclear engineer
semiconductor engineer
AI scientist
robotics engineer
biomedical engineer
pharmaceutical scientist
materials scientist
marine engineer
ship designer
railway engineer
energy engineer
environmental engineer
cyber-security specialist
advanced manufacturing specialist
agricultural technologist
এখানে শুধু PhD নয়; technician, technologist, engineer, researcher, designer, project manager— সবস্তরের মানবসম্পদ প্রয়োজন।
৫. ‘Brain Drain’ নয়—‘Brain Circulation’
বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশের জন্য সবসময় ক্ষতিকর নয়।
বরং একজন বাংলাদেশি গবেষক Harvard, MIT, Stanford, Cambridge, Oxford, Tokyo, Munich বা Paris-এ কাজ করলে তিনি যদি বাংলাদেশের সঙ্গে গবেষণা, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের সম্পর্ক বজায় রাখেন, তাহলে সেটি দেশের সম্পদ হতে পারে।
তাই নীতি হওয়া উচিত—
Brain Drain → Brain Circulation → Brain Gain
বিদেশে থাকা বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের জন্য তিনটি ব্যবস্থা করা যেতে পারে—
প্রথমত Return Fellowship
দেশে ফিরে গবেষণা করার জন্য পাঁচ বছর পর্যন্ত বিশেষ গবেষণা অনুদান।
দ্বিতীয়ত Joint Laboratory
বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণাগার।
তৃতীয়ত Diaspora Research Network
বিদেশে থাকা বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের নিয়ে sector-wise global research network
চীনও বিদেশে পড়াশোনা করা নাগরিকদের দেশে ফিরে কাজ, উদ্যোক্তা কার্যক্রম ও গবেষণায় যুক্ত করার জন্য বিভিন্ন নীতি ও সেবা কাঠামো তৈরি করেছে।
বাংলাদেশেরও প্রয়োজন অনুরূপ কিন্তু নিজস্ব বাস্তবতার উপযোগী ব্যবস্থা।
৬. বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু পরীক্ষার প্রতিষ্ঠান না রেখে ‘Innovation Institution’ করতে হবে
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বড় সমস্যা হলো গবেষণা, শিল্প ও জাতীয় সমস্যার মধ্যে দুর্বল সংযোগ।
প্রতিটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত কয়েকটি Mission-oriented Research Centre থাকা উচিত।
যেমন—
Bangladesh Institute of AI
Bangladesh Centre for Advanced Manufacturing
National Centre for Pharmaceutical Technology
Bangladesh Aerospace Research Centre
Bangladesh Marine Technology Centre
Climate and Delta Technology Institute
Semiconductor Research Centre
Agricultural Biotechnology Centre
এগুলো শুধু ভবন হবে না।
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নির্দিষ্ট শিল্পখাত, সরকারি মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সংযোগ থাকতে হবে।
৭. গবেষণার টাকা ‘ব্যয়’ নয়—‘বিনিয়োগ’ হিসেবে দেখতে হবে
বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের মধ্যেই গবেষণা, উন্নয়ন ও ব্যবহারকারীদের মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়টি রয়েছে।
কিন্তু শুধু গবেষণা প্রকল্পে অনুদান দিলে হবে না।
প্রতিটি গবেষণা প্রকল্পকে কয়েকটি পর্যায়ে নেওয়া যেতে পারে:
Basic Research → Applied Research → Prototype → Testing → Pilot Production → Commercialization → Export
প্রথম ধাপে ব্যর্থতা স্বাভাবিক।
কিন্তু prototype-এর পরও যদি অর্থায়ন না থাকে, গবেষণা কখনো শিল্পে পৌঁছাবে না।
৮. ‘Government as First Customer’
বাংলাদেশে নতুন প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় ক্রেতা হতে পারে সরকার।
ধরা যাক, একটি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান এমন একটি water purification system তৈরি করল, যা আমদানিকৃত প্রযুক্তির বিকল্প হতে পারে।
সরকার সরাসরি বলতে পারে না—‘দেশীয় বলে কিনব।’
কিন্তু সরকার বলতে পারে—
প্রযুক্তিটি নির্দিষ্ট মান পূরণ করলে প্রথমে ১০টি সরকারি প্রতিষ্ঠানে pilot project হিসেবে ব্যবহার করা হবে। সফল হলে বড় পরিসরে ক্রয় করা হবে।
এভাবে সরকারি procurement নতুন শিল্পের প্রথম বাজার তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের SBIR/STTR এবং ফ্রান্সের innovative public procurement-এর অভিজ্ঞতায় এই ধারণার বিভিন্ন রূপ দেখা যায়।
৯. প্রতিটি বড় প্রকল্পের ‘Technology Balance Sheet’ থাকতে হবে
বাংলাদেশে একটি প্রকল্পের financial audit হয়।
হওয়া উচিত আরও একটি audit—
Technology Audit
প্রকল্প শেষে হিসাব হবে—
১. কতজন বাংলাদেশি প্রকৌশলী প্রশিক্ষিত হয়েছেন?
২. কতটি প্রযুক্তিগত manual বাংলায়/ইংরেজিতে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের কাছে এসেছে?
৩. কতটি maintenance capability দেশে তৈরি হয়েছে?
৪. কতটি component স্থানীয়ভাবে তৈরি হচ্ছে?
৫. কতটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান supply chain-এ যুক্ত হয়েছে?
৬. কতটি গবেষণা প্রকল্প হয়েছে?
৭. কতটি patent বা design তৈরি হয়েছে?
৮. কতজন বিশেষজ্ঞ তৈরি হয়েছে?
৯. ভবিষ্যতে কত শতাংশ প্রযুক্তি দেশীয়ভাবে উন্নত করা সম্ভব?
১০. বিদেশি কোম্পানির ওপর নির্ভরতা কতটা কমেছে?
এই হিসাব ছাড়া প্রকল্পের ‘উন্নয়নমূল্য’ অসম্পূর্ণ থাকবে।
১০. শুধু বিমান কিনব না— অ্যাভিয়েশন ইকোসিস্টেম তৈরি করব
বাংলাদেশ বিমান কিনবে— এটি প্রয়োজন হতে পারে।
কিন্তু একটি বিমান কেনার সিদ্ধান্তের সঙ্গে আরও প্রশ্ন যুক্ত হওয়া উচিত—
বাংলাদেশে কি MRO centre হবে?
বিমান রক্ষণাবেক্ষণে কতজন প্রকৌশলী প্রশিক্ষিত হবে?
spare parts-এর কত অংশ স্থানীয়ভাবে তৈরি করা সম্ভব?
avionics maintenance capability তৈরি হবে কি?
flight simulator training centre হবে কি?
aviation university ও industry partnership হবে কি?
aircraft component manufacturing-এর সম্ভাবনা আছে কি?
একটি Boeing বা Airbus-এর পুরো প্রযুক্তি বাংলাদেশে তৈরি করা বাস্তবসম্মত নয়।
কিন্তু—
MRO → component manufacturing → engineering service → software → avionics → specialized manufacturing
এই ধাপে ধাপে এগোনো সম্ভব।
Airbus নিজেই প্রতিবছর প্রায় ৩ বিলিয়ন ইউরো R&D-তে বিনিয়োগের কথা জানায়। অর্থাৎ একটি উড়োজাহাজ কোম্পানি আসলে শুধু aircraft seller নয়; এর পেছনে বিশাল গবেষণা ও প্রযুক্তি ecosystem রয়েছে।
বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত সেই ecosystem-এর কোনো অংশে প্রবেশ করা।
১১. জাহাজ কিনলে জাহাজ নির্মাণ শিখতে হবে
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, নদী, সমুদ্রবন্দর ও নৌবাণিজ্য বিবেচনায় shipbuilding একটি সম্ভাবনাময় শিল্প।
তাই বিদেশ থেকে জাহাজ কেনার সময় তিন স্তরের নীতি নেওয়া যেতে পারে—
১ম ধাপ: বিদেশি জাহাজ ক্রয়।
২য় ধাপ: স্থানীয় shipyard-এ assembly, repair ও maintenance
৩য় ধাপ: স্থানীয় নকশা, component manufacturing ও complete vessel production
একই নীতি railway locomotive, metro coach, medical equipment, industrial machinery এবং power equipment-এর ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যায়।
১২. ‘Made in Bangladesh’ থেকে ‘Designed in Bangladesh’
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ‘Made in Bangladesh’ নিয়ে গর্ব করেছে।
এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত:
Made in Bangladesh
এর পর
Engineered in Bangladesh
এর পর
Designed in Bangladesh
এর পর
Invented in Bangladesh
এবং শেষ পর্যন্ত—
Global Technology from Bangladesh
এই পথটি দীর্ঘ। কিন্তু জাতীয় পরিকল্পনার লক্ষ্য যদি দীর্ঘমেয়াদি হয়, তাহলেই শিল্পনীতি অর্থবহ হবে।
১৩. বাংলাদেশের পরিকল্পনা কমিশনে ‘Technology Assessment Wing’
প্রতিটি বড় প্রকল্পের অর্থনৈতিক feasibility study থাকে।
কিন্তু বড় প্রকল্পের আগে একটি স্বাধীন National Technology Assessment প্রয়োজন।
এই ইউনিট যাচাই করবে—
কোন প্রযুক্তি কেনা হচ্ছে?
এর বিকল্প আছে কি?
দেশীয় সক্ষমতা কতটুকু?
technology transfer সম্ভব কি?
১০ বছর পর technology obsolescence-এর ঝুঁকি কত?
lifecycle cost কত?
foreign exchange exposure কত?
local manufacturing-এর সুযোগ কত?
geopolitical supply risk কত?
এ ধরনের ব্যবস্থা ছাড়া আমরা অনেক সময় ‘সস্তা ক্রয়মূল্য’ দেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারি, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় দেখতে পাই না।
১৪. ‘Lowest Price’ থেকে ‘Lowest Life-cycle Cost’
একটি মেশিন ১০ কোটি টাকায় কেনা হলো।
অন্যটি ১২ কোটি।
প্রথমটি ১০ বছর চালাতে ১৫ কোটি maintenance ও spare parts খরচ করল।
দ্বিতীয়টির maintenance খরচ ৬ কোটি।
তাহলে কোনটি সস্তা?
শুধু procurement price দিয়ে উত্তর দেওয়া যাবে না।
সরকারি ক্রয়ে তাই:
Purchase Price + Maintenance + Energy + Spare Parts + Training + Downtime + Replacement Cost
মিলে Life-cycle Cost হিসাব করতে হবে।
১৫. বাংলাদেশের R&D ব্যয় বাড়াতে হবে, কিন্তু শুধু সরকারি টাকা দিয়ে নয়
বিশ্বের সামগ্রিক R&D investment-এর ক্ষেত্রে UNESCO এখন R&D expenditure এবং researcher density-কে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সক্ষমতার সূচক হিসেবে বিবেচনা করে।
বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত ধাপে ধাপে R&D investment বাড়ানো।
কিন্তু শুধু সরকারি বাজেট বাড়ালে হবে না।
লক্ষ্য হওয়া উচিত—
Government R&D + University R&D + Industry R&D + International Collaboration
বাংলাদেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে গবেষণায় বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে tax incentive দেওয়া যেতে পারে।
যে কোম্পানি অনুমোদিত R&D-তে বিনিয়োগ করবে, patent করবে বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে গবেষণা করবে, তার জন্য বিশেষ কর-সুবিধা বিবেচনা করা যেতে পারে।
১৬. গবেষণার ফলের মালিকানা স্পষ্ট করতে হবে
গবেষক যদি জানেন যে তার আবিষ্কারের কোনো আর্থিক মূল্য নেই, তাহলে উদ্ভাবনের আগ্রহ কমে যায়।
জাপান সরকারি অর্থায়নে গবেষণা থেকে সৃষ্ট intellectual property-এর বাণিজ্যিক ব্যবহারে গবেষক ও প্রতিষ্ঠানের incentive বাড়ানোর জন্য Bayh-Dole-ধাঁচের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
বাংলাদেশেও প্রয়োজন—
patent ownership rules
royalty sharing
university spin-off
researcher incentive
industry licensing
technology commercialization office
অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাপত্র যেন কেবল লাইব্রেরির তাকেই না থাকে।
১৭. ‘National Technology Mission’ চালু করা
আগামী ১০ বছরের জন্য বাংলাদেশ কয়েকটি জাতীয় technology mission নির্ধারণ করতে পারে।
Mission 1: Semiconductor
ডিজাইন, packaging, testing—ধাপে ধাপে।
Mission 2: Pharmaceutical
API, biosimilar, medical device
Mission 3: Artificial Intelligence
বাংলা ভাষা, কৃষি, স্বাস্থ্য, প্রশাসন ও শিল্পের জন্য AI
Mission 4: Aerospace
MRO, avionics, simulation, components
Mission 5: Marine Technology
shipbuilding, marine equipment, navigation
Mission 6: Renewable Energy
solar equipment, battery, storage technology
Mission 7: Agricultural Technology
precision agriculture, irrigation, seed technology, cold chain
Mission 8: Climate Technology
বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা ও ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার প্রযুক্তি।
Mission 9: Advanced Manufacturing
robotics, CNC, industrial automation, materials
Mission 10: Medical Technology
diagnostic equipment, implants, laboratory equipment
এগুলোকে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক ছোট প্রকল্পে ছড়িয়ে না দিয়ে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে পরিচালনা করা উচিত।
১৮. আমলাতন্ত্রের ভূমিকা বদলাতে হবে
বর্তমান প্রশাসনিক ব্যবস্থায় একজন কর্মকর্তা যদি কোনো প্রকল্প ‘নিরাপদে’ শেষ করতে চান, তাহলে সবচেয়ে সহজ পথ অনেক সময় হলো প্রচলিত পদ্ধতিতে ক্রয় করা।
কিন্তু innovation-এর সঙ্গে risk থাকে।
তাই procurement কর্মকর্তাদের মূল্যায়নে শুধু—
‘কত দ্রুত প্রকল্প শেষ করেছেন’
নয়, বরং—
‘প্রকল্পের মাধ্যমে কতটা স্থানীয় সক্ষমতা তৈরি হয়েছে’
এটিও বিবেচনা করতে হবে।
প্রয়োজন হবে Professional Public Procurement Service—যেখানে procurement specialist, engineer, economist, technology expert এবং contract specialist একসঙ্গে কাজ করবেন।
১৯. জাতীয় শিল্পনীতির সঙ্গে ক্রয়নীতির সমন্বয়
বাংলাদেশের National Industrial Policy 2022 এবং Light Engineering Industry Development Policy 2022-এর মতো নীতিমালা রয়েছে।
কিন্তু শিল্পনীতি, শিক্ষা নীতি, বিজ্ঞান নীতি, procurement policy এবং export policy যদি আলাদা আলাদা পথে চলে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
একটি জাতীয় কাঠামো প্রয়োজন—
Education → Research → Technology → Industry → Procurement → Export
এই ছয়টি ধাপকে একই নীতিচক্রের মধ্যে আনতে হবে।
২০. ‘এক প্রকল্প—একটি সক্ষমতা’ নীতি
ভবিষ্যতে প্রতিটি বড় প্রকল্পের একটি বাধ্যতামূলক national capability outcome থাকা উচিত।
উদাহরণ—
মেট্রোরেল প্রকল্প → স্থানীয় signalling engineers
বিদ্যুৎ প্রকল্প → power-system engineers
হাসপাতাল প্রকল্প → biomedical engineers
জাহাজ ক্রয় → ship-repair capability
বিমান ক্রয় → MRO capability
ডেটা সেন্টার → cloud/data-centre engineers
সেতু নির্মাণ → advanced structural engineering capability
রেল প্রকল্প → locomotive ও rolling-stock engineering
এভাবে প্রকল্প শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি নতুন জাতীয় সক্ষমতা জন্ম নেবে।
২১. বিদেশি কোম্পানিকে শত্রু নয়, শিক্ষক ও অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য দরকার।
বিদেশি কোম্পানিকে ‘প্রযুক্তি লুটে নেওয়া’র লক্ষ্য নিয়ে দেখলে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আবার শুধু তাদের পণ্য কিনে তাদের ওপর নির্ভরশীল থাকাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
সঠিক পথ—
Buyer → Partner → Learner → Co-developer → Producer
বিদেশি কোম্পানি বাংলাদেশে বিনিয়োগ করবে, বাজার পাবে, মুনাফা করবে।
বাংলাদেশ পাবে—
দক্ষ জনবল
supplier development
research
engineering capability
intellectual property
export opportunity
এটাই হবে উভয়পক্ষের জন্য কার্যকর অংশীদারত্ব।
২২. ‘প্রযুক্তি কূটনীতি’ শুরু করতে হবে
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি অংশ হতে পারে Technology Diplomacy
চীন থেকে—
manufacturing
infrastructure
electronics
industrial automation
জাপান থেকে—
precision manufacturing
robotics
automotive
quality management
জার্মানি থেকে—
advanced manufacturing
industrial research
machinery
ফ্রান্স থেকে—
aerospace
nuclear technology
transportation
যুক্তরাষ্ট্র থেকে—
AI
biotechnology
advanced research
entrepreneurship
রাশিয়া থেকে—
nuclear technology
space
heavy engineering
অন্যান্য দেশ থেকে—
agricultural technology
medical technology
renewable energy
বাংলাদেশের উচিত এক দেশের ওপর নির্ভর না করে technology portfolio diversification তৈরি করা।
২৩. জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন
সবশেষে মূল জায়গাটি শিক্ষা।
শুধু হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে বিদেশে পাঠালেই হবে না।
তাদের পাঠাতে হবে জাতীয় প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করে।
ধরা যাক, আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশ ১০ হাজার উচ্চতর গবেষক তৈরি করবে।
তাহলে আগে নির্ধারণ করতে হবে—
কতজন AI?
কতজন semiconductor?
কতজন biomedical?
কতজন aerospace?
কতজন marine?
কতজন energy?
কতজন climate science?
কতজন agriculture?
কতজন materials science?
অর্থাৎ scholarship policy-ও হবে national industrial policy-এর অংশ।
২৪. বিদেশে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফেরার পরিবেশ তৈরি করতে হবে
কেবল ‘দেশে ফিরে আসুন’ বললে হবে না।
একজন গবেষক দেশে ফিরলে তাকে দিতে হবে:
গবেষণাগার
গবেষণা অনুদান
competitive salary
housing support
research assistant
international collaboration
সহজ procurement
conference support
patent support
academic freedom
transparent promotion
নইলে মেধা ফেরানোর প্রকল্পও কাগুজে প্রকল্পে পরিণত হবে।
২৫. জাতীয় উন্নয়নের নতুন হিসাব
একটি দেশ কতটি সেতু বানিয়েছে— এটি গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—
সেতু বানানোর পর দেশটি কি সেতু নির্মাণের প্রযুক্তি শিখেছে?
একটি দেশ কতটি বিমান কিনেছে—এটি গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ—
দেশটি কি বিমান রক্ষণাবেক্ষণ, component manufacturing এবং aviation engineering শিখেছে?
একটি দেশ কতটি হাসপাতাল করেছে—এটি গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ—
দেশটি কি চিকিৎসা যন্ত্রপাতি তৈরি করতে শিখেছে?
একটি দেশ কতটি বিশ্ববিদ্যালয় করেছে— এটি গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ—
সেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি নতুন প্রযুক্তি তৈরি করছে?
বাংলাদেশের জন্য ১৫ দফা জাতীয় কর্মপরিকল্পনা
বাংলাদেশ চাইলে আগামী ১০ বছরের জন্য নিচের ১৫ দফা গ্রহণ করতে পারে—
১. National Technology Acquisition and Transfer Policy প্রণয়ন।
২. বড় সরকারি ক্রয়ে Technology Transfer Plan বাধ্যতামূলক করা।
৩. Strategic Procurement-এর সঙ্গে Human Capital Development যুক্ত করা।
৪. National Brain Circulation Programme চালু করা।
৫. বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে Joint Research Laboratory স্থাপন।
৬. R&D expenditure ধাপে ধাপে বাড়ানো।
৭. বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প যৌথ গবেষণার জন্য বিশেষ তহবিল গঠন।
৮. Government as First Customer নীতি চালু করা।
৯. সরকারি ক্রয়ে Life-cycle Cost বিবেচনা করা।
১০. বড় প্রকল্পে Technology Audit বাধ্যতামূলক করা।
১১. গবেষণার patent ও royalty-এর জন্য গবেষক incentive চালু করা।
১২. Semiconductor, AI, pharmaceutical, aerospace, marine, energy ও climate technology-কে জাতীয় mission করা।
১৩. বিদেশি বিনিয়োগের সঙ্গে supplier development ও skill development পরিকল্পনা যুক্ত করা।
১৪. Procurement কর্মকর্তাদের জন্য professional technology-procurement training চালু করা।
১৫. প্রতি পাঁচ বছর পর জাতীয় প্রযুক্তি সক্ষমতার independent assessment করা।
শেষ কথা: লোহা থাকবে, কিন্তু জ্ঞানও থাকতে হবে
বাংলাদেশকে জাহাজ কিনতে হবে। বিমান কিনতে হবে। রেল কিনতে হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে। আধুনিক হাসপাতাল করতে হবে। বড় অবকাঠামো তৈরি করতে হবে।
প্রশ্ন এসব কেনার বিরুদ্ধে নয়।
প্রশ্ন হলো—আমরা যখন কিনছি, তখন তার সঙ্গে কী অর্জন করছি?
একটি উড়োজাহাজের মূল্য শুধু তার ক্রয়মূল্য নয়; তার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে বিমান প্রকৌশল, MRO, সফটওয়্যার, training, component manufacturing এবং নতুন শিল্প।
একটি জাহাজের মূল্য শুধু তার ইস্পাতের দামে নয়; তার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে ship design, marine engineering, repair, navigation technology এবং shipbuilding industry
একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল্য শুধু তার উৎপাদন ক্ষমতায় নয়; তার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে power engineering, control system, maintenance technology এবং স্থানীয় যন্ত্রাংশ উৎপাদন।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্য শুধু তার ভবন ও আসনে নয়; তার প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় সে কত জ্ঞান সৃষ্টি করে, কত প্রযুক্তি তৈরি করে এবং কত নতুন শিল্পের জন্ম দেয় তার ওপর।
বিশ্বের সফল রাষ্ট্রগুলোও বিদেশ থেকে সবকিছু নিজে তৈরি করে শুরু করেনি। তারা প্রযুক্তি আমদানি করেছে, যন্ত্রপাতি কিনেছে, বিদেশি বিশেষজ্ঞ এনেছে, লাইসেন্স নিয়েছে, গবেষণা করেছে। কিন্তু একটি পর্যায়ে এসে তারা প্রশ্ন বদলেছে—
‘আর কতদিন আমরা কিনব?’
তারপর শুরু হয়েছে—
শেখা।
তারপর—
উন্নয়ন।
তারপর—
নিজেদের উৎপাদন।
এবং শেষ পর্যন্ত—
বিশ্ববাজারে বিক্রি।
জাপানের শিল্পায়ন, চীনের বিশাল R&D বিনিয়োগ, যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা থেকে commercialization-এর ব্যবস্থা, জার্মানির Fraunhofer-ভিত্তিক industry-research linkage এবং ফ্রান্সের public procurement ও research-transfer কাঠামো—সবগুলোর মধ্যে একটি সাধারণ শিক্ষা পাওয়া যায়: জ্ঞানকে অর্থনৈতিক সক্ষমতায় রূপান্তর করার প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হয়।
বাংলাদেশেরও এখন সেই পরিবর্তনের সময়।
আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত—
‘কত টাকা খরচ করলাম’ নয়;
‘কতটা জাতীয় সক্ষমতা তৈরি করলাম।’
‘কতটি প্রকল্প শেষ করলাম’ নয়;
‘কতটি প্রযুক্তি আয়ত্ত করলাম।’
‘কতটি পণ্য আমদানি করলাম’ নয়;
‘কতটি পণ্য আগামী দিনে নিজেরা তৈরি করতে পারব।’
রাষ্ট্রের অর্থ দিয়ে যদি শুধু লোহা কেনা হয়, লোহা একদিন পুরোনো হবে।
কিন্তু সেই অর্থ দিয়ে যদি মানুষের মেধা, গবেষণা, প্রযুক্তি, প্রতিষ্ঠান ও উৎপাদনক্ষমতা তৈরি করা যায়—তাহলে তার সুফল প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করবে।
বাংলাদেশের সামনে তাই উন্নয়নের পরবর্তী স্লোগান হতে পারে খুব সরল:
ক্রয় থেকে সক্ষমতায়।
আমদানি থেকে উদ্ভাবনে।
ব্যবহার থেকে উৎপাদনে।
মেধা পাচার থেকে মেধা সঞ্চালনে।
‘Made in Bangladesh’ থেকে ‘Designed and Invented in Bangladesh’-এ।
আমাদের লক্ষ্য বিদেশ থেকে কেনা বন্ধ করা নয়।
আমাদের লক্ষ্য হলো—বিদেশ থেকে যা কিনি, তার মাধ্যমে যেন একদিন নিজেদের আরও বেশি কিছু তৈরি করতে পারি।
কারণ উন্নত রাষ্ট্রের শক্তি তার গুদামে কত লোহা জমা আছে, শুধু তাতে নয়;
তার মানুষের মস্তিষ্কে কত জ্ঞান, গবেষণাগারে কত প্রযুক্তি এবং কারখানায় কত উৎপাদনক্ষমতা আছে—মূল শক্তি সেখানে।
বাংলাদেশের পরবর্তী বড় বিনিয়োগ তাই শুধু সেতু, জাহাজ, বিমান বা ভবনে নয়—
মানুষে, মেধায়, গবেষণায়, প্রযুক্তিতে এবং উৎপাদন সক্ষমতায় হতে হবে।
সেখানেই আগামী বাংলাদেশের প্রকৃত সম্পদ।
মো. আব্দুর রাজ্জাক
৩৪তম বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার সদস্য
