Logo
Logo
×

Advertisement

দৃষ্টিপাত

অপেক্ষার রাজনীতি: আমরা কি একটি অপেক্ষার সমাজে বাস করছি?

Advertisement

মাহ্ফুজ সরকার

মাহ্ফুজ সরকার

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০০ পিএম

অপেক্ষার রাজনীতি: আমরা কি একটি অপেক্ষার সমাজে বাস করছি?

ছবি-এআই সম্পাদিত

Advertisement

ঢাকার একজন মানুষের দিন শুরু হয় অপেক্ষা দিয়ে, শেষও হয় অপেক্ষা দিয়ে। বাসের অপেক্ষা, যানজটে অপেক্ষা, হাসপাতালে চিকিৎসকের অপেক্ষা, সরকারি অফিসে একটা সিলের অপেক্ষা। আমরা এটাকে সাধারণত ব্যক্তিগত বিরক্তি হিসেবে দেখি—"আজ রাস্তায় খুব জ্যাম ছিল" গোছের একটা অভিযোগ। কিন্তু একটু গভীরে তাকালে দেখা যায়, অপেক্ষা আসলে নিছক সময় নষ্ট হওয়া নয়। এটা একটা সমাজে কার হাতে ক্ষমতা আছে, কে কতটা গুরুত্ব পায়, আর রাষ্ট্র নাগরিককে কীভাবে দেখে—তার একটা জীবন্ত প্রতিফলন।

বিশ্বব্যাংকের হিসাব বলছে, গত এক দশকে ঢাকার গড় যানবাহনের গতি ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার থেকে নেমে ৭ কিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে—প্রায় হাঁটার গতির কাছাকাছি। এর ফলে প্রতিদিন শহরে নষ্ট হচ্ছে প্রায় ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা। অর্থনীতির হিসাবে এটা উৎপাদনশীলতার ক্ষতি। কিন্তু আসল ক্ষতিটা আরও ব্যক্তিগত—এই সময়ে একজন বাবা সন্তানের পাশে বসতে পারতেন, একজন শিক্ষার্থী পড়তে পারতেন, একজন ক্লান্ত মানুষ একটু বিশ্রাম নিতে পারতেন।

মজার ব্যাপার হলো, প্রযুক্তি যত বাড়ছে, অপেক্ষা কিন্তু কমছে না। জার্মান সমাজতাত্ত্বিক হার্টমুট রোজা এই বৈপরীত্যটাই দেখিয়েছেন—সমাজ যত দ্রুতগতির হয়, মানুষ তত বেশি সময়ের সংকটে পড়ে, মানুষের ব্যস্ততা তত বাড়ে। মেট্রোরেল হয়েছে, এক্সপ্রেসওয়ে হয়েছে, অনলাইন সেবা এসেছে—তবু ঢাকাবাসীর জীবনে অপেক্ষা কমেনি, শুধু তার রূপ বদলেছে।

নৃবিজ্ঞানী গাসান হাজ একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন—অপেক্ষা আসলে একটা রাজনৈতিক অবস্থা। সমাজে সবাই সমান অপেক্ষা করে না। যার পরিচয়, প্রভাব বা টাকা আছে, তার জন্য দরজা দ্রুত খোলে; যার কিছুই নেই, তার কাছে অপেক্ষাটাই যেন নিয়তি। ভাবুন, কুমিল্লা থেকে ভোর চারটায় অসুস্থ সন্তান কোলে নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে আসা একজন বাবার কথা—দশ মিনিটের চিকিৎসার জন্য তাঁকে হয়তো সাত ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। অথচ একই হাসপাতালে চেনাজানা কেউ থাকলে সেই অপেক্ষা নিমিষে ফুরিয়ে যায়। এই যে বৈষম্য, একে বলা যায় ‘সময়ের বৈষম্য’। আমরা আয়ের বৈষম্য নিয়ে অনেক কথা বলি, কিন্তু সময়ও যে সমাজে সমানভাবে বণ্টিত হয় না—সেটা নিয়ে আলোচনা হয় খুব কম।

কেন এমন হয়? ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বুর্দিওর একটা সহজ কথা আছে—ক্ষমতার একটা রূপ হলো অন্যের সময় নিয়ন্ত্রণ করতে পারা। যে কাউকে অপেক্ষা করাতে পারে, সে আসলে সেই মানুষের জীবনেরই একটা অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। বাংলাদেশের অফিস-আদালতের বাস্তবতায় কথাটা যেন হুবহু মিলে যায়। আর নৃবিজ্ঞানী ডেভিড গ্রেবার দেখিয়েছেন, আধুনিক আমলাতন্ত্র প্রায়ই দক্ষতার চেয়ে নিয়ম-কানুনকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে নাগরিকের কাছে রাষ্ট্র একটা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং একের পর এক কাউন্টার, সিল আর স্বাক্ষরের একটা লাইন হয়ে ওঠে।

এই তত্ত্বগুলো শুনতে ভারী মনে হলেও এর প্রমাণ আমাদের রোজকার জীবনেই ছড়িয়ে আছে। ভূমি অফিসের কথাই ধরুন। জমির নামজারি বা খতিয়ান সংশোধনের জন্য একজন সাধারণ কৃষককে মাসের পর মাস ঘুরতে হয়—কখনো একটা কাগজের অভাবে, কখনো কর্মকর্তার অনুপস্থিতিতে। অথচ প্রভাবশালী কারও একই কাজ সপ্তাহখানেকেই মিটে যায়।

পাসপোর্ট অফিসের গল্পটাও পরিচিত। ই-পাসপোর্ট চালু করে প্রক্রিয়াটা ডিজিটাল করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু পুলিশ ভেরিফিকেশন বা কাগজপত্রের সামান্য গরমিলে আটকে গেলে আবেদনকারীকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ বসে থাকতে হয়। এই অনিশ্চয়তা এড়াতেই বহু মানুষ বাড়তি টাকা দিয়ে দালালের কাছে যান। দালাল কোনো জাদু জানেন না—তিনি শুধু একটা সংযোগ বিক্রি করেন, যা অপেক্ষার সময়টা কমিয়ে দেয়। অর্থাৎ অপেক্ষা নিজেই এখন একটা পণ্য: যার টাকা আছে, সে সময় কিনতে পারে; যার নেই, তার কাছে সময়ই একটা শাস্তি হয়ে দাঁড়ায়।

আদালতের ছবিটা আরও কঠিন। বাংলাদেশের আদালতে লাখো মামলা বছরের পর বছর অমীমাংসিত পড়ে থাকে; একটা জমির মামলা মেটাতে একটা পরিবারের প্রায় এক প্রজন্ম কেটে যেতে পারে। আইনের একটা পুরনো কথা আছে—বিলম্বিত ন্যায়বিচার আসলে ন্যায়বিচার না-পাওয়ারই নামান্তর। ব্যাংকের ঋণ অনুমোদন, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন কিংবা জন্মনিবন্ধন সংশোধনের মতো ‘ছোট’ কাজেও একই প্যাটার্ন দেখা যায়—নিয়ম সবার জন্য এক, কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা সবার জন্য সমান নয়। লক্ষ করার বিষয় হলো, অপেক্ষা কমে যায় ঠিক তখনই, যখন কারও পরিচিতি বা বাড়তি টাকা থাকে। আলাদা আলাদাভাবে দেখলে এগুলো নিছক প্রশাসনিক অদক্ষতা মনে হতে পারে; কিন্তু সবগুলো মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, এটাই আসলে একটা সমাজের অসাম্যের গোপন নকশা।

নৃবিজ্ঞানী জেমস সি. স্কট তাঁর বিখ্যাত বই ‘সিয়িং লাইক আ স্টেট’-এ দেখিয়েছেন, আধুনিক রাষ্ট্র মানুষকে চেনে নথি, মানচিত্র, পরিচয়পত্র আর রেকর্ডের মধ্য দিয়ে। কাগজে যত সহজে একজন মানুষকে ধরা যায়, বাস্তবে তত বেশি কাগজ আর অনুমোদনের ভেতর দিয়ে সেই মানুষকেই যেতে হয়। ফলে রাষ্ট্র আর নাগরিকের সম্পর্কটা আস্থার বদলে দাঁড়িয়ে যায় অপেক্ষা আর আনুষ্ঠানিকতার ওপর। হুবহু একই কথা উচ্চারিত হয়েছিল, সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘আগন্তুক’এর প্রধান চরিত্র মনমোহন মিত্রের কণ্ঠে, ‘পাসপোর্টের দুই পাতায় কি সত্যিই সম্ভব হয় মানুষ চেনা?’ কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্র এভাবেই তার নাগরিককে নথিভুক্ত করছে বা চেনে। 

নৃবিজ্ঞানী অখিল গুপ্তা তাঁর ‘রেড টেপ’ বইয়ে আরেকটু এগিয়ে বলেছেন—আমলাতান্ত্রিক বিলম্ব সব সময় শুধু অদক্ষতার ফল নয়; অনেক সময় এই বিলম্বটাই ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার একটা কৌশল। একজন মানুষকে যদি বারবার একই অফিসে যেতে হয়, একই কাগজ জমা দিতে হয়, তাহলে ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে অসহায় ভাবতে শুরু করেন। অপেক্ষা তখন শুধু সময় কাড়ে না, রাষ্ট্র আর মানুষের মধ্যেকার দূরত্বও বাড়িয়ে দেয়।

আর নৃবিজ্ঞানী অর্জুন আপাদুরাই বলেছেন একটা সুন্দর কথা—মানুষের ভবিষ্যৎ কল্পনা করার ক্ষমতাই তার উন্নয়নের একটা বড় শর্ত। মানুষ তখনই ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারে, যখন সামনে একটা নির্ভরযোগ্য, অনুমানযোগ্য ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু একটা চাকরির আবেদন, একটা জমির নথি বা একটা মামলার নিষ্পত্তির জন্য যদি বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে মানুষের স্বপ্ন দেখার ক্ষমতাটাই দুর্বল হয়ে পড়ে। দীর্ঘ অপেক্ষা তাই শুধু একটা কাজ পিছিয়ে দেয় না—অনেক সময় একটা জীবনের গতিপথই থামিয়ে দেয়।

ঢাকার যানজটও তাই আসলে নিছক পরিবহন-সমস্যা নয়; এটা নিজেই একটা প্রতিষ্ঠানের মতো হয়ে গেছে, যার নিয়ম মেনে মানুষকে প্রতিদিন জীবন সাজাতে হয়। একজন কর্মজীবী রাস্তায় গড়ে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা কাটালে বছরে তা প্রায় এক মাসের সমান সময়—যা তিনি পরিবারের সঙ্গে, বিশ্রামে বা নিজের উন্নতিতে ব্যয় করতে পারতেন। এই ক্ষতি জিডিপির হিসাবে ধরা পড়ে না, কিন্তু মানুষের জীবনে গভীর দাগ কাটে।

অনলাইন আবেদন, মোবাইল ব্যাংকিং, ই-পাসপোর্ট বা মেট্রোরেলের মতো উদ্যোগ অপেক্ষা কমানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে—এটা অস্বীকারের উপায় নেই। কিন্তু প্রযুক্তি তখনই কাজ করে, যখন প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতিও বদলায়। শুধু একটা অ্যাপ চালু করলেই আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা বদলায় না। অপেক্ষা কমানো তাই আসলে শুধু দ্রুত সেবা দেওয়ার প্রশ্ন নয়; এটা নাগরিকের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্ন।

উন্নয়নের মানদণ্ড কেবল নতুন সেতু বা উড়ালসড়ক নয়। একজন সাধারণ মানুষকে একটা সেবা পেতে কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়, সেটাও উন্নয়নের একটা সূচক—যদিও আমরা এখনো সেটা মাপি না। রাষ্ট্র নাগরিকের কাছ থেকে কর নেয়, শ্রম নেয়, আনুগত্য প্রত্যাশা করে; কিন্তু বিনিময়ে যদি সে অকারণে মানুষের সময়ও কেড়ে নেয়, তাহলে সেই ক্ষতি শুধু অর্থনৈতিক থাকে না—তা গভীরভাবে মানবিক হয়ে ওঠে। যে সমাজে মানুষের সময়ের মূল্য কম, সেই সমাজে ধীরে ধীরে মানুষের স্বপ্নের মূল্যও কমতে শুরু করে। অপেক্ষার রাজনীতি শেষমেশ একটাই কথা শেখায়—একটা রাষ্ট্রকে বিচার করতে হলে তার সড়ক-সেতুর পাশাপাশি দেখতে হবে, সে তার নাগরিকের সময়কে কতটা সম্মান করে।


মাহ্ফুজ সরকার : শিক্ষক ও লেখক

তথ্যসূত্র: 

World Bank, Towards Great Dhaka রিপোর্ট

Hartmut Rosa, Social Acceleration (2013)

David Graeber, The Utopia of Rules (2015);

 James C. Scott, Seeing Like a State (1998); Akhil Gupta, Red Tape (2012);

 Arjun Appadurai-র capacity to aspire ধারণা। 


Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

অপেক্ষার রাজনীতি: আমরা কি একটি অপেক্ষার সমাজে বাস করছি?

অপেক্ষার রাজনীতি: আমরা কি একটি অপেক্ষার সমাজে বাস করছি?

দিল্লির রাজপথে ঢাকার প্রতিধ্বনি: মোদির ভবিষ্যৎ কোন পথে?

দিল্লির রাজপথে ঢাকার প্রতিধ্বনি: মোদির ভবিষ্যৎ কোন পথে?

কিরিলের ল্যাপটপ চুরি বনাম আমাদের ভাবমূর্তি

কিরিলের ল্যাপটপ চুরি বনাম আমাদের ভাবমূর্তি

কওমি মাদ্রাসার জন্য প্রয়োজন আত্মসমালোচনা

কওমি মাদ্রাসার জন্য প্রয়োজন আত্মসমালোচনা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম