কওমি মাদ্রাসার জন্য প্রয়োজন আত্মসমালোচনা
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসাকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে নানা ধরনের নেতিবাচক সংবাদ ও অভিযোগ সামনে এসেছে। কোথাও শিক্ষক নির্যাতন, কোথাও শিক্ষার্থী নিরাপত্তা, কোথাও পাঠ্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন, আবার কোথাও শিক্ষকদের কম বেতন ও দীর্ঘ কর্মঘণ্টার বিষয় আলোচনায় এসেছে। এসব অভিযোগের কিছু বাস্তব, কিছু অতিরঞ্জিত এবং কিছু ক্ষেত্রে অপপ্রচারও থাকতে পারে। কিন্তু অভিযোগের বাইরেও কওমি শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে রয়েছে বেশ কিছু কাঠামোগত সমস্যা। বিশেষ করে শিক্ষকরা কত ঘণ্টা কাজ করেন, কত টাকা বেতন পান, কতদিন ছুটি পান, পরিবার থেকে কতটা বিচ্ছিন্ন থাকেন, তাদের আবাসন ও পেশাগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা কী-এসব প্রশ্ন এখন সামনে আসছে নতুন করে। কওমি শিক্ষার সংস্কার, শিক্ষক-কর্মপরিবেশ, শিক্ষার্থী নিরাপত্তা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং আধুনিক সময়ের চাহিদা নিয়ে এসব বিষয়ে কথা বলেছেন লেখক, গবেষক ও রাজধানীর জামিয়া আরাবিয়া নতুনবাগ মাদ্রাসার মুহাদ্দিস মাওলানা ওয়ালী উল্লাহ আরমান। সাক্ষাৎকার গ্রহণ : তোফায়েল গাজালি
যুগান্তর : কওমি মাদ্রাসা ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে অনেক নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশ হচ্ছে। আপনি কি মনে করেন এগুলো কওমি শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে অপপ্রচার?
মাওলানা ওয়ালী উল্লাহ : সবকিছুকে অপপ্রচার বলা ঠিক হবে না। আবার বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা দিয়ে পুরো কওমি শিক্ষাব্যবস্থাকে বিচার করাও ন্যায়সংগত নয়। কওমি মাদ্রাসা বাংলাদেশের একটি দীর্ঘ ঐতিহ্যের শিক্ষাব্যবস্থা। কোনো প্রতিষ্ঠানই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। কোথাও যদি শিক্ষার্থীর সঙ্গে অন্যায় হয়, শিক্ষক যদি বঞ্চিত হন, প্রশাসনে দুর্বলতা থাকে কিংবা অর্থনৈতিক অনিয়ম থাকে, তাহলে সেগুলো স্বীকার করতে হবে এবং সংশোধন করতে হবে। আমার মনে হয়, কওমি মাদ্রাসার জন্য সবচেয়ে প্রয়োজন এখন আত্মসমালোচনা। বাইরের সমালোচনাকে শুধু আক্রমণ হিসাবে না দেখে এর মধ্যে সত্য কতটুকু আছে, তাও আমাদের দেখতে হবে।
যুগান্তর : তাহলে কওমি মাদ্রাসার মূল সংকট কোথায়?
মাওলানা ওয়ালী উল্লাহ : আমি মনে করি সংকট এক জায়গায় নয়। কয়েকটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষক ব্যবস্থাপনা, অর্থনীতি, প্রশাসন, পাঠ্যক্রম, কর্মসংস্থান এবং জবাবদিহি-সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টি দেখতে হবে। আমরা অনেক সময় শুধু পাঠ্যক্রম নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু একজন ভালো শিক্ষক ছাড়া ভালো পাঠ্যক্রমও বাস্তবায়ন করা যায় না। আবার শিক্ষককে যদি সম্মানজনক পরিবেশ না দেওয়া হয়, তার নিজের জ্ঞানচর্চার সুযোগ না থাকে, তাহলে তিনি কীভাবে শিক্ষার্থীদের উৎকৃষ্ট শিক্ষা দেবেন? তাই কওমি শিক্ষার সংস্কার নিয়ে কথা বললে প্রথমেই শিক্ষককে নিয়ে কথা বলতে হবে।
যুগান্তর : অনেক কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষকরা ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখেন?
মাওলানা ওয়ালী উল্লাহ : প্রথম কথা হলো, এ বিষয়ে আমাদের সুনির্দিষ্ট তথ্য দরকার। সব কওমি মাদ্রাসায় একই ধরনের কর্মঘণ্টা নেই। তাই ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টাকে জাতীয় চিত্র হিসাবে বলা ঠিক হবে না। তবে আবাসিক মাদ্রাসার বাস্তবতা হচ্ছে, শিক্ষক শুধু ক্লাস নেন না। তাকে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, নামাজ, শৃঙ্খলা, আবাসিক জীবন, পরীক্ষা এবং নানা ধরনের তদারকির দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে একজন শিক্ষক কখন প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করলেন আর কখন বের হলেন-এটা দিয়ে তার প্রকৃত কর্মঘণ্টা হিসাব করা কঠিন। কিন্তু এ কারণে কর্মঘণ্টার কোনো সীমা থাকবে না-এটাও গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষকও মানুষ। তার বিশ্রাম প্রয়োজন, পরিবার প্রয়োজন, নিজের পড়াশোনার প্রয়োজন। একজন আলেম-শিক্ষকের নিজের জ্ঞানচর্চার সময় না থাকাটা খুবই দুঃখজনক।
যুগান্তর : ৯-১০ হাজার টাকা বেতনে একজন শিক্ষক কি বর্তমান বাজারে সংসার চালাতে পারেন?
মাওলানা ওয়ালী উল্লাহ : বাস্তবতা হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে পারেন না। অবশ্য সব মাদ্রাসার বেতন এক নয়। কোথাও কম, কোথাও বেশি। কিন্তু সামগ্রিকভাবে কওমি শিক্ষকদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
যুগান্তর : তাহলে কি কওমি শিক্ষকদের জন্য ন্যূনতম বেতন কাঠামো করা উচিত?
মাওলানা ওয়ালী উল্লাহ : আমি মনে করি, এ বিষয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। তবে বাস্তবতা বিবেচনা করতে হবে। সব মাদ্রাসার অর্থনৈতিক সক্ষমতা এক নয়। একটি বড় শহরের সমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রত্যন্ত গ্রামের একটি ছোট মাদ্রাসাকে একই কাঠামোয় বিচার করা যাবে না। তবে অন্তত একটি ন্যূনতম শিক্ষক কল্যাণনীতি থাকা দরকার। সেখানে বেতন, আবাসন, চিকিৎসা, ছুটি, জরুরি সহায়তা-এসবের একটি মৌলিক মানদণ্ড থাকতে পারে। কওমি মাদ্রাসার বোর্ডগুলো নিজেরাই এমন একটি নীতিমালা তৈরি করতে পারে।
যুগান্তর : শিক্ষকদের ছুটি নিয়েও অভিযোগ আছে। কোনো কোনো শিক্ষক মাসে মাত্র দুদিন ছুটি পান। এটি কি স্বাভাবিক?
মাওলানা ওয়ালী উল্লাহ : মাদ্রাসাভেদে ব্যবস্থা ভিন্ন। তাই মাসে দুদিন ছুটিকে সব প্রতিষ্ঠানের নিয়ম বলা যাবে না। তবে একজন শিক্ষককে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পারিবারিক সময় দিতে হবে-এটা অবশ্যই বিবেচনায় নেওয়া উচিত। আমরা শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্যের কথা বলি, কিন্তু শিক্ষকের মানসিক স্বাস্থ্যের কথাও বলতে হবে। একজন শিক্ষক যদি দীর্ঘদিন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেন, পর্যাপ্ত বিশ্রাম না পান, নিজের সন্তানকে সময় দিতে না পারেন-তাহলে এর একটা মানসিক প্রভাব তার ওপর পড়বে। এটা শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
যুগান্তর : আপনি কি মনে করেন কওমি মাদ্রাসায় পেশাদার মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা দরকার?
মাওলানা ওয়ালী উল্লাহ : অবশ্যই দরকার। আমরা অনেক সময় মনে করি মাদ্রাসা মানে শুধু ইলমের জায়গা। কিন্তু এটি একইসঙ্গে একটি বড় প্রতিষ্ঠান। এখানে শিক্ষক আছেন, শিক্ষার্থী আছেন, প্রশাসন আছে, অর্থব্যবস্থা আছে, আবাসিক ব্যবস্থা আছে। সুতরাং দায়িত্ব বণ্টন, নিয়োগ, কর্মঘণ্টা, ছুটি, বেতন, পদোন্নতি-এসবের লিখিত নীতিমালা থাকা ভালো। এতে কর্তৃপক্ষেরও সুবিধা হবে, শিক্ষকেরও সুবিধা হবে।
যুগান্তর : শিক্ষার্থী নিরাপত্তা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে। আপনার পরামর্শ কী?
মাওলানা ওয়ালী উল্লাহ : শিক্ষার্থী নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো আপস করা উচিত নয়। কোনো শিক্ষক বা কর্মকর্তা যদি শিক্ষার্থীর ওপর অন্যায় করেন, সেটি শিক্ষকতার মর্যাদাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। তবে অভিযোগ এবং অপরাধ-দুটিকে আলাদা করতে হবে। অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী বলা যাবে না; আবার অভিযোগ উঠেছে বলে সেটি চাপা দেওয়াও যাবে না।
যুগান্তর : শারীরিক শাস্তি নিয়ে আপনার অবস্থান কী?
মাওলানা ওয়ালী উল্লাহ : শিক্ষার্থীর সংশোধন ও শাস্তির মধ্যে পার্থক্য আছে। শিক্ষককে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে, কিন্তু শারীরিক নির্যাতন কোনো সমাধান নয়। শিক্ষার্থীকে ভালোবাসা, বোঝানো, পরামর্শ দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যে ভারসাম্য থাকতে হবে। কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষকরা যেহেতু শিক্ষার্থীদের চরিত্র গঠনের দায়িত্ব নেন, তাদের নিজেদের আচরণও সেই আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
যুগান্তর : কওমি শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান নিয়েও প্রশ্ন আছে। এর সমাধান কী?
মাওলানা ওয়ালী উল্লাহ : এখানে বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চিন্তা করতে হবে। একজন কওমি শিক্ষার্থী আলেম হবেন, শিক্ষক হবেন, ইমাম-খতিব হবেন-এটি অত্যন্ত সম্মানজনক পথ। কিন্তু সবাই একই পেশায় যাবেন এমন নয়। ভাষা, প্রযুক্তি, লেখালেখি, সাংবাদিকতা, গবেষণা, ব্যবসা, প্রশাসন-বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থাকা উচিত।
যুগান্তর : মাদ্রাসার অর্থনৈতিক সংকটের কারণে শিক্ষককে কম বেতন দেওয়া হয়-এমন যুক্তি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আসে। আপনি কীভাবে দেখেন?
মাওলানা ওয়ালী উল্লাহ : এখানে কর্তৃপক্ষের বাস্তব সমস্যাটিও বুঝতে হবে। অনেক কওমি মাদ্রাসা সাধারণ মানুষের দান, জাকাত, সদকা ও ওয়াকফের ওপর নির্ভরশীল। সব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা সমান নয়। তাই শুধু কর্তৃপক্ষকে দোষ দিলে সমাধান হবে না। বরং মাদ্রাসার আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। মানুষকে জানাতে হবে তাদের দান কোথায় ব্যয় হচ্ছে।
যুগান্তর : কওমি মাদ্রাসার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কী বলে আপনি মনে করেন?
মাওলানা ওয়ালী উল্লাহ : আমি ‘সবচেয়ে বড়’ একটি দুর্বলতা বলতে চাই না। তবে একটি বড় সমস্যা হলো-আমরা অনেক জায়গায় পরিবর্তিত বাস্তবতার জন্য নিজেদের পর্যাপ্তভাবে প্রস্তুত করছি না। সমাজ বদলেছে। মানুষের প্রয়োজন বদলেছে। প্রযুক্তি বদলেছে। কর্মক্ষেত্র বদলেছে। শিক্ষাব্যবস্থাকেও সেই পরিবর্তন বুঝতে হবে। তবে পরিবর্তন মানে নিজের শিকড় কেটে ফেলা নয়।
যুগান্তর : সাম্প্রতিক নেতিবাচক সংবাদে যারা কওমি মাদ্রাসাকে পুরোপুরি ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান হিসাবে দেখছেন এবং যারা সব সমালোচনাকে অপপ্রচার বলছেন-দুপক্ষকে আপনি কী বলবেন?
মাওলানা ওয়ালী উল্লাহ : দুপক্ষের প্রতিই আমার কথা হলো-বাস্তবতাকে দেখুন। কওমি মাদ্রাসার বড় অবদান আছে-এটি অস্বীকার করা যাবে না। আবার কওমি মাদ্রাসায় কোনো সমস্যা নেই-এ কথাও বলা যাবে না। ভালো কাজকে ভালো বলতে হবে, অন্যায়কে অন্যায় বলতে হবে। আমি মনে করি, কওমি মাদ্রাসাকে রক্ষা করার সবচেয়ে ভালো পথ হলো-একে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন না করা। শিক্ষককে সম্মান দিতে হবে, শিক্ষার্থীকে নিরাপদ রাখতে হবে, প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে এবং শিক্ষাকে সময়ের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে হবে।

