Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

প্রবৃত্তির সাম্রাজ্যে শুদ্ধির লড়াই ইমাম গাজ্জালীর অন্তর জয়ের মন্ত্র

Advertisement

Icon

সাব্বির রহমান

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

ইমাম গাজ্জালীর দর্শনে মানবদেহের হৃদয় বা ‘কলব’ হলো সাম্রাজ্যের এক সম্রাট, আর অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো তার বাধ্য অনুগত প্রজা। রাজপ্রাসাদ সমতুল্য হৃদয় যদি পঙ্কিলতায় ডুবে থাকে, তবে পুরো জীবনই বিভ্রান্তির ঘোর অমানিশায় তলিয়ে যায়। তার অনুসৃত আত্মশুদ্ধির ভাবধারাকে যদি আমরা আধুনিক জীবনের ক্যানভাসে সাজাই, তবে ৮টি প্রধান অনুশাসন রূপ নেয় আমাদের অন্তরের পথপ্রদর্শক হিসাবে :

আত্মোপলব্ধি ও মুহাসাবা (নিজেকে চেনার আয়না)

আত্মশুদ্ধির প্রথম পাঠই হলো স্বকীয় অস্তিত্বকে চেনা, ‘যে নিজেকে চিনেছে, সে তার রবকে চিনেছে’। গাজ্জালীর মতে, একজন সচেতন মুমিনের সবচেয়ে বড় কাজ হলো প্রতিদিন নিজের মনের আয়নায় নিজেকে মুখোমুখি দাঁড় করানো। দিনশেষে একজন ব্যবসায়ী যেমন কড়ায়-গ্লায় লাভ-ক্ষতির হিসাব কষে, ঠিক তেমনি রাতের নির্জনতায় বালিশে মাথা রাখার আগে সারা দিনের ইমান, আমল ও আচরণের চুলচেরা পর্যালোচনা করাই হলো ‘মুহাসাবা’।

আত্মপ্রবৃত্তির লাগাম ধরা (মুখালাফাতুন নফস)

মানুষের ভেতর প্রতিনিয়ত তিনটি অদৃশ্য শক্তি অবস্থান করে, পশুশক্তি (কাম ও ক্রোধ), শয়তানি শক্তি (প্রতারণা ও অহংকার) এবং রব্বানি বা আত্মিক শক্তি। আত্মশুদ্ধির মূল সংগ্রামটিই হলো প্রথম দুটি শক্তিকে কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করে নিজের ভেতরের রব্বানি শক্তিকে বিজয়ী করা। নফসের অন্যায্য আবদারকে প্রশ্রয় না দিয়ে বিপরীত পথে হাঁটাই হলো আত্মপ্রবৃত্তির লাগাম টেনে ধরার প্রধান কৌশল।

অন্তরের গহিন ব্যাধি নিরাময়

দেহের ব্যথাবেদনায় আমরা চিকিৎসকের দ্বারে ছুটি, কিন্তু মনের ব্যাধিগুলোকে নিঃশব্দে বাড়তে দিই। গাজ্জালী আত্মার প্রধান তিনটি ঘাতক ব্যাধিকে চিহ্নিত করেছেন, নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার ‘অহংকার’ (কিবর), অন্যের ভালো দেখে অন্তরে জ্বালা ধরা ‘হিংসা’ (হাসাদ) এবং স্রষ্টার বদলে মানুষের সাধুবাদ পাওয়ার বাসনা অর্থাৎ ‘লোকদেখানো আমল’ (রিয়া)। এগুলোকে দূর করতে তিনি বিষের বদলে প্রতিষেধক ব্যবহারের মতো বিপরীত গুণ চর্চার নির্দেশ দিয়েছেন।

তাওবা : কলুষমুক্ত হয়ে ফেরার আকুলতা

তাওবা হলো পঙ্কিলতার জগৎ ছেড়ে আধ্যাত্মিক শুভ্রতায় ফিরে আসার পরম তোরণ। শুধু ঠোঁটের কোণে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ জপ করা তাওবা নয়। গাজ্জালীর মতে, তাওবা হলো অতীতের ভুলের জন্য হৃদয়ের গভীর থেকে রক্তক্ষরণ অনুভব করা, তাৎক্ষণিকভাবে পাপের পথ বর্জন করা এবং ভবিষ্যতে আর কখনো সেদিকে না ফেরার এক ইস্পাতকঠিন অঙ্গীকার।

‘তাখলিয়া’ ও ‘তাহলিয়া’র সুষম ভারসাম্য

গাজ্জালীর আত্মশুদ্ধি দর্শনের অনন্য দুটি স্তম্ভ হলো তাখলিয়া ও তাহলিয়া। জমি থেকে আগাছা ও বিষাক্ত পাথর না উপড়ে যেমন ভালো ফসল আশা করা যায় না, ঠিক তেমনি মন থেকে হিংসা, লোভ ও দুনিয়াদারি ঝেড়ে ফেলা হলো ‘তাখলিয়া’ (পাপমুক্তকরণ)। আর সেই পরিচ্ছন্ন শুশ্রূষা করা হৃদয়ে তাকওয়া, ধৈর্য (সবর), কৃতজ্ঞতা (শুকর) ও নিষ্ঠার (ইখলাস) বীজ রোপণ করাই হলো ‘তাহলিয়া’ (গুণাবলিতে ভূষিতকরণ)। এই দুইয়ের ভারসাম্যেই আত্মিক বিকাশ ঘটে।

উযলাত ও ফিকর (নীরবতা ও জিকিরের আরাধনা)

অপ্রয়োজনীয় কথামালা, অতিরিক্ত আড্ডা আর কোলাহল মানুষের হৃদয়কে পাথরের মতো শক্ত ও সংবেদনহীন করে ফেলে। তাই গাজ্জালী আত্মশুদ্ধির জন্য কোলাহল ছেড়ে মাঝে মাঝে ‘উযলাত’ বা নীরবতার আশ্রয়ে যেতে বলেছেন। নির্জনতায় বসে হৃদয়ের গভীরে স্রষ্টার জিকিরে মশগুল হওয়া এবং নিজের নশ্বরতা ও আখেরাত নিয়ে চিন্তামগ্ন (ফিকর) হওয়া অন্তরকে বরফের মতো গলিয়ে দ্যুতিময় করে তোলে।

কানায়াত ও যুহ্দ (অল্পে তুষ্টির রাজকীয়তা)

দুনিয়ার ধন-সম্পদ ও পদের মোহ মানুষকে পশুর স্তরে নামিয়ে আনে। গাজ্জালীর ‘যুহ্দ’ বা দুনিয়াবিমুখতার অর্থ এই নয় যে সংসার ছেড়ে পাহাড়ে গিয়ে বাস করতে হবে। প্রকৃত অর্থ হলো, দুনিয়া থাকবে হাতের মুঠোয়, কিন্তু তার প্রতি ভালোবাসা কখনো প্রবেশ করবে না হৃদয়ের গভীরে।

সুহবাত ও আদর্শ পথপ্রদর্শকের সান্নিধ্য

আত্মার গহিন অন্ধকারের পথ একা অতিক্রম করা প্রায় অসম্ভব। নিজের অন্তরের সুপ্ত দোষত্রুটিগুলো খালি চোখে দেখা যায় না। গাজ্জালীর মতে, আত্মশুদ্ধির যাত্রায় একজন অভিজ্ঞ, আধ্যাত্মিকভাবে সমৃদ্ধ পথপ্রদর্শক এবং সৎসঙ্গের (সুহবাত) সান্নিধ্য অপরিহার্য। যেমন একটি মোমবাতি আরেকটি প্রজ্বলিত মোমের সংস্পর্শে এলেই শুধু আলো ছড়িয়ে দিতে পারে, তেমনি কামেল মানুষের সংশ্রব মনের ভেতরে জমে থাকা আঁধার এক নিমেষে দূর করে দেয়।

তাইতো গাজ্জালী বলেছেন, আমাদের হৃদয় হলো একটি অত্যন্ত স্বচ্ছ আয়না। প্রতিদিনের ছোট-বড় পাপের ধূলিকণা জমতে জমতে তা একদিন ঘোলা হয়ে আলো প্রতিফলনের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তাওবা, জিকির ও নির্ভেজাল আত্মশুদ্ধির সিসা দিয়ে যদি সেই আয়নার ধুলো মুছে আবার সাফ করা যায়, তবেই তাতে প্রতিফলিত হবে স্রষ্টার অচিন্ত্যনীয় নূর এবং পরম প্রশান্তির হাওয়া।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

কওমি মাদ্রাসার জন্য প্রয়োজন আত্মসমালোচনা

কওমি মাদ্রাসার জন্য প্রয়োজন আত্মসমালোচনা

প্রবৃত্তির সাম্রাজ্যে শুদ্ধির লড়াই ইমাম গাজ্জালীর অন্তর জয়ের মন্ত্র

প্রবৃত্তির সাম্রাজ্যে শুদ্ধির লড়াই ইমাম গাজ্জালীর অন্তর জয়ের মন্ত্র

ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকার

ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকার

জ্ঞানের বাতিঘর ও দ্বীনের প্রহরী আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.)

জ্ঞানের বাতিঘর ও দ্বীনের প্রহরী আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.)

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম