ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকার
Advertisement
মো. লোকমান হেকিম
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসের জন্য প্রতিবেশীর সঙ্গে সৌহার্দ, সহমর্মিতা ও সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি। ইসলাম প্রতিবেশীর অধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.) বিভিন্ন হাদিসে প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণ, সহযোগিতা ও দায়িত্ব পালনের শিক্ষা দিয়েছেন।
প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার অভাব-অনটনের প্রতি খেয়াল রাখা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি নিজের প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে নিজে পেটপুরে খায়, সে প্রকৃত মুমিন নয়। অর্থাৎ একজন মুসলমান নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের পাশাপাশি প্রতিবেশীর প্রয়োজন ও কষ্টের প্রতিও দায়িত্বশীল হবে।
প্রতিবেশীর সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেওয়ার শিক্ষাও দিয়েছেন মহানবী (সা.)। হজরত আবু জর (রা.)-কে তিনি বলেছেন, তরকারি রান্নার সময় তাতে বেশি করে পানি দিতে এবং তা দিয়ে প্রতিবেশীর প্রতি লক্ষ্য রাখতে। এ শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়-সামর্থ্য কম হলেও আন্তরিকতার সঙ্গে প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানো সম্ভব।
শুধু খাবার বা বস্তুগত সহযোগিতাই নয়, প্রতিবেশীকে কোনোভাবেই কষ্ট দেওয়া যাবে না। এক হাদিসে এমন এক নারীর কথা এসেছে, যিনি অনেক নফল ইবাদত করতেন; কিন্তু মুখের কথায় প্রতিবেশীকে কষ্ট দিতেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) তার পরিণাম জাহান্নাম বলে সতর্ক করেছেন। বিপরীতে, যে নারী বেশি নফল ইবাদত না করলেও প্রতিবেশীকে কষ্ট দিতেন না, তার জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়, মানুষের অধিকার ও প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণ ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবেশীর মধ্যে যিনি সবচেয়ে কাছের, তার প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়ার কথাও হাদিসে এসেছে। হজরত আয়েশা (রা.)-কে রাসূলুল্লাহ (সা.) নিকটবর্তী প্রতিবেশীকে উপহার দেওয়ার পরামর্শ দেন। তাই নিকটবর্তী প্রতিবেশীর সুবিধা-অসুবিধা, বিপদ-আপদ ও প্রয়োজনের প্রতি আমাদের বেশি নজর দেওয়া উচিত।
প্রতিবেশীর সঙ্গে ভালো আচরণ করা আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ভালোবাসারও নিদর্শন। মহানবী (সা.) সত্য কথা বলা, আমানত রক্ষা করা এবং প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচরণকে উত্তম চরিত্রের অংশ হিসাবে উল্লেখ করেছেন। প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করা, তাকে অপমান করা কিংবা তার ক্ষতি করা ইসলামের আদর্শের পরিপন্থি।
প্রতিবেশীর অধিকার নষ্ট করার পরিণামও অত্যন্ত ভয়াবহ। হাদিসে এসেছে, কিয়ামতের দিন মানুষের অধিকারসংক্রান্ত বিষয়গুলোর মধ্যে প্রতিবেশীদের পারস্পরিক অন্যায়-অবিচারের বিষয়ও গুরুত্ব পাবে। তাই প্রতিবেশীর সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ না করে ক্ষমা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে বসবাস করা উচিত।
উপহার আদান-প্রদানও প্রতিবেশীদের মধ্যে ভালোবাসা ও সম্প্রীতি বাড়ায়। উপহার ছোট হলেও তাকে তুচ্ছ করা উচিত নয়। সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিবেশীর সঙ্গে খাবার, প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিংবা আনন্দের কোনো উপলক্ষ্য ভাগ করে নেওয়া সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করে।
মহানবী (সা.) প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া সম্পর্কে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেছেন, যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়, তার ইমানের ব্যাপারে সতর্ক হওয়া উচিত। তাই প্রকৃত মুমিন কখনো প্রতিবেশীর জন্য ভয়, কষ্ট বা ক্ষতির কারণ হতে পারে না।
প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা শুধু ব্যক্তিগত নৈতিকতার বিষয় নয়; এটি একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি। পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা, সৌজন্য ও ভালোবাসার মাধ্যমে প্রতিবেশীরা বসবাস করলে সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হয়। মহানবী (সা.)-এর শিক্ষার আলোকে তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত-প্রতিবেশীর সুখে আনন্দিত হওয়া, দুঃখে পাশে দাঁড়ানো, প্রয়োজনের সময় সহযোগিতা করা এবং কোনোভাবেই তাকে কষ্ট না দেওয়া। এভাবেই প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করে আমরা একটি মানবিক, সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলতে পারি।
