দিল্লির রাজপথে ঢাকার প্রতিধ্বনি: মোদির ভবিষ্যৎ কোন পথে?
Advertisement
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১০ এএম
সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ঢাকার রাজপথে যে আগুন জ্বলে উঠেছিল, যে আগুনের সামনে ক্ষমতার দুর্ভেদ্য দুর্গও শেষ পর্যন্ত টিকতে পারেনি, দিল্লির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্তাপের দিকে তাকালে সেই স্মৃতি আবারও ফিরে আসে। প্রশ্ন জাগে, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে কি আরেকটি ঐতিহাসিক পালাবদলের পূর্বাভাস তৈরি হচ্ছে? নরেন্দ্র মোদির দীর্ঘদিনের ক্ষমতার বলয় কি এবার তরুণদের ক্ষোভ, নাগরিকের ভোটাধিকার নিয়ে বিতর্ক এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির প্রশ্নে কঠিন পরীক্ষার মুখে?
দিল্লির রাজপথে প্রতিটি নতুন ঘটনা যেন এই প্রশ্নকে আরও তীক্ষ্ণ করে তুলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া খবর, রাজনৈতিক উত্তেজনা, আন্দোলনকারীদের নিয়ে বিতর্ক এবং প্রশাসনের ভূমিকা ঘিরে জনমনে তৈরি হচ্ছে নানা জিজ্ঞাসা। একদিকে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের দৃঢ় অবস্থান, অন্যদিকে নিজেদের অধিকার, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন তরুণ প্রজন্ম—এই দুইয়ের সংঘাত ভারতীয় গণতন্ত্রের সামনে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ তুলে ধরছে। আন্দোলনের কণ্ঠস্বরকে কতটা সহ্য করতে পারে রাষ্ট্র, আর রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা কতটা অটুট রয়েছে, সেই প্রশ্নই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
ঢাকার অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে, কোনো আন্দোলনের সূচনা আর তার পরিণতি সব সময় এক বিন্দুতে থাকে না। একটি নির্দিষ্ট দাবি থেকে শুরু হওয়া প্রতিবাদও শাসকের ঔদ্ধত্য, দমন-পীড়ন কিংবা জবাবদিহির অভাবের কারণে বৃহত্তর রাজনৈতিক অসন্তোষে রূপ নিতে পারে। তরুণদের কণ্ঠকে অবজ্ঞা করা, নাগরিকের ন্যায্য প্রশ্নকে ষড়যন্ত্রের তকমা দেওয়া কিংবা বিরোধী মতকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা—এসবের পরিণতি কখনো কখনো শাসকের নিজের হিসাবকেও ওলটপালট করে দেয়। তাই দিল্লির পরিস্থিতিকে কেবল সাময়িক রাজনৈতিক উত্তেজনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; একই সঙ্গে যাচাইযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে বুঝতে হবে, সেখানে আসলে কী ঘটছে, কারা আন্দোলন করছে এবং তাদের দাবির প্রতি রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া কী।
দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে ক্ষমতার স্থায়িত্ব আর জনগণের আস্থার সম্পর্ক বারবার নতুন করে সামনে এসেছে। শ্রীলঙ্কায় গণবিক্ষোভ, বাংলাদেশে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে চলমান বিতর্ক আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জনগণের সমর্থন কোনো শাসকের স্থায়ী সম্পত্তি নয়। নির্বাচন, সংবিধান, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, মুক্ত গণমাধ্যম এবং নাগরিকের প্রতিবাদের অধিকারই গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি। এই প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হলে ক্ষমতার বাহ্যিক দৃঢ়তার আড়ালেও সংকট জমতে থাকে।
সেই কারণেই দিল্লির রাজপথের দিকে তাকিয়ে আজ একটি প্রশ্ন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ: নরেন্দ্র মোদি কি জনগণের অসন্তোষ ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহির প্রশ্নগুলোকে মোকাবিলা করে নতুন আস্থা গড়ে তুলতে পারবেন, নাকি রাজনৈতিক সংঘাত আরও গভীর হবে? ঢাকার স্মৃতি আর দিল্লির বর্তমান বাস্তবতার তুলনা আমাদের আবেগতাড়িত করতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের যথার্থ শিক্ষা পেতে হলে আবেগের পাশাপাশি তথ্য, যুক্তি ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ ক্ষমতার ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় শুধু রাজপথের স্লোগানে নয়, জনগণের আস্থা, প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং শাসকের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েও।
২০২৬ সালের ১০ অক্টোবর ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির নেতৃত্বে তরুণদের একটি আন্দোলন এবং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অংশগ্রহণে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভের কর্মসূচি নেওয়া হয়। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ার বিষয়টি এই প্রতিবাদের কেন্দ্রে রয়েছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ার ফলে বহু বৈধ ভোটারের ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন বিজেপি অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করে তালিকা সংশোধনকে নিয়মিত যাচাইপ্রক্রিয়ার অংশ বলে দাবি করছে।
বিক্ষোভের আগে থেকেই দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়। যন্তর-মন্তরের দিকে যাওয়ার পথগুলোতে ব্যারিকেড বসানো হয়, বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয় এবং কয়েকটি মেট্রো স্টেশনের কার্যক্রম সীমিত বা বন্ধ রাখা হয়। মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা স্থগিত করার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। ১০ অক্টোবর বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার আগে আন্দোলনের সংগঠক, ছাত্রনেতা, রাজনৈতিক কর্মী ও বিভিন্ন বিরোধী দলের নেতাদের আটক করার খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে দুই হাজারের বেশি বিক্ষোভকারীকে আটকের কথা বলা হয়েছে; অন্য সংবাদমাধ্যমে আটকের সংখ্যা ও পরিধি নিয়ে ভিন্ন তথ্য এসেছে।
এই ঘটনাগুলোকে ঘিরে বিতর্কের মূল জায়গা হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করার মধ্যে ভারসাম্য কতটা বজায় রাখা হয়েছে। কোনো বিক্ষোভে সহিংসতার আশঙ্কা থাকলে প্রশাসনের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু সেই ব্যবস্থা যদি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ, সংবাদ সংগ্রহ কিংবা নাগরিকের স্বাভাবিক চলাচলের পথও অযৌক্তিকভাবে সংকুচিত করে, তবে তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিরাপত্তার যুক্তি যেন নাগরিক অধিকার খর্ব করার স্থায়ী অজুহাতে পরিণত না হয়।
বিক্ষোভের অনুমতি নিয়ে প্রশাসন ও আয়োজকদের মধ্যে বিরোধও সামনে এসেছে। দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়সীমা ও পূর্ববর্তী কর্মসূচির শর্তসংক্রান্ত কারণে তারা প্রস্তাবিত সমাবেশের অনুমতি দেয়নি। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, এই বিধিনিষেধের উদ্দেশ্য ছিল তাদের কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করা। এই দুই অবস্থানের মধ্যে কোনটি কতটা যুক্তিসংগত, তা নির্ধারণে প্রশাসনিক নথি, প্রযোজ্য আইন এবং প্রত্যক্ষ ঘটনাপ্রবাহের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন প্রয়োজন। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিবাদের অধিকার এবং জননিরাপত্তা পরস্পরের প্রতিপক্ষ হওয়ার কথা নয়।
এই আন্দোলনের বিশেষত্ব শুধু এর রাজনৈতিক দাবিতে নয়, এর প্রতীকী পরিচয়েও। ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকা নামটি এসেছে তরুণদের প্রতি অবমাননাকর ভাষা ব্যবহারের প্রতিবাদ থেকে। ভারতের জাতীয় মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা নিট-সংক্রান্ত প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষাব্যবস্থার অনিয়মের অভিযোগে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এই প্রতিবাদের বিস্তার ঘটে। পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য দীর্ঘদিন পরিশ্রম করা শিক্ষার্থীদের কাছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ শুধু একটি পরীক্ষার অনিয়ম নয়; এটি তাদের ভবিষ্যৎ, যোগ্যতার মূল্যায়ন এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার প্রশ্ন।
এই প্রেক্ষাপটে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক পরিচয় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। শিক্ষাব্যবস্থার জবাবদিহি, পরীক্ষার স্বচ্ছতা এবং তরুণদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়ে শুরু হওয়া অসন্তোষ ধীরে ধীরে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্নে গড়ায়। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত তরুণেরা নিজেদের অবমাননাকর পরিচয়কেই প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত করেছেন। তাদের বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, কাউকে তুচ্ছ করে তার প্রশ্নকে অগ্রাহ্য করা যায়, কিন্তু তার ক্ষোভের কারণ দূর করা যায় না।
আন্দোলনের চাপের মুখে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের ঘটনাও এই ধারাবাহিকতার অংশ। নিট পরীক্ষার অনিয়মের অভিযোগ ও শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে তার পদত্যাগ ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার তদারকি এবং পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ককে আরও জোরালো করে। তবে একজন মন্ত্রীর পদত্যাগই যে সমস্যার সমাধান, তা নয়। পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা, তদন্তের স্বচ্ছতা, দায়ীদের জবাবদিহি এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের ন্যায্যতা নিশ্চিত করা না গেলে একই ধরনের অসন্তোষ আবারও ফিরে আসতে পারে।
এখানেই বাংলাদেশের ২০২৪ সালের আন্দোলনের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য দেখা যায়। বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবি থেকে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তা দ্রুত বৃহত্তর রাজনৈতিক অসন্তোষে রূপ নেয়। শিক্ষার্থীদের দাবি, রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া এবং সংঘাতের তীব্রতা আন্দোলনের চরিত্র বদলে দেয়। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। এই অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, তরুণদের একটি নির্দিষ্ট দাবি কখনো কখনো রাষ্ট্র পরিচালনা, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্নের সূচনা করতে পারে।
তবে বাংলাদেশ ও ভারতের পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ এক করে দেখা যুক্তিসংগত হবে না। দুই দেশের রাজনৈতিক কাঠামো, নির্বাচনব্যবস্থা, সামাজিক বাস্তবতা, বিরোধী দলগুলোর অবস্থান এবং আন্দোলনের ইতিহাস আলাদা। বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থান একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে সংঘটিত হয়েছে। ভারতের বর্তমান আন্দোলনও নিজস্ব রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। তাই ঢাকার অভিজ্ঞতা দিল্লির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সতর্কতামূলক শিক্ষা দিতে পারে, কিন্তু তা থেকে ভারতের সরকারের পতন অবধারিত—এমন সিদ্ধান্ত টানা যায় না।
দিল্লির সাম্প্রতিক আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসআইআর প্রক্রিয়ায় দেশজুড়ে প্রায় ১৩ কোটি ভোটার-নাম বাদ পড়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে নাম বাদ পড়া মানেই সব ক্ষেত্রে বৈধ ভোটারকে ইচ্ছাকৃতভাবে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। ভোটার তালিকা থেকে মৃত ব্যক্তি, স্থানান্তরিত ভোটার কিংবা একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত নাম বাদ দেওয়ার বৈধ প্রয়োজন থাকতে পারে। একই সঙ্গে যাচাইপ্রক্রিয়ার ত্রুটি, পর্যাপ্ত নোটিশের অভাব কিংবা পরিচয়সংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রকৃত ভোটারের নাম বাদ পড়লে সেটিও গুরুতর সমস্যা।
এই বিতর্কের সমাধান রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে বেশি নির্ভর করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়া ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের ওপর। কতজনের নাম বাদ পড়েছে, তাদের মধ্যে কতজন মৃত, কতজন স্থানান্তরিত এবং কতজন জীবিত ও যোগ্য ভোটার—এসব তথ্য পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করা জরুরি। যাদের নাম বাদ পড়েছে, তাদের আপিল ও পুনর্বহালের কার্যকর সুযোগ দিতে হবে। নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা বজায় রাখতে হলে তার সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি, তথ্য ও প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
একটি নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা শুধু ভোটের দিন কেন্দ্রের পরিবেশের ওপর নির্ভর করে না। ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে প্রার্থী মনোনয়ন, প্রচার, ভোটগ্রহণ, গণনা এবং ফলাফল ঘোষণার প্রতিটি ধাপের ওপর জনগণের আস্থা থাকতে হয়। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ তৈরি হলে তার প্রভাব নির্বাচনের ফলাফলের বাইরেও বিস্তৃত হয়। নাগরিকের মনে যদি প্রশ্ন জাগে যে তার ভোট আদৌ গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হবে কি না, তবে রাজনৈতিক ব্যবস্থার বৈধতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
ভারতের মতো বিশাল ও বৈচিত্র্যময় গণতন্ত্রে এই প্রশ্নের গুরুত্ব আরও বেশি। ধর্ম, ভাষা, জাতিগত পরিচয়, অঞ্চল ও সামাজিক অবস্থানের বৈচিত্র্যের মধ্যে নির্বাচনই নাগরিকদের সমান রাজনৈতিক মর্যাদার একটি প্রধান ভিত্তি। সেই ভিত্তি দুর্বল হলে শুধু বিরোধী দল নয়, সামগ্রিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই নির্বাচন কমিশনের উচিত অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক বিরোধিতা বলে উড়িয়ে না দিয়ে তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে স্বাধীন তদন্ত ও সংশোধনের সুযোগ রাখা।
২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর নরেন্দ্র মোদি ভারতীয় রাজনীতিতে নিজের শক্ত অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার নেতৃত্বে বিজেপি একাধিক নির্বাচনে সাফল্য পেয়েছে, জাতীয় রাজনীতিতে দলটির প্রভাব বিস্তৃত হয়েছে এবং সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো দেশটির অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা কোনো সরকারের জন্যই জনসমর্থনকে স্থায়ী বলে ধরে নেওয়া নিরাপদ নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থান, শিক্ষার সুযোগ, মূল্যস্ফীতি, সামাজিক সম্প্রীতি, নাগরিক স্বাধীনতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ এই রাজনৈতিক পরীক্ষার একটি বড় অংশ। ভারতের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর কাছে শিক্ষা ও কর্মসংস্থান কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয় নয়; এগুলো সামাজিক মর্যাদা, আত্মনির্ভরতা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ কিংবা নিয়োগপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা তাদের মনে এই ধারণা তৈরি করতে পারে যে পরিশ্রম ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না। এই অনুভূতি যখন বৃহত্তর রাজনৈতিক অবিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন অসন্তোষের পরিধি দ্রুত বাড়তে পারে।
মোদি সরকারের সামনে তাই শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন নয়, বরং জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সরকারের উচিত আন্দোলনকারীদের প্রতিটি বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়া নয়; বরং যেসব অভিযোগের ভিত্তি রয়েছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা। যেসব অভিযোগ তথ্যের সঙ্গে মেলে না, সেগুলোরও প্রমাণভিত্তিক ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন। প্রশাসনিক ক্ষমতা দিয়ে সাময়িকভাবে একটি সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করা সম্ভব, কিন্তু নাগরিকের মনে জমে থাকা প্রশ্নের স্থায়ী সমাধান করা যায় না।
এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বিচারব্যবস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকেরা যেন ভয় বা বাধা ছাড়াই ঘটনাস্থল থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন, আটক ব্যক্তিরা যেন আইনগত সহায়তা পান এবং আদালত যেন প্রতিটি অভিযোগের বিচার স্বাধীনভাবে করতে পারেন—এসবই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক শর্ত। সরকারের সমালোচনা করা রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়; বরং ভুল সংশোধন এবং নীতির উন্নয়নের জন্য সমালোচনা অনেক সময় অপরিহার্য।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। ভোটাধিকার, নাগরিক স্বাধীনতা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে না পারলে আন্দোলনের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আন্দোলনের নেতৃত্বকে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ, তথ্যের নির্ভুলতা এবং সহিংসতা পরিহারের নীতিতে অটল থাকতে হবে। একই সঙ্গে সরকারের উচিত বিরোধী দলের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইন সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা। গণতন্ত্রের শক্তি কোনো একটি পক্ষের নিরঙ্কুশ বিজয়ে নয়, বরং ভিন্নমতের সহাবস্থান ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধায়।
বাংলাদেশের ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে একটি গভীর বার্তা রেখে গেছে। জনগণের ক্ষোভকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করা, প্রতিবাদের অধিকার সংকুচিত করা এবং রাজনৈতিক সংকটের সমাধানে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ওপর নির্ভর করা শেষ পর্যন্ত সরকারের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তবে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা কেবল একটি সরকারের পতন নয়; বরং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন এবং নাগরিকের অধিকার রক্ষা না করলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
শ্রীলঙ্কার গণবিক্ষোভও দেখিয়েছে, অর্থনৈতিক সংকট ও জনগণের আস্থাহীনতা এক পর্যায়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য গভীর সংকট তৈরি করতে পারে। নেপালসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা ভিন্ন হলেও একটি সাধারণ সত্য সামনে আসে: জনগণের প্রত্যাশা ও সরকারের সিদ্ধান্তের মধ্যে ব্যবধান বাড়তে থাকলে রাজনৈতিক চাপও বাড়ে। তবে কোনো একটি দেশের ঘটনা অন্য দেশের ভবিষ্যৎ অবধারিতভাবে নির্ধারণ করে না। রাজনৈতিক পরিণতি নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের প্রতিষ্ঠান, নেতৃত্ব, অর্থনৈতিক অবস্থা, বিরোধী শক্তির ভূমিকা এবং সংকট মোকাবিলার পদ্ধতির ওপর।
দিল্লির বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই মোদি সরকারের সামনে মূলত দুটি পথ রয়েছে। প্রথমটি হলো অভিযোগগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে স্বচ্ছ তদন্ত, জবাবদিহি ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে আনা। দ্বিতীয়টি হলো বিরোধিতাকে প্রধানত নিরাপত্তার সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করা। দ্বিতীয় পথ সাময়িকভাবে রাজপথের দৃশ্যমান উত্তেজনা কমাতে পারে, কিন্তু অভিযোগের মূল কারণ অমীমাংসিত থাকলে অসন্তোষ আরও গভীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সুতরাং ঢাকা থেকে কলম্বো, নাইরোবি থেকে কাঠমান্ডু—ইতিহাসের শিক্ষা অত্যন্ত নির্মম ও সত্য। যখন তরুণ সমাজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে এবং নিজেদের অধিকার ও মর্যাদার লড়াইয়ে রাজপথে নেমে আসে, তখন বন্দুকের গুলি কিংবা প্রশাসনিক দমননীতি দিয়ে সেই স্রোত আটকানো যায় না। নয়াদিল্লির শাসকগোষ্ঠী যদি রাজপথের এই দেয়াল লিখন পড়তে ব্যর্থ হয়, তবে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশটিতে জেন-জি তরঙ্গের ধাক্কায় মোদি সরকারের সামনেও একটি ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানই হয়তো অপেক্ষা করছে!
আহসান হাবিব বরুন
সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected]

