ক্ষমতার অপব্যবহার যেন নতুন অপরাধের জন্ম না দেয়
Advertisement
আবু হেনা রাজ্জাকী
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২৩ পিএম
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একটি সমাজে অপরাধের বিস্তার কখনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, অন্যায়ের প্রশ্রয় এবং আইনের প্রয়োগে বৈষম্য। বিশেষ করে সমাজের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে আইন অমান্য, জনসম্পত্তি দখল কিংবা অবৈধ অর্থ উপার্জনের অভিযোগ উঠলে এবং তার যথাযথ প্রতিকার না হলে তা সমাজের অন্যান্য স্তরেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এ ধরনের কর্মকাণ্ড যেন অন্যদের কাছে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে না ওঠে।
সম্প্রতি সংবাদপত্রে প্রকাশিত আশুলিয়ার কামারপাড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের জমিসংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন আমাদের সামনে তেমনই এক উদ্বেগজনক প্রশ্ন তুলে ধরেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে কামারপাড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের ১৬৪ শতক জমি একটি প্রস্তাবিত মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল এলাকার সাধারণ মানুষের জন্য উন্নত চিকিৎসাসেবার সুযোগ সৃষ্টি করা। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, প্রায় শতকোটি টাকা মূল্যের সেই জমিতে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে কাঁচাবাজারের আড়ত গড়ে তোলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, ওই আড়ত থেকে প্রতি মাসে প্রায় ১৬ লাখ টাকা ভাড়া আদায় করা হচ্ছে এবং সেই অর্থ সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে ভাগাভাগি হচ্ছে। এমনকি জমিটি স্থায়ীভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রচেষ্টার অভিযোগও রয়েছে।
এসব অভিযোগ অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে তা শুধু একটি জমি দখলের ঘটনা নয়; বরং জনকল্যাণের জন্য নির্ধারিত সম্পদকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহারের গুরুতর দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।
একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার জন্য নির্ধারিত জমি নিয়ে এমন অভিযোগের গুরুত্ব কেবল তার আর্থিক মূল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সেখানে একটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হলে অসংখ্য মানুষ চিকিৎসাসেবার সুযোগ পেতে পারতেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারত এবং এলাকার স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতো। জনকল্যাণের সেই সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ তাই স্বাভাবিকভাবেই গভীর উদ্বেগের বিষয়।
তবে এই ঘটনার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে, যা আমাদের বিশেষভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় পর্যায়ের কোনো নেতার বিরুদ্ধে যদি জনসম্পত্তি দখল করে নিয়মিত বিপুল অর্থ উপার্জনের অভিযোগ ওঠে এবং তার কার্যকর প্রতিকার না হয়, তাহলে আশপাশের এলাকার অন্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যেও একই ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা সৃষ্টি হতে পারে।
কেউ বাজার দখল, কেউ ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ, কেউ পরিবহণ খাত থেকে চাঁদা আদায়, আবার কেউ সরকারি জমি দখলের মাধ্যমে অবৈধ আয়ের পথ খুঁজতে উৎসাহিত হতে পারে।
এখানেই সবচেয়ে বড় আশঙ্কা—একটি অন্যায় যেন আরও দশটি অন্যায়ের জন্ম না দেয়। একজনের ক্ষমতার অপব্যবহার যেন অন্য দশজনের কাছে অবৈধ অর্থ উপার্জনের দৃষ্টান্ত হয়ে না ওঠে।
এই নেতিবাচক প্রভাব শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা নেই। সমাজের তরুণদের একটি অংশও এতে প্রভাবিত হতে পারে। একজন বেকার যুবক যখন দেখতে পায়, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাব ব্যবহার করে কেউ কেউ সহজে বিপুল অর্থ উপার্জন করছেন এবং দৃশ্যমান কোনো জবাবদিহির মুখোমুখি হচ্ছেন না, তখন তার মধ্যেও পরিশ্রমের পরিবর্তে অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জনের আকাঙ্ক্ষা জন্ম নিতে পারে।
কেউ ছিনতাই, কেউ চাঁদাবাজি, কেউ মাদক ব্যবসা, আবার কেউ কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে।
অবশ্য ছিনতাই, কিশোর গ্যাং কিংবা অন্যান্য অপরাধের পেছনে বেকারত্ব, পারিবারিক পরিবেশ, শিক্ষার অভাব এবং সামাজিক বৈষম্যসহ বিভিন্ন কারণ কাজ করে।
কিন্তু সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত গুরুতর অনিয়মের অভিযোগের প্রতিকার না হলে তা অপরাধের প্রতি একধরনের পরোক্ষ সহনশীলতা সৃষ্টি করতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি যেন কোনোভাবেই নতুন অপরাধীদের উৎসাহিত না করে, সে বিষয়ে শুরু থেকেই সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
আমরা প্রায়ই উদ্বেগ প্রকাশ করি—সমাজে ছিনতাই কেন বাড়ছে, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য কেন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস কেন বন্ধ হচ্ছে না? কিন্তু এসব অপরাধের প্রতিকার খুঁজতে গিয়ে সমাজের ওপরের স্তরে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তাও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।
একজন সাধারণ ছিনতাইকারী কয়েক হাজার টাকা ছিনতাই করলে তাকে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনা যেমন প্রয়োজন, তেমনি কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে শতকোটি টাকার সম্পত্তি দখল কিংবা মাসে লাখ লাখ টাকা অবৈধভাবে আদায়ের অভিযোগ উঠলে তারও নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে।
অপরাধের গুরুত্ব নির্ধারিত হবে তার প্রকৃতি ও প্রমাণের ভিত্তিতে, অভিযুক্ত ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে নয়।
এখানেই ইংরেজি প্রবাদটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক—‘চ্যারিটি বিগিন্স অ্যাট হোম’ অর্থাৎ ভালো কাজের সূচনা নিজের ঘর থেকেই করতে হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি সমাজ থেকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যুতা, ছিনতাই ও কিশোর অপরাধ দূর করতে চান, তাহলে সর্বপ্রথম নিজেদের সংগঠনের ভেতরে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নিজের দলের কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা আড়াল না করে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করাই দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পরিচয়।
আশুলিয়ার কামারপাড়ার আলোচিত জমির ক্ষেত্রেও প্রয়োজন জমির মালিকানা, হস্তান্তরের শর্ত, বর্তমান দখলের বৈধতা এবং ভাড়া আদায়ের প্রকৃত হিসাব যাচাই করা।
অবৈধ দখল প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী জমি উদ্ধার এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি যে জনকল্যাণমূলক উদ্দেশ্যে জমিটি দেওয়া হয়েছিল, সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের সম্ভাবনাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, তরুণ প্রজন্ম শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে নৈতিকতা শেখে না; সমাজের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের আচরণ থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করে। তারা যখন দেখে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তখন আইনের প্রতি আস্থা তৈরি হয়।
বিপরীতে প্রভাবশালীদের অনিয়মের প্রতিকার না হলে আইন অমান্য করেও পার পাওয়া সম্ভব—এমন ধারণা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
পরিশেষে বলতে চাই, সমাজ থেকে অপরাধ দূর করতে হলে শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই চলবে না; অপরাধকে উৎসাহিত করে এমন পরিবেশ ও দায়মুক্তির সংস্কৃতিরও অবসান ঘটাতে হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে উপলব্ধি করতে হবে, ক্ষমতা ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের সুযোগ নয়, বরং জনগণের কল্যাণে দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার।
আবু হেনা রাজ্জাকী
আইনজীবী ও রাজনীতি বিশ্লেষক
