Logo
Logo
×

Advertisement

দৃষ্টিপাত

বিলুপ্ত প্রায় ‘ঠার’ ভাষা সংগ্রহে একজন হাবিবুর রহমান

Advertisement

Icon

কায়েস আহমেদ সেলিম

প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৬:৪৩ পিএম

বিলুপ্ত প্রায় ‘ঠার’ ভাষা সংগ্রহে একজন হাবিবুর রহমান

ছবি: যুগান্তর

Advertisement

বিচিত্র জাত বেদেরা। ধর্ম তাদের ইসলাম। কিন্তু আচারে পুরা হিন্দু। কথিত আছে, বেদেরা আরাকান রাজ্যের মনতং আদিবাসী গোত্রের দেশত্যাগী অংশ। এরা অত্যন্ত কষ্টসহিষ্ণু ও সাহসী। এদের গাত্রবর্ণ ও আকৃতি বাঙালিদের মতোই। এরা মূলত দুটি ভাষায় কথা বলে। এক ‘বাংলা’ ভাষা; দুই ‘ঠার’ ভাষা। ‘ঠার’ এদের মাতৃভাষা। 

তবে ভাষাটির নেই কোনো বর্ণ বা লিপি। মূলত এটি কথ্য ভাষা। যা সাধারণ মানুষের বোধগম্যের বাইরে। যদিও ভাষাটি নিয়ে খুব বেশি গবেষণা হয়নি। ব্যক্তি উদ্যোগে কয়েক জন গবেষক ‘ঠার’ ভাষা নিয়ে করেছেন গবেষণা। যার ফলে বিশেষ প্রতিবেদন। তবে ‘ঠার’ নিয়ে লেখা হয়নি কোনো গ্রন্থ কিংবা পান্ডুলিপি।

ভাষা বিজ্ঞানীদের মতে, ১৬৩৮ সালে শরণার্থী আরাকানরাজ বলালরাজের সঙ্গে মনতং জাতির যে ক্ষুদ্র অংশ বাংলাদেশে প্রবেশ করে তাদের ভাষার নাম ‘ঠার’ বা ‘ঠেট’ বা ‘থেক’ ভাষা। ভাষার মাসে সেই রহস্যময় ‘ঠার’ ভাষার পূর্ণাঙ্গ বই প্রকাশ করছেন ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হাবিবুর রহমান। 

যিনি কেবল পুলিশের একজন উর্দ্ধতন কর্মকর্তাই নন, সমাজের পিছিয়ে পড়া বেদে সম্প্রদায় ও হিজড়া সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে সাক্ষাৎ দেবতা। আইন শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি তিনি অবহেলিত বেদে সম্প্রদায় ও হিজড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে কাজ করে থাকেন। 

‘বইমেলা ২০২২’ উপলক্ষে তিনি লিখেছেন ‘ঠার’, বেদে জনগোষ্ঠীর ভাষা নামক বই। যেখানে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন প্রান্তিক বেদেপল্লীর নিজস্ব ভাষা ‘ঠার’এর অদ্যোপান্ত। ২২ ফেব্রয়ারি বিকাল সাড়ে ৩টায় বইটির প্রকাশনা উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে বাংলা একাডেমির আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে। 

এ আয়োজনে উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত থাকবেন কথা সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন কবি কামাল চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক কবি ও লেখক মিনার মনসুর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান। 

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন বাংলা একাডেমির সভাপতি কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। অনুষ্ঠানে বইটির ভাবনা ও প্রস্তাবণা তুলে ধরবেন বইয়ের লেখক হাবিবুর রহমান।

সমাজের কাছে প্রায় অজানা ‘ঠার’ ভাষার প্রতি এমন আগ্রহের কথা জানতে চাইলে ডিআইজি হাবিবুর রহমান বলেন, ‘ঠার’, বেদে জনগোষ্ঠীর ভাষা বইটি দীর্ঘ আট বছর গবেষণার ফসল। শুরুর গল্পটা ছিল এরকম- ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার থাকাকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আয়োজিত বিভিন্ন সভায় বেদে প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের রীতি চালু করি। 

তিনি বলেন, বেদেরা তাতে অংশগ্রহণ করে। হঠাৎ লক্ষ করি বেদেরা নিজেদের মধ্যে একটি ভিন্ন ভাষায় কথা বলছে, যা আমাকে কৌতুহলী করে তোলে। তখন জানতে পারলাম- ভাষাটি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের অংশ। গবেষকদের কেউ কেউ একে ‘ঠার’ বা ‘ঠের’ ভাষা বলে থাকেন। যেহেতু ভাষাটির লিখিত কোনো রূপ নেই, সেহেতু শব্দটির কোনটি সত্য তা বলা মুশকিল। 

‘ঠার’ ভাষাভাষী বেদে সম্প্রদায়ের সম্পর্কে হাবিবুর রহমান বলেন, বেদে জনগোষ্ঠীর আবির্ভাব সম্পর্কে তথ্যানুসন্ধান ও সমাজ-সংস্কৃতি পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে জানতে পারি ‘ঠার’ বেদেদের স্বতন্ত্র ভাষা। যাতে অন্যরা তাদের কথাবার্তা বুঝতে না পারে। তবে বাংলা ভাষাভাষীর সঙ্গে তারা বাংলা ভাষায় কথা বলে। তাদের ভাষার সঙ্গে আরাকানদের ভাষার মিল রয়েছে। কেউ কেউ আবার ভাষাটির সঙ্গে চাক এবং কাডু ভাষার সামঞ্জস্যতার কথা বলেছেন। তবে ‘ঠার’ নিয়ে গবেষণা করে বুঝলাম, এর বেশির ভাগ শব্দই বাংলা ভাষার আদি রূপ থেকে উদ্ভুত। ভাষাবিজ্ঞানের ছাত্র বা গবেষক না হয়েও ভাষাটি সম্পর্কে কৌতূহলী মানসিকতা আমাকে উৎসাহিত করেছে। সেই থেকে বই রচনার পরিকল্পনা। যার পূর্ণাঙ্গ রূপ ‘ঠার’ বেদে জনগোষ্ঠীর ভাষা।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় সাত লাখ ৮০ হাজার বেদে জনগোষ্ঠী রয়েছে। ৫৩টি জেলায় তাদের মানবেতর জীবনযাপন। বেদেরা শতকরা ৯০ ভাগই নিরক্ষর। সামাজিকভাবেও এরা চরম অবহেলিত। নৌকায় তাদের জন্ম, নৌকায় তাদের মৃত্যু, নৌকায় তাদের বেড়ে ওঠা। ভূ-প্রকৃতি ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং নদী-নালা শুকিয়ে যাওয়ার কারণে বেদেরা জীবিকা নির্বাহের জন্য জল ছেড়ে ডাঙায় উঠে এসেছে। শিক্ষার অভাব, নাগরিক সুবিধা বঞ্চিত হওয়ায় তাদের বেশির ভাগই রয়ে গেছে নদীর পাড়ে, ব্রিজের নীচে কিংবা কোনো বস্তির খুপড়ি ঘরে। 

ডিআইজি হাবিবুর রহমান ব্যক্তি উদ্যোগে বেদেদের পুনর্বাসন এবং বিলুপ্ত প্রায় ‘ঠার’ ভাষার গবেষণায় দীর্ঘ আট বছর কাজ করেছেন। দীর্ঘ এই গবেষণা যাত্রায় হাবিবুর রহমানকে তথ্যউপাত্ত সংগ্রহে ঘুরতে হয়েছে বিভিন্ন জেলায়। মাঠ পর্যায়ের গবেষণায় তাকে সাহায্য করেন তার সহকর্মীরাও। এমনকী ভাষাটির তথ্যউপাত্ত সংগ্রহে বেশ কয়েক জন প্রতিনিধির নিরলস পরিশ্রমের পাশাপাশি যুক্ত ছিলেন গোপালগঞ্জ সরকারি বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের প্রভাষক আমানত মোল্লা এবং সাভারের পোড়াবাড়ীর বেদেপল্লীর সদস্য আমজাদ হোসেন। 

গ্রন্থটি গবেষণানির্ভর ও তথ্যসমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেন আরও অনেক গুণগ্রাহী ব্যক্তিবর্গও।

সর্বোপরি, বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলে বসবাসরত বেদে জনগোষ্ঠীর ঠারভাষী প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে ২০২০ সালের ২০ নভেম্বর ঢাকার ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে ঠার ভাষাবিষয়ক এক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। 

সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের বর্তমান চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও সাবেক চেয়ারম্যান ও চীনের ঝেজিয়াং ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান এবং সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুল মনসুর আহমেদ। 

উপস্থিত অতিথিদের সামনে ঠারভাষী প্রতিনিধিদের সম্মতিক্রমে ভাষাটির শব্দ, উচ্চারণ, বাক্যগঠন এবং ব্যাকরণ ইত্যাদি যাচাইবাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। ‘বইমেলা ২০২২’এ বইটি ‘ঠার’ ভাষা বইটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। 

হাবিবুর রহমান বলেন, ‘ঠার’ ভাষার গবেষণার পাঁচ শতাধিক বেদে প্রতিনিধির সঙ্গে দীর্ঘ আট বছর যোগাযোগ রেখেছি। তাদের মাধ্যমে ভাষাটির শব্দ, ব্যাকরণ উদ্ধারের চেষ্টা করেছি। কখনও কখনও বেদেপল্লীতে উপস্থিত হতে না পারলে বেদেদের আমার অফিসে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। তাদের সঙ্গে কথা বলে অজানা ভাষাটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ বই হিসেবে লিখিত রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছি। বেদে সম্প্রদায়ের লোকজনও দীর্ঘ এই গবেষণাযাত্রায় সংগৃহীত ঠার ভাষার শব্দ, চয়ন, বাক্যগঠন ইত্যাদি সম্পর্কে একমত পোষণ করেছেন। বেদে সম্প্রদায়ের ভাষা নিয়ে রচিত গ্রন্থটির মোড়ক উম্মোচন  ২২ ফেব্রুয়ারি। 

তিনি আরও বলেন, গ্রন্থটি প্রকাশ হবে পাঞ্জেরী প্রকাশনীর ব্যানারে। পাঞ্জেরী প্রকাশনীর স্বত্তাধিকারী কামরুল হাসান শায়ক ভাইয়ের প্রতি অসংখ্য কৃতজ্ঞতা। গ্রন্থটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গবেষক, শিক্ষক, ছাত্র সকলকে আমি অশেষ ধন্যবাদ ও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। গ্রন্থটিতে বাংলাদেশের বেদে জনগোষ্ঠীর ভাষার উদ্ভব আলোচনা, ভাষাতাত্তিক বৈশিষ্ট্য নির্ণয় ও বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হয়েছে, যেন বিপন্নপ্রায় এই জাতির বিলুপ্ত প্রায় ভাষাটি সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ও যৌক্তিক ধারণা লাভ করা যায়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি মানব সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন ডিআইজি হাবিবুর রহমান। অবহেলিত বেদে সম্প্রদায় ও হিজড়া জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসনে নিরলস খেটে যাচ্ছেন পুলিশের এই উর্দ্ধতন কর্মকর্তা। ব্যক্তি উদ্যোগ ও উত্তরণ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে অবহেলিত বেদে ও হিজড়া সম্প্রদায়ের লোকজনের মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছেন মানবতার আলো। তাদের মূল পেশার (প্রতারণা, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসা) বাইরে এনে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পাশাপাশি তাদেও জন্য বুটিক, পার্লারসহ নানা প্রতিষ্ঠানও গড়ে তোলা হয়েছে। তাদের সন্তানদের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে শিক্ষালয়। 

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি তাদের জন্য তৈরি হচ্ছে মিউজিয়াম। ডিআইজি হাবিবুর রহমানের ব্যক্তিগত উদ্যোগে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ও এনজিও এগিয়ে আসছে। সমাজ পরিবর্তনে, মানুষের কল্যাণে, মানবতার স্বার্থে পুলিশের কার্যকর ভূমিকায় ব্যতিক্রমী অবদান রেখে চলেছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।

Advertisement

বিলুপ্ত ঠার ভাষা

Advertisement

আরও পড়ুন

ক্ষমতার অপব্যবহার যেন নতুন অপরাধের জন্ম না দেয়

ক্ষমতার অপব্যবহার যেন নতুন অপরাধের জন্ম না দেয়

ভারতে গণতন্ত্রের অপমৃত্যু রুখতে তরুণদের অদম্য প্রতিরোধ

ভারতে গণতন্ত্রের অপমৃত্যু রুখতে তরুণদের অদম্য প্রতিরোধ

জুলাইয়ের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা

জুলাইয়ের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা

অপেক্ষার রাজনীতি: আমরা কি একটি অপেক্ষার সমাজে বাস করছি?

অপেক্ষার রাজনীতি: আমরা কি একটি অপেক্ষার সমাজে বাস করছি?

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম