‘ইসলাম পরিপন্থি’ হওয়ায় আফগানিস্তানে চোখের কর্নিয়া প্রতিস্থাপন নিষিদ্ধ
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫৪ পিএম
এক ব্যক্তির চোখ পরীক্ষা করছেন চিকিৎসক। ছবি: এএফপি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আফগানিস্তানে কর্নিয়া প্রতিস্থাপন নিষিদ্ধ করেছে তালেবান সরকার। এর ফলে প্রতিবছর শত শত মানুষ দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার থেকে বঞ্চিত হবেন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। ইসলামী শিক্ষার সঙ্গে এই চিকিৎসাপদ্ধতি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে দাবি করে অস্ত্রোপচার বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
২০২১ সালে ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির সুযোগ সীমিত করে একের পর এক নির্দেশনা জারি করছে তালেবান সরকার। কর্নিয়া প্রতিস্থাপন নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তও সেই ধারাবাহিকতার সর্বশেষ পদক্ষেপ।
সম্প্রতি একটি চিকিৎসাসেবামূলক দাতব্য সংস্থা আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল ও পূর্বাঞ্চলীয় শহর জালালাবাদে স্থানীয় চিকিৎসকদের কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। এর কয়েক মাসের মধ্যেই এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলো।
চিকিৎসকরা বলছেন, বিস্ফোরণ, দুর্ঘটনা ও বিভিন্ন ধরনের আঘাতে দৃষ্টিশক্তি হারানো রোগীদের জন্য আফগানিস্তানে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের ব্যাপক প্রয়োজন রয়েছে।
কাবুলের নূর আই হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. নূর জামান হাশিম জানান, তালেবানের নির্দেশে কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার আগে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তার হাসপাতালের চিকিৎসকরা ৯০টি কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করেছিলেন।
তিনি বলেন, হাসপাতালটিতে অস্ত্রোপচারের জন্য অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। তাদের বেশির ভাগই তরুণ। আঘাত, দুর্ঘটনা, বিস্ফোরণ এবং ওয়েল্ডিংয়ের কাজ করতে গিয়ে চোখের ক্ষতির কারণে তারা দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন।
ডা. নূর জামান বলেন, ‘দশকের পর দশক ধরে চলা সহিংসতা আফগানিস্তানের স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোকে বিপর্যস্ত করেছে। প্রতিস্থাপনের চাহিদা পূরণের জন্য আমাদের পর্যাপ্ত চক্ষু বিশেষজ্ঞ নেই। স্থানীয়ভাবেও প্রয়োজনীয় কর্নিয়া পাওয়া যায় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘তালেবান মৌখিকভাবে আমাদের কর্নিয়া প্রতিস্থাপন বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে। তাদের নির্দেশ অমান্য করার সাহস কারও নেই, কারণ এতে কঠোর শাস্তির ঝুঁকি রয়েছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়ভিত্তিক দাতব্য সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন অব ফিজিশিয়ানস অব পাকিস্তানি ডিসেন্ট অব নর্থ আমেরিকা (এপিপিএনএ) ২০১৭ সাল থেকে পাকিস্তানে বিনা মূল্যে কর্নিয়া সরবরাহ করে আসছে। অঙ্গদানের মাধ্যমে এসব কর্নিয়া সংগ্রহ করা হয়।
চলতি বছরের শুরুতে সংস্থাটি তাদের কার্যক্রম সীমান্ত পেরিয়ে আফগানিস্তানেও সম্প্রসারণ করে। এর ফলে সেখানে ১৫০টির বেশি কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়। এ কার্যক্রমের আওতায় পাকিস্তানের পেশোয়ারে তিনজন আফগান চক্ষু বিশেষজ্ঞকে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল।
এপিপিএনএর কর্নিয়া কর্মসূচির প্রধান এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জাফফার মীর ফাউন্ডেশনের প্রধান ডা. ফাওয়াদ জাফফার বলেন, ‘২০১৭ সাল থেকে আমরা পাকিস্তানে বিনা মূল্যে কর্নিয়া পাঠিয়ে আসছি। এর মাধ্যমে ১০ হাজার মানুষ উপকৃত হয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘প্রায় চার মাস আগে আমরা আফগানিস্তানেও এই কর্মসূচি সম্প্রসারণ করি। দেশটিতে শত শত মানুষের কর্নিয়া প্রতিস্থাপন প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তালেবানের নির্দেশনার কারণে কর্মসূচিটি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।’
এ নিষেধাজ্ঞার কারণে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা রোগীদের জীবনও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
কাবুলের আখের রস বিক্রেতা সালামত খান ২০২৩ সালে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দৃষ্টিশক্তি হারান। বিনা মূল্যে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের সুযোগের কথা জানতে পেরে তিনি হাসপাতালে যোগাযোগ করেছিলেন।
সালামত খান বলেন, ‘এই কর্মসূচির মাধ্যমে উপকৃত হয়েছেন এমন একজনের কাছ থেকে বিনা মূল্যে চিকিৎসার বিষয়টি জানতে পারি। এরপর হাসপাতালে যাই। চিকিৎসকরা আমাকে জানিয়েছিলেন, সেপ্টেম্বরে আমার অস্ত্রোপচার হবে। কিন্তু আগস্টে কর্মসূচি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে জানার পর আমি হতবাক হয়ে যাই।’
নিষেধাজ্ঞার আরেক ভুক্তভোগী ৪০ বছর বয়সী খাদিজা বেগম। জালালাবাদে বিস্ফোরণে চোখে আঘাত পাওয়ার পর তিনি চিকিৎসার জন্য স্থানীয় আই হাসপাতালে নিবন্ধন করেছিলেন।
তিনি বলেন, ‘দুই মাস আগে আমি জালালাবাদ আই হাসপাতালে নিবন্ধন করি। কিন্তু গত মাসে তালেবান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কর্মসূচিটি বন্ধ করার নির্দেশ দেয়। তাদের দাবি, এই চিকিৎসা ইসলামী শিক্ষার পরিপন্থি।’
এপিপিএনএ এক বিবৃতিতে তালেবান সরকারের প্রতি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে।


