চোখের সামান্য সমস্যাও হতে পারে বড় বিপদের সংকেত, যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৪৫ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিশ্বজুড়ে প্রায় ২২০ কোটি মানুষ কাছের কিংবা দূরের বস্তু দেখতে বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় ভুগছেন। তাদের মধ্যে অন্তত ১০০ কোটি মানুষের দৃষ্টিসমস্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল অথবা যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে এখনো সমাধান করা যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত একটি তথ্যপত্রে উঠে এসেছে এ তথ্য।
চোখের সমস্যা কেবল ঝাপসা দেখা কিংবা দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব পড়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষা, কর্মক্ষমতা ও স্বাভাবিক চলাফেরায়। বিশেষ করে শিশুদের শেখার দক্ষতা এবং বয়স্কদের স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের ক্ষেত্রে দৃষ্টিসমস্যা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে নিয়মিত চোখ পরীক্ষা, সময়মতো চিকিৎসা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চশমা ব্যবহারের মাধ্যমে অনেক সমস্যাই প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ার প্রধান কারণগুলো কী?
চোখের দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
প্রতিসরণজনিত ত্রুটি: চোখের ভেতরে আলো সঠিকভাবে ফোকাস না হলে কাছের বা দূরের বস্তু স্পষ্ট দেখা যায় না। সাধারণত সঠিক পাওয়ারের চশমা কিংবা কনট্যাক্ট লেন্স ব্যবহার করে এ সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক—উভয়ের মধ্যেই এটি দৃষ্টিসমস্যার একটি সাধারণ কারণ।
ছানি: চোখের স্বচ্ছ লেন্স ঘোলা হয়ে গেলে দৃষ্টি ঝাপসা হতে শুরু করে। বয়স বাড়ার সঙ্গে ছানির ঝুঁকি বাড়ে। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সাধারণত এই সমস্যার চিকিৎসা করা সম্ভব। তবে অনেক মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পান না।
গ্লুকোমা: এই রোগে চোখের স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় উল্লেখযোগ্য লক্ষণ দেখা যায় না। চিকিৎসা না করালে স্থায়ী দৃষ্টিহানির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বয়সজনিত ম্যাকুলার ডিজেনারেশন: চোখের রেটিনার কেন্দ্রীয় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সূক্ষ্ম বিষয় দেখা ও পড়ার মতো কাজে সমস্যা হতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে এ রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
ডায়াবেটিসজনিত চোখের ক্ষতি: দীর্ঘদিন রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে রেটিনার রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া এমনকি গুরুতর দৃষ্টিহানিও ঘটতে পারে।
এ ছাড়া ৪০ বছর বয়সের পর অনেকের কাছের বস্তু দেখতে অসুবিধা হয়। এ সমস্যাকে প্রেসবায়োপিয়া বলা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৮২ কোটি ৬০ লাখ মানুষ এই সমস্যার জন্য প্রয়োজনীয় চশমা বা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত।
চোখের সমস্যা দৈনন্দিন জীবনে যেসব প্রভাব ফেলে
দৃষ্টিশক্তির দুর্বলতা মানুষের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারে।
শিশুদের ক্ষেত্রে: ছোটবেলা থেকে গুরুতর দৃষ্টিসমস্যা থাকলে শারীরিক, ভাষাগত, সামাজিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। পাশাপাশি পড়াশোনায় মনোযোগ ও ফলাফলেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে: কাজের দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যেতে পারে। দীর্ঘদিনের দৃষ্টিসমস্যা মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও বিষণ্নতার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
বয়স্কদের ক্ষেত্রে: স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে অসুবিধা হয়। পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়া বা হাড় ভাঙার আশঙ্কা বাড়ে। এ ছাড়া অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতাও তৈরি হতে পারে।
চোখের যেসব লক্ষণ অবহেলা করা উচিত নয়
কিছু লক্ষণ চোখের সাধারণ সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে, আবার কিছু লক্ষণ গুরুতর রোগের সংকেতও হতে পারে। তাই নিচের সমস্যাগুলো দেখা দিলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
- কাছের বা দূরের বস্তু ঝাপসা দেখা।
- পড়ার সময় মাথাব্যথা হওয়া কিংবা চোখ কুঁচকে দেখতে হওয়া।
- রাতে দেখতে অসুবিধা হওয়া।
- মোবাইলের লেখা পড়তে বারবার ফোন দূরে সরিয়ে ধরতে হওয়া।
- চোখে দীর্ঘস্থায়ী অস্বস্তি কিংবা বারবার দৃষ্টির সমস্যা দেখা দেওয়া।
এসব লক্ষণ থাকলে চোখ পরীক্ষা করিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া উচিত। তবে হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া, চোখে তীব্র ব্যথা বা আলোর ঝলকানি দেখা দেওয়ার মতো উপসর্গকে সাধারণ সমস্যা ভেবে অবহেলা করা যাবে না।
চোখ সুস্থ রাখতে করণীয়
নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করান: চোখে কোনো সমস্যা অনুভব না করলেও বয়স, শারীরিক অবস্থা ও ঝুঁকি অনুযায়ী নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করা জরুরি। এতে ছানি, গ্লুকোমা, চোখের পাওয়ারের সমস্যা এবং ডায়াবেটিসজনিত ক্ষতি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা যেতে পারে।
প্রয়োজনে সঠিক পাওয়ারের চশমা ব্যবহার করুন: ঝাপসা দেখা, পড়তে অসুবিধা কিংবা কাছের লেখা স্পষ্ট দেখতে না পাওয়ার মতো সমস্যা হলে চোখের পরীক্ষা করান। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চশমা ব্যবহার করুন।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন: ডায়াবেটিস থাকলে নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করানো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি রক্তে শর্করা, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
চোখের আঘাত ও সংক্রমণকে গুরুত্ব দিন: চোখে আঘাত লাগলে কিংবা সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। নিজে থেকে চোখে ওষুধ, অনিরাপদ ভেষজ উপাদান বা ঘরোয়া মিশ্রণ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন।
যেসব লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন
কিছু চোখের সমস্যা দ্রুত চিকিৎসা না করালে স্থায়ী দৃষ্টিহানির কারণ হতে পারে। তাই নিচের লক্ষণগুলোর কোনোটি দেখা দিলে দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা নিন—
- হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া বা একেবারে দেখতে না পাওয়া।
- চোখে তীব্র ব্যথা হওয়া।
- চোখ লাল হওয়ার পাশাপাশি দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়া।
- হঠাৎ আলোর ঝলকানি দেখা কিংবা চোখের সামনে নতুন ভাসমান দাগের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া।
- দৃষ্টির সামনে পর্দা নেমে আসার মতো অনুভূতি হওয়া।
- চোখে রাসায়নিক পদার্থ প্রবেশ করা।
বিশেষ করে হঠাৎ দৃষ্টি হারানো, চোখে রাসায়নিক পড়া কিংবা তীব্র ব্যথার ক্ষেত্রে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, দৃষ্টিসমস্যার অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে উপকার পাওয়া সম্ভব। যাদের দৃষ্টিশক্তির ক্ষতি পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়, তাদের জন্যও বিশেষ পুনর্বাসনসেবা দৈনন্দিন কাজ সহজ করতে এবং স্বাধীনভাবে জীবনযাপনে সহায়তা করতে পারে।
তাই চোখের ছোটখাটো সমস্যাকেও দীর্ঘদিন অবহেলা না করে প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া গেলে অনেক ক্ষেত্রেই দৃষ্টিশক্তি রক্ষা করা সম্ভব।
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস
