চোখে আঞ্জনি? ওষুধ নয়, ঘরোয়া যে যত্নে মিলতে পারে আরাম
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪৭ পিএম
আঞ্জনিকে অবহেলা করলে চিরতরে নষ্ট হতে পারে চোখ। ছবি: শাটারস্টক।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঋতুর পরিবর্তনে চোখের নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে চোখের পাতায় ছোট ফোঁড়ার মতো ফুলে ওঠা, ব্যথা ও লালচে ভাবের অন্যতম কারণ হলো আঞ্জনি। অনেকেই মনে করেন, চোখে ময়লা জমলে কিংবা অপরিষ্কার পানি দিয়ে চোখ ধুলেই এই সমস্যা হয়। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ব্যাখ্যা কিছুটা ভিন্ন। চোখের পাতার তেল উৎপাদনকারী গ্রন্থি বন্ধ হয়ে গেলে কিংবা সেখানে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হলে আঞ্জনি দেখা দিতে পারে।
আঞ্জনি হলে চোখে অস্বস্তি, ব্যথা, ফোলাভাব এমনকি পুঁজও হতে পারে। তবে সব ক্ষেত্রে শক্তিশালী ওষুধের প্রয়োজন হয় না। প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক পরিচর্যায় অনেক সময় এই সমস্যা নিজে থেকেই সেরে যায়। কিন্তু কোন ঘরোয়া উপায় নিরাপদ, আর কোনটি চোখের ক্ষতি করতে পারে, তা জানা জরুরি।
কেন হয় চোখে আঞ্জনি?
চক্ষু বিশেষজ্ঞদের মতে, চোখের পাতায় থাকা তেল উৎপাদনকারী গ্রন্থিগুলোর মুখ বন্ধ হয়ে গেলে সেখানে তেল জমতে পারে। ওই স্থানে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হলে আঞ্জনি বা স্টাই (Stye) তৈরি হতে পারে। এতে চোখের পাতায় লালচে ফোলা, ব্যথা এবং কখনো পুঁজ দেখা যায়।
তবে আঞ্জনি ও চোখ ওঠা এক বিষয় নয়। আঞ্জনি সাধারণত চোখের পাতার নির্দিষ্ট স্থানে ফোঁড়ার মতো দেখা দেয়। অন্যদিকে, চোখ ওঠা বলতে সাধারণত চোখের কনজাংটিভার প্রদাহকে বোঝানো হয়, যার কারণ ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া কিংবা অ্যালার্জি হতে পারে।
আঞ্জনি হলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে ফোলাভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে, দৃষ্টিশক্তিতে পরিবর্তন এলে কিংবা তীব্র ব্যথা হলে দ্রুত চক্ষু চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
আঞ্জনি হলে কী করবেন? ঘরোয়া যত্নের নিরাপদ উপায়
১. গরম সেঁক দিতে পারেন
আঞ্জনির অস্বস্তি কমাতে পরিষ্কার কাপড় দিয়ে উষ্ণ সেঁক দেওয়া সবচেয়ে প্রচলিত ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্বীকৃত ঘরোয়া পদ্ধতিগুলোর একটি।
একটি পরিষ্কার নরম কাপড় কুসুম গরম পানিতে ভিজিয়ে নিংড়ে নিন। এরপর বন্ধ চোখের পাতার ওপর ১০–১৫ মিনিট আলতো করে ধরে রাখুন। দিনে তিন থেকে পাঁচবার এভাবে সেঁক দেওয়া যেতে পারে। কাপড় ঠান্ডা হয়ে গেলে আবার উষ্ণ পানিতে ভিজিয়ে নিন।
উষ্ণ সেঁক জমে থাকা তেল নরম করতে এবং গ্রন্থি থেকে স্বাভাবিকভাবে তা বের হতে সাহায্য করতে পারে। তবে তাওয়া বা চাটুতে কাপড় সরাসরি গরম করে চোখে দেওয়া উচিত নয়। অতিরিক্ত গরম কাপড়ে চোখের পাতার সংবেদনশীল ত্বক পুড়ে যেতে পারে।
২. পেয়ারা পাতা ব্যবহারে সতর্ক থাকুন
পেয়ারার পাতায় কিছু উপাদান রয়েছে, যেগুলোর জীবাণুরোধী গুণ নিয়ে গবেষণা হয়েছে। তবে আঞ্জনি সারাতে পেয়ারা পাতা কার্যকর— এমন নির্ভরযোগ্য ক্লিনিক্যাল প্রমাণ নেই।
শুকনো তাওয়ায় গরম করা পেয়ারা পাতা কাপড়ে জড়িয়ে চোখের ওপর ধরে রাখা কিংবা পাতার নির্যাস চোখের কাছে ব্যবহার করা নিরাপদ পদ্ধতি নয়। পাতায় থাকা ধুলা, জীবাণু বা অন্যান্য উপাদান চোখে জ্বালা ও সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তাই আঞ্জনির ক্ষেত্রে পেয়ারা পাতার পরিবর্তে পরিষ্কার কাপড় দিয়ে উষ্ণ সেঁক দেওয়াই ভালো।
৩. ক্যাস্টর অয়েল সরাসরি চোখে ব্যবহার করবেন না
ক্যাস্টর অয়েলে কিছু প্রদাহনাশক বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। তবে সাধারণ ক্যাস্টর অয়েল দিয়ে আঞ্জনি সারানো যায়—এমন পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। চোখের পাতায় বা চোখের ভেতরে এটি ব্যবহার করলে জ্বালা, অ্যালার্জি কিংবা দূষিত তেলের কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তাই গরম ভাপ নেওয়ার পর তুলোয় ক্যাস্টর অয়েল মাখিয়ে আক্রান্ত চোখে লাগানোর পরামর্শ দেওয়া যায় না। চিকিৎসকের নির্দেশ ছাড়া কোনো তেল, ভেষজ নির্যাস বা ঘরোয়া মিশ্রণ চোখে ব্যবহার করবেন না।
আঞ্জনি হলে যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন
- চোখের পাতার ফোলা অংশ চেপে ধরবেন না বা ফোঁড়া ফাটানোর চেষ্টা করবেন না।
- চোখে হাত দেওয়ার আগে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিন।
- আঞ্জনি থাকা অবস্থায় চোখের প্রসাধনী ও কনট্যাক্ট লেন্স ব্যবহার এড়িয়ে চলুন।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বা স্টেরয়েডযুক্ত আই ড্রপ ব্যবহার করবেন না।
- চোখে তীব্র ব্যথা, দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন, জ্বর কিংবা চোখের চারপাশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া লালচে ফোলা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিন।
- সাধারণ আঞ্জনি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে সেরে যায়। তবে ফোলা না কমলে, বারবার একই জায়গায় আঞ্জনি হলে কিংবা সমস্যা বাড়তে থাকলে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন।
বারবার আঞ্জনি হলে কী করবেন?
যাদের ঘন ঘন আঞ্জনি হয়, তাদের চোখের পাতার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার পাশাপাশি সমস্যার অন্তর্নিহিত কারণ খুঁজে দেখা জরুরি। চোখের পাতার দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ, ব্লেফারাইটিস কিংবা তেল উৎপাদনকারী গ্রন্থির সমস্যার কারণে বারবার আঞ্জনি হতে পারে।
ডায়াবেটিস থাকলে সংক্রমণের ঝুঁকি ও ক্ষত সারতে দেরি হওয়ার আশঙ্কা বাড়তে পারে। তাই বারবার আঞ্জনি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করানো যেতে পারে। তবে আঞ্জনি হলেই যে ডায়াবেটিস রয়েছে, এমন নয়।
চোখের আঞ্জনি সাধারণত সাময়িক সমস্যা হলেও অবহেলা করা ঠিক নয়। প্রাথমিক পর্যায়ে পরিষ্কার কাপড় দিয়ে নিয়মিত উষ্ণ সেঁক দিলে অনেক সময় অস্বস্তি কমে এবং আঞ্জনি নিজে থেকেই সেরে যায়। কিন্তু পেয়ারা পাতা, ক্যাস্টর অয়েল কিংবা অন্য কোনো ঘরোয়া উপাদান চোখে ব্যবহার করার আগে তার নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
মনে রাখবেন, চোখ অত্যন্ত সংবেদনশীল অঙ্গ। তাই সামান্য সমস্যাতেও এমন কিছু ব্যবহার করা উচিত নয়, যা চোখের ক্ষতি করতে পারে। নিরাপদ পরিচর্যা করুন, বিপদের লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন এবং বারবার আঞ্জনি হলে সমস্যার মূল কারণ নির্ণয় করুন।
