Logo
Logo
×
   

Advertisement

রাজধানী

ছয় বছরেই ধ্বংসস্তূপ শহীদনগর বালুঘাট মাঠ, সরকারি জমি দখলের অভিযোগ

Advertisement

মো. জহিরুল ইসলাম

মো. জহিরুল ইসলাম

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৩ এএম

ছয় বছরেই ধ্বংসস্তূপ শহীদনগর বালুঘাট মাঠ, সরকারি জমি দখলের অভিযোগ

পুরান ঢাকার লালবাগের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের শহীদনগরে লালবাগ থানার পেছনের মাঠ।

Advertisement

‎শিশুদের খেলাধুলার জন্য মাঠ। অথচ সেই মাঠেই এখন কাদা-পানি, বড় বড় গর্ত, ভাঙা কাচ, লোহার টুকরো আর ময়লার স্তূপ। ২৬টি বৈদ্যুতিক বাতি থাকলেও সন্ধ্যার পর একটিও জ্বলে না। বাউন্ডারি জাল ছেঁড়া, গেট নড়বড়ে। ফুটবল গোলপোস্টসহ লোহার বিভিন্ন সরঞ্জামও নেই। সন্ধ্যা নামলেই অন্ধকার মাঠে বসে মাদকসেবী ও উদীয়মান কিশোর গ্যাংয়ের আড্ডা। যে মাঠটি ছয় বছর আগে আধুনিক খেলার মাঠ ও বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে শিশুদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেটিই এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। 

‎রাজধানীর পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ লালবাগের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের শহীদনগরে লালবাগ থানার পেছনে এ মাঠের অবস্থান। ২০২০ সালে মাঠটি উদ্বোধনের সময় আধুনিক আলোকসজ্জা, আন্তর্জাতিক মানের ফুটবল গোলপোস্ট, বসার বেঞ্চ, শিশুদের জন্য পার্ক ও বিভিন্ন খেলার রাইড স্থাপনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ছয় বছর পর এসব প্রতিশ্রুতির অধিকাংশেরই কোনো চিহ্ন নেই। বরং মাঠের চারপাশ ও ভেতরের অবস্থা দেখে মনে হয়, দীর্ঘদিন ধরে এর দেখভালই হয়নি।

‎সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাঠের সমতল রূপ আর নেই। সামান্য বৃষ্টি হলেই বিভিন্ন স্থানে পানি জমে কাদা-পানিতে একাকার হয়ে যায়। মাঠের বিভিন্ন অংশে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। বৃষ্টির সময় এসব গর্ত ছোটখাটো ডোবায় পরিণত হয়। কোথাও জমে আছে নোংরা পানি, কোথাও কাদা। এর মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ভাঙা কাচ, ইটের খোয়া, লোহার টুকরোসহ নানা ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ বস্তু। মাঠের বিভিন্ন স্থানে স্তূপ করে রাখা হয়েছে ময়লা-আবর্জনা। মাঠের চারপাশের লোহার বাউন্ডারি জাল বিভিন্ন জায়গায় ছিঁড়ে গেছে। গেটগুলোও ভেঙে নড়বড়ে হয়ে রয়েছে। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, বাউন্ডারির বিভিন্ন অংশ গোড়া থেকে দুর্বল হয়ে পড়েছে। যেকোনো সময় সেগুলো ভেঙে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কোনো নিরাপত্তাকর্মীও নেই। ফলে মাঠের নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ দুটোই প্রশ্নের মুখে। মাঠে স্থাপন করা হয়েছিল ২৬টি লাইট। কিন্তু বৈদ্যুতিক তার চুরি হয়ে যাওয়ায় এখন একটিও জ্বলে না। সন্ধ্যার পর পুরো মাঠ অন্ধকারে ডুবে যায়। এই অন্ধকারের সুযোগেই সেখানে মাদকসেবী ও উদীয়মান কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের আনাগোনা বেড়ে যায়। তারা আড্ডা দেয়, চেঁচামেচি করে এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে সন্ধ্যার পর মাঠসংলগ্ন পথ দিয়ে সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচলও কঠিন হয়ে পড়ে। মাঠের ফুটবল গোলপোস্ট থেকে শুরু করে বিভিন্ন লোহার অংশ চুরি হয়ে গেছে। শিশুদের জন্য যে পার্ক ও বিভিন্ন খেলার রাইড বসানোর কথা ছিল, তারও কোনো অস্তিত্ব নেই। দর্শনার্থীদের বসার জন্য বেঞ্চ থাকলেও সেগুলোতে ময়লা আবর্জনার স্তুপ। ফলে শিশুদের খেলাধুলা ও বিনোদনের জন্য তৈরি মাঠটি এখন অনেকটাই ময়লার ভাগাড়ের চেহারা নিয়েছে।

‎স্থানীয় মো. সাদিকুর রহমান বলেন, ‘২০২০ সালে মাঠটি উদ্বোধনের সময় বলা হয়েছিল এখানে সব ধরনের আধুনিক খেলার সুযোগ থাকবে। কিন্তু গত ছয় বছরে আমরা কিছুই পাইনি। সামান্য বৃষ্টি হলেই মাঠে পানি জমে ডোবা হয়ে যায়। বিভিন্ন জায়গায় গর্ত। চারদিকে ভাঙা কাচ, লোহা আর ময়লা জমে ধ্বংসস্তূপ হয়ে আছে। সন্ধ্যার পর কিশোর গ্যাং আর মাদকসেবীদের আড্ডা গড়ে ওঠে।

‎তিনি আরও বলেন, বিদ্যুতের খুঁটি আছে, কিন্তু সারা মাঠে একটি লাইটও নেই। বিদ্যুতের তার সব চুরি হয়ে গেছে। পুরো মাঠের বাউন্ডারির বিভিন্ন অংশ গোড়া থেকে ভেঙে পড়েছে। যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। ঝুঁকি নিয়ে শিশু ও এলাকার কিশোররা খেলছে।

‎শহীদনগর এলাকার শিশু মাহাদি, ইয়াসিন, হাবিবুল্লাহ, জিহাদ, আলামিন ও সাব্বির জানায়, তাদের খেলার জায়গা নেই। একমাত্র এই মাঠে খেলতে গেলেও ইটের কণা, লোহার টুকরো ও ভাঙাচোরা জিনিসের কারণে প্রায়ই হাত-পা কেটে যায়। সন্ধ্যার পর মাঠের কোথাও আলো জ্বলে না। সব লাইট ও তার চুরি হয়ে গেছে। বৃষ্টি হলে মাঠে পানি জমে যায়, তখন তারা খেলতে পারে না। পুরো মাঠ ময়লা-আবর্জনায় ভরা।

‎মাঠের এমন বেহাল দশার পাশাপাশি সিটি করপোরেশনের জায়গা দখল করে ভবন নির্মাণের অভিযোগও উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা এবং পাশের বাড়ির মালিক মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন যুগান্তরকে জানান, ২০২০ সালে মাঠটি উদ্বোধনের পর প্রথম দিকে পরিস্থিতি ভালো ছিল। এরপর ধীরে ধীরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মাঠটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।  

‎তাদের অভিযোগ, মাঠের দক্ষিণ পাশে পুরো বাউন্ডারির লাগোয়া একটি ছোট মাঠ রয়েছে। সেই মাঠের এক কোণের অংশ দখল করে পাঁচতলা একটি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। লালবাগ রাজস্ব সার্কেলের ৬০২২ দাগের জায়গায় ওই ভবন নির্মাণ করা হয়েছে বলে তারা দাবি করেন। সেখানে প্রায় আধা কাঠা জায়গা রয়েছে বলেও জানান তারা।   

‎স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০০০ সালের পর সিটি করপোরেশন ও ভূমি কর্মকর্তাদের টাকা দিয়ে মাঠের সিটি করপোরেশনের সরকারি জায়গা দখল করে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনটির মালিক হাজী আব্দুল করিম বলেও তারা জানান। তিনি অবৈধভাবে মাঠের জায়গা দখল করে ভবন নির্মাণ করেছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে ভবনের মালিক হাজী আব্দুল করিমের বক্তব্য জানতে সরেজমিনে গিয়ে ভবনের ভাড়াটিয়াদের কাছে তার মোবাইল নম্বর চাওয়া হয় এবং একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, সিটি করপোরেশন ঠিকমতো মাঠের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করে না। মাঠের পুনঃরক্ষণাবেক্ষণের কার্যক্রমও নেই। ফলে যে মাঠটি শিশুদের জন্য খেলার জায়গা হওয়ার কথা ছিল, সেটি এখন দিনের পর দিন অবহেলায় পড়ে থেকে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।  

‎মাঠটির দীর্ঘদিনের বেহাল দশা ও সরকারি জায়গা দখলের অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৩-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা আখতারুন নেসা শিউলী যুগান্তরকে বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আপনার মাধ্যমেই প্রথম অবগত হলাম। এর আগে এ তথ্য আমার জানা ছিল না। তবে করপোরেশনের ফান্ড কমে গেলেও আমাদের উন্নয়নমূলক কাজ থেমে নেই। মাননীয় প্রশাসক মহোদয়ের নির্দেশনা রয়েছে—আমরা যেন এলাকাভিত্তিক সরেজমিনে ভিজিট করি এবং মানুষের সবচেয়ে বেশি জরুরি প্রয়োজনগুলো চিহ্নিত করি।

‎তিনি বলেন, ইতিমধ্যেই নতুন অর্থবছর শুরু হয়েছে। তাই এই প্রস্তাবনাগুলো নতুন অর্থবছরের বাজেটে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। শহীদনগর মাঠের সমস্যাগুলো আমাকে লিখিতভাবে প্রদান করা হলে আমি নিজে এলাকাটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে বিষয়গুলো মিলিয়ে দেখব।

‎সরকারি জায়গা দখল করে ভবন নির্মাণের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত সীমানাপ্রাচীর ও সরকারি জায়গা দখল করে কেউ ভবন নির্মাণ করতে পারে না। যদি মাঠের জায়গা দখল করার প্রমাণ মেলে, তবে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে তা উচ্ছেদে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

লালবাগ থানার ওসি মোহাম্মদ জামিল হোসেন বলেন, প্রতিদিনই লালবাগ থানা এলাকার বিভিন্ন জায়গায় আমাদের পুলিশ টহল টিমসহ নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। যেহেতু আমাদের থানার পেছনে একটি সিটি করপোরেশনের মাঠ রয়েছে, সেখানে শিশুসহ বিভিন্নরা খেলাধুলা করে। মাদক সেবনসহ কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হলে তা তদন্ত করে অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম