কুষ্টিয়া-৪ আসন
ধানের শীষের পরাজয় নিয়ে বিতর্ক ও পালটা-পালটি অভিযোগ
কুমারখালী (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৬, ০৮:৪৬ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসনে ধানের শীষের প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমির চেয়ে ৭ হাজার ৬৩০ ভোট বেশি পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী মো. আফজাল হোসেন।
ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই ধানের শীষের পরাজয় ঘিরে বিভিন্ন মহলে শুরু হয় আলোচনা ও গুঞ্জন। ভোট গণনায় কারচুপি, পুনর্গণনার দাবি এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিএনপির নেতাকর্মীরা একে অপরের বিরুদ্ধে পালটাপালটি অভিযোগ করতে থাকেন।
নির্বাচনপরবর্তীতে ১৪ ফেব্রুয়ারি ভোট পুনর্গণনার দাবিতে কুমারখালী ও খোকসার জনসাধারণের ব্যানারে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।
এ সময় তারা বলেন, ভোট গণনার পর রেজাল্ট ঘোষণার আগ মুহূর্তে পোলিং এজেন্টের আলাদা ঘরে দিয়ে প্রিসাইডিং এবং সহকারী প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসাররা আলাদা নোট করে ধানের শীষের ভোটকে দাঁড়িপাল্লা করেছে এবং দাঁড়িপাল্লার ভোটকে ধানের শীষ দেখিয়ে রেজাল্ট ঘোষণা করেছে।
এ সময় নেতাকর্মীরা ভোট পুনর্গণনার দাবি জানিয়ে অভিযোগ করেন, জেলা কমিটিতে আওয়ামী লীগের প্রেতাত্মা লুকিয়ে আছে। তারা বর্তমান কমিটি ভেঙে ত্যাগী নেতাদের নিয়ে নতুন কমিটি গঠনের দাবি জানান।
এরপর ১৬ ফেব্রুয়ারি যুবদলের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রার্থী সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমির বিরুদ্ধে কাজ করার অভিযোগে কুমারখালী উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট জাকারিয়া আনসার মিলনকে বহিষ্কার করা হয়।
এরপর খোকসা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ চত্বরে আয়োজিত খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া অনুষ্ঠানে বিএনপি নেতা বাহার অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচনে সৈয়দ আমজাদ আলী ও অধ্যক্ষ আনিসসহ একাধিক ব্যক্তি প্রচুর টাকা কালেকশন করেছে। বিভিন্ন ব্যবসায়ী, ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে লক্ষাধিক টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে জানিয়ে তিনি নিজেও পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়েছেন বলে জানান। এ সময় তিনি আওয়ামী লীগ নেতা শান্তর কাছ থেকে বিশ লাখ ও সদর খানের কাছ থেকে বিশ লাখসহ বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা কালেকশন করে সৈয়দ আমজাদ এবং আনিস ভাগ করে নিয়েছে বলে অভিযোগ করেন।
তিনি আরও বলেন, আলাউদ্দিন খান গ্রুপের লোকের হাতে তারা কোনো টাকা পয়সাই দেননি। তারা অবমূল্যায়ন, অবজ্ঞা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে আমাদের বলেছে যে ওদের ভোট আমাদের দরকার নাই। আমাদের যে আওয়ামী লীগের ভোট আর হিন্দু ভোট আসবে, এই ভোটে আমরা হয়ে যাব। ১৭ বছর জেল, জুলুম ও যুদ্ধ করার পরও আলাউদ্দিন খানের গ্রুপের লোকজন আমাদের ভোট দেননি, প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছেন। তাদের ব্যর্থতা, অপকর্ম এইগুলো ঢাকার জন্য সুকৌশলে আমাদের উপরে দোষগুলো চাপায় যাচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
এরপর ২২ ফেব্রুয়ারি খোকসা-কুমারখালী বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাদের আয়োজনে বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন বিএনপির কার্যালয়ে এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমীর বিপক্ষে কতিপয় নেতার ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শেখ সাদী, কুমারখালী উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল ইসলাম আনসার প্রামাণিক, সাধারণ সম্পাদক লুৎফর রহমান, খোকসা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আলাউদ্দিন খানসহ তাদের সমর্থিতদের পরিকল্পনায় ধানের শীষের প্রার্থীকে পরাজিত করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়। সেই সময় বক্তারা তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক তদন্ত সম্পন্ন করে দল থেকে বহিষ্কারের দাবি জানান।
এরপর ২৫ ফেব্রুয়ারি কুমারখালী উপজেলা, পৌর বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠন পৌর যুবদলের ওপর দায় চাপানোর প্রতিবাদে পৃথক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপজেলার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির দায়িত্বে ছিলেন তরিকুল ইসলাম লিপন, অ্যাডভোকেট শাতিল মাহমুদ ও আব্দুর রাজ্জাক বাচ্চু।
ওই কমিটিতে বর্তমান উপজেলা ও পৌর বিএনপির কোনো নেতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এমনকি পোলিং এজেন্ট নিয়োগের ক্ষেত্রেও স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়নি। নির্বাচন পরিচালনায় সমন্বয়হীনতার ও সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণেই কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি। এজন্য সংশ্লিষ্ট পরিচালনা কমিটিকে দায় নিতে হবে। এছাড়া প্রার্থীর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, তৃণমূল নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়ন, অযোগ্য ব্যক্তিদের দিয়ে নির্বাচন পরিচালনা এবং সাংগঠনিক সমন্বয়ের অভাব পরাজয়ের অন্যতম কারণ বলে দাবি করা হয়।
পৃথক সংবাদ সম্মেলনে উপজেলা যুবদলের নেতারা বলেন, ২২ ফেব্রুয়ারির সংবাদ সম্মেলনে যে অভিযোগ করা হয়েছে তা অসত্য, বানোয়াট, ভিত্তিহীন ও কাল্পনিক। যুবদলের নেতাকর্মীরা নির্বাচনে ধানের শীষের প্রচারণায় সক্রিয় ছিলেন। এ সময় নুরুল ইসলাম আনছার প্রামাণিকের পরিবারের সব সদস্য বাড়ি বাড়ি ভোট প্রার্থনা করেছেন বলে দাবি করা হয়।
এরপর ওই দিনই নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আব্দুর রাজ্জাক বাচ্চু এক ভিডিও বার্তায় কুমারখালী উপজেলা বিএনপির সংবাদ সম্মেলনে করা অভিযোগ মিথ্যা, বানোয়াট এবং ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।
এ সময় তিনি বলেন, নির্বাচনে সমন্বয় করার জন্য ধানের শীষের প্রার্থী সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমি কয়েকবার তাদের বাসা ও অফিসে গিয়েছেন এবং তারা কথা দিয়েছেন যে তারা নির্বাচন করবেন কিন্তু তারা ধানের শীষের পক্ষে নির্বাচন না করে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে নির্বাচন করেছেন জানিয়ে এর প্রমাণ রয়েছে বলে জানান। দলের কতিপয় বিএনপির নেতার ষড়যন্ত্রের কারণেই আমরা এখানে হেরেছি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
