না খেয়ে ভূমধ্যসাগরে প্রাণ গেল দিরাইয়ের ৬ যুবকের
জিয়াউর রহমান লিটন, দিরাই (সুনামগঞ্জ)
প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৬, ১১:০৬ পিএম
প্রতীকী ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
‘দালাল কথা রাখেনি, দোতলা শিপে না হলে একতলা শিপে গেইমে নেওয়ার কথা, তা না করে প্লাস্টিকের বোটে গেইম নেয়। দালাল বলছিল খাদ্যের কোনো অভাব হবে না, কিন্তু খাদ্যের অভাবে আমার ছেলে মারা যায়।
এ কথা বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন ছেলে হারানো এক পিতা।
সোহানুর রহমানের পিতা ছালিকুর রহমান আরও বলেন, আমার ছেলেকে গেইমে (নির্ধারিত তারিখ) দেব দেব বলে লিবিয়ার মরুভূমিতে এক মাস প্রায় বন্দি অবস্থায় রাখে। আমার ছেলেকে আমি বৈধপথে বিদেশ পাঠাতে পাসপোর্টসহ এক লাখ টাকা একটি ট্রাভেলসে জমা রাখি, কিন্তু জগদল গ্রামের আব্দুল ওয়াসিরের ছেলে ইতালি প্রবাসী দালাল সালেহ আহমদের প্রলোভনে পরে আমার ছেলে ইউরোপ যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। ২২ তারিখ আমার ছেলের সঙ্গে শেষ কথা হয়। সে বলছিল আব্বা আমার কষ্ট হলেও তুমি কোনো চিন্তা করিও না। এরপর থেকে আমি দালাল সালেহ আহমদকে ফোন দিলে ফোন ধরেনি, আমার ছেলের মৃত্যুর খবর জেনে দালালকে একাধিকবার ফোন দিলেও সে রিসিভ করেনি।
সরেজমিন উপজেলার বাসুরী গ্রামে গেলে এহিয়ার চাচাতো ভাই সুয়েজ আহমদ জানান, দালালরা দিকনির্দেশক যন্ত্র ‘কম্পাস’ না দিয়েই বোট ছেড়ে দেয় সাগরে, কম্পাস না থাকায় পথ হারিয়ে যায় তারা।
একই দালাল সালেহ আহমেদের ওপর অভিযোগ এনে মাটিয়াপুর গ্রামের মৃত মেহেদী হাসান তায়েফের পিতা আনোয়ার হোসেন জানান, আমার ছেলেকে শিপে নেওয়ার লাগি দালালের সঙ্গে ১২ লাখ টাকায় কন্টাক্ট হয়, ছেলেকে সেইফে নিতে আরও এক লাখ টাকা বাড়িয়ে ১৩ লাখ টাকায় কন্টাক্ট করি কিন্তু দালাল তার কথা রাখেনি।
কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের মৃত সাজিদুর রহমানের পিতা জানান, একই গ্রামের দালাল মুজিবুর রহমানের কথায় আশ্বস্ত হয়ে ছেলেকে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দেই। দালাল মুজিব বলেছিল বড় নৌকায় করে আমার ছেলেকে সাগর পার করাবে। খাবার পানির সমস্যা হবে না; কিন্তু আমার ছেলে খাবার ও পানির অভাবে মরল।
একই গ্রামের মৃত নুরুজ্জামান সরদার ময়নার বড়ভাই হেলাল সরদার জানান, হবিগঞ্জের দালাল জসিমের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। আমার ভাইকে জসিম আশ্বস্ত করে, জাহাজে করে লিবিয়ার সাগর পারি দেওয়াবে। কিন্তু জসিম দালাল আমার ভাই ও অন্যদের ছোট প্লাস্টিকের নৌকায় উঠিয়ে ছেড়ে দেয়। খাবার ও পানির অভাবে আমার ভাই মারা গেছে।
একই গ্রামের নিখোঁজ শাহানের ভাই জাকারিয়া জানান, আমার ভাই শাহান হবিগঞ্জের দালাল জসিমের সঙ্গে কিভাবে পরিচিত হয় জানি না। জসিমের কথায় আমরা আশ্বস্ত হয়ে শাহানকে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দেই। দালালের সঙ্গে আমাদের ১২ লাখ টাকার চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী দালালকে অগ্রিম ৬ লাখ টাকা দেই। অথচ দালালরা তাদের কথা রাখেনি। তবে একটি সূত্রে জানতে পেরেছি, শাহান গ্রিসের উপকূলের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। এ বিষয়ে আজ রাতে ভিডিও কলে দেখে নিশ্চিত হতে পারব বলে তার ভাই জানান।
ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্নে দালালদের খপ্পরে পড়ে লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে গ্রিস যাওয়ার পথে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার অন্তত ৬ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা হলেন- উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের আবু মিয়া সর্দারের ছেলে নুরুজ্জামান সর্দার ময়না (৩২), ক্বারি ইসলাম উদ্দিনের ছেলে সাহান এহিয়া (২৪) ও আব্দুল গনির ছেলে মাওলানা সাজিদুর রহমান (২৫); করিমপুর ইউনিয়নের মাটিয়াপুর গ্রামের আনোয়ার হোসেনের ছেলে মেহেদী হাসান তায়েফ (১৯), রাজানগর ইউনিয়নের রনারচর গ্রামের আব্দুল মালিকের ছেলে মুজিবুর রহমান (৪৪), জগদল ইউনিয়নের বাসুরী গ্রামের ছালিকুর রহমানের ছেলে সোহানুর রহমান (১৮)।
এছাড়াও জগদল ইউনিয়নের হালেয়া রাজনগর গ্রামের আরজু মিয়ার ছেলে আব্দুল্লাহ একই বোটের যাত্রী ছিলেন; তিনি নিখোঁজ রয়েছেন।
এ খবর ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ তৎপর হয়ে উঠে। রোববার দিনভর দিরাই থানার ওসি এনামুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে পুলিশ মৃতদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে দালালদের তথ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজখবর নিতে দেখা যায়।
৬ জনের মৃত্যু নিশ্চিত উল্লেখ করে ওসি এনামুল হক চৌধুরী বলেন, দালালদের ধরতে পুলিশ তৎপর রয়েছে, অভিযোগ পেলে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় এমপি নাছির চৌধুরী মৃতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তাদের পরিবারের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। এর সঙ্গে জড়িত দালাল চক্রের মূল হোতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান।
