যে জাতির রাজনীতি থেকে সাহিত্য নির্বাসিত, তার অবক্ষয় অনিবার্য: আবদুল হাই সিকদার
Advertisement
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ০১:১৪ এএম
প্রকৃত আধুনিকতা মানুষের চিন্তা, নৈতিকতা, মানবিকতা ও সৌন্দর্যবোধের বিকাশে নিহিত বলেছেন আবদুল হাই সিকদার।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সাহিত্য ও সংস্কৃতি থেকে রাজনীতি এবং সমাজ যত দূরে সরে যাবে, জাতির নৈতিক অবক্ষয় ততই অনিবার্য হয়ে উঠবে বলে মন্তব্য করেছেন দেশের খ্যাতিমান কবি ও দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক কবি আবদুল হাই সিকদার।
তিনি বলেন, আধুনিকতা মানে অন্ধ অনুকরণ বা বেহায়াপনা নয়; বরং অতীতের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও প্রযুক্তির আলোকে মানবকল্যাণের পথে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেই প্রকৃত আধুনিকতার পরিচয় নিহিত।
শুক্রবার (১৯ জুন) বিকালে জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার মিলনায়তনে কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমির রজতজয়ন্তী উদযাপন ও সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্তদের সম্মাননা স্মারক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি আল মুজাহিদীর মৃত্যুতে এবং একাডেমির প্রয়াত সদস্যদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন ও বিশেষ মোনাজাত করা হয়। একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, লোকগবেষক ও সাংবাদিক মুহম্মদ নূরুল ইসলামের সভাপতিত্বে এবং প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক আজাদ মনসুরের সঞ্চালনায় বিশেষ অতিথি ছিলেন বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্সের মহাপরিচালক এম এম সিরাজুল ইসলাম এবং লেখক-কলামিস্ট অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর। স্বাগত বক্তব্য দেন একাডেমির সাধারণ সম্পাদক ও কথাসাহিত্যিক সোহেল ইকবাল।
কবি আবদুল হাই সিকদার বলেন, বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার বীজ রোপিত হয় ঔপনিবেশিক সময়ে, যখন পাশ্চাত্যের শিক্ষা ও চিন্তাধারার সঙ্গে বঙ্গীয় মননের সংঘাত ও সংমিশ্রণ ঘটে। কিন্তু আধুনিকতার অর্থ নিজের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে বিসর্জন দেওয়া নয়।
তিনি বলেন, আধুনিকতা মানে বেহায়াপনা নয়। যদি তাই হতো, তাহলে আদিম যুগের গুহাবাসী মানুষই সবচেয়ে আধুনিক হতো, কারণ তারা কোনো পোশাক পরিধান করত না। প্রকৃত আধুনিকতা মানুষের চিন্তা, নৈতিকতা, মানবিকতা ও সৌন্দর্যবোধের বিকাশে নিহিত।
দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় আধুনিকতার ধারণাকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যদি আধুনিকতার সব শিক্ষা ইউরোপ থেকেই নিতে হতো, তাহলে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নান্দনিক স্থাপনা তাজমহল কি ইউরোপীয়রা নির্মাণ করেছে? আমাদের নিজস্ব সভ্যতা, ঐতিহ্য ও নন্দনতত্ত্বও বিশ্বসভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, তারা আমাদের ক্রিকেট খেলতে শিখিয়েছে, কিছু প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে শোষণ, বৈষম্য ও বিভাজনের সংস্কৃতিও রেখে গেছে। এগুলোকে আধুনিকতা বলা যায় না। প্রকৃত আধুনিকতা মানুষের বিবেককে জাগ্রত করে, মানবিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করে।
দেশের বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কবি আবদুল হাই সিকদার বলেন, আমাদের রাজনীতিবিদরা চুরি, ডাকাতি, দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অঙ্ক বোঝেন, কিন্তু সাহিত্যকে বোঝেন না। অথচ সাহিত্যই একটি জাতির মনন, বিবেক ও মানবিকতার ভিত নির্মাণ করে। যে জাতির রাজনীতি থেকে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ নির্বাসিত হয়, সেই জাতির নৈতিক অবক্ষয় অনিবার্য হয়ে ওঠে।
কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমির ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, গত ২৫ বছরে সংগঠনটি কেবল একটি সাহিত্য সংগঠন হিসেবেই নয়, বরং জেলার শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। সৃজনশীল প্রকাশনা, সাহিত্যচর্চা এবং নতুন লেখক তৈরিতে একাডেমির ভূমিকা বাংলা সাহিত্যে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন রামু ক্যান্টনমেন্ট ইংলিশ স্কুলের প্রিন্সিপাল লেফটেন্যান্ট কর্নেল ড. মো. আব্দুর রহিম, জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক কবি আকতার উদ্দিন হেলালী, সাংবাদিক ইউনিয়ন কক্সবাজারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জি এ এম আশেক উল্লাহ, কক্সবাজার ডায়াবেটিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল কাইয়ুম, একাডেমির সহসভাপতি ও সাবেক জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নাছির উদ্দিন এবং দৈনিক নিরপেক্ষ পত্রিকার সম্পাদক আতা উল্লাহ খান।
পরে একাডেমির সাবেক সাধারণ সম্পাদক কবি ও অধ্যাপক দিলওয়ার চৌধুরীর সঞ্চালনায় সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্তদের সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়।
সম্মাননাপ্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন সাহিত্য সংগঠক, প্রাবন্ধিক ও কবি অ্যাডভোকেট সুলতান আহমদ (মরণোত্তর), অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব, কথাসাহিত্যিক ও গীতিকার ড. শাহেদ ইকবাল, প্রবীণ সাংবাদিক ও কবি রুহুল কাদের বাবুল,গীতিকার ও কবি ড. আবদুল্লাহ আল মামুন, প্রচ্ছদশিল্পী ও কবি খালিদ আহসান (মরণোত্তর), কক্সবাজারের প্রথম নারী কবি হাসিনা চৌধুরী লিলি, শিক্ষাবিদ ও কবি ঝিনুক জোবাইদা এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, গবেষক ও কবি ড. মোহাম্মদ আলম চৌধুরী।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমির ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে কেক কাটা হয় এবং রজতজয়ন্তী স্মারকগ্রন্থ ‘সমুদ্র সংলাপ’ প্রকাশ করা হয়। এ সময় জেলার কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, সাহিত্যপ্রেমী ও শুভানুধ্যায়ীদের উপস্থিতিতে মিলনায়তনটি এক প্রাণবন্ত সাহিত্যিক পরিবেশে পরিণত হয়।
