Logo
Logo
×

Advertisement

সারাদেশ

কক্সবাজারে হারিয়ে গেছে সহস্রাধিক পুকুর, প্রতি বছর নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর

Advertisement

Icon

বাসস

প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০৩ পিএম

কক্সবাজারে হারিয়ে গেছে সহস্রাধিক পুকুর, প্রতি বছর নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

বিশ্বের তৃতীয় দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকতের স্বীকৃতি পেয়েছে কক্সবাজারের ‘বালুকাময় সৈকত’। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রাকৃতিক বালুর পর্যটনকেন্দ্রও এ সৈকত। আর এ জেলারই ঐতিহ্যবাহী এবং সাধারণ পুকুরগুলো দখল ও ভরাটের কারণে ক্রমান্বয়ে ছোট হয়ে যাচ্ছে। 

পুকুরগুলো ছোট এবং বিলুপ্তির পেছনের মূল কারণ হিসেবে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো অপরিকল্পিত নগরায়ন, বাণিজ্যিকভাবে মাটি ভরাট এবং যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব বলে মনে করছেন।

অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলায় সদর ৪ নম্বর ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন প্রায় সাড়ে ৯ বিঘার বিশাল সরকারি পুকুরটিও ছোট হয়ে যাচ্ছে। 

গত তিন বছরে পুকুরটির পাড় আস্তে আস্তে ভরাট হয়ে আয়তনে ছোট হয়ে গেছে। অথচ বছরের পর বছর প্রতিদিন গড়ে ৫ হাজার মানুষ এ পুকুরটি ব্যবহার করে আসছেন। আর প্রতি হাটবারে অন্তত ২৫-৩০ হাজার মানুষ পুকুরটি ব্যবহার করে থাকেন।

শুধু এ পুকুরটি নয়, একসময় কক্সবাজার জেলায় ছড়িয়ে ছিল ছোট-বড় অসংখ্য পুকুর ও জলাধার। নগরায়নের বিস্তারের সঙ্গে একের পর এক এসব জলাধার ভরাট করে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন, মার্কেট, আবাসিক স্থাপনাসহ বিভিন্ন অবকাঠামো।

সরকারি নথি অনুযায়ী, কক্সবাজার জেলায় থাকা ১০ হাজার ৬৩৭টি পুকুরের মধ্যে বর্তমানে টিকে আছে ৯ হাজার ৫৬০টি। তবে স্থানীয় বাসিন্দা এবং পরিবেশবাদী সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জেলায় পুকুরের সংখ্যা ৭ হাজারের বেশি হবে না।

দেশের পর্যটন শহর কক্সবাজারে এভাবে একের পর এক পুকুর ও জলাধার কমে যাওয়ায় সরাসরি এর প্রভাব পড়ছে পানি নিষ্কাশন, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ ও স্থানীয় তাপমাত্রার ওপর। ফলে সংকট বাড়ছে সুপেয় পানির। এর ফলে মারাত্মক পরিবেশগত সংকট তৈরি হচ্ছে।

জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার জেলায় মোট ৯ হাজার ৫৬০টি পুকুর রয়েছে। এরমধ্যে চকরিয়ায় ৮৮৭টি, কুতুবদিয়ায় ৬৩২টি, কক্সবাজার সদরে ৮৮৪টি, রামুতে ১ হাজার ৯৮০টি, উখিয়ায় ৮৮০টি, মহেশখালীতে ১৯৯টি, পেকুয়ায় ৩ হাজার ৩১৭টি এবং টেকনাফে ৮১৬টি।

অথচ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০১১ সালে কক্সবাজার জেলায় মোট ১০ হাজার ৬৩৭টি পুকুর রয়েছে। এরমধ্যে চকরিয়ায় ৫ হাজার ৬০টি, কুতুবদিয়ায় ১ হাজার ৬৬৬টি, কক্সবাজার সদরে ৯৩৩টি, রামুতে ৮৮৮টি, উখিয়ায় ৮৬৫টি, মহেশখালীতে ৫৭০টি, পেকুয়ায় ৩৮০টি এবং টেকনাফে ২৭৫টি।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, প্রতিবছর যেভাবে পুকুর হারিয়ে যাচ্ছে, তা জেলার জন্য ভয়াবহ অশনি সংকেত। ব্যক্তিমালিকানাধীন ও সরকারি, দুই ধরনের পুকুর ভরাটের কারণে বাড়ছে সুপেয় পানি এবং পরিবেশগত সংকট।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুকুর ভরাট বন্ধে প্রশাসনের অভিযান, জরিমানা ও আইনি বিধান থাকলেও পুরোপুরি থামছে না এর প্রবণতা। কোথাও অভিযান চালিয়ে ভরাট বন্ধ করা ও পুকুর পুনরুদ্ধার করা হলেও কিছুদিন পর আবারও সেখানে মাটি ফেলার অভিযোগ উঠছে।

পুকুর ভরাটের বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, এলাকায় পুকুর বা জলাশয় কমে গেলে বা ভরাট হয়ে গেলে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও জনজীবনে নানা ধরনের মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি হয়। তাই পুকুর ভরাটের অভিযোগ পাওয়া গেলে পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সাথে সাথে ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে জানান তিনি। 

তিনি বলেন, পুকুর শুধু পানি ধরে রাখার জায়গা নয়, প্রতিটি পুকুরের নিজস্ব একটি প্রতিবেশব্যবস্থা রয়েছে। বৃষ্টির সময় পুকুর প্রাকৃতিকভাবে পানি ধারণ করে এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে জলাধারগুলো স্থানীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। পুকুর ও জলাভূমি কমে গেলে আরবান হিট আইল্যান্ড বা তাপদ্বীপের প্রভাব বাড়তে পারে। এতে তাপমাত্রা আরও বেশি অনুভূত হতে পারে এবং জলজ ও স্থলজ জীববৈচিত্র্যেরও ক্ষতি হতে পারে।

কক্সবাজারভিত্তিক পরিবেশ বিষয়ক সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস) চেয়ারম্যান অ্যাড. মুজিবুল হক বলেন, শুধু তাপমাত্রার ওঠানামাকে পুকুর কমে যাওয়ার একক ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি স্থানীয় ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তনও নগরের তাপীয় পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে। 

তিনি বলেন, জলাধারের পানি বাষ্পীভবনের মাধ্যমে আশপাশের পরিবেশকে তুলনামূলক শীতল রাখতে সহায়তা করে। বিপরীতে কংক্রিট, ইট ও পিচসহ নির্মিত পৃষ্ঠ সূর্যের তাপ শোষণ করে ধরে রাখে। ফলে জলাধার কমে এবং নির্মিত এলাকা বাড়লে কিছু এলাকায় তাপীয় অস্বস্তি বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শহরের জন্য অন্তত ১৫ শতাংশ জলাধার থাকা প্রয়োজন। কক্সবাজারে যেভাবে জলাধার ভরাট চলছে, এভাবে চলতে থাকলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রাকৃতিক জলাধার টিকবে না। তখন পানি-নিরাপত্তা, জলাবদ্ধতা, তাপ—সব সংকটই আরও তীব্র হবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

আইনে যা আছে 

প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০ অনুযায়ী, কোনো পুকুর, জলাশয়, নদী, খাল ইত্যাদি ভরাট করা বেআইনি। প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গার শ্রেণি পরিবর্তন বা অন্য কোনোভাবে ব্যবহার, ভাড়া, ইজারা বা হস্তান্তর বেআইনি। কোনো ব্যক্তি এ বিধান লঙ্ঘন করলে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষক আইন (২০১০ সালের সংশোধিত) অনুযায়ী, যেকোনো ধরনের জলাশয় ভরাট করা নিষিদ্ধ।

কক্সবাজারে সুপেয় পানির সংকট

কক্সবাজারের সর্বত্র সুপেয় পানির সংকট চলছে। জেলাশহরসহ ৯ উপজেলার ৭২ ইউনিয়নের সিংহভাগ এলাকাতেই ক্রমে নামছে ভুগর্ভস্থ পানির স্তর। পুকুর বা জলাশয় ভরাট, অনাবৃষ্টি ও বাড়তি তাপমাত্রায় এ ভোগান্তি বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী আবুল মনজুর।

কক্সবাজার পৌরসভা ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের মতে, কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য অগভীর নলকূপ অকেজো হয়ে পড়েছে। 

কক্সবাজারে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিবছর ১০ থেকে ১১ ফুট হারে নিচে নামছে। ১০ বছর আগেও শহরের টেকপাড়ায় ১২০ থেকে ১৫০ ফুটের মধ্যে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পাওয়া যেত। অথচ এখন পানির জন্য যেতে হয় ৩শ’ ফুটের বেশি গভীরে। গত কয়েক বছরে কক্সবাজার সাগরপাড়ের কলাতলী এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১০ থেকে ১৫ ফুট নিচে নেমেছে। ফলে অকেজো হয়েছে সাগরপাড়ের তিন শতাধিক আবাসিক হোটেলের অসংখ্য পানির পাম্প। ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার, পুকুর বা জলাশয় ভরাটের কারণে এমন অবস্থা বলে মনে করছে পরিবেশ অধিদপ্তর।

সুপেয় পানি নিশ্চিত করতে সরকারের উদ্যোগ

কক্সবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী আবুল মনজুর বলেন, কক্সবাজারে ক্রমাগত ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুকুর-লেক বা নদীর পানির ব্যবহার বৃদ্ধি করে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে হবে।

তিনি বলেন, জেলায় সুপেয় পানি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর একাধিক প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বাঁকখালী নদীর পানি শোধনের জন্য একটি বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১০ লাখ লিটার পানি শোধন করা সম্ভব হবে, যা পৌরসভার মোট চাহিদার প্রায় ৫৫ শতাংশ মেটাতে পারবে।

এছাড়াও ভূগর্ভস্থ পানির সংকট দূর করতে এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে সুপেয় পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন এলাকায় রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং প্রকল্প চলমান রয়েছে। পাশাপাশি উখিয়া ও টেকনাফ এলাকায় স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সুপেয় পানির চাহিদা মেটাতে পৃষ্ঠপানি জলাধার ও পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশব্যাপী পুকুর, খাল এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক জলাধার রক্ষায় বেশ কিছু দূরদর্শী ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। পরিবেশ সংরক্ষণ, মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় তার সরকার জলাশয় সুরক্ষাকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়েছে।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

সেন্টমার্টিন ভ্রমণে আসছে নতুন নিয়ম

সেন্টমার্টিন ভ্রমণে আসছে নতুন নিয়ম

৩০ শতক জমির নামজারিতে ঘুস ৯ শতক, উপসচিবসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা

৩০ শতক জমির নামজারিতে ঘুস ৯ শতক, উপসচিবসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা

কক্সবাজার বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক টার্মিনালে পরীক্ষামূলক ফ্লাইট শুরু

কক্সবাজার বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক টার্মিনালে পরীক্ষামূলক ফ্লাইট শুরু

অস্ত্রসহ ৩ রোহিঙ্গা আটক

অস্ত্রসহ ৩ রোহিঙ্গা আটক

কক্সবাজারে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করতে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে: মীর শাহে আলম

কক্সবাজারে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করতে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে: মীর শাহে আলম

মাঠে পর্যাপ্ত লবণ, তারপরও দেড় লাখ টন আমদানির অনুমতি

মাঠে পর্যাপ্ত লবণ, তারপরও দেড় লাখ টন আমদানির অনুমতি

আরও পড়ুন

কক্সবাজারে হারিয়ে গেছে সহস্রাধিক পুকুর, প্রতি বছর নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর

কক্সবাজারে হারিয়ে গেছে সহস্রাধিক পুকুর, প্রতি বছর নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর

মানিকগঞ্জ পৌরসভায় যোগ দিলেন নতুন প্রশাসক

মানিকগঞ্জ পৌরসভায় যোগ দিলেন নতুন প্রশাসক

জামাইয়ের সঙ্গে মেয়ের বিচ্ছেদ, দুধ দিয়ে গোসল করলেন মা!

জামাইয়ের সঙ্গে মেয়ের বিচ্ছেদ, দুধ দিয়ে গোসল করলেন মা!

ভূমিহীন তাছলিমার নিয়োগপত্র বাতিল, এমপির হস্তক্ষেপে পেলেন চাকরি

ভূমিহীন তাছলিমার নিয়োগপত্র বাতিল, এমপির হস্তক্ষেপে পেলেন চাকরি

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম